19/11/2021
■■ গীবত বা পরনিন্দা যিনার চেয়েও জঘন্য অপরাধ!
************************************************
■■ আপনি কি চান যে, আপনার কষ্টের নেক আমল ধ্বংস হয়ে যাক? তাহলে বেশি বেশি করে গীবত বা পরনিন্দা করতে থাকুন! আর তা না চাইলে গীবত বা পরনিন্দা করা থেকে নিজেকে বিরত রাখুন।
■■▪গীবত কী? গীবতের শাস্তি এবং তা থেকে বাঁচার উপায় নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা উপস্থাপন
করা হলোঃ
●● গীবত হচ্ছে কারো অসাক্ষাতে তার বিরুদ্ধে কোন আলোচনা-সমালোচনা করা ও দোষত্রুটি বর্ণনা করা।
●▪গীবত বা পরনিন্দা যিনা বা ব্যাভিচারের চেয়েও জঘন্যতম গুনাহ।
●▪গীবত মানুষের ঈমান ও আমল ধ্বংস করে দেয়। পার্থিব ও অপার্থিব কল্যাণ দূর করে দেয়। ইসলামে কাউকে সামনে থেকে নিন্দা করাও মারাত্মক অপরাধ।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছেঃ
-------"পেছনে ও সামনে প্রত্যেক পরনিন্দাকারীর জন্য দুর্ভোগ-ধ্বংস।"
-----(সূরা, হুমাজাহ, আয়াত : ০১)
●▪হাদীসে এমন কথাও এসেছে যে, এমন লোকও হাসরের মাঠে থাকবে যে, ৮০ বৎসর ইবাদত করেও কিয়ামতের দিন তার কোন আমল কাজে আসবে না!
■▪হাদীসের এই কথাটির দ্বারা কি বুঝা গেলো?
আপনি আমি তো আল্লাহর অশেষ দয়ায়
■■ আলহামদুলিল্লাহ! আমরা সবাই অনেক আমলই করছি!
■▪কিন্তু, আমাদের আমলের খাতায় একটি ছোট ছিদ্র বা ফুটো তৈরী হয়ে আছে! যে ছিদ্র বা ফুটো দিয়ে আমাদের নেক আমল গুলো ঝড়ে পরে যাচ্ছে!
■▪এক সময় দেখা যাবে, আমলনামায় কিছুই নেই। সব একদম খালি!
■▪সেই ছিদ্র গুলো তৈরী হয়, শুধুমাত্র গীবত করা এবং গোপনে গুনাহের মাধ্যমে।
■■ হাদীসে এসেছেঃ
-------"কিয়ামতে এমন লোকও উপস্থিত হবে, যার আমল পর্বত মালার সমান। কিন্তু, সে গোপনে গুনাহ করায় তার আমল গুলো চুর্ণ বিচুর্ণ করে দেওয়া হবে।
■■ প্রিয় পাঠক! একটু চিন্তা করে দেখুন!
■▪আপনি আমি তো অনেক আমলই করছি, আর ভাবছি যে, ভালো কাজের বিনিময়ে তো জান্নাত পেয়ে যেতেই পারি!
■▪কিন্তু, শুধু আমল করাই তো শেষ নয়! বরং আমল টিকিয়ে রাখা দরকার। তাই গীবত বা পরনিন্দা এবং গোপনে পাপ করা থেকে বিরত থাকতে হবে!
■■ গীবতের কয়েকটি উদাহরণঃ
●▪কাউকে নিয়ে হাসাহাসি করা!
●▪দীর্ঘ দেহবিশিষ্ট লোককে লম্বু,▪খর্ব লোককে বামুন,▪কালো লোককে নিগ্রো,▪উজ্জ্বল লোককে সাদা,▪টেরা ইত্যাদি বললে দেহ সম্পর্কে গীবত হয়ে যায়!
●▪কোনো ব্যক্তিকে কোনো হীন পেশাদারের সন্তান বললে তার বংশ সম্বন্ধে গীবত হয়ে যায়!
●▪কাউকে▪নিন্দুক,▪মিথ্যাবাদী,▪গর্বিত, ▪কাপুরুষ,▪অলস ইত্যাদি বললে তার প্রকৃতি সম্পর্কে গীবত করা হয়!
●▪কাউকে▪বিশ্বাসঘাতক,▪হিংষুক,▪আমানত খেয়ানতকারী,▪অসংযমী,▪অতিরিক্ত আহারকারী, ▪হারামখোর,▪অধিক নিদ্রা যায়,▪পোশাক পরিচ্ছদ পরিষ্কার রাখে না,▪আয় অনুযায়ী ব্যয় করে না ইত্যাদি বলা তার ক্রিয়াকলাপ সম্বন্ধে গীবত।
●▪কারো সম্পর্কে যদি বলা হয়,▪তার পোশাক বেসামাল,▪আস্তিন ঢিলা,▪আচল দীর্ঘ তা হলে তার বসন-ভূষণ সম্পর্কে গীবত করা হলো!
●▪গীবত কেবল মুখ দ্বারাই হয় না। চোখ, হাত এবং ইঙ্গিত দ্বারাও গীবত হয়ে থাকে। সব ধরণের গীবতই হারাম।
●●শহযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ আমি একদিন মহানবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ'লাহি ওয়াসাল্দাম এর নিকট ইশারায় প্রকাশ করেছিলাম যে, অমুক মহিলা বেটে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ
-------"হে আয়েশা! তুমি গীবত করলে!"
■■ অর্থাৎ, এক জনের অনুপস্থিতিতে এমন কিছু বলা বা করা, যা ঐ ব্যক্তি জানলে কষ্ট পেতো।
■▪আবার এই কথাও ভাব্বেন না যে, আমিতো ঐ লোকের সামনেও এই কথা গুলো বলতাম! কেনো না, কারো কোন বিষয়ে সামনে কথা বললেও যদি সেই কথায় সে কষ্ট পায় তাহলে তা বলা নিষেধ। কেনো না, কারো মনে কষ্ট দিয়ে কোন কথা বলা নিষেধ
■■▪সুতরাং, চুপ থাকাই হচ্ছে একটা ইবাদত।
■■ পরনিন্দা সম্পর্কে আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ
-------"পরনিন্দা ব্যভিচারের চেয়েও ঘৃণ্য ও জঘন্যতম। পরনিন্দাকারী এবং পরনিন্দা শ্রবণকারী উভয়ই সমান অপরাধী।"
■▪যার মধ্যে যে দোষ নেই, তা যদি বলা হয়, তাহলে তা হবে মিথ্যা অপবাদ। আর যদি সত্যি হয়, তখন তা হবে গীবত। এই প্রসঙ্গে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
-------"কারো সম্বন্ধে তার অগোচরে এমন কোনো কথা যদি বলা হয়, যা শুনলে তার নিকট অপ্রীতিকর বোধ হয়, তবে সে কথা সত্য হলেও গীবত।"
-------আবু হুরাইরা(রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ "তোমরা আন্দাজ-অনুমান থেকে বেঁচে থেকো। কেননা অনুমান করে কথা বলা সবচেয়ে বড় মিথ্যা!"
-----(বুখারি, হাদীস নং: ২২৮৭; মুসলিম, হাদীস নং: ২৫৬৩)
■■ মহান আল্লাহ্ তা'আলা ইরশাদ করেনঃ
-------"কোনো সম্প্রদায় যেন অপর কোনো সম্প্রদায়কে বিদ্রুপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রুপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর কোনো নারীও যেন অন্য নারীকে বিদ্রুপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রুপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর তোমরা একে অপরের নিন্দা করো না এবং তোমরা একে অপরকে মন্দ উপনামে ডেকো না। ঈমানের পর মন্দ নাম কতইনা নিকৃষ্ট! আর যারা তাওবা করে না, তারাই তো জালিম।"
-----(সূরা, হুজরাত, আয়াত : ১১)
■■ সব ধরনের অশ্লীলতা ও অশালীন উক্তি ইসলামে নিষিদ্ধ। যে কথা শুনে মানুষ কষ্ট পায়, তাই অশালীন। কারো সম্পর্কে অপ্রীতিকর বাক্য না বলাই হচ্ছে শালীনতা। ইসলামের আগমন হয়েছে মানুষকে শালীনতা ও সৌহার্দ্য শিক্ষা দেয়ার জন্য। তাই শালীনতাকে ইসলাম মানুষের মর্যাদার মাপকাঠি হিসাবেও নির্ধারণ করেছে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছেঃ
-------"আল্লাহ তা’আলার নিকট ওই ব্যক্তি বেশি মর্যাদাবান যে বেশি শালীন ও পরহেজগার।"
■■ গীবত বা পরনিন্দার শাস্তিঃ
গীবতের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে হাদীসেএসেছেঃ -------"তোমরা গীবত বা পরনিন্দা করা থেকে বেঁচে থাকবে। কারণ তাতে রয়েছে তিনটি মারাত্মক ক্ষতি। যথাঃ▪গীবতকারীর দু'আ কবুল হয় না!▪গীবতকারীর কোনো নেক আমল কবুল হয় না এবং▪আমলনামায় তার পাপ বৃদ্ধি হয়ে থাকে।"
-----(বুখারি)
■▪আল্লাহ্ তা'আলা বলেনঃ
-------"হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের পেছনে নিন্দা করো না। তোমাদের কেউ কী স্বীয় মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তা একেবারেই ঘৃণাই করো।"
-----(সূরা, হুজরাত : আয়াত ১২)
■▪রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ
-------"আমার প্রতিপালক যখন আমাকে মিরাজে নিয়েছিলেন,তখন আমি এমন একশ্রেণীর মানুষের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলাম; যাদের নখগুলো ছিল পিতলের নখের মতো। যার দ্বারা তারা নিজেদের চেহারা এবং বুক খামচাচ্ছিল। আমি এ লোকগুলোর ব্যপারে হজরত জিবরাইল আলাইহিস সালামকে জিজ্ঞাসা করলে, তিনি বলেছিলেন, "এরা সেইসব ব্যক্তি, যারা দুনিয়াতে মানুষের গোশত খেতো এবং তাদের ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলতো।"
-----(মিশকাত)
■■▪আর মানুষের গোশত খাওয়ার মানে হলো অন্যের গিবত করা।
-------"যে ব্যক্তি অপর মুসলমানের দোষ অনুসন্ধান করে আল্লাহ তার দোষ অনুসন্ধান করেন। আল্লাহ যার দোষ অনুসন্ধান করেন তাকে লাঞ্চিত ও অপমানজনক শাস্তি দিবেন।"
-----(তিরমিজি)
■■ পরিশেষে বলছি, গীবত করা হারাম এবং কবিরা গুনাহ। গীবতের মাধ্যমে আল্লাহর হক ও বান্দার হক দুটোই নষ্ট করা হয়। মানবজীবনে পরনিন্দা ও পরচর্চায় পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি হয়, বিদ্বেষ জন্ম নেই এবং সমাজের শান্তি-শৃংখলা বিনষ্ট হয়। তাই গীবত পরিত্যাগ করা অত্যন্ত জরুরি।
■■ গীবত থেকে বাঁচার জন্য করণীয়ঃ
●▪০১) হযরত থানবী (রহঃ) বলেনঃ
-------"কারো গীবত করে ফেললে যার গীবত করা হয়েছে তার কাছে গিয়ে জানাবে যে, আমি আপনার গীবত করে ফেলেছি। আমাকে মাফ করে দিন।"
●▪০২) মুখ খোলার পূর্বে চিন্তা করা যে, যা বলতে যাচ্ছি তাতে গুনাহ হবে না তো?
●▪০৩) মেয়েদের গীবত রোগের বড় চিকিৎসা হলো, এক স্থানে জমা না হওয়া। কেননা, তারা নিজের বাড়ী বা একাকী থাকলে গীবত হয় না। কিন্তু যেই সে বাইরে যায় বা বাড়ীতে অন্য মেয়েরা আসে তখনই 'গীবত-শেকায়েত শুরু হয়।
●▪০৪) ভাল কথাও বেশি না বলা। কেননা, ভাল ভাল কথা দীর্ঘ হলে মাঝে মাধ্যে অসতর্কবশত দোষ বের হয়ে যায়।
●▪০৫) অপরকে সব সময় নিজের থেকে ভালো মনে করা। ফলে তার দোষ চোখে না পড়ায় পরে তার গীবত হবে না।
●▪০৬) যেসব মহিলা গীবতে অভ্যস্ত, তাদের কাছে না যাওয়া। গেলেও গীবত করার সুযোগ না দেওয়া।
●▪০৭) গীবত করতে মনে চাইলে গীবতের দুনিয়াবী এবং পরকালীন পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা করা ইত্যাদি।
■▪মহান আল্লাহ্ তা'আলা আমাদের সবাইকে সঠিক এবং পরিপূর্ণ ভাবে জানার, বোঝার এবং মেনে চলার ও সকল প্রকার হিংসা, বিদ্বেষ এবং গীবত করা থেকে বিরত থাকার তাওফীক দান করুন এবং আমাদেরকে ক্ষমা, কবুল এবং হিফাযত করুন (আ-মীন)।।