উম্মতে মুহম্মদী সাঃ Ummat-e-Muhammadi SAW

  • Home
  • Bangladesh
  • Dhaka
  • উম্মতে মুহম্মদী সাঃ Ummat-e-Muhammadi SAW

উম্মতে মুহম্মদী সাঃ  Ummat-e-Muhammadi SAW আসসালামু আলাইকুম

24/08/2023

আল্লাহর পেয়ারে হাবিব বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সাঃ) দেখতে কেমন ছিলেন

মহান রাব্বুল আল আমিন আসমান, জমিন, গ্রহ-নক্ষত্রসহ সকল কিছুই সুনিপুণ ভাবে সৃষ্টি করেছেন। সেই মহান সৃষ্টিকর্তা তাঁর পেয়ারে হাবিব নবী মুহাম্মদ (সাঃ) কে কিভাবে সৃষ্টি করেছেন? তিনি দেখতেই বা কেমন ছিলেন? প্রতিটি মুমিনেরই তা জানতে ইচ্ছা করে। যদিও রাসূল (সা.) এর পবিত্র সৌন্দর্যের যথার্থ বর্ণনা করা কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। তবুও যে সকল সাহাবা (রাঃ) গণ মুহাম্মদ (সাঃ) কে সরাসরি দেখেছেন, তাঁদের বর্ণনা ও হাদিসে পাকের আলোকে আমরা জানার চেষ্টা করবো আমাদের বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সাঃ) দেখতে কেমন ছিলেন?

হযরত জাবির (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) বলেছেন, মিরাজের রাতে আমার সম্মুখে নবীদের হাজির করা হয়। সে সময় মুসা (আ.)-কে আমি দেখলাম, তিনি যেন শানুআহ গোত্রের একজন পুরুষ। আমি ঈসা ইবনে মারিয়াম (আ.)-কেও লক্ষ করেছি, আমার দেখা লোকদের মাঝে তিনি উরওয়াহ ইবনে মাসউদের মতো।

আমি ইব্রাহীম (আ.)-কেও লক্ষ করেছি, আমার দেখা লোকদের মাঝে তিনি তোমাদের বন্ধুর মতো, (বন্ধু বলতে তিনি নিজেকে বুঝিয়েছেন)। জিবরাঈল (আ.)-কেও আমি লক্ষ করেছি, তিনি আমার দেখা লোকদের মাঝে দিহয়া ইবনে খলিফা আল ক্বালবির মতো।’ (সহীহ মুসলিম, হা/৪৪১; তিরমিজি, হাদিস : ৩৬৪৯; মুসনাদে আহমদ, হা/১৪৬২৯ সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৬২৩২ জামেউস সগীর, হা/৭৪৫১; মিশকাত, হা/৫৭১৪)

হযরত কুরতুবী (রহ.) বলেন, "রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি স্বরূপে আমাদের মাঝে আবির্ভূত হতেন, তাহলে তাঁকে সম্পূর্ণরূপে অবলোকন করা কারুর পক্ষেই সম্ভব হত না।" (খাসায়েলে মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম – মুফতি সুলাইমান)।

হযরত আবু তুফায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখেছি তবে তাকে যারা দেখেছেন তাঁদের মধ্যে আমি ছাড়া কেউ ভূপৃষ্ঠে বেঁচে নেই। (বর্ণনাকারী বললেন) আমি বললাম আপনি আমার কাছে তাঁর বিবরণ পেশ করুন। তিনি বললেন, তিনি ছিলেন শুভ্রকায় ও লাবণ্যময় সুসামঞ্জস্যপূর্ণ। (সহীহ মুসলিম, হ/৬২১৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩৮৪৮; আদাবুল মুফরাদ, হা/৭৯০; শারহুস সুন্নাহ, হা/৩৬৪৮; জামেউস সগীর, হা/৮৭৫১; মিশকাত, হা/৫৭৮৫)

হযরত জাবির ইবনে সামুরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একবার পূর্ণিমা রাত্রির স্নিগ্ধ আলোতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে লাল চাদর ও লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় দেখলাম। তখন আমি একবার তাঁর দিকে ও একবার চাঁদের দিকে তাকাতে থাকলাম। মনে হলো তিনি আমার কাছে পূর্ণিমার চাদের চেয়ে অধিকতর চমৎকার। (মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৭৩৮৩; মারেফাতুস সাহাবা, হা/১৪৩৫; মিশকাত, হা/৫৭৯৪; তিরমিজি; দারেমি)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে কাআব (রহ.) বলেন, ‘আমি আমার পিতা কাআব ইবনে মালিক (রা.)-কে তাঁর তাবুক যুদ্ধে না যাওয়ার ঘটনা বর্ণনা করতে শুনেছি। তিনি বলেন, আমি রাসুল (সা.)-কে সালাম করলাম, খুশি ও আনন্দে তাঁর চেহারা ঝলমল করে উঠল। তাঁর চেহারা আনন্দে এমনই টগবগ করত, মনে হতো যেন চাঁদের একটি টুকরা। তাঁর মুখমণ্ডলের এ অবস্থা থেকে আমরা তা বুঝতে পারতাম।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৫৫৬, বুখারি : ১/৫০২)

হযরত রবি বিনতে মোয়াওয়েয (রা.) বলেন, তোমরা যদি রাসূল (সা.)-কে দেখতে, তখন মনে হতো যে, যেন উদিত সূর্যকে দেখছ। (মোসনাদে দারেমী, মেশকাত ২/৫১৭)।

হযরত আবু কারসানার মা এবং খালা আবু কারাসানার সঙ্গে রাসূল (সা.) এর কাছে বায়াতের জন্য আসেন। অতঃপর ফিরে যাওয়ার পথে তারা বললেন, ‘আমরা এমন সুদর্শন মানুষ আর দেখিনি। আমরা তাঁর মুখ থেকে আলো বিকীর্ণ হতে দেখেছি।’ (আল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়া ১/২৫৫)।

হযরত আলী (রা.) যখনই প্রিয়নবী (সা.)-এর দেহ মোবারকের বর্ণনা দিতেন, তখন বলতেন, "নবী (সা.) অত্যধিক লম্বাও ছিলেন না এবং একেবারে বেঁটেও ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন লোকদের মধ্যে মধ্যম আকৃতির। তার মাথায় চুল একেবারে কোঁকড়ানো ছিল না এবং সম্পূর্ণ সোজাও ছিল না; বরং মধ্যম ধরনের কোঁকড়ানো ছিল। তিনি অতি স্থূলদেহী ছিলেন না এবং তার চেহারা মোবারক একেবারে গোল ছিল না; বরং লম্বাটে গোল ছিল। গায়ের রঙ ছিল লাল-সাদা সংমিশ্রিত। চোখের বর্ণ ছিল কালো এবং পলক ছিল লম্বা ও চিকন। হাড়ের জোড়াগুলো ছিল মোটা। পুরো দেহ মোবারক ছিল পশমহীন, অবশ্য পশমের চিকন একটি রেখা বুক থেকে নাভি মোবারক পর্যন্ত লম্বা ছিল। দুই হাত এবং দুই পায়ের তালু ছিল মাংসে পরিপূর্ণ। যখন তিনি হাঁটতেন তখন পা পূর্ণভাবে উঠিয়ে মাটিতে রাখতেন, যেন তিনি কোনো উঁচু জায়গা থেকে নিচের দিকে নামছেন। যখন তিনি কোনোদিকে তাকাতেন তখন ঘাড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে তাকাতেন। উভয় কাঁধের মাঝখানে ছিল মোহরে নবুওয়াত বা নবী হওয়ার অলৌকিক নিদর্শন। তিনি ছিলেন মানুষের মধ্যে অধিক দানশীল, সবচেয়ে বেশি সত্যভাষী। তিনি ছিলেন সবচেয়ে কোমল স্বভাবের এবং বংশের দিক থেকে সম্ভ্রান্ত এবং মর্যাদার অধিকারী। যে ব্যক্তি তাঁকে হঠাৎ দেখত, সে ভয় পেত (গুরুগম্ভীরতার কারণে)। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পরিচিত হয়ে তার সঙ্গে মিশত, সে তাকে অনেক ভালোবেসে ফেলত। নবী (সা.)-এর গুণাবলী বর্ণনাকারী এ কথা বলতে বাধ্য হন যে, আমি তার আগে ও পরে তার মতো কাউকে কখনও দেখতে পাইনি।" (বোখারী শরীফ: ১/৫০২, শামায়েলে তিরমিজি : ২৫৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৪৬; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৪১৯৪; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৬৩১১)

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব দীর্ঘ ছিলেন না আবার খাটোও ছিলেন না। তিনি ধবধবে সাদা কিংবা বাদামী বর্ণেরও ছিলেন না। তাঁর চুল একেবারে কোঁকড়ানো ছিল না, আবার একদম সোজাও ছিল না। ৪০ বছর বয়সে আল্লাহ তা’আলা তাকে নবুওয়াত দান করেন। এরপর মক্কায় ১০ বছর এবং মদিনায় ১০ বছর কাটান। আল্লাহ তা’আলা ৬০ বছর বয়সে তাঁকে ওফাত দান করেন। ওফাতকালে তাঁর মাথা ও দাড়ির ২০টি চুলও সাদা ছিল না। (সহীহ বুখারী, হা/৫৯০০; সহীহ মুসলিম, হা/৬২৩৫; মুয়াত্তা মালেক, হা/১৬৩৯; ইবনে মাজাহ, হা/১৩৫৪৩; মুসনাদুল বাযযার, হা/৬১৮৯; শারহুস সুন্নাহ হা/৩৬৪, হা/৩৭৩৫; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৬৩৮৭; মুসনাদে আবু ই’আলা, হা/৩৮৩২)

হযরত বারাআ ইবনে আজিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মধ্যমাকৃতির ছিলেন। তাঁর দুই কাঁধের মধ্যবর্তী অংশ ছিল তুলনামূলক প্রশস্ত। তাঁর ঘন চুলগুলো কানের লতি পর্যন্ত লম্বা ছিল। তাঁর দেহে লাল লুঙ্গি ও লাল চাদর শোভা পেত। আমি তাঁর তুলনায় সুদর্শন কাউকে কখনো দেখিনি। (সহীহ বুখারী, হা/৩৫৫১; সহীহ মুসলিম, হা/৬২১০; নাসাঈ, হা/৫২৩২)

হযরত বারা ইবনে আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুলবিশিষ্ট লাল চাদর ও লাল লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেয়ে সুদর্শন কাউকে দেখিনি। তাঁর কেশগুচ্ছ ছিল কাঁধ বরাবর। তাঁর দু’কাঁধের মধ্যবর্তী স্থান অন্যদের তুলনায় কিছুটা প্রশস্ত ছিল। তিনি অধিক খাটো বা অধিক দীর্ঘাকৃতির ছিলেন না। (সহীহ মুসলিম, হা/৬২১১; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮৫৮১)

হযরত আবু তোফায়েল বলেন, তিনি ছিলেন গৌর রং-এর, চেহারা ছিল মোলায়েম। তাঁর উচ্চতা ছিল মাঝারি ধরনের। (সহিহ মুসলিম: ২/২৫৮)।

হযরত জাবির ইবনে সামুরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুখ প্রশস্ত ছিল। চোখের শুভ্রতার মাঝে কিছুটা লালিমা ছিল। পায়ের গোড়ালি স্বল্প মাংসল ছিল। শু’বা (রহঃ) বলেন, আমি সিমাক (রহঃ) কে বললাম, ضَلِيعُ الْفَمِ (যলী’উল ফাম) কী? তিনি বললেন, বড় মুখগহ্বর বিশিষ্ট। আমি আবার বললাম, أَشْكَلُ الْعَيْنِ (আশকালুল ’আইন) কী? তিনি বললেন, ডাগর চক্ষুবিশিষ্ট। আমি বললাম, مَنْهُوسُ الْعَقِبِ (মানুহূসুল আক্বিব) কী? তিনি বললেন, সরু গোড়ালি বিশিষ্ট। (সহীহ মুসলিম, হা/৬২১৬; মুসনাদে আহমাদ, হা/২১০২৪; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৬২৮৯; জামেউস সগীর, হা/৮৯৫২; মিশকাত, হা/৫৭৮৪; মুসলিম, হাদিস ২৩৩৯; তিরমিজি, হাদিস : ৩৬৪৬)

হযরত আনার (রা.) বলেন, তিনি আযহারুল লাউন তথা লালিমা মিশ্রিত শ্বেত বর্ণের অধিকারী ছিলেন। (বোখারী শরীফ: ১/৫০২)

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুভ্রতায় ছিলেন রৌপ্যের ন্যায় এবং তাঁর চুলগুলো ছিল কিছুটা কোঁকড়ানো। (জামেউস সগীর, হা/৮৭৪৮; সিলসিলা সহীহাহ, হা/২০৫৩)

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, তিনি এত সুন্দর, নান্দনিক এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ছিলেন যেন তাঁর পবিত্র দেহখানা পূর্ণিমার চন্দ্র দ্বারা ধৌত করা হয়েছে। (শামায়েলে তিরমিযী)।

হযরত জাবির ইবনে সামুরাহ (রা.) বলেন, "রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চুল এবং দাড়ির সামনের অংশ সাদা হয়ে গিয়েছিল। তিনি যখন তেল দিতেন (সাদা) চুল তখন দেখা যেত না, আর যখন চুল অগোছালো হতো তখন দেখা যেত। তাঁর দাড়ি প্রচুর ঘন ছিল।" জনৈক লোক বলল, 'নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেহারা কি তলোয়ারের মতো ছিল?' হজরত বারা ইবনে আযেব (রা.) বলেন, "না, তাঁর চেহারা ছিল সূর্য ও চন্দ্রের মতো (উজ্জ্বল) গোলাকার। আমি তাঁর পিঠের উপরিভাগে কবুতরের ডিমসদৃশ নবুয়তের মোহর দেখেছি। এটির রং ছিল তাঁর গায়ের রঙের মতো।" ( সহীহ বোখারী : ১/৫০২, ৩৫৫২; সহীহ মুসলিম ২/২৫৯; মুসলিম, হাদিস : ৫৯৭৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮৫০১; দারেমী, হা/৬৪; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৬২৮৭)

হযরত হাসান বিন আলী বলেন, আমার মামা হিন্দ বিন আবু হালাকে (রা.) রাসুল (সা.)-এর অবয়ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। তিনি নবীজি (সা.)-এর পুরো শরীরের বর্ণনা দেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, "হুজুর (সা.)-এর কপালে ছিল বেশ উন্নত। ভ্রু ছিল সরু ও ঘন পাপড়ি বিশিষ্ট। দুই ভ্রু জোড়া আলাদা ছিল। মাঝখানে একটি রগ ছিল। নবীজি (সা.) যখন রাগ হতেন, তখন তা ভেসে উঠত। নাক ছিল খাড়া উঁচু। ভালোভাবে না দেখলে মনে হত তিনি প্রকাণ্ড নাক বিশিষ্ট। নাক থেকে এক ধরনের নূর চমকাত।" (শামায়েলে তিরমিজি)

হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, তাঁর সম্মুখের দাঁতগুলি পৃথক পৃথক ছিল। অর্থাৎ মাঝে ফাঁক ছিল, ঘন ছিল না। যখন তিনি কথা বলতেন, তখন এই দাঁত মোবারক হতে যেন নূর ঠিকরে পড়ত। (মেশকাত শরীফ ২য় খন্ড, ৫৭১ পৃষ্ঠা)।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, "রাসুল (সা.)-এর সম্মুখের দাঁত দুটির মাঝে কিছুটা ফাঁক ছিল। যখন তিনি কথাবার্তা বলতেন, তখন মনে হতো উক্ত দাঁত দুটির মধ্য দিয়ে যেন নূর বিচ্ছুরিত হচ্ছে।" (দারেমি)

হযরত হিন্দ ইবনে আবি হালা (রা.) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেহাবয়ব সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, তাঁর ঘাড় মোবারক এত সুন্দর ও সূক্ষ্ম ছিল, যেমন কোনো ভাস্কর্যের গর্দান। (শামায়েলে তিরমিযী)

হযরত আলী (রা.) হতে বর্ণিত আছে, প্রিয় নবীজির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উভয়স্কন্ধের হাড়সমূহ বড়সড় ছিল। (আর-রাহীকুল মাখতুম ৭৫২ পৃষ্ঠা)।

হযরত হিন্দ ইবনে আবি হালা (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি পেট ও বক্ষের সমতল স্থুল দেহের অধিকারী ছিলেন। মেদভুড়ি সম্পন্ন ছিলেন না। (শামায়েলে তিরমিযী)

প্রশস্ত বক্ষের অধিকারী ছিলেন এবং তাঁর বক্ষের উপরি অংশে পশমও ছিল। তবে উভয় স্তন পশম শূন্য ছিল। (শামায়েলে তিরমিযী)।

হযরত আনাস (রা.) বলেন, রাসুল (সা.)-এর হাত গোশতে পূর্ণ ছিল। তাঁর পরে আমি কোনো লোককে এমন দেখিনি। আর রাসুল (সা.)-এর চুল ছিল মাঝারি ধরনের, অধিক কোঁকড়ানোও না, অধিক সোজাও না। (বুখারি, হাদিস : ৫৯০৬)

হযরত জাবের ইবনে সামুরা (রা.) থেকে বর্ণিত, শৈশবে রাসুল সা. তার গালে হাত বুলিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি তার হাতে এমন শীতলতা ও সুগন্ধি অনুভব করেছি, যেন তিনি তা সুগন্ধির কস্তুরি থেকে বের করেছেন’। (মুসলিম, হাদিস ২৩২৯)

হযরত হিন্দ ইবনে আবি হালা (রা.) বলেন, নবী কারিম (সা.) এর হস্তদ্বয় প্রশস্ত, গোশতে পরিপূর্ণ ও নরম ছিল। আঙ্গুলসমূহ একই ধরনের লম্বা ছিল। অর্থাৎ অন্য লোকদের তুলনায় একটু লম্বা ধরনের ছিল। হ্যাঁ, তবে সীমাতিরিক্ত লম্বা ছিল না যে, অসুন্দর দেখা যায় এবং আঙ্গুলের জোড়া শক্ত ও বড় ছিল। (শামায়েলে তিরমিযী)।

হযরত আনাস (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) ছিলেন শুভ্র উজ্জ্বল বর্ণের। তাঁর ঘাম যেন মুক্তার মতো। তিনি চলার সময় সম্মুখপানে ঝুঁকে চলতেন। আমি নরম কাপড় বা রেশমকেও তাঁর হাতের তালুর মতো নরম পাইনি এবং মিশক ও আম্বরের মধ্যেও রাসুল (সা.)-এর শরীরের চেয়ে অধিক সুগন্ধ পাইনি। (মুসলিম, হাদিস : ৫৯৪৮)

হযরত আনাস (রা.) বলেন, রাসুল (সা.)-এর মাথা ও দুই পা ছিল মাংসপূর্ণ। তাঁর আগে ও তাঁর পরে আমি তাঁর মতো অন্য (কাউকে অধিক সুন্দর) দেখিনি। তাঁর হাতের তালু ছিল চওড়া। (বুখারি, হাদিস : ৫৯০৭)

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.)-এর দুই পা ছিল মাংসপূর্ণ। চেহারা ছিল সুন্দর। আমি তাঁর পরে তাঁর মতো কাউকে দেখিনি।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৯০৯)

হযরত হিন্দ ইবনে আবি হালা (রাযি.) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) এর পায়ের তলা খানিকটা গর্ত ছিল। (শামায়েলে তিরমিযী)

হযরত আবু জুহাইফা রা.-কে রাসুল সা. সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছেন, "রাসুল (সা.) দেখতে ছিলেন অনেকটা হাসান ইবনে আলী (রা.)এর মতো। (বুখারী, হাদিস ৩৫৪৩)

বান্দার প্রতি আল্লাহর এক অব্যাহত অপার অনুগ্রহ হলো, তিনি কাউকে কাউকে স্বপ্নযোগে রাসুল সা.-এর দর্শন লাভের সুযোগ দান করেন। এই স্বপ্ন সত্য। রাসুল সা. ইরশাদ করেছেন- যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নযোগে দেখেছে, সে আমাকেই দেখেছে। কেননা, শয়তান আমার রূপ ধারণ করতে পারে না। (বুখারী, হাদিস ২৫৫২)

আল্লহ রাব্বুল আল-আমিন আপনিই তো আল গাফফার, আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, অজ্ঞতার কারণে যদি কোনোরূপ সত্য গোপন, অসত্য উপস্থাপন, কুফরি, বেদাত, ইসলামী ঐক্য বিনষ্ট, বিভেদ, বেয়াদবি, শানের বরখেলাপ, ধৃষ্টতা, অবমাননা সংগঠিত হয়ে থাকে, তবে আমাদেরকে আপনি ক্ষমা করে দিন। আপনিই তো আল আলিম, আপনার হিকমা ও ইলম এর আলোকে আমাদের অজ্ঞতার অন্ধকারকে দূর করে দিন।
-আমিন

20/08/2023

খতেমুন্নাবিয়্যীন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর মোহরে নব্যুয়ত মোবারক

হুজুর আকরাম (সাঃ) এর স্কন্ধ দ্বয়ের মধ্যবর্তী স্থানে মোহরে নবুওয়াত ছিলেন, তিনি নবুয়তের ধারা সমাপ্তকারী ছিলেন। মোহরে নবুওয়াত ছিল ঈষৎ উঁচু মাংস বিশেষ, যা শরীরের বর্ণের মতোই ছিল স্বচ্ছ ও নূরানী। উক্ত মাংসপিণ্ডের মোহরে নবুওয়াত বা খাতমুন নবুয়ত বলা হয়। ختم ‘খতেম’ শব্দের তা বর্ণে যবর দিয়ে فاعل ‘ফায়েল' বা কর্তৃকারক পদ হয়, তার অর্থ হচ্ছে, কোন কিছুর শেষ প্রান্তে পৌছে তার পূর্ণতা সাধনকারী। আর যদি খতেম শব্দটির তা বর্ণে যবর দিয়ে পড়া হয়, তখন অর্থ হবে মহর বা আংটি।

সার্বিক ভাবে خاتم النبين ‘খাতামুন্নাবিয়্যীন' এর অর্থ দাঁড়ায়, তার পর আর কোনাে নবীর আবির্ভাব হবে না। সর্বশেষ নবী যে তিনি, তার প্রমাণ হচ্ছে মহরে নবুওয়াত। খতেমুন্নাবিয়্যীন হিসাবে তাকে আখ্যায়িত করার কারণ এই যে, পূর্ববর্তী বিভিন্ন আসমানী কিতাবে তার পরিচিতি এভাবেই প্রদান করা হয়েছে। সুতরাং মহরে নবুওয়াতখানি একটি নিদর্শন, যা দেখে মানুষ বুঝে নিতে পারে যে, তিনিই ঐ আখেরী যমানার নবী যে সম্পর্কে পূর্বে সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে। মোহরে নবুওয়াত আল্লাহ তায়ালার মহান নিদর্শনাবলীর অন্যতম নিদর্শন যা দ্বারা হুজুর আকরাম (সাঃ) কে বিশেষিত করা হয়েছে। সাহাবায়ে কেরামে (রাঃ) এর মাঝে যারা সেটি দেখেছে, তাদের বর্ণনায় তুলে ধরা হলো-

হযরত সায়িব ইবনে ইয়াযীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমার খালা আমাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে গেলেন। এরপর তিনি আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার ভাগ্নে অসুস্থ। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার মাথায় হাত বুলালেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু’আ করলেন। তারপর তিনি ওযু করলেন। আমি তাঁর ওযুর অবশিষ্ট পানি পান করলাম এবং তাঁর পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সহসা তাঁর দু’কাঁধের মধ্যস্থ মোহরে নবুওয়াতের প্রতি আমার দৃষ্টি পড়ে, যা দেখতে পাখির (কবুতরের) ডিমের মতো। (সহীহ বুখারী, হা/১৯০; সহীহ মুসলিম, হা/৬২৩৩; মুজামুল কাবীর, হা/৬৫৪০: শারহুস সুন্নাহ, হা/৩৬২২ মিশকাত, হা/৪৭৬)

হযরত জাবির ইবনে সামুরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দু’কাঁধের মধ্যবর্তী স্থানে মোহরে নবুওয়াত দেখেছি। আর তা যেন ছিল ডিমের ন্যায় লাল মাংসপিণ্ড। (সহীহ মুসলিম, হা/৬২৩০; মুসনাদে আহমাদ, হা/২১০৩৬; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৪১৯৭; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৬৩০১ জামেউস সগীর, হা/৮৯৩৯ মিশকাত, হা/৫৭৭৯)

হযরত আবু যায়েদ আমর বিন আখতাব আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, হে আবু যায়েদ! আমার কছে এসো এবং আমার পৃষ্ঠদেশে হাত বুলাও। তখন আমি তাঁর পিঠে হাত বুলাতে থাকলাম। এক পর্যায়ে আমার আঙ্গুলগুলো মোহরে নবুওয়াতের উপর লেগে গেল। বর্ণনাকারী আমর বিন আখতাব (রাঃ) কে বললেন, ’খাতাম’ (মোহরে নবুওয়াত) কী জিনিস? তিনি বললেন, এক গুচ্ছ কেশ। (মুসনাদে আহমাদ, হা/২২৯৪০: মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৪১৯৮)

দুনিয়াতে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত মহিলা সাহাবি হযরত রুমায়সা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সা’দ ইবনে মুয়ায (রাঃ) এর ওফাতের দিন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে, তাঁর মৃত্যুতে রহমান (আল্লাহ তা’আলা) এর আরশ কেঁপে উঠেছিল। রুমায়ছা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এ উক্তি করেন তখন আমি তাঁর এত নিকটে ছিলাম যে, ইচ্ছে করলে তাঁর মোহরে নবুওয়াত চুম্বন করতে পারতাম। (মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬৮৩৬; মুজামুল কাবীর, হা/২০১৬৫; মারেফাতুস সাহাবা, হা/৭০০৫)

হজরত আবু বুরায়দা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মদিনায় হিজরতের পর একবার সালমান ফারসী (রাঃ) একটি পাত্রে কিছু কাঁচা খেজুর নিয়ে এলেন এবং তিনি তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে রাখলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে সালমান! এগুলো কিসের খেজুর? (অর্থাৎ হাদিয়া না সাদাকা?) তিনি বললেন, এগুলো আপনার ও আপনার সার্থীদের জন্য সাদাকা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এগুলো তুলে নাও। আমরা সাদাকা খাই না।

বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর তিনি তা তুলে নিলেন। পরের দিন তিনি অনুরূপ খেজুর নিয়ে আসলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে পেশ করেন। তখন তিনি বললেন, সালমান! এসব কিসের খেজুর? সালমান (রাঃ) বললেন, আপনার জন্য হাদিয়া। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীগণকে বললেন, তোমরা হস্ত প্রসারিত করো (হাদিয়া গ্রহণ করো)। এরপর সালমান (রাঃ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পৃষ্ঠদেশে মোহরে নবুওয়াত দেখতে পেলেন; অতঃপর ঈমান আনলেন।

বর্ণনাকারী বলেন, সালমান (রাঃ) জনৈক ইয়াহুদির গোলাম ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এত এত দিরহামের বিনিময়ে এবং এ শর্তে খরিদ করেন যে, সালমান তাঁর ইয়াহুদি মনিবের জন্য একটি খেজুর বাগান করে দেবে এবং তাতে ফল আসা পর্যন্ত তত্ত্বাবধান করতে থাকবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নিজ হাতে একটি চারা ছাড়া সবগুলো রোপণ করলেন এবং একটি চারা গাছ ওমর (রাঃ) রোপণ করেছিলেন। সে বছরই সকল গাছেই খেজুর আসল কিন্তু একটি গাছে খেজুর আসল না। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ গাছটির এ অবস্থা কেন? উমার (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এটি রোপণ করেছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ চারাটি উপড়িয়ে আবার রোপণ করলেন। ফলে সে বছরই তাতে খেজুর আসল। (মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩০৪৭ শারহুল মা’আনী, হা/২৯৮৬; মুসনাদুল বাযযার, হা/৪৪০৭)

হযরত আবু নজর আওয়াকী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মোহরে নবুওয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তখন তিনি বললেন, তা ছিল তাঁর পৃষ্ঠদেশের উপর এক টুকরো বাড়তি মাংস। (জামেউস সগীর, হা/৮৯৩৯; সিলসিলা সহীহাহ, হা/২০৯৩)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সারজিস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আসলাম। তখন তিনি তাঁর সাহাবীগণের মাঝে ঘুরতেছিলেন। এক পর্যায়ে আমি তাঁর পিছু ধরলাম। তিনি আমার মনোবাঞ্ছনা বুঝতে পেরে পিঠ থেকে চাদর সরিয়ে ফেলেন। তখন আমি তাঁর দু’কাঁধের মধ্যবর্তী স্থানে মোহরে নবুওয়াত দেখতে পাই। আর তা ছিল মুষ্টিবদ্ধ আঙ্গুলীর ন্যায় এবং এর চারপার্শ্বে আচিলের মতো কতগুলো তিলক শোভা পাচ্ছিল। এরপর আমি তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালাম এবং বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন। তখন তিনি বললেন, তোমাকেও ক্ষমা করুন। তারপর লোকে আমাকে বলতে লাগল, তুমি বড়ই সৌভাগ্যবান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমার মাগফিরাত কামনা করেছেন। তখন তিনি বললেন, হ্যাঁ, তিনি তোমাদের জন্যও দু’আ করেছেন। এরপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করেন

وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ

(হে রাসূল!) আপনি আপনার জন্য এবং মুমিন পুরুষ ও নারীদের জন্য মাগফিরাত কামনা করুন। [সূরা মুহাম্মাদ- ১৯] (সুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ, হা/১১৪৩২ মারেফাতুস সাহাবা, হা/৩৭৩১)

হযরত জাবির ইবনে সামুরাহ (রা.) বলেন, ""রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চুল এবং দাড়ির সামনের অংশ সাদা হয়ে গিয়েছিল। তিনি যখন তেল দিতেন (সাদা) চুল তখন দেখা যেত না, আর যখন চুল অগোছালো হতো তখন দেখা যেত। তাঁর দাড়ি প্রচুর ঘন ছিল।" জনৈক লোক বলল, 'তাঁর চেহারা ছিল তরবারির মতো।' জাবির (রা.) বলেন, "না, তাঁর চেহারা ছিল সূর্য ও চন্দ্রের মতো (উজ্জ্বল) গোলাকার। আমি তাঁর পিঠের উপরিভাগে কবুতরের ডিমসদৃশ নবুয়তের মোহর দেখেছি। এটির রং ছিল তাঁর গায়ের রঙের মতো।" (মুসলিম, হাদিস : ৫৯৭৮)

হযরত মুহাম্মদ ইব্‌ন ইসহাক হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, 'তিনি বলেন, এক ইহুদী মক্কায় বাস করত। সে সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য করতো। রাসূলুল্লাহ (সা) যে রাতে ভূমিষ্ঠ হন সে রাতে কুরাইশ এর এক মজলিসে সে বলল, আজ রাতে কি তোমাদের মধ্যে কারও কোনও সন্তানের জন্ম হয়েছে? জবাবে তারা বলল, আল্লাহর কসম!! আমরা এ রকম কিছুই জানি না। ইহুদীটি বলল, আল্লাহু আকবার! তোমাদের অজান্তে ঘটে থাকলে তো কোনও অসুবিধা নেই। তবে তোমরা খোজ করে দেখ এবং যা বলছি। স্মরণ রাখো। এ রাতে আখেরী নবী ভূমিষ্ঠ হয়েছেন। তাঁর দুই কাধের মধ্যবর্তী স্থানে একটি চিহ্ন আছে। তাতে ঘোড়ার কেশরের মত একগুচ্ছ চুল আছে। দুরাত তিনি দুধ পান করবেন না। কারণ একটি দুষ্ট জিন তাঁর মুখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিয়েছে। ফলে তাঁকে দুধ পান থেকে নিবৃত্ত রাখা হয়েছে। শুনে লোকজন মজলিস ছেড়ে উঠে। চতুর্দিক ছড়িয়ে পড়ে। ইহুদীর কথায় তারা হতভম্ভ স্তম্ভিত! ঘরে গিয়ে প্রত্যেকে তারা ঘরের লোকদেরকে এ খবরটি শুনায়। শুনে তারা বলে উঠে, হ্যাঁ, আল্লাহর শপথ! আব্দুল্লাহ ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিবের একটি পুত্ৰ সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে। তারা তার নাম রেখেছে মুহাম্মদ। এবার তারা ইহুদীর কথা ও এই নবজাতক সম্পর্কে কানাঘুষা করতে করতে ইহুদীর নিকট যায় এবং তাকে এ খবরটি জানায়। ইহুদীটি বলল, তোমরা আমাকে নিয়ে চল, আমি তাকে একটু দেখব। লোকেরা ইহুদীকে নিয়ে আমেনার ঘরে গিয়ে তাকে বলল, তোমার পুত্রটিকে একটু আমাদের কাছে দাও। আমেনা পুত্ৰকে তাদের কাছে দিলে তারা তার পিঠের কাপড় সরিয়ে ইহুদীর বর্ণিত নিদর্শনটি দেখতে পায়। সাথে সাথে ইহুদী অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তার জ্ঞান ফিরলে লোকেরা তাকে বলল, কী ব্যাপার, আপনার হয়েছে কি? ইহুদীটি বলল, আল্লাহর শপথ? নবুওত বনী ইসরাঈল থেকে বিদায় নিল! তোমরা এতে আনন্দিত হও, হে কুরাইশের দল!! আল্লাহর শপথ, তোমাদের সহায়তায় তিনি এমন বিজয় লাভ করবেন যে, প্রাচ্যে-প্রতীচ্যে তীর সুসমাচার ছড়িয়ে পড়বে।'

আল্লহ রাব্বুল আল-আমিন আপনিই তো আল গাফফার, আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, অজ্ঞতার কারণে যদি কোনোরূপ সত্য গোপন, অসত্য উপস্থাপন, কুফরি, বেদাত, ইসলামী ঐক্য বিনষ্ট, বিভেদ, বেয়াদবি, ধৃষ্টতা সংগঠিত হয়ে থাকে, তবে আমাদেরকে আপনি ক্ষমা করে দিন। আপনিই তো আল আলিম, আপনার হিকমা ও ইলম এর আলোকে আমাদের অজ্ঞতার অন্ধকারকে দূর করে দিন।
-আমিন

18/08/2023

হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর নবুয়্যতের স্বীকৃতি স্বরূপ পবিত্র আসমানি কেতাব কুরআন মজিদ নাজিলের ঘটনা

যুবক মুহাম্মদ (সঃ) ছিলেন সৎ চরিত্র, সত্যবাদি, আমানতরক্ষাকারী। সে কারণেই সমগ্র আরবে তিনার উপাধি ছিলো আল-আমীন। গত্রীয় পরিচয়ে মুহাম্মদ (সাঃ) কে সবাই সম্মান করলেও, তিনি ব্যাক্তিগতভাবে তেমন সম্পদশালী ছিলেন না। তিনি ছিলেন এতিম। অপরপক্ষে খাদিজা (রাঃ) ছিলোন তৎকালীন আরবের অভিজাত পরিবারের ধনাঢ্য বিধবা মহিলা।

'মক্কার অভিজাত ও ধনী নারী ছিলেন খাদিজা বিনতে খোওয়াইলিদ (রা.)। রূপ ও গুণেও তিনি ছিলেন অনন্যা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চারিত্রিক মাধুর্য ও বিশ্বস্ততার কথা শুনে খাদিজা (রা.) তাঁকে নিজের ব্যাবসায়িক প্রতিনিধি হিসেবে সিরিয়ায় পাঠানোর প্রস্তাব দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রস্তাবে রাজি হলে নিজের ক্রীতদাস মাইসারাকেও তাঁর সঙ্গে পাঠান।

এ বাণিজ্যিক সফরে মহানবী (সা.) দ্বিগুণ মুনাফা অর্জন করেন। সিরিয়া পৌঁছানোর পর একজন খ্রিস্টান পাদরি মহানবী (সা.)-কে দেখে নবী হওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করেন। এ ছাড়া মাইসারা লক্ষ করেন, চলার পথে চলমান মেঘমালা মহানবী (সা.)-কে ছায়া প্রদান করছে। সফর থেকে ফেরার পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সততা, বিচক্ষণতা ও মাইসারার বর্ণনা শুনে খাদিজা (রা.) তাঁকে বিয়ের করার মনস্থ করেন।' (সিরাতে ইবনে হিশাম, পৃষ্ঠা ৪৬)

'খাদিজা (রা.) অভিভাবকতুল্য চাচাতো ভাই ওরাকা ইবনে নওফেলের সঙ্গে পরামর্শ এবং বান্ধবী নাফিসা বিনতে মুনাব্বিহের কাছে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তারা উভয়ে তাকে অগ্রসর হওয়ার পরামর্শ দেন। নাফিসা মহানবী (সা.)-এর কাছে প্রস্তাব দিলে তিনি সম্মত হন এবং চাচাদের তা অবগত করেন। রাসুল (সা.)-এর চাচা হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব খাদিজা (রা.)-এর পরিবারের কাছে প্রস্তাব নিয়ে যান।

উভয় পরিবারের সম্মমিতে তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিশুদ্ধ মতে বিয়ের সময় মহানবী (সা.)-এর বয়স ২৫ বছর এবং খাদিজা (রা.)-এর বয়স ৪০ বছর ছিল। বাণিজ্যিক সফর থেকে ফেরার দুই মাস পর বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। মহানবী (সা.) খাদিজা (রা.)-কে মহর হিসেবে ২০টি উট প্রদান করেন। যার তৎকালীন বাজারমূল্য ছিল পাঁচিসশ দিরহাম।' (আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃষ্ঠা ৭৭; সিরাতে মোস্তফা : ১/১০৮)

হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন যে,' রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে লক্ষ্য করে একবার বলেছিলেন, ‘আল্লাহ–তায়ালা আমাকে খাদিজার চেয়ে উত্তম বিকল্প দান করেননি। কারণ মানুষ যখন কুফরি করেছে, খাদিজা তখন আমার প্রতি ঈমান এনেছে। মানুষ যখন আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, খাদিজা তখন আমাকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছে। মানুষ যখন আমাকে সবকিছু থেকে বঞ্চিত করেছে, সে তখন নিজের সম্পদ নিয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে। কুরাইশ নারীদের সন্তানরা যখন আমাকে বঞ্চিত করছিল, আল্লাহ তখন আমাকে খাদিজার গর্ভে সন্তান দান করেছেন।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৪,৮৬৪)

বিবাহ পরবর্তীতে খাদিজা (রাঃ) তাঁর সকল ধন-সম্পদ, প্রাণ প্রিয় স্বামী মুহাম্মদ (সাঃ) কে উপহার হিসাবে দিয়ে দেন। এই অঢেল ধন-সম্পদ, বিত্ত-বৈভব, জৌলুশ, সামাজিক মান, মর্জাদা, সম্মান, কতৃত্ব কোনো কিছুর প্রতি মুহাম্মদ (সাঃ) আসক্ত ছিলেন না। গরীব-দুঃখীদের প্রতি তিনি ছিলেন অতিব দানশীল ও সদয়। এই বিষয়ে বিবি খাদিজা (রাঃ) এর বরাবর সম্মতি ও উৎসাহ ছিলো।

'সুবহানাল্লাহ! আল্লাহর রাসুলের দান-সদকার প্রতি কতটা আগ্রহ ছিল, তাঁর একটি হাদিস দ্বারা এর কিঞ্চিৎ ধারণা পাওয়া যায়। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, আমার কাছে যদি উহুদ পাহাড়ের সমান সোনা থাকত, তাহলেও আমার পছন্দ নয় যে তিন দিন অতিবাহিত হওয়ার পর তার কিছু অংশ আমার কাছে থাকুক। তবে এতটুকু পরিমাণ ছাড়া, যা আমি ঋণ পরিশোধ করার জন্য রেখে দিই।' (বুখারি, হাদিস : ২৩৮৯)

আল্লাহ রাব্বুল আল-আমিন এভাবেই মুহাম্মদ (সাঃ) এর দারিদ্র্যতা, পার্থিব চাহিদা, লোভ-লালসা, ক্ষমতা লিপসার সীমা অতিক্রম করান।

সে সময় আরব ছিলো অন্ধকারে নিমজ্জিত আইয়ামে জাহেলিয়া এর যুগ। আরবদের মধ্যেকার নানারূপ ধর্মীয় অনাচার, পাপাচার, কুসংস্কার, অবিচার, হানাহানি, খুনাখুনি, পাষন্ডতা, হিংস্রতা যুবক মুহাম্মদ (সাঃ) কে বেথিত করে তুলতো। তৎকালীন আরবে মেয়েদের কোনো অধিকার বা মূল্য ছিলো না। আরবরা পুত্র সন্তানের আশায়, তাদের ভুমিষ্ট হওয়া বেশিরভাগ কন্যা সন্তান মাটিতে জীবন্ত পুঁতে ফেলতো।মুহাম্মদ (সাঃ) না পরছিলেন সে সব প্রতিহত করতে, না পরছিলেন মন থেকে মেনে নিতে। মুহাম্মদ (সাঃ) ধীরে ধীরে নির্জনতা ও একাকীত্ব প্রিয় হয়ে যান।

'পুরো রমাযান রাসূলুল্লাহ (ষাঃ) হেরা গুহায় অবস্থান করে আল্লাহ তা’আলার ইবাদাত বন্দেগীতে লিপ্ত থাকেন। বিশ্বের দৃশ্যমান বস্তুনিচয়ের অন্তরাল থেকে যে মহাশক্তি প্রতিটি মুহুর্তে সকল কিছুকে জীবন, জীবিকা ও শক্তি জাগিয়ে চলেছেন, সেই মহা মহীয়ান ও গরীয়ান সত্ত্বার ধ্যানে মশগুল থাকতেন। স্বগোত্রীয় লোকদের অর্থহীন বহুত্ববাদী বিশ্বাস ও পৌত্তলিক ধ্যান-ধারণা তাঁর অন্তরে দারুন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করত। কিন্তু তাঁর সামনে এমন কোন পথ খোলা ছিল না যে পথ ধরে তিনি শান্তি ও স্বস্তির সঙ্গে পদচারণা করতে সক্ষম হতেন।' (আল্লামা সুলায়মান মানসুরপুরী, রহমাতুল্লি­ল ‘আলামীন ১ম খন্ড ৪৭ পৃষ্ঠা, ইবনে হিশাম ১ম খন্ড, ২৩৫ ও ২৩৬ পৃষ্ঠা। ফী যিলালিল কুরআন: ২৯/১৬৬ পৃষ্ঠা)

মুহাম্মদ (সা.) এর বয়স চল্লিশে পৌঁছার অনেক আগে থেকেই তিনি (সা.) হেরার গুহায় নির্দিষ্ট মেয়াদে সময় কাটাতে থাকেন। বয়ঃপ্রাপ্তি বা বিয়ের পর থেকে প্রতিবছরই তিনি (সা.) রমজানের একমাস এখানে নির্জনবাস করতেন। জাহিলি যুগে এ ধরনের নির্জনবাস প্রথা কোরায়েশরাও পালন করতেন। কিছু খাবার ও পানি সাথে নিয়ে তিনি হেরা পর্বতের গুহায় ইবাদত ও ধ্যানমগ্ন অবস্থায় অবস্থান করা শুরু করেন। খাবার ও পানি ফুরিয়ে গেলে বাসায় এসে, সেগুলো নিয়ে আবার গুহায় ফিরে যেতেন। বিবি খাদিজা (রাঃ)ও প্রায়ই তার প্রাণ প্রিয় স্বামীর জন্য খাবার নিয়ে ঐ উচু পহাড়ে আরহণ করতেন। লোক মারফত জরুরত পৌঁছে দিতেন, খোঁজ-খবর রাখতেন। বিবি খাদিজা (রাঃ) তার স্বামী মুহাম্মদ (সাঃ) কে অত্যন্ত ভালবাসতেন এবং তাঁর আধ্যাতিক অবস্থা বুঝতেন।

মুহাম্মদ (সাঃ) এর বয়স তখন চল্লিশ পূর্ণ হওয়ার পূর্বে, আল্লাহ রাব্বুল আল-আমিন এর অদৃশ্য ইশারায় মুহাম্মদ (সাঃ) লাগাতার হেরার গুহায় ইবাদত ও ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। এই সময়কালে, তিনি নানারকম ঐশ্বরিক স্বপ্ন দেখা শুরু করেন। তিনি যখনই কোনো স্বপ্ন দেখতেন তা প্রতীয়মান হতো সুবহে সাদিকের মতো। সকল স্বপ্ন তিনি বিবি খাদিজা (রাঃ) এর নিকট বর্ণনা করতেন। বুদ্ধিমতী বিবি খাদিজা (রাঃ) সে সব স্বপ্নের গভীর অর্থ না বুঝলেও, ঐশ্বরিক বিষয় অনুধাবন করতেন। এবং প্রাণ প্রিয় স্বামীকে সমর্থন ও সাহস যোগাতেন। এরপর ধীরে ধীরে ঐশ্বরিকতা একটু একটু করে প্রকট হতে থাকে। স্বপ্ন দর্শণের পাশাপাশি মুহাম্মদ (সাঃ) হেরার গুহায় ধ্যান মগ্ন অবস্থায়, প্রায়ই শুনতে পেতেন কেউ তার নাম “ইয়া মুহাম্মদ!” (সাঃ) বলে ডাকছে। তিনি চোখ খুলে কাউকে না দেখে, ভীত হয়ে পরতেন। সাথে সাথে বাসায় এসে সব কথা বিবি খাদিজা (রাঃ) এর নিকট বলতেন। এভাবে মুহাম্মদ (সাঃ) এর বয়স চল্লিশ পূর্ণ হওয়ার পর, প্রতিদিন একাধিকবার ঐ ডাক শুনতে পেতেন। বিবি খাদিজা (রাঃ) এর নিকট এইসব ঘটনা খুলে বলায়, বিবি খাদিজা (রাঃ) অভয় দিয়ে, পরামর্শ দিলেন, এর পরেরবার যখন কেউ আপনাকে ডাকবে তখন আপনি ভয় না পেয়ে, বরং জিজ্ঞেস করবেন, "আপনি কে?" এবং "আমাকে কেন ডাকছেন?"

এর পরে আবার তিনি শুনতে পেলেন কেউ “ইয়া মুহাম্মদ!” (সাঃ) বলে ডাকছে। সাথে সাথে তিনি দাঁড়িয়ে চারদিক তাকিয়ে, কাউকে না দেখে, উপরের দিকে তাকালেন। উপরে তাকাতেই তিনি ফেরেশতা জিব্রাইল (আঃ) (Arabic: جبريل, Jibrīl or جبرائيل, Jibrāʾīl) এর বিশাল আকৃতি দেখে, ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে দৌড়ে বাড়িতে এসে বিবি খাদিজা (রাঃ) কে সব খুলে বললেন। বিবি খাদিজা (রাঃ) সব সময় মুহাম্মদ (সঃ) কে অভয় এবং উৎসাহ দিতেন। পরবর্তিতে আবার মুহাম্মদ (সঃ) হেরার গুহায় ফিরে গিয়ে ধ্যান মগ্ন হলেন। দুদিন পার হয়ে গেলো কিন্তু আর কিছুই ঘটলো না।

নবুওয়াত গ্রহণের প্রস্তুতি হিসাবে মুহাম্মাদ (সঃ) কে আল্লাহ রাব্বুল আল-আমিন প্রায় ছয় মাসকাল বিভিন্ন আধ্যাতিকতার সংস্পর্শে এনে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করেছেন।

হযরত হাফেয ইবনে হাজার বলেন যে, 'বায়হাকী এ ঘটনা উদ্ধৃত করেছেন যে, স্বপ্নের সময় ছয় মাস ছিল। অতএব স্বপ্নের মাধ্যমে নবুওয়তের শুরু চলি­শ বছর পূর্ণ হবার পরে রবিউল আওয়াল মাসেই হয়েছিল। যা তাঁর জন্ম মাস ছিল। কিন্তু জাগ্রত অবস্থায় তাঁর নিকট রমাযান মাসে ওহী আসা আরম্ভ হয়েছিল।' ফাতহুলবারী ১ম খন্ড ২৭ পৃষ্ঠা।

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, "হেরা গুহায় অবস্থানকালে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে ফেরেশতা এসে বলল, ‘পাঠ করুন’। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, আমি বললাম, ‘আমি পড়তে জানি না।

তিনি (সা.) বলেন, অতঃপর সে আমাকে জড়িয়ে ধরে এমন ভাবে চাপ দিল যে আমার খুব কষ্ট হলো। এভাবে তিনবার করার পর তাঁকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, ‘পাঠ করুন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। যিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্তপিণ্ড থেকে, পাঠ করুন, আর আপনার প্রতিপালক অতিশয় দয়ালু। (সুরা আলাক, আয়াত : ১-৩)

এ আয়াত নিয়ে আল্লাহর রাসুল (সা.) প্রত্যাবর্তন করলেন। তাঁর হৃদয় তখন কাঁপছিল।

তিনি খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদের এর কাছে এসে বললেন, আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত কোরো, আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত কোরো। তারা তাঁকে চাদর দ্বারা আবৃত করলেন। এমনকি তাঁর শঙ্কা দূর হলো। তখন তিনি খাদিজা (রা.)-এর কাছে ঘটনাবৃত্তান্ত জানিয়ে তাঁকে বললেন, আমি আমার নিজেকে নিয়ে শঙ্কা বোধ করছি। খাদিজা (রা.) বললেন, আল্লাহর কসম, কখনোই নয়। আল্লাহ আপনাকে কখনো লাঞ্ছিত করবেন না। আপনি তো আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সদাচরণ করেন, অসহায় দুস্থদের দায়িত্ব বহন করেন, নিঃস্বকে সহযোগিতা করেন, মেহমানের আপ্যায়ন করেন এবং হক পথের দুর্দশাগ্রস্তকে সাহায্য করেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩)

এই সময়কালটি ছিলো ৬১০ খ্রিস্টাব্দের রমজান মাসের এক সম্মানিত রাত। এ রাতকে 'শবে কদর' (ফার্সি: شب قدر‎‎) বা 'লাইলাতুল কদর' (আরবি: لیلة القدر‎‎) বলা হয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘রমজান মাস, যে মাসে নাজিল করা হয়েছে আল–কোরআন, মানুষের জন্য হিদায়াত রূপে এবং পথনির্দেশনার প্রমাণ ও সত্য-মিথ্যা পার্থক্য নির্ণয়কারী হিসেবে (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ২৮৫)।’

পবিত্র রমজান মাসের এক বিশেষ রাত সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আল-আমিন বলেছেন, ‘আমি তো এ কোরআন অবতীর্ণ করেছি এক লাইলাতুল মুবারকে (সৌভাগ্যের রাত্রিতে) আমি তো সতর্ককারী।’ (সুরা দুখান, আয়াত: ৩)

আল্লাহ আরও বলেন, ‘আমি এ কোরআন অবতীর্ণ করেছি লাইলাতুল কদরে (মহিমান্বিত রাত্রিতে)।’ (সুরা কদর, আয়াত: ১)

লাইলাতুল কদরের তারিখের ব্যাপারে নবী করীম (সা.) এরশাদ করেন, ‘আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়েছে, অতঃপর আমাকে তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। অতএব তোমরা শেষ দশ রাতের বেজোড় রাতসমূহে তা খোঁজ করবে।’ (বুখারি, হাদিস নম্বর : ৭০৯)।

রাসুল (সা.) আরো বলেন, ‘রমজানের শেষ দশ দিনে তোমরা কদরের রাত তালাশ করো।’ (মুসলিম, হাদিস নম্বর : ১১৬৯)। আর এ রাতগুলো হলো ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯।

একদা হজরত উবায়দা (রা.) নবী করীম (সা.)-কে লাইলাতুল কদরের রাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তখন নবীজি সেই সাহাবিকে বললেন, ‘রমজানের শেষের দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোকে তালাশ করো।’ (বুখারি, হাদিস নম্বর : ২০১৭)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যদি কেউ লাইলাতুল কদর খুঁজতে চায় তবে সে যেন তা রমজনের শেষ দশ রাতে খোঁজ করে।’ (মুসলিম, হাদিস নম্বর : ৮২৩)।

এরপর খাদিজা (রা.) তার চাচাত ভাই ওরাকা বিন নাওফালের কাছে নবীজিকে নিয়ে গেলেন। অন্ধকার যুগে ওরাকা বিন নাওফাল খ্রিস্টান ধর্ম অবলম্বন করেছিলেন এবং ইবরানি ভাষা পড়তে ও লিখতে শিখেছিলেন। এক সময় তিনি ইবরানি ভাষায় কিতাব লিখতেন। কিন্তু যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে সে সময় তিনি অত্যন্ত বৃদ্ধ এবং অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। খাদিজা (রা.) তাকে বললেন, ‘ভাইজান, আপনি আপনার ভাতিজার কথা শুনুন। তিনি কী যেন সব কথাবার্তা বলছেন এবং অস্থির হয়ে পড়ছেন।’ ওরাকা বললেন, ‘ভাতিজা, বল তো তুমি কী দেখেছ? কী হয়েছে তোমার? রাসুলুল্লাহ (স.) যা কিছু প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং হেরা গুহায় যেভাবে যা ঘটেছিল সবকিছু সবিস্তারে বর্ণনা করলেন। সবকিছু শোনার পর বিস্ময়-বিহ্বল কণ্ঠে ওরাকা বলে উঠলেন, ‘ইনিই তো সেই জন, যিনি মুসা (আ.)-এর কাছেও আগমন করেছিলেন।’ (তাবারি ২য় খণ্ড, পৃ-২০৭; ইবনে হিশাম ১ম খণ্ড, পৃ-২৩৭-২৩৮)

তারপর ওরাকা আরও বলতে থাকলেন, ‘হায়! হায়! যেদিন আপনার স্বজাতি এবং স্বগোত্রীয় লোকেরা আপনার ওপর নানাভাবে অত্যাচার করবে এবং আপনাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করবে সেদিন যদি আমি শক্তিমান ও জীবিত থাকতাম।’ ওরাকার মুখে এ কথা শোনার পর রাসুলুল্লাহ (স.) অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘একী! ওরা আমাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করবে?’ ওরাকা বললেন, ‘হ্যাঁ, তারা অবশ্যই আপনাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করবে।’ তিনি আরও বললেন ‘শুধু আপনিই নন, অতীতে এ রকম বহু ঘটনা ঘটেছে। যখনই জনসমাজে কোনো সত্যের বার্তাবাহকের আবির্ভাব ঘটেছে তখনই তার গোত্রীয় লোকেরা নানাভাবে তার উপর জুলম, নির্যাতন চালিয়েছে এবং দেশ থেকে বহিষ্কার করেছে।’ তিনি আরও বললেন, ‘মনে রাখুন আমি যদি সেই সময় পর্যন্ত জীবিত থাকি তাহলে আপনাকে আমি সবরকম সাহায্য করব।’ কিন্তু এর কিছুকাল পরেই ওরাকা মৃত্যুবরণ করেন..। (সহিহ বুখারি, অধ্যায়-ওহি নাজিলের বর্ণনা, ১ম খণ্ড, পৃ- ২ ও ৪৩)

ওরাকা এর উৎসাহসূচক কথাবার্তা ও আশ্বাসের বাণীতে মহানবী (সাঃ) স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন (ফেললেন)। নবীজী (সাঃ) ও বিবি খাদিজা (রাঃ) এর মনে তখন কিছুটা ভয়ের উদ্রেক হলেও, তারা আনন্দের সাথেই বাড়িতে ফিরলেন।

এরপর থেকে নবীজী (সাঃ) এর উপর ঘনঘন ওহী নাজিল হতে লাগলো। যখনি কোনো আয়াত নাজিল হতো, তখন তিনি কোনোকিছু দিয়ে শরীর আবৃত করে শুয়ে পড়তেন, এবং তার শরীর থেকে তখন ঘাম নির্গত হতো। আয়াতগুলো নাজিল হতেই তিনি সেটা মুখস্ত করে ফেলতেন, এবং বিবি খাদিজা (রাঃ) কে সেটা শুনাতেন। বিবি খাদিজা (রাঃ) ও সেটা মুখস্ত রাখতেন। পরবর্তীতে নাজিলকৃত আয়াত সমূহ অন্যান্য বিবিগণ ও সাহাবীগণও নবীজি (সাঃ) র মুখে শুনে শুনে মুখস্থ রাখতেন।

এভাবেই হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর নবুয়্যতের স্বীকৃতি সরূপ পবিত্র আসমানী কেতাব কুরআন মজিদ ৬১০ খ্রিস্টাব্দে রমজান মাসের কোনো এক মর্জাদাপূর্ণ রাতে নাযিল শুরু হয়, যখন ফেরেশতা জিবরাইল (আঃ) মক্কা নগরীর হেরা পর্বতে, সর্ব প্রথম কোরআনুল করিমের সূরা আলাক্ব এর আয়াত নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) কে পাঠ করান। আর এই অহী প্রাপ্তির ধারাবাহিকতা ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে খতমে নবুয়্য হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর ইন্তেকালের মাধ্যমে পরিসমাপ্তি ঘটে।

আল্লহ রাব্বুল আল-আমিন আপনিই তো আল গাফফার, আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, অজ্ঞতার কারণে যদি কোনোরূপ সত্য গোপন, অসত্য উপস্থাপন, কুফরি, বেদাত, ইসলামী ঐক্য বিনষ্ট, বিভেদ, বেয়াদবি, ধৃষ্টতা সংগঠিত হয়ে থাকে, তবে আমাদেরকে আপনি ক্ষমা করে দিন। আপনিই তো আল আলিম, আপনার হিকমা ও ইলম এর আলোকে আমাদের অজ্ঞতার অন্ধকারকে দূর করে দিন।
-আমিন

Address

Mohammadpur
Dhaka
1207

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when উম্মতে মুহম্মদী সাঃ Ummat-e-Muhammadi SAW posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Place Of Worship

Send a message to উম্মতে মুহম্মদী সাঃ Ummat-e-Muhammadi SAW:

Share