24/08/2026
আজকের এই পবিত্রারোপনী একাদশীর দিনে সবাই মিলে একাদশীর ব্রত মাহাত্ম্য কথা পাঠ করুন:-
❃ শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষীয়া ‘পবিত্রারোপনী একাদশী’ ব্রত মাহাত্ম্য ভবিষোত্তরপুরাণে বর্ণিত আছে।
❃ একদিন মহারাজ যুধিষ্ঠির ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করলেন ━ “হে মধুসূদন! শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের একাদশীর নাম কি, এই ব্রতের মাহাত্ম্য কি, ব্রত পালন বিধিই বা কি, তা কৃপা করে আমাকে বলুন। আমি তা শ্রবন করতে ব্যকুল।”
❃ যুধিষ্ঠির মহারাজের জানার ব্যকুলতা দেখে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ প্রসন্ন হয়ে বলতে শুরু করলেন ━ “হে রাজন! এখন আমি সেই পবিত্র ব্রত মাহাত্ম্য বর্ণনা করছি, মনোযোগ দিয়ে তা শ্রবন কর। যা শোনামাত্রই বাজপেয় যজ্ঞের ফল লাভ হয়।”
◼️ রাজা মহিজীৎ ও লোমশ মুনির কাহিনী ◼️
✸ প্রাচীন কালে দ্বাপর যুগের শুরুতে মাহিস্মতি নগরে মহিজীৎ নামক এক প্রসিদ্ধ রাজা রাজত্ব করতেন। তিনি ছিলেন ধর্মপরায়ণ, শান্তিপ্রিয় ও দানশীল। কিন্তু দুঃখের বিষয় ছিল এই যে, তিনি ছিলেন নিঃসন্তান, তাই তার মনে বিন্দুমাত্র শান্তি ছিল না। ‘পুত্রহীনের ইহলোক পরলোকে কোথাও সুখ হয় না’ ━ এই রূপ চিন্তা করতে করতে বহুদিন কেটে গেল। কিন্তু তবুও পুত্র মুখ দর্শনে রাজা বঞ্চিতই রইলেন। নিজেকে অত্যন্ত দুর্ভাগা মনে করে রাজা চিন্তাগ্রস্ত হলেন।
✸ প্রজাদের সামনে রাজা অক্ষেপ করে বলতেন ━ “হে প্রজাবৃন্দ! তোমরা শোন। আমি এই জন্মে তো কোন পাপকাজ করিনি, অন্যায় ভাবে আমার রাজকোষ বৃদ্ধি করিনি, ব্রাহ্মণ বা দেবতাদের সম্পদ কখনও গ্রহণ করিনি, উপরন্তু প্রজাদেরকে পুত্রের মতো পালন করেছি, ধর্ম অনুসারে পৃথিবী শাসন করেছি। দুষ্টদের যথানুরূপ দন্ড দিয়েছি, সজ্জন ব্যক্তিদের যথাযোগ্য সম্মান করতেও কখনও অবহেলা করিনি। তাই হে ব্রাহ্মণগণ, এই প্রকার ধর্ম পথ অবলম্বন করা সত্ত্বেও কেন আমার পুত্র লাভ হল না, তা আপনারা কৃপা করে অনুসন্ধান করুন।”
✸ রাজার এই প্রকার কাতর উক্তি শ্রবণে ব্যথিত রাজভক্ত পুরোহিত, ব্রাহ্মণগণ রাজার মঙ্গলের জন্য গভীর বনে ত্রিকালজ্ঞ মুনি ঋষির কাছে যেতে মনস্থ করলেন। বনের মধ্যে সমস্ত ঋষিদের আশ্রম দেখতে দেখতে অবশেষে তারা এক মুনির সন্ধান পেলেন। তিনি দীর্ঘায়ু, নীরোগ, নিরাহারে ঘোর তপস্যায় মগ্ন ছিলেন। সর্বশাস্ত্র বিশারদ, ধর্মতত্ত্বজ্ঞ ও ত্রিকালজ্ঞ সেই মহামুনি লোমশ নামে খ্যাত ছিলেন। তার শরীর লোমে ভরা। তিনি ব্রহ্মার মতো উজ্জ্বল। তিনি ত্রিকালজ্ঞ অর্থাৎ অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ তিন কালের সবই জানেন। ব্রহ্মার এক কল্প অতিবাহিত হলে মুনিবরের গায়ের একটি করে লোম খসে পড়ে, এমনই দীর্ঘায়ু তার! এই কারণে এই মহামুনির নাম লোমশ।
✸ মহামুনি লোমশকে দেখে সকলেই ধন্য হল। তারা পরস্পর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে শুরু করল, আমাদের বহু জন্মের সৌভাগ্যের ফলে আজ আমরা এই মহামুনির সাক্ষাৎ লাভ করলাম।
✸ তারপর ঋষিবর তাদের সম্বোধন করে বললেন ━ “কি কারণে আপনারা এখানে উপস্থিত হয়েছেন? আপনাদের আগমনের কারণ স্পষ্ট করে বলুন। আপনাদের যাতে মঙ্গল হয়, আমি নিশ্চয়ই তার উপায় বলব।”
✸ ব্রাহ্মণেরা বিনয়ের সুরে কাকুতি করলেন ━ “হে ঋষিবর! আমরা যে উদ্দেশ্যে এখানে এসেছি আপনি তা কৃপা করে শুনুন। এ পৃথিবীতে আপনার মতো শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি আর কোথাও নেই। মহীজিৎ নামে এক রাজা নিঃসন্তান হওয়ায় অতি দুঃখে দিন যাপন করছে। আমরা তার প্রজা, তিনি আমাদেরকে পুত্রের মতো পালন করছেন। কিন্তু তিনি পুত্রহীন বলে আমরাও সবাই মর্মাহত। তাঁর দুঃখ দূর করার উদ্দেশ্যে ব্যথিত হৃদয়ে আমরা এখানে এসেছি তপস্যা করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে। হে ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ! হে দ্বিজোত্তম! রাজার সৌভাগ্যের কারণে এই সময়ে আমরা আপনার দর্শন পেয়েছি। মহাপুরুষদের দেখেই মানুষের সব কাজ সফল হয়। হে মুনিবর! রাজা যাতে পুত্র লাভ করতে পারেন, কৃপা করে তার কোনো উপায় আমাদের বলুন।”
✸ তাদের কথা শুনে মুনি ধ্যান মগ্ন হলেন। কিছু সময় পরে রাজার পূর্বজন্মবৃত্তান্ত দর্শন করে বলতে লাগলেন, “হে লোকে! তবে শুনুন। পূর্বজন্মে রাজা মহিজিৎ এক দরিদ্র বৈশ্য ছিলেন। ওই বৈশ্য গ্রামে গ্রামে ঘুরে ব্যবসা করতেন। একবার তিনি এক অন্যায় কার্য করে ফেলেন। কোনও এক জ্যৈষ্ঠের শুক্লপক্ষের দশমীর দিনে পথে সূর্যের তীব্র দাবদাহে তিনি অত্যন্ত তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েন। তখন তিনি একটি গ্রামের সীমানায় একটি জলাশয় দেখতে পেলেন। তিনি তৃষ্ণায় অস্থির ছিলেন এবং গরমে ভুগছিলেন, তাই কালবিলম্ব না করে সেখানে জলপানের জন্য যান। সেই মুহূর্তে এক গাভী ও তার বাছুর সেখানে জলপান করছিল। তাদেরকে তাড়িয়ে দিয়ে তিনি নিজেই জলপান করতে লাগলেন। এই পাপকর্মের ফলে তিনি পুত্র সুখে বঞ্চিত হয়েছেন। কিন্তু পূর্বজন্মের কোনো পূণ্যের ফলে তিনি এরকম নিষ্কন্টক রাজ্য লাভ করেছেন।”
✸ ব্রাহ্মণেরা অনুরোধ করলেন, ━ “হে মুনিবর! পুরাণে উল্লেখ আছে যে, প্রায়শ্চিত্তের দ্বারা পাপক্ষয় হয়। তাই আপনি এমন একটি পূণ্য ব্রতের উপদেশ করুন যাতে তার জন্ম জন্মান্তরের পাপ দূর হয় এবং আপনার অনুগ্রহে তিনি পুত্র সন্তান লাভ করতে পারেন।”
✸ লোমশ মুনি বললেন, ━ “হে লোকে! শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের পবিত্রারোপণী একাদশী ব্রত অভিষ্ট ফল প্রদান করে। আপনারা যথাবিধি তা সকলে পালন করুন।” লোমশ মুনির উপদেশ শুনে আনন্দ চিত্তে গৃহে প্রত্যাবর্তন করে তারা রাজাকে সকল কথা জানালেন। তারপর সকলে মিলে মুনির নির্দেশ অনুযায়ী ব্রত পালন করলেন। তাদের সকলের পূণ্যফল রাজাকে প্রদান করলেন। সেই পূণ্য প্রভাবে রাণী গর্ভবতী হলেন। উপযুক্ত সময়ে বলিষ্ঠ, সর্বাঙ্গসুন্দর এক পুত্র সন্তানের জন্ম দান করলেন।
✸ ভবিষোত্তরপুরানে এই ব্রত মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে। এই ব্রত যিনি পাঠ বা শ্রবণ করবেন তিনি সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হবেন এবং পুত্র সুখ ভোগ করে অবশেষে দিব্যধাম প্রাপ্ত হবেন।
🌸 জয় পবিত্রারোপনী একাদশী 🌸
🌿রাধে রাধে 🌿