21/07/2025
তাঁর দয়ার দরবার নিত্য অবারিত-তিনি অকাতরে বিলিয়ে চলেছেন মণিমাণিক্য, অমূল্য রত্নরাজি। কাঙ্গাল মানুষ বঞ্চিত হয় না, বিমুখ হয় না তাঁর কাছে এসে কখনও-তাই বারে-বারে আসে, ফিরে-ফিরে আসে, বিশ্বের ভাণ্ডারী যিনি, তাঁরই কাছে-নিখিলের জ্ঞান, গুণ, প্রেম ও প্রাণের রূপায়িত বিগ্রহ যিনি, তাঁরই কাছে।
বীরেনদা (ভট্টাচার্য্য)— সদগুরু গ্রহণ করে কিছু যদি না করে, তবে কিছু লাভ হয়?
শ্রীশ্রীঠাকুর—দীক্ষা গ্রহণ ক'রে যে যে-ভাবেই চলুক, যাই করুক, একটা খচ্খচানি লেগেই থাকে, এইটুকুই লাভ।
শৈলেনদা (ভট্টাচার্য্য)— ঋত্বিক্রা যদি কদাচারী হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে দীক্ষাও দেয়, তাতে কি লাভ হয়?
শ্রীশ্রীঠাকুর— ঋত্বিদের qualification (গুণ) দু-রকম, এক যুক্ত, আর realised (সিদ্ধ)। যুক্ত মানে interested (অন্তরাসী), attached (অনুরক্ত)। যে যত interested (অন্তরাসী), infusing-এ (ইষ্ট-অনুপ্রাণনা সঞ্চারে) সে তত successful (কৃতকার্য্য)। সবাই সমান না পারলেও আচার্য্যের রকমটা যা' মাথায় থাকে, imparting-এর (সঞ্চারণার) সময় তার কিছু-না-কিছু ঠিকরে বেরোয়ই— তা'তে কাজ হয়। তবে কদাচারী হ'লে অন্তরস্থিত দীপনা নিষ্প্রভ হ'য়ে যেতে থাকে, তখন অন্যের প্রাণকে ভাল ক'রে স্পর্শ করতে পারে না ।
প্রশ্ন— 'ঋত্বিক্' বই দেখে একজন যদি তা' অনুসরণ করে, কোন ঋত্বিকের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যদি দীক্ষা না নেয়, তা'তে হয় না?
শ্রীশ্রীঠাকুর— তা'তে হয় না। একজনের কাছ থেকে impulse (প্রেরণা-সংঘাত)-টা পাওয়ার দরকার, সেইটুকুই আদত জিনিস।
ধূর্জ্জটিদা (নিয়োগী)-কোন বিষয়ে মানুষের taste (অনুরাগ) কোথা হ'তে আসে?
শ্রীশ্রীঠাকুর— যে যেমন instinct (সহজাত সংস্কার) ও temperament (প্রকৃতি) নিয়ে জন্মায় এবং তার মধ্যে যেটার আবার nurturing (পোষণ) বেশী পায়, তার সেইটেই prominent (প্রধান) হ'য়ে ওঠে। তাই শুধু জন্মগত সংস্কার থাকলেই হবে না, সেই সংস্কারের উদ্বোধনের জন্য আবার উপযুক্ত পারিবেশিক প্রেরণা চাই। এই পারিবেশিক প্রেরণার অভাবে, সুযোগ-সুবিধার অভাবে মানুষ তার অন্তর্নিহিত অনেক কিছু সম্ভাব্যতা সম্বন্ধেই সচেতন হ'তে পারে না, তাকে বাস্তবায়িত করা তো দূরের কথা।
প্রফুল্ল— জন্মের ব্যাপারে শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর ক্রিয়া এবং অবদানের কথা বোঝা যায়, কিন্তু বাইরের একটা বায়ুভূত soul-এর (আত্মার) সঙ্গে শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর সম্পর্ক বা সঙ্গতি কী বা কোথায়?
শ্রীশ্রীঠাকুর— স্ত্রীর যে ভাবধারা ও যেমনতর impulse (সাড়া)-দ্বারা পুরুষ স্ত্রীতে আনত হয়, পুরুষের brain-centre (মস্তিষ্ক-কেন্দ্রও) তেমনভাবে excited (উত্তেজিত) হয়, আর সেই সময়ই ঐ ভাবের range-এর (সীমার) মধ্যে যত soul (আত্মা) in tune (ঐকতানিক সূত্রে) থাকে, তারা এসে হাজির হয়। Scrotum-এর (অণ্ডকোষের) মধ্যে যে সমস্ত s***mcells (শুক্রাণুকোষ) থাকে, সে-সময় সেগুলি charged (শক্তিসম্ভূত) হ'য়ে নিয়ে life (জীবন) পায় অর্থাৎ ঐ আগত soul (জীবাত্মা)-গুলি s***mcell (শুক্রাণুকোষ)-কে life (জীবন) দিয়ে চলৎশীল, নড়নশীল, সজীব করে তোলে, মানুষের শরীরের মধ্যে তখন একটা contraction (আকুঞ্চন)-এর ভাব হয়। তারপর স্ত্রী-পুরুষের মিলনের সময় তারা o**m-এর (ডিম্বাণুর) সঙ্গে মেশার জন্য ছুটে যায়। স্ত্রী আবার স্বামীর ভাবভঙ্গী থেকে, আচার-ব্যবহার থেকে যেমনভাবে impressed (প্রভাবিত) হয়, o**m (ডিম্বাণু)-ও তেমনিভাবে impressed (প্রভাবিত) হয় তার ভাবভূমির ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে। অবশ্য, পুরুষও যে স্ত্রীর ভাবের দ্বারা প্রভাবিত হ'য়ে থাকে সে-কথা তো পূর্ব্বেই বলেছি। স্ত্রীর একনিষ্ঠ শ্রদ্ধাপ্লুত পরিচর্যা পুরুষকে যতখানি exalt (উন্নীত) করে তোলে, তত উন্নত স্তরের আত্মা নেমে আসে। কিন্তু শুক্রাণুগুলি যত উন্নত স্তরের আত্মা বহন করেই আনুক না কেন, ডিম্বাণু যে-রকম impressed (প্রভাবিত) হয়, সেই impression (প্রভাব ও ছাপ)-এর সঙ্গে affinity (সঙ্গতি)-ওয়ালা যে শুক্রাণু থাকে তারই সঙ্গে হয় মিলন-যেন খাঁজে-খাঁজে প'ড়ে গেল, আর ফাঁক রইল না, শুক্রাণু ডিম্বাণুর সঙ্গে মিশে একটা whole entity (গোটা সত্তা) হ'য়ে গেল, তারপর cell-division (কোষ-বিভাজন) আরম্ভ হয় as a whole (সামগ্রিকভাবে) সেই হোল ছেলে। পুরুষ ও নারী স্বভাবতঃই যদি উর্দ্ধমুখী না হয় বাস্তব জীবনে, তবে কিন্তু বুদ্ধি করে ঐ সময়ে উচ্চ ভাবভূমিতে থাকতে পারে না। তাই পুরুষের ইষ্টনিষ্ঠ চলন ও স্ত্রীর ইষ্টানুগ স্বামিভক্তির উপর অতো জোর দেওয়া হয়। তবে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মধ্যে একটা পারস্পরিকতা চাই, সঙ্গতি চাই, গভীর প্রীতি চাই, শরীর, মন, চরিত্র ও প্রকৃতির সামঞ্জস্য চাই, আর এইটে পেতে গেলে বিয়েটা হওয়া চাই বিধিমাফিক। এতখানি হ'লে তবেই উন্নত আত্মার আবির্ভাব সম্ভব। আর, আমার মনে হয়, প্রত্যেকটা s***m (শুক্রাণু)-ই micro-cosmic form-এ (ক্ষুদ্রাকারে) এক-একটা being (জীব), ও নষ্ট করা মানে micro-cosmic form-এর (ক্ষুদ্রাকারের) একটা মানুষ মেরে ফেলা। আমাদের বোধশক্তি ও মমত্ববোধ জাগলে তখন আর অযথা নিষ্প্রয়োজনে, নিজের সুখের জন্য, ইন্দ্রিয়-পরিতৃপ্তির জন্য লক্ষ-লক্ষ শুক্রাণু নষ্ট করে অতোগুলি soul (আত্মা)-কে মারতে পারবো না। নিজেরা জন্ম নিতে এসে বার-বার যদি অমন করে মারা পড়ি, তখন কী অবস্থা হয়, সেই কথা চিন্তা করে শিউরে উঠব। অবশ্য, ডিম্বাণু যে সাধারণতঃ একটার বেশী শুক্রাণু গ্রহণ করতে পারে না এবং একটা জীবনকে রূপায়িত করে তোলার ব্যাপারে যে বহু শুক্রাণুর জীবনাহুতির প্রয়োজন হ'য়ে পড়ে, প্রকৃতির এই বিধানের উপর তো কারও কোন হাত নেই। তাই প্রজননকল্পে ছাড়া অন্য কারণে শুক্রাণু যথাসম্ভব নষ্ট না করাই উচিত। তুমি-আমি সবই তো ঐ living s***m (জীবন্ত শুক্রাণু), প্রত্যেকে ওরই উপর দাঁড়িয়ে গজিয়েছে, ওই আজ কত কথা কইছে, ঘুরছে, ফিরছে, হাতি-ঘোড়া মারছে। তুমি যে-দশা পছন্দ কর না, অনর্থক সে-দশায় ওদের ফেলবে? ওরা যে তুমিই।
১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৩৪৮, সোমবার
(১।১২। ১৯৪১ ইং)
"আলোচনা-প্রসঙ্গে"
১ম খন্ড
🙏🙏 জয়গুরু 🙏🙏
ঠাকুর সম্পর্কে নিজে জানেন এবং অন্য কেও জানান।।