15/07/2024
কারোও যদি ফরজ গোসলের প্রয়োজন হয়, সে যদি ফরজ গোসল না করে, পুরো নদীর পানি দিয়েও পরিস্কার ভাবে গোসল করে তবুও সে পবিত্র হবেনা। আর পবিত্র না হয়ে জীবনে যত আমল করেছে ( নামাজ, রোজা, হজ্ব ) বিশেষ করে যে আমল করতে পবিত্রতা অর্জন করা ফরজ, সেসব আমল আল্লাহ তায়া’লা র কাছে গ্রহণযোগ্য হবেনা।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের মধ্যে অনেকেই ফরজ গোসলের নিয়ম জানেনা এবং অনেকেই লজ্জায় জিজ্ঞেসও করেনা। তাদের উদ্দেশ্যেই আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস
যে সব কারণে গোসল ফরজ হয়ঃ
****************************
১. স্বপ্নদোষ বা উত্তেজনাবশত বীর্যপাত হলে।
২. সহবাসে (সহবাসে বীর্যপাত হোক আর নাই হোক)।
৩. মেয়েদের হায়েয-নিফাস শেষ হলে।
গোসলের ফরয তিনটিঃ
********************
১। ভালোভাবে কুলি করা। (সুরা মায়েদা-৬)
গড়গড়াসহ কুলি করা সুন্নাত। তবে রোযাদার হলে গড়গড়াসহ কুলি করা যাবে না,শুধু কুলি করবে।
২।নাঁকের নরম স্হান পর্যন্ত পানি পৌঁছানো। (মায়েদা-৬) নাকের মধ্যে শুকনো ময়লা থাকলে তাও দূরভীত করবে,তবে রোযা অবস্হায় শুধু নাকে পানি দিবে নরম হাড় পর্যন্ত পানি পৌঁছানো যাবে না।
৩। সমস্ত শরীরে পানি পৌঁছানো ফরয, যেন কোথাও এক চুল পরিমাণ শুকনো না থাকে ।( সুরা মায়েদা-৬, তিরমিযী ১০৩,বাহরুর রায়েক ১/৪৫, শামী ১/১৫১,হেদায়া ১/২৯)
ফরজ গোসলের সঠিক নিয়মঃ
*************************
(ফরয গোসলের সঠিক পদ্ধতি ও সুন্নাত তরিকা)
গোসলের আগে প্রস্রাব-পায়খানা সেরে নেবে। এতে বীর্য ইত্যাদি সম্পূর্ণরূপে বের হওয়া সহজ হয়।
১। শুরুতে নিয়ত করবে, এবং বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম পড়বে। (বুখারী ২৪৮)
২। দুই হাত কবজি পর্যন্ত পৃথকভাবে তিনবার ধৌত করবে। (বুখারী -২৪৮)
৩। এরপর ডান হাতে পানি নিয়ে বাঁ হাত দিয়ে শরীরের যেসব জায়গায় বীর্য ও নাপাকি লেগে থাকে, তা তিনবার ধুয়ে পরিষ্কার করবে। (মুসলিম শরীফ ৩২১)
৪। নাপাকি লেগে থাকুক বা না থাকুক সর্ব অবস্হায় গুপ্তাঙ্গ ধৌত করবে এরপর উভয় হাত ভালো করে ধুয়ে ফেলবে। (বুখারী-২৪৯)
৫। তারপর নামাজের অজুর মত ভালোভাবে অজু করবে, তবে পা ধৌত করবে না। গোসলের শেষে ধুয়ে ফেলবে। (বুখারী শরীফ ২৫৭-২৫৯)
৬। অতঃপর পুরো শরীর ধোয়ার জন্য প্রথমে মাথায় পানি ঢালবে। (বুখারী - ২৫৬)
৭। তিনবার ডানে অর্থাৎ ডান কাঁধে তারপর তিনবার বাঁয়ে বা বাম কাঁধে পানি ঢালবে। (বুখারী- ২৫৪)
৮। পুরো শরীর ভালোভাবে ধুতে হবে, যেন শরীরের কোনো অংশ এমনকি কোনো পশমও শুকনো না থাকে। (বুখারী ২৭৪, আবূ দাউদ ৪৯, ইবনে আবি শায়বা ৮১৩)
তবে সাগর, নদী, পুকুর ইত্যাদিতে গোসল করলে কিছুক্ষন ডুব দিয়ে থাকলে তিন বার পানি ঢালার সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে।(আবূ দাউদ ২৪৯, ইবনে আবি শায়বা ৮১৩)
৯। সমস্ত শরীর হাত দ্বারা ঘষে মেজে ধৌত করবে। (তিরমিযী ১০৬)
১০। নাভি, বগল ও অন্যান্য জায়গায় পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুতে হবে। সব শেষে গোসলের জায়গা থেকে সামান্য সরে গিয়ে দুই পা তিনবার ধুয়ে নেবে। (হেদায়া : ১/৩০)
১১। উঁচু স্থানে বসে গোসল করবে, যাতে পানি গড়িয়ে যায় ও গায়ে ছিটা না লাগে। পানির অপচয় না করে, বসে বসে গোসল করবে, লোকসমাগমের স্থানে গোসল করবে না। পবিত্র জায়গায় গোসল করবে। ডান দিক থেকে গোসল শুরু করবে। (বাদায়েউস সানায়ে ১/৩৪, রদ্দুল মুহতার ১/৯৪)
১২। বাহ্যিক অঙ্গের চুল পরিমাণ জায়গাও শুকনো থাকলে ফরজ গোসল শুদ্ধ হবে না। ( আবু দাউদ ২৫৯,শরহে মুখতাসারুত তাহাভি ১/৫১০)
১৩। নেইলপলিশ, রং বা সুপার গ্লু ইত্যাদি যা শরীরে পানি পৌঁছার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়, তা উঠিয়ে নিচে পানি পৌঁছানো জরুরি, অন্যথায় গোসল শুদ্ধ হবে না। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৩)
১৪। ফরজ গোসলে পুরুষের দাড়ি ও মাথার চুল গোড়াসহ সম্পূর্ণ ভালোভাবে ভিজতে হবে। নারীদের চুল বাঁধা থাকলে খোলা ছাড়া যদি চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানো সম্ভব হয়, তাহলে না খুলে শুধু গোড়ায় পানি পৌঁছানোই যথেষ্ট। আর যদি চুল খোলা থাকে তাহলে পুরুষের মতো সম্পূর্ণ চুল ধৌত করা ফরজ। (বাদায়েউস সানায়ে ১/৩৪, রদ্দুল মুহতার ১/১৪২)
১৫। ফরজ গোসলে নারীদের কান ও নাকফুল নাড়িয়ে ছিদ্রে পানি পৌঁছানো জরুরি। (আল মুহীতুল বুরহানি ১/৮০)
কানের ভেতর ও নাভিতে পানি পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা জরুরি।
১৬। গোসলের ভেজা কাপড় বালতি বা এধরনের ছোট পাত্রে ধোয়া হলে তিনবার ধুয়ে তিনবার নিংড়াবে। তবে নাপাক কাপড় যদি প্রবহমান পানি যেমন, নদী, পুকুরে বা টেপের পানিতে এত বেশি করে ধোয়া হয়, যাতে নাপাকি দূর হওয়ার ব্যাপারে প্রবল ধারণা হয়ে যায় তাহলে তা পাক হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে তিনবার নিংড়িয়ে ধোয়া জরুরি নয়।
(রদ্দুল মুহতার ১/৩৩৩, আলবাহরুর রায়েক ১/২৩৭, ফতুয়ায় হক্কানিয়া ২/৫৭৪, জামেউল ফতুয়া ৫/১৬৭)
এটাই হচ্ছে গোসলের পরিপূর্ণ সঠিক পদ্ধতি ।
বিঃদ্রঃ অনেকই মনে করেন গোসল শেষে নামাজ পড়তে চাইলে আবার নতুন করে অজু করতে হবে। এটা ভুল, এইভাবে গোসল করলে আবার নতুন করে অজু করা লাগবে না। তবে গোসলের মাঝে যদি অজু ভঙ্গের কোন কারণ পাওয়া যায় তাহলে আবার অজু করবে।
আল্লাহর আমাদের সবাইকে আমল করার তাওফিক দান করুক আমিন।
(পোস্টটি হানাফী ফিকহ (Hanafi Fiqh) গ্রুপ থেকে সংগৃহীত)