02/11/2025
প্রশ্ন (২৬): কোনো ব্যক্তি মারা গেলে মাইকিং করে তার মৃত্যুর সংবাদ দেওয়া যাবে কি
উত্তর : না, মাইকিং করে মৃত্যুর সংবাদ দেওয়া যাবে না। কেননা এটি জাহেলী প্রথা। তবে নিকটাত্মীয়, পরিচিতজন ও মুসলিমদের নিকটে সাধারণভাবে টেলিফোন, মোবাইল কিংবা সামাজিক যেকোনো যোগাযোগ মাধ্যমে মৃত্যু সংবাদ জানাতে পারবে। হাবশার বাদশাহ নাজ্জাশী মৃত্যুবরণ করলে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মৃত্যু সংবাদ মুসলমানদের জানিয়ে দেন এবং জানাযার ছালাত আদায় করেন (ছহীহ বুখারী, হা/১২৪৫)।
মৃত্যু সংবাদ প্রচার করা:
মৃত্যু সংবাদ প্রচার করা জাহেলী আদর্শ। এ ব্যাপারে রাসূল (ছাঃ) কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। হুযায়ফাহ (রাঃ) বলেন, يَنْهَى عَنِ النَّعْيِ রাসূল (ছাঃ) মৃত্যু সংবাদ প্রচার করতে নিষেধ করতেন।[1] মৃত্যু সংবাদ প্রচারের নামে শোক প্রকাশ করে কোন লাভ হয় না। শুধু লোক দেখানোই হয়। তার প্রমাণ হল, সব জানাযাতে লোকের সংখ্যা এক রকম হয় না। কারো জানাযায় হাযার হাযার লোক হয়, আবার কারো জানাযায় একশ’ লোকও জুটে না। অথচ সব মাইয়েতের জন্যই মাইকিং করা হয়। সুতরাং এতে কোন ফায়েদা নেই। এটা মূলতঃ ব্যক্তির প্রসিদ্ধি ও গুণের কারণ। তাছাড়া শুভাকাঙ্খী হলে এমনিতেই সে মৃত্যু সংবাদ শুনতে পাবে, মাইকিং করে জানানো লাগবে না।
উল্লেখ্য যে, মারা যাওয়ার পূর্বে প্রত্যেক ব্যক্তির উচিৎ তার উত্তরসূরী ও আত্মীয়-স্বজনকে অছিয়ত করে যাওয়া, যেন তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিদ‘আতী কর্মকান্ড অনুষ্ঠিত না হয়। বিশেষ করে বিলাপ করা ও বিভিন্ন কথার মাধ্যমে শোক প্রকাশ করা। কারণ সাবধান করে না গেলে বা এর প্রতি সন্তুষ্ট থাকলে এ জন্য তাকে কবরে শাস্তি দেওয়া হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন,
أَلاَ تَسْمَعُوْنَ إِنَّ اللهَ لاَ يُعَذِّبُ بِدَمْعِ الْعَيْنِ وَلاَ بِحُزْنِ الْقَلْبِ وَلَكِنْ يُعَذِّبُ بِهَذَا وَأَشَارَ إِلَى لِسَانِهِ أَوْ يَرْحَمُ وَإِنَّ الْمَيِّتَ يُعَذَّبُ بِبُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ. وَكَانَ عُمَرُ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ يَضْرِبُ فِيْهِ بِالْعَصَا وَيَرْمِىْ بِالْحِجَارَةِ وَيَحْثِى بِالتُّرَابِ.
‘তোমরা কি শুননি, নিশ্চয়ই আল্লাহ চোখের কান্না ও অন্তরের চিন্তার কারণে শাস্তি দিবেন না; বরং তিনি শাস্তি দিবেন এর কারণে। অতঃপর তিনি তার জিহবার দিকে ইঙ্গিত করলেন। অথবা তার উপর রহম করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ মাইয়েতকে তার পরিবারের কান্নার কারণে শাস্তি দেন। ওমর (রাঃ) এ জন্য লাঠিপেটা করতেন, পাথর মারতেন এবং মাটি নিক্ষেপ করতেন।[2]
[1]. তিরমিযী হা/৯৮৬, ১/১৯২ পৃঃ; ইবনু মাজাহ হা/১৪৭৬, পৃঃ ১০৬, ‘জানাযা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৪, সনদ হাসান।
[2]. ছহীহ বুখারী হা/১৩০৪, ১/১৭৪ পৃঃ, (ইফাবা হা/১২২৬, ২/৩৮৭ পৃঃ); ছহীহ মুসলিম হা/২১৭৬; মিশকাত হা/১৭২৪; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/১৬৩২, ৪/৮৪, ‘জানাজা’ অধ্যায়।
প্রশ্ন (২৯/২৬৯) : মানুষ মারা গেলে মাইকে কিংবা মোবাইলে সংবাদ প্রচার করা যাবে কি?
উত্তরঃ মোবাইলে সংবাদ দেয়া যাবে। তবে মাইকে প্রচার করা যাবে না। কারণ মাইক ও মোবাইলে সংবাদ প্রচার এক নয়। মাইকের মাধ্যমে সকল জনতার কাছে শোক সংবাদ প্রকাশ করা হয়। এটা ‘নাঈ’ অর্থাৎ বিলাপ হিসাবে গণ্য হবে। হাদীছে শোক সংবাদ প্রচার করতে নিষেধ করা হয়েছে (ছহীহ তিরমিযী হা/৯৮৬, সনদ হাসান)। হাদীছে এসেছে সংবাদ জানিয়ে মৃত ব্যক্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্য আবেদন করে সংবাদ দিতে পারে। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নাজাশীর মৃত্যু সংবাদ প্রচার করেছেন (বুখারী হা/১২৪৫; মুসলিম হা/৯৫১)।
প্রশ্ন (৫) : ইসলামে মৃত্যু সংবাদ প্রচার করা নিষেধ। কিন্তু ইদানিং অনলাইনে ব্যাপকভাবে ‘মৃত্যু সংবাদ’ প্রচার করা হয়। প্রশ্ন হল, অনলাইনে মৃত্যুসংবাদ প্রচার করা যাবে কি?
উত্তর : মৃত্যু সংবাদ জানানোর জন্য মসজিদে বা বাজারে-গ্রামে যেভাবে মাইকিং করা হয়, তা শরী‘আত সম্মত নয় (তিরমিযী হা/৯৮৬, সনদ হাসান)। অনুরূপ মসজিদের বোর্ডে কারো মৃত্যু সংবাদ লিখে প্রকাশ করাও জায়েয নয়। তবে নিকটাত্মীয় ও স্বজনদেরকে জানানোর জন্য মোবাইল বা অনলাইনে অবহিত করা জায়েয (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ৯/১৪২ পৃ.)।
ইসলামের দৃষ্টিতে শোক সংবাদ তিন প্রকারের। যথা-
(১) হারাম শোক সংবাদ : যে প্রচারণা জাহিলী যুগের প্রচারণার ন্যায়। অর্থাৎ সাধারণ বাজার ও গণজমায়েতের স্থানগুলোতে ঘোষণার উদ্দেশ্যে মৃত্যুর সংবাদ জ্ঞাতকরণ করা এবং সেই সাথে মৃত ব্যক্তির বংশীয় গৌরব ও তার কীর্তিগুলো উল্লেখ করা কিংবা ঘোষণার সাথে বিলাপ, হাহাকার, আর্তনাদ ও হাহুতাশ প্রকাশ করা (হাশিয়াতুল জামাল ‘আলা শারহিল মানহাজ, ৩/৬৮৭ পৃ.)।
(২) মাকরূহ শোক সংবাদ : বংশীয় গৌরবগাঁথা কিংবা কীর্তি উল্লেখ না করে ঘোষণার মাধ্যমে মৃত্যু সংবাদ জ্ঞাতকরণ করা ও স্বর উচ্চ করা।
(৩) মুবাহ বা বৈধ শোক সংবাদ : কোন ঘোষণা ব্যতীত শুধু মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর সংবাদটা জ্ঞাতকরণ করা। আলেমগণ বলেন, কোন ঘোষণা ব্যতীত শুধু জানাযার ছালাতের সময়কাল জ্ঞাতার্থে মৃত্যুর সংবাদটা জ্ঞাতকরণ করা বৈধ (ফাৎহুল ক্বাদীর, ২/১২৭; হাশিয়াতুদ দাসুক্বী, ১/২৪; নিহায়াতুল মুহতাজ, ৩/২০)। ছহীহ সুন্নাহর দলীলগুলো শেষ প্রকারের মৃত্যু সংবাদ বৈধ হওয়ার প্রমাণ বহন করে। যেমন নবী (ﷺ) নাজাশীর ক্ষেত্রে, মুতা যুদ্ধের শহীদদের ক্ষেত্রে ও অন্যান্য ক্ষেত্রে জানিয়েছিলেন (ছহীহ বুখারী, হা/১৩২৮, ১৩৩৩, ৪৫৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৫৬)।
কাসানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘মৃত ব্যক্তির মৃত্যু সংবাদটি তার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও প্রতিবেশীদেরকে জ্ঞাপন করাতে কোন আপত্তি নেই, যাতে করে তারা জানাযার ছালাত আদায় করা, দু‘আ করা ও দাফনে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির হক্ব আদায় করতে পারে। আর যেহেতু এই ধরণের সংবাদ দেয়ার মধ্যে নেক কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধকরণ ও প্রস্তুতি নেয়ার প্রতি উৎসাহিতকরণ রয়েছে, তাই এটি নেকী ও তাক্বওয়ার কাজে সহযোগিতা করার অন্তর্ভুক্ত এবং ভাল কাজের মাধ্যম হওয়া ও সন্ধান দেয়ার পর্যায়ভুক্ত হবে’ (বাদায়িউছ ছানায়ী, ৩/২০৭ পৃ.)।
সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটির আলেমগণ বলেন, ‘কেউ মারা গেলে তার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও প্রতিবেশীদেরকে আহ্বান করা জায়েয, যাতে করে তারা জানাযার ছালাতে অংশগ্রহণ করতে পারে, তার জন্য দু‘আ করতে পারে, তার লাশের সাথে যেতে পারে এবং তার দাফনকর্মে সহযোগিতা করতে পারে। কেননা নাজাশী বাদশাহ যখন মারা গিয়েছিলেন তখন নবী (ﷺ) তাঁর সাথীবর্গকে তার মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন যাতে করে তারা তার জানাযার ছালাত আদায় করতে পারেন (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ৮/৪০২ পৃ.)।
দ্বিতীয়তঃ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সমূহ যেমনঃ ফেসবুক, টুইটার ও ওয়াটস্আপ ইত্যাদিতে কিংবা ইমেইলে ও মোবাইল ম্যাসেজে কারো মৃত্যু সংবাদ প্রচার করাতে কোন আপত্তি নেই। এক্ষেত্রে মূল উদ্দেশ্যে হল, যাতে করে মানুষ তার জানাযার ছালাতে উপস্থিত হতে পারে, মৃত ব্যক্তির জন্য দু‘আ ও ক্ষমাপ্রার্থনা করতে পারে কিংবা মৃতের পরিবার-পরিজনের প্রতি সহানুভূতি ও সমবেদনা জ্ঞাপন করতে পারে। এ অবহিতকরণ মূলত ঐ সমস্ত নেক কাজের মাধ্যম (ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-২৩১০২৯)। শায়খ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-কে পত্র-পত্রিকায় মৃত্যু সংবাদ প্রচার করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে উত্তরে তিনি বলেন, ‘খবর হিসাবে প্রচার করার ক্ষেত্রে এর মধ্যে কোন আপত্তিকর বিষয় আছে বলে আমাদের মনে হয় না (মাসায়িলুল ইমাম বিন বায, পৃ. ১০৮)।