08/10/2026
সম্পদ শুধু ভোগ করার জন্য নয়, আল্লাহর পথে কাজে লাগানোর জন্যও সৃষ্টি করা হয়েছে।
পার্থিব জীবনের বড় একটা সময় আমরা অর্থ উপার্জনের পেছনে ব্যয় করি। কেউ ব্যবসা করেন, কেউ প্রতিষ্ঠান গড়েন, কেউ নিজের সামর্থ্য বাড়াতে দিনের পর দিন পরিশ্রম করেন।
কিন্তু একজন মুসলিমের জন্য প্রশ্নটা শুধু ‘কত আয় করলাম?’ নয়। প্রশ্ন হলো, আল্লাহ আমাকে যে সম্পদ দিলেন, সেটার উদ্দেশ্য কী?
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত একটি হাদিসে কুদসীতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “নিশ্চয়ই আমি সম্পদ নাযিল করেছি, যেন সালাত কায়েম করা যায় এবং যাকাত প্রদান করা যায়।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২১৯৮৮; আত-তাবারানী, আল-মুজামুল কাবীর; সহীহ আল-জামি‘, হাদিস: ১৭৮১)
খেয়াল করার বিষয় হলো, এখানে সম্পদের উদ্দেশ্য হিসেবে শুধু ব্যক্তিগত ভোগের কথা বলা হয়নি। সালাত কায়েম করা এবং যাকাত আদায়ের কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ সম্পদ এমন একটি শক্তি, যার মাধ্যমে একজন মানুষ নিজের ইবাদত যেমন ঠিক রাখতে পারে, তেমনি সমাজের অর্থনৈতিক দায়িত্বও পালন করতে পারে।
দরিদ্র, অসহায়, এতিম ও ঋণগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো যেমন সম্পদের দায়িত্ব, তেমনি দ্বীনের জ্ঞান, দাওয়াহ ও শিক্ষার কাজকে টিকিয়ে রাখাও সম্পদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার।
এ কারণেই পূর্ববর্তী যুগের অনেক আলেম সম্পদকে দূরে ঠেলে দেননি। বরং সম্পদকে তাঁরা দ্বীনের কাজে ব্যবহার করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে দেখেছেন।
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.) ছিলেন বড় আলেম ও মুহাদ্দিস, আবার একই সঙ্গে সফল ব্যবসায়ীও ছিলেন। তাঁর ব্যবসার সম্পদ দিয়ে মক্কা-মদিনার হাদিসের ছাত্রদের পড়াশোনা, থাকা-খাওয়া ও গবেষণায় সহযোগিতা করা হতো।
সুফিয়ান আস-সাওরী (রহ.)-এর কাছেও সম্পদ ছিল একজন মুমিনের শক্তির অন্যতম মাধ্যম। সম্পদ মানুষকে নিজের আত্মসম্মান ও স্বাধীনতা রক্ষা করতে এবং দ্বীনের কাজকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করতে পারে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সীরাতেও অর্থনৈতিক শক্তির গুরুত্ব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। কুরাইশদের প্রভাবের পেছনে কাবার কর্তৃত্বের পাশাপাশি শীত ও গ্রীষ্মের বাণিজ্যও ছিল বড় শক্তি। (সূরা কুরাইশ: ১-৪)
তাই ইসলামের ইতিহাসে অর্থনীতি কখনোই তুচ্ছ কোনো বিষয় ছিল না। বাণিজ্যপথ, খাদ্য সরবরাহ ও অর্থনৈতিক শক্তির প্রভাব সমাজ ও রাজনীতির ওপরও পড়ত।
সুমামা ইবনে উসাল (রা.) ইসলাম গ্রহণের পর ইয়ামামা থেকে মক্কায় খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ফলে মক্কার মানুষ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে খাদ্যের জন্য আবেদন করেছিল। (সহীহ বুখারী, হাদিস: ৪৩৭২)
তাহলে একজন মুসলিম উদ্যোক্তার জন্য সম্পদের অর্থ কী?
হালালভাবে উপার্জন করা, ব্যবসা বড় করা, ভালো পোশাক পরা কিংবা উন্নত জীবনযাপন করা নিজেই কোনো অপরাধ নয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ৯১)
সমস্যা সম্পদে নয়, সমস্যা হলো সম্পদ যখন জীবনের উদ্দেশ্য হয়ে যায়। তখন মানুষ সম্পদের মালিক থাকে না, বরং সম্পদই তাকে নিজের দাস বানিয়ে ফেলে।
একজন মুসলিম উদ্যোক্তার দৃষ্টিভঙ্গি তাই একটু ভিন্ন হতে পারে। ব্যবসার প্রতিটি বৈধ মুনাফাকে শুধু নিজের ভোগের অর্থ না ভেবে, আল্লাহর দেওয়া একটি আমানত হিসেবে দেখা।
নিজের পরিবার, কর্মী, সমাজ, দরিদ্র মানুষ, জ্ঞানচর্চা, দাওয়াহ এবং দ্বীনের কল্যাণকর কাজে সেই সম্পদকে প্রবাহিত করা।
তখন ব্যবসা শুধু জীবিকা অর্জনের মাধ্যম থাকে না। সঠিক নিয়ত ও হালাল পদ্ধতির মাধ্যমে সেটিই হয়ে উঠতে পারে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি বড় পথ।
আমাদের লক্ষ্য শুধু ধনী হওয়া নয়। এমনভাবে সম্পদশালী হওয়া, যাতে সেই সম্পদ আমাদেরও উপকার করে, মানুষেরও উপকার করে এবং দ্বীনের কল্যাণেও কাজে আসে।