01/06/2021
নরসুন্দরের গৌরপ্রেম লাভ
-শ্রীল জয়পতাকা স্বামী গুরুমহারাজ
গৃহত্যাগের পর শ্রীমন্মহাপ্রভু কাটোয়ায় এসে ভক্তপরিবেষ্টিত হয়ে কীর্তন করতে লাগলেন। শ্রীচৈতন্যদেব কীর্তন থামিয়ে বললেন," আমার চুল ফেলে দেয়ার জন্য নরসুন্দরকে ডাকো।" তার মস্তক মুন্ডনের জন্য নরসুন্দর এলেন, তখনকার দিনে বড় ক্ষুর ব্যবহার করা হতো এবং একই ক্ষুর অনেক লোকের জন্য ব্যবহৃত হতো। যখন সে শ্রীচৈতন্যদেবের মস্তক মুন্ডন করতে উদ্যত হলো, তখন ভক্তগণ চিৎকার করে উঠলেন,"না, না, না! মহাপ্রভুর চুল ফেলে দিও না। মহাপ্রভুর অপূর্ব দীর্ঘ কেশরাশি কেটে ফেলা হচ্ছে-এই দৃশ্য আমরা সহ্য করতে পারবো না। উপস্থিত সবাই এভাবে চিৎকার করতে লাগলেন। তখন সেই নরসুন্দর বললো, "না, না, আমি এই কাজ করতে পারবো না। আমি সম্পূর্ণ অপারগ। আমাকে ক্ষমা করুন।" তখন চৈতন্যদেব বললেন, "শোনো, আমি সন্ন্যাস গ্রহণ করতে এসেছি, তাই আমাকে মস্তক মুন্ডন করতেই হবে। তুমি একজন নরসুন্দর, এটা তোমার কর্তব্য। আমি তোমাকে এই কাজ করার আদেশ দিচ্ছি। যদি এতে কোনো পাপ হয়, তাহলে সে দায়িত্ব আমার, তোমার কোন ক্ষতি হবে না। কিন্তু কর্তব্যে অবহেলা করাটা অন্যায়। অতএব তুমি তোমার কর্তব্য সম্পাদন কর, আমার মস্তক মুন্ডন করে দাও।"
মহাপ্রভুর এমন কঠোর আদেশ পেয়ে নরসুন্দর চুল কাটতে লাগল। কিন্তু মহাপ্রভুকে স্পর্শ করা মাত্র তার মধ্যে কৃষ্ণপ্রেম সঞ্চারিত হলো। তার হৃদয় গলে গেল, কাপতে লাগল এবং চোখ থেকে অশ্রু বর্ষিত হতে লাগল। সে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। কাজ করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল আর হাত দুইটা কাপছিল। তার পক্ষে মহাপ্রভুর মস্তক মুন্ডন করা গিরিলঙ্ঘন করার মতোই কঠিন হয়ে দাড়াল। আগে কখনো তার এমন হয়নি। খুব সর্তকতার সাথে সে অবশিষ্ট কাজটি শেষ করলো। মস্তক মুন্ডন সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে সে প্রেমাবিষ্ট হয়ে সেই কেশরাজির উপর পড়ে থেকে অনবরত ক্রন্দন করতে লাগল।
একটিমাত্র সেবা করেই সে একজন মহান সাধুতে পরিণত হলো। হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করা কখনই ত্যাগ করেনি। মহাপ্রভুর মস্তক মুন্ডনের পর নরসুন্দর আর কোনদিন কারও চুল কাটেন নি। তার সারাজীবনের জন্য ঐ একটি সেবাই যথেষ্ট ছিলো। এই শুদ্ধ ভক্তকে কেশব ভারতীর সমাধীর পাশেই সমাধিস্থ করা হয়।
('গৌরাঙ্গ' গ্রন্থ থেকে সংকলিত)