20/05/2026
বৌদ্ধ সংস্কৃতির পরম্পরা
ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু
১) বর্তমানে ইরান নামক রাষ্ট্র যেখানে রয়েছে, সেখানে পূর্বে সুমেরিয়ান সভ্যতা ছিল। সুমেরিয়ান সভ্যতার প্রাচীন শহর ছিল উর। ইহা কখনও কখনও সুমেরুর রাজধানীও ছিল। রাজধানী উর হতে ভারতে তৈরী চুনা-মাটির বর্তন বা বাসন পত্র পাওয়া গিয়েছে। উরের স্থাপনা সমূহ ছিল হরপ্পার মতো দেখতে।
দ্রাবিড় ভাষা সমূহে উর যে শব্দ রয়েছে, ইহাই প্রাকৃত ভাষায় ওর হয়েছে। তাহাই তাঞ্জৌরে ( তাঞ্জৌর) রয়েছে। উর হল স্থান বাচক শব্দ।
বুদ্ধের সময় কালে বুদ্ধগয়ার নিকট উরুবেলা ছিল। এ উরুবেলা গ্রামের বর্তমান নাম হল উরেল। সুমেরী ভাষা হতেও ভারতের দ্রাবিড় ভাষা সমূহ হল প্রাচীন।
সুমেরিয়ান সভ্যতার উর শব্দ যা ভারত হতে নেওয়া হয়েছিল, তাও সিন্ধু ঘাঁটি সভ্যতার সাথে যুক্ত হওয়ার পরে নেওয়া হয়েছে।
সিন্ধু ঘাঁটি সভ্যতার এ উর শব্দ বুদ্ধকালীন গ্রাম উরুবেলার সাথে যুক্ত।
স্বয়ং সুমেরিয়ান সভ্যতা ভারত হতে স্বীয় রাজধানীর উর নাম নিয়েছিল।
সুমেরুর প্রসিদ্ধ নগর ছিল নিপ্পুর। নিপ্পুরে রয়েছে পুর শব্দ। সুমেরী উর এবং পুর হল সে শব্দই, যা সমগ্র ভারতের নগর সমূহে ব্যাপ্ত রয়েছে।
সুমেরের মত কীলাক্ষরে শুমের লিখা হত স্বয়ং আজমের, বাড়মের, আমের শব্দ সমূহ তাহাই আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
বৌদ্ধকালীন কুসীনারায় যে ‘নারা’ শব্দ রয়েছে তা হল নগরবোধক শব্দ। এ ‘নারা’ যখন ‘নার’ হয়েছে, তখন তা হতে হয়েছে বিহার রাজ্যের মহনার। এ ‘নারা’ যখন ‘নের’ হয়েছে, তখন তা রাজস্হানের বিকানের হয়েছে। এ নারা যখন ‘নেরী’ হয়েছে, তখন তা মহারাষ্ট্রের শিবনেরী হয়েছে। এ নারা যখন ‘নী’ হয়েছে তখন মধ্য প্রদেশের সিবনী রয়েছে। এ নারা যখন ‘ন’ হয়েছে, তখন বিহারের সিবান শব্দ তৈরী হয়েছে। এরকম আরও অনেক রয়েছে।
বিহারের কেবল সিবান নয়, বরং সারণ এবং চম্পারণও এ ‘নী’ পর্যায় হতে হয়েছে।
রাজস্হানের কেবল বিকানের নয়, বরং জৈসলমেরও এ ‘নের’ (মের) এর পর্যায় হতে তৈরী হয়েছে।
সুমেরীর লোকেরা মূলতঃ কৃষক ও পশুপালক ছিল। তারা গম এবং যবের ক্ষেত করতো। পশুপালকদের এরকমের যে তাদের ভাষা তাতে ২০০ শব্দ রয়েছে, যেগুলি কেবল ভেরার সাথেই সম্বন্ধযুক্ত। শব্দের বাহুল্যতা জানিয়ে দেয় যে, সুমেরী লোক ভেরা চরাতো। তখন ভারতের সিন্ধু ঘাঁটি সভ্যতা অনেক বিকশিত ছিল।
সিন্ধু সভ্যতার লোক কৃষি যুগ হতে সামনে অগ্রসর হয়েছিল। সিন্ধু সভ্যতার নগর সমূহ পাকা ইটের ছিল এবং ইটও ছিল অনেক স্ট্যান্ডার্ড সাইজের।
সুমেরী সভ্যতার ইট ছিল কাঁচা, পাকা, আধাপাকা এবং অনিয়মিত সাইজের। সিন্ধু সভ্যতার লোক সুমেরী সভ্যতার লোক হতে সর্বক্ষেত্রে অগ্রসর ছিল।
হরপ্পা লিপিতে ৪০০ লিপি চিহ্ন যেখানে রয়েছে, সেখানে সুমেরী লিপিতে হয়েছে ৯০০ লিপি চিহ্ন। তাঁদের লিপিতে অধিক চিহ্নের কারণ প্রমাণ করে যে, সুমেরী লিপি সিন্ধু সভ্যতা হতে বেকওয়ার্ড লিপি ছিল।
লিপি বিজ্ঞানের সিদ্ধান্ত ইহাই যে, যেভাবে যেভাবে লিপি বিকশিত হয়, সেভাবে সেভাবে লিপির চিহ্নও কমে আসে।
তারপরেও এল. এ. বেডেলের মতো ঐতিহাসিকেরা মনে করেন যে, খৃষ্টপূর্ব চার হাজার বছর পূর্বে সুমেরুর লোক সিন্ধু সভ্যতায় এসে অবস্থান করেছিল এবং তারাই নিজেদের লিপির সেখানে প্রসার করেছিল।
সঠিকভাবে বলতে গেলে ইহাই বলতে হয়ে যে, সিন্ধু সভ্যতাকে সুমেরীর লোকেরা নয়, বরং সুমেরীর লোকদেরকে সিন্ধু সভ্যতার লোকেরা প্রভাবিত করেছেন।
এখন আবার নতুন গবেষণায় বলা হচ্ছে যে, সিন্ধু ঘাটি সভ্যতা যখন বিকশিত ছিল, তখন সুমেরিয়ান সভ্যতার জন্মও হয়নি।
২) বিশেষজ্ঞ পুরাতত্ববিদ ও অধ্যাপক ড. রাজেন্দ্র প্রসাদের মতে-‘গণিতে শূণ্যের আগমণ হয়েছে বৌদ্ধ দর্শন হতে। শূণ্য ছাড়া দর্শনের জিরোর অনুসন্ধান হল অসম্ভব।’ তিনি আরো বলেছেন যে-‘পঞ্চম শতাব্দীতে ভারতীয় গণিতজ্ঞ আর্যভট্ট (৪৭৬-৫৫০) কর্তৃক শূণ্য আবিস্কারের কাহিনী হল নিচক মিথ্যা রটনা।’
ভগবান বুদ্ধের অব্যবহিত পরে বৌদ্ধ দার্শনিক মঞ্জুশ্রী এবং বিমলকীর্তির মধ্যে যে সমাচার বা বার্তালাপ হয়েছিল, তা ছিল শূণ্যের উপর।
সেখান হতেই খোরাক নিয়ে আচার্য নাগার্জুন (১৫০-২৫০) দর্শনের ক্ষেত্রে শূণ্যবাদের স্থাপনা করেছেন।
বৌদ্ধ দর্শনে যে শূণ্য রয়েছে, তাহাই হল আরবীতে সিফর ( সিফ্র) অর্থাৎ খালি।
আরবী ভাষায় যে সিফর রয়েছে, তাহাই হল লেটিন ভাষায় জেফিরম।
যা লেটিনে জেফিরম তাহাই আবার ইংরেজীতে জিরো হয়েছে।
সুতরাং, Zephirum>Zepiro>Zeuero>Zero.
সুন্ন যতই প্রাকৃতিক ও উর্বর…. শূণ্য হল ততই কৃত্রিম। শূণ্যে কোন উপসর্গ, প্রত্যয় যুক্ত করলেই তখন শব্দ নির্মাণ সম্ভব হয়ে থাকে। যেমন- শূণ্যতা, শূণ্যবাদ, জনশূণ্য ইত্যাদি।
সুন্ন হল উর্বর, সুন্ন এর শাখা-প্রশাখা সমূহ দূর দূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে। শরীর সুন্ন হয়ে থাকে। মানুষ সুন্ন থেকে যায়। স্থান সুনসান হয়ে যায়। সন্নাটা বিস্তারিত হয়েছে। সবার মধ্যে সুন্ন রয়েছে। শূণ্য কোথাও নাই।
সুন্ন মূলতঃ হল দর্শনের শব্দ। মেথমেটিক্সের ক্ষেত্রে সেখান হতেই ইহা এসেছে। ইউরোপ এবং আমেরিকার অনেক গণিতজ্ঞ এ বিষয়ের উপর নিজেদের মোহর লাগিয়েছেন।
সুন্নের প্রয়োগ কেবল প্রাচীন বৌদ্ধ দর্শনে হয়নি, বরং সিদ্ধা, নাথ এবং সন্তদের সাহিত্যেও অনেক ব্যাপকভাবে প্রয়োগ হয়েছে।
সুন্ন, যাকে বর্তমানেও জনসাধারণ সুন্না (সিফর,0 ) বলে থাকে, যে কোন অবস্থায় প্রাকৃত ধারার অনুসন্ধান রয়েছে, যাতে শূণ্যের ভূমিকা হল শূণ্যই।
আলবার্ট আইনস্টাইন (১৮৭৯-১৯৫৫) হতে স্টিফেন হকিং (১৯৪২-২০১৮) পর্যন্ত পৃথিবীর বিখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানী মাধ্যাকর্ষণ, শূণ্য এবং সময়কে নিয়ে যে সমস্ত অভূতপূর্ব কাজ করেছেন, তাতে এক ফাঁক অবশিষ্ট থেকে গিয়েছে এবং পৃথিবীর এখনকার পদার্থ বিজ্ঞানীরা এর ফাঁক দূর করতে প্রয়াসরত রয়েছেন।
এ প্রচেষ্টায় দু’টি পৃথক পৃথক পক্ষ এখনও তৈরী হয়ে রয়েছে। সেগুলির মধ্যে একটি হল সুপার স্ট্রীগ সিদ্ধান্ত এবং অন্যটি হল লুপ ক্বোয়ান্টাম গ্রেবিটি। লুপ ক্বোয়ান্টাম গ্রেবিটিকে অশ্টেকর প্রোগ্রাম নামেও জানা যায়। অশ্টেকর প্রোগ্রামের সিদ্ধান্তকার হলেন স্বয়ং অশ্টেকর।
মুদ্রারাক্ষস প্রণীত আলেখ্যঃ বুদ্ধের পুণর্পাঠের সময়, পৃষ্টা ১০৩ এ বর্ণিত হয়েছে যে, অশ্টেকর স্বীয় সিদ্ধান্তের বিবেচনা করতে গিয়ে লিখেছেন যে, খৃষ্টপূর্ব ষষ্ট শতাব্দীতে গৌতম বুদ্ধ বলেছিলেন-সময়ের অবধি শুদ্ধরূপ হতে পরম্পরাগত ধারণা, সময় এবং শূণ্য আমাদের অনুভব সমূহের সাপেক্ষতায় অস্তিত্বমান হয়ে থাকে। বুদ্ধ পুদ্গল নৈরাত্ম এবং বিজ্ঞপ্তি মাত্রতার মত অবধারণা সমূহের যে সূত্র দিয়েছেন, সে সম্পর্কে ভারতে বর্তমান সময়ে কোন কাজ কেহ করেননি।’
বৌদ্ধ দর্শন এবং পাশ্চিমা বিশ্ব
———————————-
অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীতে জার্মানীতে যে বিজ্ঞানবাদী দর্শনের বিকাশ হয়েছে, সেগুলির উপর বৌদ্ধ দার্শনিক অসঙ্গ (চতুর্থ শতাব্দী) এবং বসুবন্ধু দ্বারা চতুর্থ শতাব্দীতে নাগার্জুনের শূণ্যবাদের সবচেয়ে মহত্বপূর্ণ কাজ করা হয়েছিল।
যে ‘জ্ঞান-মিমাংসা’ পাশ্চাত্য দর্শন শাস্ত্রে সবচেয়ে বড় স্থান লাভ হয়েছে, তার প্রতিপাদন বৌদ্ধ দার্শনিক আচার্য দিঙ্গনাগ (৪৮০-৫৪০) করেছিলেন। তিনি বৌদ্ধ দর্শনের খুব বড় নৈয়ায়িক এবং তর্কশাস্ত্রী ছিলেন।
আচার্য দিঙ্গনাগের শিষ্য ছিলেন ষষ্ট শতাব্দীর আচার্য ধর্মকীর্তি। ন্যায় শাস্ত্রের উপর তিনিও স্মরণীয় কাজ করেছেন। আচার্য ধর্মকীর্তিকে পাশ্চাত্য দার্শনিকগণ ইমেন্যুয়েন কান্টের সংজ্ঞা প্রদান করেছেন।
অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান (৯৮২-১০৫৪) ১১ বছর বয়সে ন্যায় শাস্ত্রের উপর গম্ভীর চিন্তন শুরু করেছিলেন।
একাদশ শতাব্দীর আচার্য রত্নকীর্তি এবং জ্ঞানশ্রী মিত্র তর্ক শাস্ত্রের উপর গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। চতুর্থ শতাব্দীর আচার্য কুমারজীব বস্তুবোধের প্রক্রিয়ার উপর গম্ভীর বৈচারিক খণ্ডন করেছেন।
উপরিউল্লিখিত দার্শনিকগণকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হতে গ্রীক পর্যন্ত আমন্ত্রণ করা হয়েছিল।
পাশ্চাত্য দর্শন শাস্ত্র বিংশ শতাব্দীর উত্তরার্ধে শব্দার্থ দর্শন এবং উচ্চতর গণিতের সিঁড়ি বিস্তার করে অনেক তলা পর্যন্ত করে নিয়েছেন।
কিন্তু ভারতের বৌদ্ধগণ নিজেদের বিহার সমূহে অসঙ্গ হতে ধর্মকীর্তি পর্যন্ত কাজগুলিকে কেন অগ্রসর করাননি? তাঁরা বৌদ্ধধর্মের উপরি বাকলকেই বৌদ্ধধর্ম বলে কেন মানছেন?
প্রায় অষ্টম শতাব্দী হতে দর্শন শাস্ত্রের ক্ষেত্রে বৌদ্ধদের কাজ আর বেশী দেখা যায় না। ( আলেখ্যঃ উত্তর দেওয়ার দাবী এখন শেষ, মুদ্রারাক্ষস, পৃষ্টা-৫৪-৫৫)।
৩) ভগবান বুদ্ধের বৈজ্ঞানিক দিশায় সবচেয়ে বড় এবং মৌলিক স্থাপনা হল কার্য-কারণ বা কারণ-কার্য সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ কারণই কোন কার্যের জন্ম দিয়ে থাকে। অকারণ কোন কিছুই হয়না এবং হতেও পারেনা।
ভগবান বুদ্ধ যে কারণ-কার্য সিদ্ধান্তের বুনিয়াদ খৃষ্টপূর্ব ষষ্ট শতাব্দীতে করেছিলেন, তাকেই বুঝতে ইউরোপকে পুরা দু’হাজার বছর সময় লেগেছিল।
সমগ্র ইউরোপে ইহাকে সবচেয়ে প্রথমে ষোড়শ শতাব্দীতে ফান্সিস বেকন (১৫৬১-১৬২৬) কর্তৃক লিখিত ও বুঝানো হয়েছে যে, যে ব্যক্তি জ্ঞান প্রাপ্ত করতে ইচ্ছুক হন, তাঁকে সর্ব প্রথমে ঘটনা সমূহের অধ্যয়ণ কারণের সাথে করতে হবে। তখনই সিদ্ধান্ত বানিয়ে তাকে প্রয়োগাত্মক পরীক্ষা করা উচিত।
বৌদ্ধধর্মের পালি ভাষায় ‘থের’ নামে যে শব্দ রয়েছে, তাহাই ইংরেজীতে Theory হয়েছে। এজন্য বুদ্ধের শিক্ষা সমূহকে সিদ্ধান্তও বলা যায়।
ইউরোপে কার্য-কারণের প্রতি চেতনা ফ্রান্সিস বেকন দ্বারা প্রসারিত হয়েছে। তখনই গেলিলেই গেলিলিও (১৫৬৪-১৬৪২) , জোহন্স কেপলর (১৫৭১-১৬৩০) এবং আইজাক ন্যুটনের (১৬৪৩-১৭২৭) মত মহান বৈজ্ঞানিকেরা উৎপন্ন হয়েছেন।
জ্ঞানের দুনিয়াতে বুদ্ধ হলেন অতুলনীয়।
পৃথিবীকে ১, ২, ৩ …. লিখার পদ্ধতি শিখিয়েছে বৌদ্ধ সভ্যতা।
বৌদ্ধ সভ্যতার সম্রাট অসোকের ধম্মলিপি হতে লেখনীতে ১, ২, ৩ .. বিকাশ হয়েছে।
সর্ব প্রথমে সপ্তম শতাব্দীতে ইহাকে আরবীয়রা শিখেছিলেন এবং তারা ইহাকে হিন্দসা অর্থাৎ হিন্দ দেশ হতে পেয়েছে এরূপ বলেছে।
আরবীয়দের কাছ থেকে দ্বাদশ শতাব্দীতে ইহা ইউরোপীয়রা শিখেছেন, এবং তাঁরা ইহাকে বলেছেন আরেবিকা।
ইউরোপে দ্বাদশ শতাব্দীর পরে যে বৈজ্ঞানিক এবং শিল্পোদ্যোগের উত্থান শুরু হয়েছিল, তাতে বৌদ্ধ সভ্যতার ১, ২, ৩…. ইত্যাদির অনেক ভূমিকা ছিল।
রোমান সংখ্যা সমূহে লিখতে অনেক জটিলতা রয়েছে। আরবিতে সহজতা রয়েছে। আরবিক যুক্ত-বিয়োজন প্রক্রিয়াকে সহজ করে দিয়েছে।
সে কারণেই ইউরোপে শিল্প উদ্যোগিক উত্থান দ্বাদশ শতাব্দীর পরে হয়েছে। সে সময় লোকেরা আরবীয়দের কাছ হতে আরবী শিখেছিলেন।
প্রত্যেক সভ্যতা বৌদ্ধ সভ্যতা হয়না!
৪) বৌদ্ধ সভ্যতা অনেক দেশ সমূহের নামও দিয়েছে, সে বিষয়ে অথচ সে সমস্ত দেশও জানেনা।
ভাষা বৈজ্ঞানিকেরা জ্ঞাপন করেছেন যে, শ্রীলঙ্কার নাম ( Ceylon) সিলোন হল পর্তুগালবাসীদের দান।
কিন্তু চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং (৬০২-৬৬৪) পর্তুগালীয়রা শ্রীলঙ্কা আসার সহস্রাধিক বছর পূর্বেই লিখেছিলেন, যাকে বর্তমান ‘সিলনগিরি’ও বলা হয়।
পুর্তগালীয়দের পূর্বে শ্রীলঙ্কার জন্য ‘সিলন’ নাম প্রচারিত ছিল, তাহাই ‘সিলোন’ হয়েছে।
পালির এক পারিভাষিক শব্দাবলী হল ‘সীলন।’ ‘সীলন’ এর সোজা সাপটা অর্থ হয়ে থাকে ‘বিনয়’ (অর্থাৎ বিনয় পিটকের নিয়ম) এর অধীন থাকা।
শ্রীলঙ্কা এখনও বৌদ্ধ দেশ এবং হিউয়েন সাং’য়ের সময় তা আরও বেশী বুদ্ধপ্রিয় দেশ ছিল। তার অনেক প্রমাণও রয়েছে। যে সমস্ত বৌদ্ধ গ্রন্থ ফা-হিয়েন (৩৩৭-৪২২) খুঁজে পাননি, তিনি সেগুলি শ্রীলঙ্কায় পেয়েছিলেন।
তখন শ্রীলঙ্কার অধিকাংশ জনগণ বিনয়ের অধীনেই থাকতেন। তখনই ইহা সঠিকভাবে জানা যায় যে, এ সীলন হতে সিলোন ( Ceylon) এর বিকাশ হয়েছে।
হিউয়েন সাং’য়ের ‘ভারত যাত্রা’ পুস্তকের পৃষ্টা ৪০৩ অনুসারে-‘ সিংহলের এক নাম ছিল ‘সিলনগিরি।’ ঐতিহাসিক ঠা. প্র. শর্মা বলেছেন-‘ সীলন এর অর্থ হল বিনয়ের অধীনে থাকা।’ ( পালি-হিন্দি কোষ, পৃষ্টা-৩৫১, ভদন্ত আনন্দ কৌশল্যায়ন।)
চীনের প্রাচীন নাম যাই ছিলনা কেন, খৃষ্টের দু’ শতাব্দী পূর্বে সে দেশের নাম চীন বা চায়না প্রচলনে এসেছে। সে সময়টি ছিল তখনই যখন বুদ্ধের জ্ঞান (ধ্যান) চীন পৌঁছেছিল। ধ্যানকে চীনা ভাষায় চান বা চি’আন বলা হয়ে থাকে।
বুদ্ধের জ্ঞান যখন চীন পৌঁছেছিল, তখন ইহার নাম চীন বা চায়না প্রচলন হয়েছে।
বুদ্ধের চান বা চি’আন হতে চীন বা চায়না নামের অবশ্যই কোন সম্বন্ধ রয়েছে। যদি সেরকম না হতো, তাহলে বিচার করুন যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে হিন্দ-চীন এবং মধ্য এশিয়ার বিস্তৃত ভূ-খণ্ডকে চীনা-তুর্কীস্তান কেনো বলা হয়। তৎকালীন সময়ের প্রাচীন কালে এসব এলাকা ছিল বৌদ্ধময়।
অনুরূপভাবে তিব্বত নিবাসীরা নিজেরাই তাদের দেশকে বোদ্ নামে সম্বোধন করে থাকেন। এ বোদ্ মানে কি? ইহাই হল তাদের বুদ্ধ উচ্চারণ রীতি। বর্তমানে যে ভোট রয়েছে, তাও বুদ্ নামের উপরই হয়েছে এবং এ ভোট হতে ভূটান হয়েছে।
হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারোতে অন্নাগার পাওয়া গিয়েছে। হরপ্পায় রাজমার্গের উভয় দিকে উঁচু স্থানে বিশাল অন্নাগার নির্মিত ছিল দেখা যায়।
অন্নাগারের এ পরম্পরা পূর্ব মৌর্যকাল এবং মৌর্যকালেও চলমান ছিল। আশ্চর্য ইহাই যে, তাও সিন্ধু সভ্যতার মত রাজমার্গের উভয় পাশে তৈরী হয়েছে।
সৌহগোরা তাম্রপত্রে অন্নাগার তৈরীর উল্লেখ পাওয়া যায়। এ অন্নাগারও চৌমাথা রাস্তায় তৈরী হত। এ অভিলেখনীতে দু’টি অন্নাগার তৈরীর উল্লেখ দেখা যায়। সেগুলি তিন কামরা বিশিষ্ট হওয়ার চর্চা করেছে।
সৌহগোরা তাম্রপত্র উত্তর প্রদেশের গোরক্ষপুর ক্ষেত্রের সৌহগোরা নামক গ্রামে প্রাপ্ত হয়েছে। ইহা প্রায় খৃষ্টপুর্ব চতুর্থ শতাব্দীর বলে মনে করা হয়।
ইহার সবচেয়ে উপরে রয়েছে বৌদ্ধধর্মের প্রতীক চিহ্ন। যেমন বোধিবৃক্ষ, স্তূপ ইত্যাদি। বোধিবৃক্ষ যা তাম্রপত্রের সবচেয়ে প্রথমে রয়েছে, তাকেই বিহার সরকার নিজের রাজচিহ্ন বানিয়েছে। দু’টি প্রতীক হল কোষ্ঠাগারের যা ভবনের মত দেখা যায়। এ ভবন হল বাস্তুকলার অভিলেখনীর প্রমাণ প্রস্তুত করে।
কোষ্ঠাগারে দু’ ভবন এজন্যই যে, তাম্রপত্রে দু’ কোষ্ঠাগার (ফসল সঞ্চয়ের জন্য) বিপদের সময় জনহিতের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
সিন্ধু সভ্যতার নগর সমূহে পাকা ইটের দ্বারা নির্মিত স্নানঘর এবং শৌচালয় ছিল। শৌচালয়ের নির্মাণ হল সিন্ধু সভ্যতার খাস বিশেষত্ব।
খৃষ্টপূর্ব ১২০০ শতাব্দীতে মিশরে শৌচালয় পাওয়া যায়। প্রথম শতাব্দীতে রোমান সভ্যতায় শৌচালয় পাওয়া যায়। গ্রীকে ভারত হতে যে জ্ঞান পৌঁছেছিল, রোমান সভ্যতায় শৌচালয় মনে হয় ইহারই ফসল।
সিন্ধু সভ্যতা হতে শৌচালয়ের এ পরম্পরা সিন্ধু মঠ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। বৈশালী যাদুঘরে এক টয়লেট পেন রাখা আছে। ইহা বৈশালীর কোল্হুআ স্থানে খনন কার্যে পাওয়া গিয়েছিল।
টয়লেট পেনটি ছিল প্রথম এবং দ্বিতীয় শতাব্দীর। আঠার-ঊনিশ শত বছরের পুরাতন। ইহা এক বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংস স্তূপ হতে পাওয়া গিয়েছে।
টয়লেটের ব্যাস হল ৮৮ সেন্টিমিটার এবং মোটায় ৭ সেন্টিমিটার। পা দানির দৈর্ঘ হল ২৪ সেন্টিমিটার এবং চওড়া হল ১৩ সেন্টিমিটার।
টয়লেট পেন টেরাকোটা নির্মিত। পায়খানা এবং পশ্রাবের জন্য পৃথক পৃথক ছেদ রয়েছে।
অনুমান করা হয় যে, ইহা হল ভিক্ষুণীদের বিহারের টয়লেট পেন।
বর্তমানে ভারত সরকার কর্তৃক খোলা ময়দানে শৌচক্রিয়া হতে মুক্তি দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। তখন বিচার করুন যে, এ দিশায় বৌদ্ধ সভ্যতার কিরকম প্রাগ্রসর যোগদান বা ভূমিকা ছিল!
৫) সিন্ধু সভ্যতার লোকদের লেখন-কলা কোন কোন ক্ষেত্রে ধম্ম লিপি ( ব্রাহ্মী) লেখনীর লোকদের লেখন-কলার সাথে মিল দেখা যায়।
সিন্ধু সভ্যতার লিপি, ধম্ম লিপি এবং তামিল ব্রাহ্মী লিপির সাথে অন্ততঃ পক্ষে পাচঁটি অক্ষরের মিল পাওয়া যায়।
সিন্ধু সভ্যতা প্রাক্ বৌদ্ধ সভ্যতা এবং ভগবান বুদ্ধ তথা তাঁর পরবর্তী বৌদ্ধ সভ্যতার মধ্যে লেখন-কলায় মিল পাওয়া যায়। পরম্পরা সমূহ মরে যায়না।
সমস্ত ঐতিহাসিকেরা যা মৌর্যদের কারিগরীকে ইরানে গিয়ে অনুসন্ধান করে থাকেন, তাঁরা কেনো বলেননা যে, মৌর্যদের শাহী মহল ইরানের সুসা এবং একবটনার শাহী মহল হতে অনেক কারণে অধিক সুন্দর ছিল।
পাটলীপুত্রের শাহী মহল ইরানের শাহী মহল হতে অধিক সুন্দর এবং বিশাল ছিল। এ কথা ভারত এবং ইরানের ঐতিহাসিকেরা বলেননি, বরং গ্রীকের ঐতিহাসিকেরা বর্ণনা করেছেন। পক্ষপাতের কোন দোষ গ্রীক ঐতিহাসিকদের ছিলনা।
এখন অসোক কালীন রামপুরবার ষাঁড়ের মুর্তিকে দেখুন, ইহার সমস্ত বিন্যাস সিন্ধু সভ্যতার সে কুবরদার বৃষভের (তথাকথিত) সাথে মিল দেখা যায়।
যদি কারো সন্দেহ হয়, তাহলে মৌর্যকালীন হাতীর উৎকীর্ণকে দেখুন। তাও সিন্ধু সভ্যতার সীল গুলিতে উৎকীর্ণ হাতীর সাথে মিল দেখা যায়। যে দেশে সিন্ধু সভ্যতার মত এরকম গৌরবপূর্ণ ঐতিহ্য রয়েছে, তারা অন্য দেশের সভ্যতার দিকে তাকানো কি শোভনীয়?
সিন্ধু কালের প্রিষ্ট কিংগের মুর্তি এবং মৌর্য কালীন যক্ষিণী মুর্তির তুলনা দেখুন।
উভয় মুর্তির নাক ভাঙ্গা রয়েছে। এক এক হাত ভাঙ্গা রয়েছে। ইহা আকস্মিক হতে পারে। কিন্তু উভয় মুর্তির মস্তকে যে গোলাকার পাগরী বা শিরোভূষণ রয়েছে, তা এক কোনো নিদির্ষ্ট প্রকারের সভ্যতার ঈঙ্গিত করে থাকে এবং সে সভ্যতা হল বৌদ্ধ সভ্যতা।
মৌর্যকাল এবং সিন্ধু সভ্যতার কাল উভয়ই হল বৌদ্ধ সভ্যতার ভেজানো কাল। এজন্য উভয় কালের মুর্তি সমূহে দৃশ্যমান গোলাকার শিরোভূষণের সমানতা আকস্মিক নয়।
গম্বুজ হল এক প্রকার অর্ধ গোলাকার ছাদ। ছাদ মনুষেরা থাকার জন্য বানিয়ে থাকে। গম্বুজকে ইংরেজীতে Dome বলা হয়। Dome ঘরের সাথেই যুক্ত। এজন্য গৃহস্থীকে ইংরেজীতে Homestic নয়, Domestic বলা হয়।
রাশিয়ান ভাষায় দোম মানে হল ঘর। লেটিনে ডোমস অর্থাৎ ঘর। Dome অর্থাৎ গম্বুজ গৃহের সাথে সম্বন্ধযুক্ত। এজন্য গম্বুজের ইতিহাস মানব সভ্যতার চেয়ে প্রাচীন।
কিন্তু ইট-পাথরের দ্বারা তথা স্বতন্ত্র গম্বুজ বানানোর স্পষ্ট ইতিহাস আমরা ভারতীয় উপমহাদেশে সর্বপ্রথম বৌদ্ধ পরম্পরা হতে দেখতে পাই। এখন ইহাকে আপনারা ডবল গম্বুজ বলতে পারেন।
গম্বুজ বানিয়েছে স্তূপ। গুম্বাত হল স্তূপ। ইহা পাকিস্তানের স্বাত ঘাঁটিতে বারীকোট হতে ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত।
স্তূপের উপর গম্বুজ বানানো হয়েছে। এজন্য ইহাকে গম্বুজ স্তূপ বলা হয়। গুম্বাত হল পশ্তো ভাষার শব্দ। ইহার অর্থ হল গম্বুজ।
ভারতীয় দ্বীপে কোন ইমারতের উপর স্পষ্ট এবং ডবল গম্বুজ বানানোর ইহা প্রথম স্পষ্ট প্রমাণ যে, যার নির্মাণকাল খৃষ্টপূর্ব দ্বিতীয় অব্দের পরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
ভারতে মধ্য কালীন ইমারত সমূহ গম্বুজ যুক্ত দেখা যায়। তাই এ সমস্ত স্থাপত্য হল বৌদ্ধ স্থাপত্যের দান।
মধ্যকালে অষ্টকোণা ইমারত সমূহ অনেক নির্মিত হয়েছিল। দিল্লিতে শের শাহের মকবরা হল অষ্টকোণীয়। বৌদ্ধ স্থাপত্য কলায় অষ্টকোণীয়ের নিজস্ব মহত্ব রয়েছে। মানতী স্তূপের আকৃতি অষ্টাঙ্গিক মার্গের কারণে অষ্টকোণীয় হয়ে থাকে। কুয়া বা কূপও তৈরী হয়েছে অষ্টকোণীয়। অষ্টকোণীয় প্রাচীন কুয়া বিহারের সাসারামেও রয়েছে। ইহাকে হথিয়া কুয়া বলা হয় এবং বুদ্ধগয়া এলাকায়ও এরকম কুয়া রয়েছে।
কেবল মানতী স্তূপ নয়, বরং অন্য স্তূপ সমূহও অস্টকোণীয় তৈরী হয়েছে। অষ্টকোণীয় স্থাপত্য হল বৌদ্ধদের দান। অষ্টাঙ্গিক মার্গের প্রতীক স্বরূপ এগুলি বানানো হয়েছে। পরে অন্য সংস্কৃতির লোকেরা অষ্টকোণীয় স্থাপনা আত্মসাত করে নিয়েছে।
ধম্মচক্রের ইতিহাস হল প্রাচীন। সিন্ধু সভ্যতার সীল সমূহেও ছয় শলাকা বিশিষ্ট ধম্মচক্র পাওয়া যায়। ধৌলাবীরা সাইনবোর্ডেও ছয় শলাকা বিশিষ্ট ধম্মচক্র রয়েছে।
বুদ্ধের সময়ে আট শলাকা বিশিষ্ট ধম্মচক্র বানানো হয়েছে। সম্রাট অসোক ২৪ শলাকা বিশিষ্ট এবং ৩২ শলাকা বিশিষ্ট ধম্মচক্রের ব্যবহার করেছেন। ৩২ শলাকার অধিকও ধম্মচক্র বানানো হয়েছে।
ধম্মচক্রের মত স্তূপও বানানো হয়েছে। সংঘোলের স্তূপ হল এর উদাহরণ। ধম্মচক্রের মত স্তূপ ধৌলাবীরাতেও দেখা যায়।
সিন্ধু সভ্যতায় ৬ শলাকা বিশিষ্ট ধম্মচক্রের ব্যবহার লিপিতে করা হয়েছে।
ভগবান গৌতম বুদ্ধ ৮ শলাকা বিশিষ্ট ধম্মচক্রের ব্যবহার শিক্ষায় দিয়েছেন।
সম্রাট অসোক ২৪ শলাকা বিশিষ্ট ধম্মচক্রের ব্যবহার শাসনে দিয়েছেন।
এরকমই ধম্মচক্রের পদক্ষেপ সিন্ধু সভ্যতা হতে মৌর্য কাল পর্যন্ত প্রসারিত হয়ে এসেছে।
যখন বুদ্ধ ছিলেন, তখন অশ্বত্থ বৃক্ষকে সমগ্র ইউরোপ জানত না। সেন্ট্রাল আমেরিকা এবং কেরিবিয়ান এলাকায় তো অশ্বত্থ বৃক্ষ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষেই পৌঁছেছে।
ভগবান বুদ্ধের অনেক শতাব্দী পরে উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা অশ্বত্থ বৃক্ষের Botanical নাম Ficus Religiosa রেখেছেন। এ নাম ভগবান বুদ্ধের কারণে পড়েছে।
অশ্বত্থের Secret Fig নামও বুদ্ধের কারণে হয়েছে। ইংরেজীতে যা হল অশ্বত্থের Bo Tree, তা হল Bodhi Tree’র সংক্ষিপ্ত রূপ। অশ্বত্থের সাথে পরিচিত না হওয়ার কারণে ইউরোপীয় ভাষা সমূহে অশ্বত্থের কোন অর্জিনিয়াল নামও নাই।
এশিয়ার দেশ সমূহ অনেক ভাগ্যশালী যে, তাদের সাথে অশ্বত্থবৃক্ষের সাথে পরিচয় তখনই হয়েছে যখন তারা ধম্মের শরণাগত হয়েছে। ভগবান বুদ্ধের কারণে অশ্বত্থ বৃক্ষকে এশিয়ায় সম্মানজনক পরিচয় হয়েছে।
বুদ্ধ কর্তৃক এ অশ্বত্থ বৃক্ষ প্রাক বৌদ্ধ সভ্যতা হতে লাভ হয়েছে এবং ইহাকে Tree of Awakening (বোধিবৃক্ষ) নামে পুনর্বার মর্যাদায়িত করা হয়েছে।
ভগবান গৌতম বুদ্ধের পূর্বে দীপঙ্কর বুদ্ধের বোধিবৃক্ষ ছিল অশ্বত্থ বৃক্ষ। তিনি ছিলেন চতুর্থ বুদ্ধ। তা ছিল সিন্ধু ঘাঁটি সভ্যতার সমকালীন।
২০১৯ সালে বিহারের লক্ষীসরাইয়ের সূর্যগড়া প্রখণ্ডের রামপুর গ্রামের পশ্চিমে স্থিত ভেলবা পুকুরের খননকার্যে কাল পাথরের এক বৌদ্ধ স্মারক পাওয়া গিয়েছে। এ বৌদ্ধ স্মারকটি হল ৪৬ কিলো ওজনের। ইহা দ্বিতল বিশিষ্ট। প্রত্যেক তলায় ৪ টি করে বুদ্ধের মুর্তি উৎকীর্ণ করা হয়েছে। মোট আটটি মুর্তি উৎকীর্ণ করা হয়েছে।
ইহা সংযোগ ছিলনা বরং জেনে বুঝেই উৎকীর্ণ বুদ্ধমুর্তি সমূহের নাক ও বিভিন্ন অঙ্গ বিকৃত করা হয়েছিল, যাতে মুর্তি চেনা না যায়।
সংযোগ বলতে পারেন যে, স্মারকের নীচের অংশে দু’লাইনের অভিলেখ রয়েছে। তা হল-‘যে ধম্মা হেতুপ্পভবা……
ইহা হল সে প্রসিদ্ধ বাণী যা বৌদ্ধ সাহিত্যে অশ্বজিত এবং সারিপুত্রের মধ্যে বার্তালাপরূপে জানা যায়।
এ বাণী হল অশ্বজিত স্থবিরের। যা তিনি সংক্ষেপে সারিপুত্রকে ধম্মের সাররূপে শুনিয়েছিলেন।
এর সারাংশ ইহাই যে, ঘটনা সমূহ কারণ হতে উৎপন্ন হয়, তথাগত বুদ্ধ কারণ সমূহ শিক্ষা দিয়ে থাকেন। সেগুলি বন্ধ করার উপায়ও রয়েছে। সে সম্পর্কেও বুদ্ধ বলে থাকেন।
সত্যি বলতে কি এ বৌদ্ধ স্মারক হল মহাবোধি মহাবিহারেরই ভাবানুবাদ, প্রতিকৃতি নয়।
পৃথিবীতে এখনও মহাবোধি মহাবিহারের প্রায় ৩৯ টি প্রতিকৃতি মওজুদ রয়েছে এবং যা আমেরিকা ও চীন-জাপান-কোরিয়া হতে নেপাল, বার্মা, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম এবং থাইল্যান্ড পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে।
ভগবান বুদ্ধের কপিলবাস্তু ঠিক সেরকমই পত্তন হয়েছিল, যেরকম বসতি হয়েছে হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো নগরের।
দু’ভাগে তা বিস্তার হয়েছিল। একভাগ রিহায়শী ক্ষেত্র গনবরিয়া ছিল এবং অন্যভাগ পিপরওবা। উভয় মিলেই ছিল কপিলবাস্তু। বুদ্ধের পিতৃ মহল ছিল গনবরিয়ার রিহায়শী বা বসতি ক্ষেত্রে।
হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারো নগর সমূহেও বসতি ক্ষেত্র পৃথক ছিল এবং ধার্মিক ক্ষেত্র পৃথক ছিল। যাকে পুরাতত্ববিদেরা স্তূপ ক্ষেত্র বলে আখ্যা দিয়েছেন।
সিন্ধু ঘাঁটি নগর পরিকল্পনা হতে কপিলবাস্তুর নগর পরিকল্পনা পৃথক নয়।
হিমাচল প্রদেশের কাঙ্গারায় পঠিয়ার গ্রামের পাশে শিলালেখ রয়েছে। স্থানীয় লোকদের মান্যতা হল যে, বিস্ময়কারী লিপিতে লিখিত এ শিলালেখ কেহ বুঝতে পারেনি।
কিন্তু শিলালেখনীর উপর এবং নীচে কেবল দু’ পংতি লিখা হয়েছে। উপরে লিপি হল ধম্ম এবং নীচেরটা হল খরোষ্টী।
উপরে লিখা রয়েছে বায়লস পুকরিণী এবং নীচে লিখা রয়েছে রাঠি দাহাস বাযলস পুকরিণী।
উপরের অর্থ হল জলাশয় অর্থাৎ সার্বজনীন জলাশয় এবং নীচের অর্থ হল রাষ্ট্রিক দারার সার্বজনীন জলাশয়।
কিন্তু লিপিতেই পঠিয়ার শিলালেখনীতে স্বস্তিক নির্মিত হয়েছে। অনেক ধম্মলিপির অভিলেখনীতে স্বস্তিক রয়েছে। আশ্চর্য জনকরূপে স্বস্তিকের এ পরম্পরা সিন্ধু সভ্যতা হতে যুক্ত। সেখানেও স্বস্তিকা পাওয়া যায়।
৬) অনেক বৌদ্ধ ঘটনা সমূহ পরিবর্তিতরূপে পরবর্তী সাহিত্যেও দেখা যায়। যেমন পালি সাহিত্য হতে জ্ঞাত হওয়া যায় যে, ভগবান বুদ্ধ মথুরা হতে বেরঞ্জা এসেছিলেন এবং অনেক লোকের মান্যতা যে, প্রাচীন বেরঞ্জা হল বর্তমানের ব্রজমণ্ডল। বেরঞ্জা উত্তর প্রদেশের ব্রজভাষা ক্ষেত্রের ব্রজমণ্ডলের এটা হতে ১৬ কিলোমিটার দূরে উত্তরের দিকে অবস্থিত।
অতিরঞ্জী খেরা হতে বেরঞ্জার পরিচয় করা হয়েছে। অতিরঞ্জী খেরার খোঁজ করেছিলেন পুরাতত্ববিদ স্যার আলেক্সজান্ডার কানিংহাম ১৮৬১-৬২ সালে।
অতিরঞ্জী খেরা ছিল বর্তমানের কালী নদীর পাশে। কালী নদী হল উত্তর প্রদেশের কন্নৌজে, যা কালিন্দী নামে প্রসিদ্ধ।
অর্থাৎ বেরঞ্জা কালিন্দী নদীর কিনারে ছিল। হিন্দির মধ্যকালীন কবিগণ স্মৃতি এবং অবশেষরূপে ব্রজকে কালিন্দী নদীর কিনারে বলে উল্লেখ করেছেন।
রসখান লিখেছেন যে-‘কালিন্দী কুল কন্দব কী ডারন’ অর্থাৎ তারা ব্রজের কদম্ব বৃক্ষের কালিন্দী নদীর কিনারে দাঁড়িয়েছিল।
কবি গঙ্গা লিখেছেন যে-‘কালীদহ কালিন্দী’ অর্থাৎ কালিন্দীতে কালীদহ ছিল। কালীদহ তো কালি নদীর দহ (নদীর গভীর অংশ) হয়ে থাকবে।
বর্তমানের কালী নদী হল পূর্বের কালিন্দী নদীই। পার্শিয়ান লেখকেরা কালিন্দী নদীর নাম কালি নদী করেছেন এবং ইহা কবি গঙ্গার সময়ে প্রচলিত হয়েছে।
বর্তমানে যমুনার এক নাম হল কালিন্দী নদী। কিন্তু যমুনার কালিন্দী নাম পরবর্তী সাহিত্যে পাওয়া গিয়েছে।
পূর্বের সাহিত্যে কালিন্দী এবং যমুনা পৃথক পৃথক নদী ছিল। বাল্মিকী রামায়ণে উল্লেখ আছে যে-‘কালিন্দী যমুনা রম্যা।’
বর্তমানের ব্রজমণ্ডল হল যমুনা নদীর পাশে এবং তখনকার বেরঞ্জা ছিল যমুনার তটে। হিন্দি সাহিত্যে গোপিনীদের বিরহকে ‘বৈঠে ঠালের বিলাপ’ বলা হয়েছে। কারণ কৃষ্ণ ব্রজ হতে মথুরা চলে গিয়েছিলেন এবং বর্তমানের ব্রজ হতে মথুরার দূরত্ব হল কয়েক মিনিটের।
আরও এক উদাহরণ-
পরিভ্রমণ করতে করতে হিউয়েন সাং গান্ধার ক্ষেত্রে পৌঁছেছিলেন। আবার তিনি পুস্কলাবতী গিয়েছিলেন। পুস্কলাবতীর নিকট এক স্তূপ ছিল। তা বোধিসত্ব শ্যাম বা শ্রমকের স্মৃতিতে বানানো হয়েছিল।
বোধিসত্ব শ্রমক সেখানে অবস্থান করে স্বীয় অন্ধ মাতা -পিতার সেবা করতেন। একদিন তিনি তাঁর অন্ধ মাতা-পিতার জন্য ফল আহরণ করতে বনে গিয়েছিলেন।
তখন এক রাজা শিকারের জন্য বেরিয়েছিলেন। তিনি অজান্তে শ্রমকের উপর বিষ-বাণ নিক্ষেপ করেছিলেন। বোধিসত্ব সে বিষবাণে মারা যাননি। বরং তাঁর ক্ষত স্থান ঔষধির দ্বারা আরোগ্য হয়েছিল।
মাতা-পিতাকে সেবাকারী বোধিসত্ব শ্রমকের স্মৃতিতে সে স্তূপ নির্মিত হয়েছিল। ইহাই হল বৌদ্ধধম্ম।
শ্রমকের এ ইতিহাস পড়ার পরে কেনো পুরাণ সমূহে শ্রবণ কুমারের স্মরণ এসেছিল? (হিউয়েন সাংয়ের ভ্রমণ বৃত্তান্ত হতে গৃহীত)।
অনেক স্থানে বুদ্ধ মুর্তি সমূহকে অন্য মুর্তির নামে পূজা করা হচ্ছে। কোথাও মেরবা বাবা, কোথাও তেলিয়া বাবা, কোথাও তিরুপতি বালাজী বা কোথাও অন্য ধর্মের দেবী-দেবতায় রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছে।
কোথাও কোথাও এক বুদ্ধ বিরোধী পরম্পরা হয়েও বৌদ্ধ স্থল সমূহকে ভাঙ্গচুর করে নিজেদের করায়ত্ব করে নিয়েছে।
এক উদাহরণ এখানে তুলে ধরছি।
বোজ্জনকাণ্ডা হল এক বৌদ্ধ স্থল। ইহা অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনমের সঙ্করমে (সঙ্ঘারাম) অবস্থিত। মকর সংক্রান্তির পূর্ব দিন এখানে ‘কনুমা দিবস’ উদযাপনের পরম্পরা রয়েছে।
কনুমা দিবস উপলক্ষে সেখানে হাজার হাজার লোক একত্রিত হয়। তখন লোক সেখানে অতীব উত্তেজিত হয়ে সকলে পাথর একত্রিত করে। বৌদ্ধ স্থলের পাথরকেই তারা সকলে আবার বৌদ্ধ স্থলের দিকে নিক্ষেপ করে থাকে।
বুদ্ধকে দানব মনে করে তারা পাথর নিক্ষেপ করে বৌদ্ধ স্থানকেই ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দেয়। অনেক বছর হতে চলে আসা এ পরম্পরা কয়েক বছর পূর্ব হতে প্রায় বন্ধ হয়েছে। এ প্রথার সময় সেখানে ২০২০ সাল পর্যন্ত জিলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও সামিল হতেন।
আলেক্সজান্ডার রীম ১৯০৬ সালে সে স্থানে খোদাই করেছিলেন। তখন পাথর নিক্ষেপের এ রীতি ছিলনা। সম্ভবতঃ ১৯২০ এর দশকে এ রীতি প্রচলনে এসেছে।
পরিতাপের বিষয় যে, ১৯২০ এর দশকে সমগ্র ভারতবর্ষে ইংরেজদের বিতাড়িত করার আন্দোলন শুরু হয়। তখন কিছু লোক ১৯২০ এর দশকেই বুদ্ধকে দানব বা দৈত্য আখ্যা দিয়ে বুদ্ধের উপর এ দুর্গতি করতে উঠে পড়ে লেগেছিল। যেমন মক্কায় হজ্ব করতে যাওয়া হাজীরা বুদ্ধের পদচিহ্নের পাথরকে শয়তানের পাথর আখ্যা দিয়ে সেখানে পাথর খণ্ড নিক্ষেপ পূর্বক পূণ্য করে আসে।
আমি লেখার শুরুতে যে উরের কথা বলেছিলাম এক ইসলামিক বিশেষজ্ঞও সে সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন-‘পার্শিয়ান গ্রন্থ সমূহে বর্ণনা রয়েছে যে, প্রাচীন উর শহর হল আর্যদের মূল স্থান। তারা হল উরবাসী, এজন্য তাদেরকে আর্য বলা হয়। ভারতীয় আর্য দাবী করা ব্রাহ্মণেরা হল মূলতঃ সেখান হতে এসেছে।’