07/05/2026
রাহুলের প্রব্রজ্যা
-
বুদ্ধত্ব লাভের পর তথাগত বুদ্ধ যখন কপিলবাস্তুতে গিয়েছিলেন, তখন মমতাময়ী মাতা যশোধরা তাঁর পিতার পরিচয় দিয়ে এবং তাঁকে চেনার উপায় জানিয়ে পুত্র রাহুলকে বলেছিলেন-‘ প্রাণধন পুত্র! যাও, স্বীয় পিতার সাথে সাক্ষাত করো এবং তাঁর কাছ হতে পিতৃধন অর্থাৎ উত্তরাধিকারী চেয়ে নাও।তাঁর নিকট রয়েছে স্বর্ণরত্ন ভর্তি চার কলসী।’
মাতা যশোধরা যে চার স্বর্ণরত্ন ভর্তি কলসীর কথা বলেছেন, সে চার স্বর্ণ ভর্তি কলসী কি কি? সেগুলি হল চার আর্যসত্য, অর্থাৎ দু:খ আর্য সত্য, দু:খ সমুদয় আর্য সত্য, দু:খ নিরোধ আর্য সত্য এবং দু:খ নিরোধের উপায় বা আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ আর্য সত্য, যা হল স্বর্ণ রত্ন হতেও অধিক মূল্যবান এবং বস্তুত: সেগুলিই হল অমূল্য সম্পদ।
এজন্যই রতন সুত্রে বলা হয়েছে-
‘ যং কিঞ্চি বিত্তং ইধ বা হুরং বা
সগ্গেসু বা যং রতনং পণীতং।
ন নো সমং অত্থি তথাগতেন,
ইদম্পি বুদ্ধে রতনং পণীতং।’
( খুদ্দক পাঠ, সুত্র-৩)
অর্থাৎ যা কিছু ধন-সম্পত্তি এখানে বা ইহলোকে রয়েছে অথবা সেখানে বা অন্য লোকে রয়েছে এবং স্বর্গেও যে সমস্ত রত্ন সম্পত্তি সমূহের রাশি রয়েছে, সেগুলির মধ্যে কোন রত্ন সম্পত্তিই সে সম্পত্তির সাথে তুলনা হয়না, যে সম্পত্তি তথাগত বুদ্ধের নিকট রয়েছে। সেগুলিই হল সবচেয়ে উন্নত ও প্রণীত সম্পদ বা রত্ন।
বুদ্ধের কাছে যে রত্ন আছে, তা হল অতুলনীয়, অমূল্য ও সর্বোত্তম। বুদ্ধের আবিস্কৃত চার আর্যসত্য সম্পদ হল অমূল্য রত্ন, যা তিনি স্বয়ংই অর্জন করেছেন, যেগুলি তিনি অকাতরে দিকে দিকে লোকদেরকে অহর্নিশি বিতরণ করে চলেছেন। স্নেহময়ী মাতা যশোধরা প্রাণধন পুত্র রাহুলকে বলেছেন-‘ তুমিই হলে এ রত্ন সম্পদের উত্তরাধিকারী। সেগুলি হল তোমার সম্পদ। শীঘ্র যাও, তুমি তা চেয়ে নাও।’
মাতা যশোধরা নিজেও মনে মনেই ভাবতে লাগলেন-‘ আমিও এ অমূল্য রত্ন সম্পদের ভাগীদার হব। কিন্তু বুদ্ধ যে কোন কারণে এখনও ভিক্ষুণী সঙ্ঘের স্থাপনা করেননি। আমার বিশ্বাস যে, বিলম্বে হলেও তিনি তা করবেন। যখন তিনি ভিক্ষুণী সঙ্ঘের স্থাপনা করবেন, তখন আমিও কালবিলম্ব না করে প্রব্রজ্যিতা হয়ে বুদ্ধের চরণ চিহ্নের অনুগমণ করে গৃহত্যাগ করব এবং নিজেকে ভবমুক্ত করে তথাগতের লোক সুখায় ও লোক হিতায় ধর্মাভিযানে সামিল হব। আমার প্রাণ প্রতিম পুত্র এ রাহল রাজমহলের বিত্ত-বৈভবের বিলাস বহুল ও ইন্দ্রিয়াসক্ত জীবনে আবদ্ধ থেকে কি করবে?
দেব-মানবের শাস্তা স্বীয় করুণাময় পিতা বুদ্ধের অপার কল্যাণদায়ী ছত্রছায়ায় পালিত হলে সে তখন সদ্ধর্মের অমূল্য রত্ন লাভ করতে পারবে। তার জীবনকে ধন্য ও সফল করতে পারবে। এ সমস্ত ভাবতে ভাবতে মাতা যশোধরা স্বীয় প্রাণ প্রিয় পুত্রকে বিদায় দিতে দিতে বলেছিলেন-‘ যাও, বাচাধন! স্বীয় পিতার কাছ হতে উত্তরাধিকার চেয়ে নাও।’
সপ্ত বর্ষীয় বালক পুত্র রাহল সুপ্রসন্ন চিত্তে ভগবান তথাগতের নিকট পৌঁছলেন এবং নির্ভিকভাবে পিতা বুদ্ধের হাত ধরলেন। পৌঁছতেই তিনি এতই গভীর দিব্য সুখ, প্রশান্তি ও শীতলতা অনুভব করলেন যে, তাঁর মুখ হতে অজানতেই বেরিয়ে পড়ল -
‘ সুখা তে, সমণ ছাযাতি।’
শ্রমণ, আপনার ছায়া বড়ই সুখদায়ক।
করুণাঘন ভগবানের ছায়া কার না সুখদায়ক হয়? তাঁর সান্নিধ্যে আসলে প্রত্যেকের সমস্ত পাপ দূর হয়ে যায়। অমানুষ মানুষ হয়ে যায়, দুর্বিনীত সুবিনীত হয়ে যায়, নিরাশ্রয় আশ্রয় পেয়ে যায়, দিশাহীন দিশা পেয়ে যায়, অধার্মিক ধার্মিক হয়ে যায়, শোকগ্রস্থ নি:শোক হয়ে যায়, দু:খী সুখী হয়ে যায়, ভয়গ্রস্থ নির্ভয় হয়ে যায়, অন্ধ পেয়ে যায় দিব্য আলো এবং দুর্গতির লোকেরা পেয়ে থাকে সুগতি । পুণ্য পারমী সম্পদে ধনী পুত্র রাহুল তখন পিতার এরকম সুখদায়ক শান্তিপ্রদ ছত্রছায়া লাভ করলেন। সে ছত্রছায়া লাভের জন্যই তিনিও অসংখ্য জন্মাবধি পারমী পূরণ করে আসছিলেন। করুণাময় পিতা বুদ্ধ সুযোগ্য পুত্র রাহুলকে ধর্মরত্নের অমূল্য উত্তরাধিকার দিলেন। তাঁকে ভগবানের মহান অগ্রশ্রাবক ধর্মসেনাপতি আয়ুস্মান সারিপুত্র স্থবিরের হাতে তুলে দিলেন। ভদন্ত সারিপুত্র স্থবির রাহুলকে যথানিয়মে প্রব্রজ্যা প্রদান করলেন।
অরহতগণের ধর্মময় পরিবেশে পালন-পোষণ হয়ে রাহুল বড় হলেন এবং বিদর্শন সাধনা-ভাবনা নিষ্ঠার সাথে শিক্ষা করলেন এবং তা সমর্পণভাবে অনুশীলন করতে করতে অরহন্ত অবস্থা পর্যন্ত প্রাপ্ত করেছিলেন। এখন ধন্য হল বুদ্ধপুত্র রাহুলের জীবন। ধন্য হয়েছে রাহুলের প্রাপ্ত পিতার উত্তরাধিকার। যথার্থ উত্তরাধিকার রত্ন সম্পদে সমৃদ্ধ হলেন আয়ুস্মান রাহল!
-বুদ্ধের শাসন চিরজীবী হোক ❤️