19/06/2026
🔰অষ্ট লোকধর্ম কি কি? কিরূপে এসব লোকধর্ম মানুষের জীবনে সদাসর্বদা প্রভাব বিস্তার করে?
অষ্টবিধ লােকধর্ম হচ্ছে:--- (ক) লাভ - অলাভ (খ) যশ - অযশ (গ) নিন্দা - প্রশংসা (ঘ) সুখ - দুঃখ ।
এই আট প্রকার বিপরীতধর্মী পার্থিব অবস্থা দ্বারা প্রতিটি মানুষের জীবন কম - বেশী প্রভাবাধীন । মানব জীবনের পাপ - পুণ্য কিংবা উত্থান - পতনের সাথে এদের কর্ম - ক্রিয়া গভীরভাবে সম্পৃক্ত । তাই এদেরকে লােকধর্মরূপে বুদ্ধ আখ্যায়িত করেছেন । প্রত্যেকে চায় লাভ , যশ , প্রশংসা ও সুখ ; অলাভ , অযশ , নিন্দা ও দুঃখের ভাগী হতে কেহ চায় না । না চাইলেও এরা সবার জীবনে আসবেই । দুই বিপরীত মুখী অবস্থার একটা প্রাপ্ত হলে অপরটার জন্যে অবশ্যই তৈরী থাকা দরকার । এদের শুভ প্রভাব সুখকর হলেও মন্দ বা অশুভ প্রভাব বড়ই বেদনাদায়ক হয় , বহু সময় মানুষের জীবন তচনচ হয়ে যায় । খুব কমসংখ্যক লােক জীবনের এই ভাঙ্গা - গড়ায় সঠিক হাল ধরে ঠিকে থাকতে পারে ।
(ক). লাভ - অলাভ (GAIN and LOSS): লােকধর্মের প্রথম দুই বিপরীত অবস্থা হচ্ছে লাভ ক্ষতি (অলাভ) । এ সব মানুষের কর্ম - জীবনে ঘটে থাকে । লাভ - ক্ষতি সচরাচর ব্যবসায়ীদের জীবনের অঙ্গ স্বরূপ । এখানে শুধু ব্যবসায়ীর লাভ - ক্ষতিকে বুঝানাে হয়নি । কুশল কর্ম প্রভাবে কারাে জীবন হয় সুখপ্রদ , অকুশল কর্ম প্রভাবে কারাে জীবন হয় দুর্বিসহ । লাভকে সবাই হাসি মুখে বরণ করে নেয় , কিন্তু ক্ষতিকে অত সহজে অনেকেই গ্রহণ করতে পারে না । ক্ষতি যখন অসহনীয় হয়ে উঠে , কেহ কেহ তখন মানসিক ভারসাম্য রক্ষা করতে না পেরে আত্মহত্যা করে । এরূপ প্রতিকূল অবস্থায় জীবন - সংগ্রামী প্রত্যেককে সাহসী ও আত্মপ্রত্যয়ী হওয়া উচিত । তার বুঝা উচিত যে সবার জীবনে উত্থান - পতন আছে । প্রতিটি ব্যক্তিকে ক্ষতির জন্যে সর্বদা প্রস্তুত থাকা দরকার ; তবেই তাে খুব বড় মাপের ক্ষতিও মানুষকে তেমন হতাশ করতে পারে । জিনিষপত্র চুরি হলে অথবা কেহ হাইজ্যাক করলে , ঘর পােড়া গেলে বা ঝড় - তুফানে নষ্ট হলে কিংবা নিকটতম কেহ মারা গেলে মানুষ হতাশায় ভেঙ্গে পড়ে । যেহেতু সেটা আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয় , তার জন্যে বারংবার চিন্তা করে মন খারাপ করা নিতান্তই বৃথা । বুদ্ধের সময়ে বৌদ্ধ উপাসিকা মল্লিকাদেবী তথাগত বুদ্ধ প্রমুখ পঞ্চশত ভিক্ষুসঙ্ঘকে ভােজন দান করছিলেন । সে সময় ছােট্ট একটি চিরকুট পেয়ে মল্লিকা জানতে পারলেন যে তার স্বামী পুত্রেরা সবাই হত । কোশলরাজ প্রসেনজিতের নির্দেশে তারা সবাই বিদ্রোহ দমন করতে রাজ্য সীমান্তে গিয়েছিলেন । ভদ্র মহিলা এই দুঃসংবাদ পেয়েও কাউকে কিছু না বলে পত্রখানা কটিদেশে রেখে বুদ্ধ প্রমুখ ভিক্ষুসঙ্ঘের পরিচর্যা করতে লাগলেন । পরিবেশনের সময় তাঁর পরিচারিকার অন্যমনস্কতায় হস্তচ্যুত হয়ে ঘৃতের কলসী ভেঙ্গে যায় । তিনি তা অপনয়ন করিয়ে অন্য কলসী এনে পরিবেশন করালেন । খাওয়া শেষে ভগবান কথা উত্থাপন প্রসঙ্গে বললেন , “ মল্লিকে , যা ভঙ্গুর তা ভেঙ্গেছে , এর জন্যে চিন্তা করাে না । ” তখন মল্লিকা কটিদেশ হতে পত্রখানি বের করে বললেন , “ ভন্তে , লােকে আমাকে এ পত্রে জানিয়েছে যে আজ আমার বত্রিশ জন পুত্রের ও স্বামীর শিরচ্ছেদ হয়েছে । এ খবর শুনে অনর্থক শােকগ্রস্ত হইনি , ঘৃত কলসীর জন্য চিন্তা করব কেন ? ” সাহসী মহিলার এরূপ নির্ভীকতাপূর্ণ বাক্য খুবই প্রশংসনীয় বৈকি ! বিপদে হতবুদ্ধি না হওয়া জ্ঞানীর লক্ষণ ।
(খ). যশ - অযশ ( FAME and DEFAME ): যশ - অযশ অষ্ট লােকধর্মের দ্বিতীয় দুই বিপরীত অবস্থা । দৈনন্দিন জীবন পরিচালনায় আমাদেরকে এ দুটো অনিবার্য অবস্থার সম্মুখীন হতে হয় । যশকে আমরা সবাই স্বাগত জানাই , অযশকে আমরা পছন্দ করি না । যশ আমাদের মনকে উল্লসিত করে , কিন্তু অযশ আমাদেরকে হতাশ করে । যশ হল খ্যাতি , আর অযশ হল অখ্যাতি । আমরা খ্যাতিমান হতে চাই ; পত্র - পত্রিকায় ছবিসহ নাম দেখার বড়ই আগ্রহী আমরা । আমাদের কাজকর্ম যতই গুরুত্বহীন হােক না কেন , প্রচারিত হলে আমরা আনন্দ পাই । মাঝে মধ্যে আমরা অবাঞ্চিত প্রচারেও ইচ্ছুক । ম্যাগাজিনে বা পত্র - পত্রিকায় নিজ ছবি দেখতে কেহ কেহ অর্থ প্রদানেও রাজী । স্বল্প সময়ের সম্মানের জন্যে অনেকেই উৎকোচ প্রদানেও প্রস্তুত কিংবা ক্ষমতাসীন দলকে মােটা অঙ্কের চাঁদা দিতেও প্রস্তুত । নিছক পরিচিতির উদ্দেশ্যে কেহ বহু মানুষকে নিমন্ত্রণ খাইয়ে দানবীর হতে চান , অথচ প্রতিবেশী গরীব অথবা অভাবী মানুষের প্রতি মুখ ফিরিয়ে তাকান । অভাবের তাড়নায় কেহ চুরি করলে তাকে তারা শাস্তি দেন , কিন্তু সুনামের স্বার্থে সম্পদের অপব্যবহারে তারা কুণ্ঠাবােধ করেন না । এসব হচ্ছে মানুষের চরিত্রের দুর্বলতা । এমন কি কোন কোন সৎকাজ অনেকে বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণােদিত হয়ে সম্পাদন করে । স্বার্থহীন ব্যক্তি জগতে দুর্লভ । সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করার লােক সংসারে নিতান্তই কম । আসলে যশের আকাঙ্খী হওয়া উচিত না । যশ মূলতঃ এক প্রকার জনরব বা জনশ্রুতি , যা পদ্মপত্রের জলের ন্যায় টলটলায়মান , যে কোন সময় এর পতন অনিবার্য । আমরা যদি যশ - খ্যাতির যােগ্য হই , তাহলে না চাইলেও এটা আসবে । মধুর লােভে মৌমাছিরা ফুলের প্রতি আকৃষ্ট হয় । ফুল কখনও মৌমাছিকে আবার আমন্ত্রণ জানায় না ।
বাস্তবিকপক্ষে আমরা সুখী অথবা অতিরিক্ত সুখী হই , যখন আমাদের যশ - খ্যাতি দেশ - বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে । কিন্তু আমাদের অবশ্যই মনে রাখা উচিত যে মান - সম্মান কিংবা যশ - গৌরব কোনটাই স্থায়ী নয় । সবই ধ্বংসশীল , যদিও এসব কর্ণ সুখকর , তবুও এগুলাে অসার , অনিত্য , অর্থহীন ও নিস্ফল বাক্য ছাড়া আর কিছুই নয় । এ সব পারলৌকিক জীবনে ফল প্রদানে অক্ষম । সুরম্য প্রাসাদ নির্মাণে বছরের পর বছর সময় লাগতে পারে । অথচ আধুনিক ধ্বংসাত্মক যন্ত্রের সাহায্যে তাকে দু'এক মিনিটে ধূলিস্মাৎ করা সম্ভব । তদ্রপ জীবনে সুনাম অর্জন করতে বছরের পর বছর , হয়তাে জীবনভর সময়ের প্রয়ােজন হতে পারে । কিন্তু কষ্টার্জিত সুনাম নষ্ট করতে এক মিনিট সময়েরও প্রয়ােজন হবে না । কিন্তু এই অখ্যাতিমূলক শব্দ দিয়ে আরম্ভ করা ক্ষতিকর মন্তব্য থেকে কোন মানুষ মুক্ত নয় । যেমন - হা , তিনি খুবই ভাল লোক , তিনি এ কাজ করেছেন , ওটা করেছেন ইত্যাদি , কিন্তু .......। এই ‘ কিন্তু দিয়ে বাক্য বলে তার সমস্ত ভাল কাজের সুখ্যাতি এক মুহুর্তে কালিমালিপ্ত করে দেয় । তথাগত বুদ্ধের ন্যায় জীবন যাপন করলেও আপনি সমালােচনা , আক্রমণ ও অপমানের ঊর্ধ্বে নন । মান - সম্মান ও লাভ - সৎকার কমে যাওয়ায় বুদ্ধের বিরুদ্ধবাদী অন্য তীর্থিকেরা বুদ্ধের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন । তাদের ষড়যন্ত্রের ফসল চিঞ্চা মানবিকার অপগৰ্ভ এবং জনৈক পরিব্রাজকের সুন্দরী মেয়ের মৃত্যু ঘটিয়ে অপপ্রচার এমন কি বুদ্ধের মামাত ভাই ও শিষ্য ভিক্ষু দেবদত্ত তথাগত বুদ্ধকে মারবার বিভিন্ন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন । কিন্তু তিনি সম্যক সম্বুদ্ধ বলেই হত্যা করা কিছুতেই সম্ভব হয়নি । কোন দোষ - ত্রুটিহীন , নিস্পাপ ও পরিপূর্ণ পরিশুদ্ধ বুদ্ধের বেলায় যদি এরূপ হয় , তাহলে আমাদের মত সাধারণ মানুষের অবস্থা কী হতে পারে - একবার ভেবে দেখুন । আপনি পাহাড়ের যতই উপরে উঠবেন , অনায়াসে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবেন । তবে সবার চোখে আপনি ক্রমশঃ ছােট হয়ে যাচ্ছেন । আপনার পিঠ দেখা গেলেও সামনের ভাগ থাকবে সবার অলক্ষ্যে । ছিদ্রান্বেষী বিশ্ব সততঃ আপনার দোষ - ত্রুটি ও অপকর্মগুলাে সবার সমক্ষে তুলে ধরবে এবং আপনার মুখ্য গুণসমূহ ঢেকে রাখবে । তুষ ঝাড়ার যন্ত্র তুষ ত্যাগ করে শুধু শস্যকেই রাখে । ঝাঝরি বরং স্থূল অংশ রেখে মিষ্ট রস ফেলে দেয় । জ্ঞানীরা অসার ত্যাগ করে সারই রাখেন । আর অজ্ঞানীরা সার ত্যাগ করে অসারকেই রাখে । কম আলােচিত হলে মনে করবেন যে আপনি অন্ততঃ কিছুটা জ্ঞানী হতে পেরেছেন । আপনি যতই বড় জ্ঞানী হবেন , ততই ভয়ঙ্কর ও মহত্তর অভিযােগ আপনার বিরুদ্ধে উত্থাপিত হবে । মিথ্যা অভিযােগের সংশােধন চেষ্টা করা বৃথা , যতক্ষণ আপনি পরিস্থিতির শিকার বা বাধ্য না হচ্ছেন । কারণ আপনি আঘাত প্রাপ্ত হয়েছেন দেখে শত্রুরা তৃপ্তি লাভ করে , সেটিই তাে তারা চেয়েছিল । আপনি যদি উপেক্ষার ভাব প্রদর্শন করেন , তাহলে সেই ভুল তথ্য আপনার বধির কর্ণে প্রবেশ করবে না । অপরের দোষ - ত্রুটি দেখেও অন্ধের মত আচরণ করা উচিত । অপরের বিরুদ্ধে সমালােচনা শুনেও বধিরের ন্যায় আচরণ করা উচিত । অপরের দুর্বাক্য শুনেও বােবার মত আচরণ করা উচিত । মিথ্যা অভিযােগের শেষ নেই , তাই এর পরিসমাপ্তি ঘটানাে সম্ভব না । এ দুনিয়া ফুলশয্যা নয় , অসংখ্য কাটা ও কঙ্করে পরিপূর্ণ । এদেরকে সরানাে সম্ভব না । হাঁটতে কষ্ট না হয় মত বরং জুতাে পরাই উত্তম কাজ । পায়ে ধূলাে না লাগার জন্যে রাস্তায় জল ঢেলে রাস্তা পরিষ্কারের চাইতে জুতাে পরাই বুদ্ধিমানের কাজ । ধর্মবাণী থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া । যেমন- সুত্তনিপাতের খগ্গবিসান সুত্তে আছে-
সীহাে চ অদ্ধেসু অসন্ত সন্তো ,
কতাে ব জালম্হি অসজ্জমানো ,
পদুমং ব তােয়েন অলিম্পমানো ,
একোচরে খগ্গবিসান কপ্পো ।
সিংহকে খাঁচায় আবদ্ধ রাখলে যেমন অশান্ত থাকে , বাতাসকে যেমন জালে আবদ্ধ করা যায় না। , জল যেমন পদ্মপত্রে লিপ্ত হয় না , তদ্রুপ জ্ঞানী ব্যক্তিরা সংসার ধর্মে অনাসক্ত হয়ে গণ্ডারের মত একাকী বিচরণ করেন । কুকুর ঘেউ ঘেউ করতে থাকে , কিন্তু বণিক দলের গাড়ী নিঃশব্দে সম্মুখ পানে চলতেই থাকে । কর্দমাক্ত মাটিতেই ফুটে উঠে হাজার হাজার পদ্মফুল , কিন্তু কোনটার গায়ে কর্দম লিপ্ত হয় না কিংবা এরা কলুষিত হয় না । পক্ষান্তরে তারা বিশ্বকে সুশােভিত করে । সেরূপ কাদা ছোঁড়াকে অগ্রাহ্য করে আমাদেরকে দোষমুক্ত মহৎ জীবন গড়ে তােলার চেষ্টা করা উচিত । মহৎ লােকেরা নাম - যশের প্রত্যাশী হয়ে কোন কাজ করেন না । তারা যশ কিংবা অযশে অনাসক্ত থাকেন । কারাে স্বীকৃতির আশায় তারা মানুষের মঙ্গল সাধন করেন না , এমন কি ফলের আশায়ও নয় ।
(গ). প্রশংসা - নিন্দা ( PRAISE and BLAME ): অষ্ট লােকধর্মের তৃতীয় বিপরীত অবস্থার জোড়া হচ্ছে নিন্দা প্রশংসা , যা প্রত্যেকের জীবনকে নিত্য আক্রান্ত করে । প্রশংসা করলে মানুষ স্বভাবতঃ উৎফুল্ল হয় , কিন্তু নিন্দা করলে উদ্যমহীন হয় । বুদ্ধ বলেন , জ্ঞানীরা প্রশংসা ও নিন্দায় উল্লসিত বা ভগ্নোদ্যম হয় না । শক্ত প্রস্তর খণ্ড যেমন বাতাসে কম্পিত হয় না , সেরূপ জ্ঞানীরাও সর্বাবস্থায় অবিচলিত থাকেন । প্রশংসা শুনতে কানে ভাল লাগে , কিন্তু তােষামােদপূর্ণ প্রশংসা প্রতারণার সামিল । সাংসারিক দৃষ্টিতে প্রশংসার ফল দূরপ্রসারী । সামান্য প্রশংসা করে কারও অনুগ্রহ লাভ করা সহজ । কিছু বলার পূর্বে দর্শককে আকৃষ্ট করার জন্যে তাদের প্রশংসাসূচক দু'একটা শব্দ কিংবা বাক্যই যথেষ্ট । প্রারম্ভেই যদি কোন বক্তা দর্শকের প্রশংসা করে , তবে দর্শকেরা তার কথায় মনযােগী হয় । আর সমালােচনা করলে সন্তোষজনক সাড়া পাওয়া মুস্কিল । অজ্ঞানীরা যেমনি কারও তােষামােদ করতে জানেন না , তেমনি তারা অপরের তােষামােদও চান না। প্রশংসার যােগ্যকে তারা ঈর্ষাহীন চিত্তে প্রশংসা করেন । আবার দোষীর যােগ্যকে তারা দোষারােপ করেন , ঘৃণা করে নয় বরং অনুগ্রহ করে তাদের সংশােধনের উদ্দেশ্য । মহৎ ব্যক্তিরা ছােটবড় সকলের দ্বারা প্রশংসিত হন , যদিও তাঁরা এর প্রত্যাশী নন । নিন্দার বেলায় বুদ্ধ বলেন , “ যারা বেশী কথা বলে , তারা নিন্দিত হয় । যারা কম কথা বলে , তারাও নিন্দিত হয় । যারা নীরব থাকে , তারাও নিন্দিত হয় । এ পৃথিবীতে অনিন্দিত কেউ নেই । ” তাই মানব জাতির নিকট এ নিন্দা সার্বজনীন সম্পদ স্বরূপ । যুদ্ধক্ষেত্রে হস্তী যেমন চতুর্দিকের নিক্ষিপ্ত তীর নীরবে সহ্য করে অটল থাকে , সেরূপ বুদ্ধ সকল অপমান নীরবে সহ্য করেন । বুদ্ধের জীবন থেকে তাই আমরা নিন্দার ব্যাপারে যােগ্য শিক্ষা লাভ করতে পারি । প্রতারক ও দুষ্ট প্রকৃতির লােকেরা অপরের কেবল কুৎসা রটনায় প্রবৃত্ত থাকে , গুণ - কীর্তনে নয় । তথাগত বুদ্ধ ব্যতীত জগতে শতে শতভাগ ভাল কেহ নেই । তবে শতে শতাংশ খারাপও কেহ নয় । আমাদের সর্বোত্তম ভালাের মধ্যেও মন্দ কিছু নিহিত থাকে ; আবার নেহাৎ খারাপের মধ্যেও ভাল কিছু বিদ্যমান । বুদ্ধ বলেন- যে লােক আক্রান্ত হয়ে , অপমানিত হয়ে কিংবা নিন্দিত হয়েও নিজকে স্বাভাবিক ও শান্ত রাখতে পারে , নির্বাণ লাভ না করলেও সে ব্যক্তি নির্বাণের দ্বারপ্রান্তে উপনীত ।
বুদ্ধের মামাত ভাই ও শিষ্য ভিক্ষু দেবদত্ত ঋদ্ধিশক্তির অধিকারী হয়েছিলেন । এই ঋদ্ধি শক্তির সাহায্যে তিনি বুদ্ধকে নিষ্প্রভ করতে চেয়েছিলেন , শুধু তা নয় পাহাড়ের উপর থেকে প্রস্তর ছুঁড়ে বুদ্ধকে হত্যা করার বৃথা চেষ্টা চালান এবং হতার আরও বিবিধ কৌশল অবলম্বন করেন । কিন্তু বুদ্ধ এর কোন প্রতিশােধ গ্রহণ করেননি । না করলেও বুদ্ধ হত্যার ষড়যন্ত্র ও সঙ্ঘভেদের দরুণ তার গতি হয় অবীচি নরকে । এক সময় বুদ্ধ জনৈক ব্রাহ্মণের বাড়ীতে আমন্ত্রিত হয়ে গিয়ে দুর্ব্যবহার লাভ করেন । বুদ্ধ এর কোন প্রতিশােধ নেননি । বুদ্ধকে স্বামীরূপে বরণ করতে না পেরে মাগন্ধিয়া নাম্নী এক ব্রাহ্মণ - কন্যা বুদ্ধের বিরােধিতা শুরু করে । তারই নিযুক্ত মাতালের দুর্ব্যবহারের দ্বারা বুদ্ধকে বিবিধভাবে অপমান করার প্রচেষ্টা চলে । কিন্তু বুদ্ধ প্রতিশােধ না নিয়ে বরং তাদের প্রতি মৈত্রী প্রদর্শন করেন । বুদ্ধ বলেছেন , “ শত্রুতার দ্বারা শত্রুতার উপশম হয় না , মিত্ৰতা বা মৈত্রী দ্বারাই উপশম হয় । ” মহাপুরুষদের আচরণ এরূপই । বুদ্ধকে আরও বহুভাবে অপমানের চেষ্টা চলে । বুদ্ধের মত কোন ধর্মগুরু এত বেশী প্রশংসিত হননি এবং এত তীব্রভাবে সমালােচিতও হননি । দার্শনিক সক্রেটিসকে তাঁর পত্নী সব সময় অপমান করত । যখনই তিনি পরের মঙ্গলার্থে ঘরের বের হতেন , তখনই তাঁর পত্নী তাকে তিরস্কার করত । একদিন সে অসুস্থ হয়ে তিরস্কার করার কথা ভুলে যায় । সেদিন সক্রেটিস বিমর্ষ মুখে ঘরের বাহির হলে বন্ধু তাকে মন খারাপের কারণ জিজ্ঞেস করেন । জবাবে সক্রেটিস বলেন , “ আজ আমার স্ত্রী আমাকে তিরস্কার করে নাই । ” বন্ধু বলেন , “ তিরস্কৃত না হলে তাে খুশী হবার কথা । ” উত্তরে দার্শনিক বলেন , “ তিরস্কার করলে আমি ধৈর্য ’ গুণ অভ্যাস করার সুযােগ লাভ করি । আজ আমি সেই সুযােগ থেকে বঞ্চিত । এজন্যেই আমার দুঃখ । ” সকলের জন্যে এগুলাে স্মরণীয় উপদেশ বৈকি ! তাই অপমানিত হলে আমাদের চিন্তা করা উচিত যে ধৈর্য শিক্ষা করার একটি সুযােগ সৃষ্টি হল । বিরক্ত বা ক্রোধান্ধ না হয়ে বরং শত্রুপক্ষের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত ।
(ঘ). সুখ - দুঃখ ( HAPPINESS and PAIN ): অষ্ট লােকধর্মের সর্বশেষ জোড়া অবস্থা হচ্ছে । সুখ - দুঃখ , যা মানব জীবন নিয়ন্ত্রণে অতীব শক্তিশালী উপাদান । সুখ সবার কাম্য , দুঃখ কারাে কাম্য নয় । যা বিনাকষ্টে ভােগ করা যায় , তা সুখ এবং যা ভােগ করা কষ্টকর এমনকি অসহনীয় , তা দুঃখ । আকাঙ্খার বিনােদন বা ইচ্ছা পূরণ হল সাধারণ সুখ । কিন্তু কোন একটা আকাঙ্খিত বস্তু লাভের সাথে সাথে সুখের নবতর আকাঙ্খার উদ্রেক হয় । অতএব আমাদের সুখের আকাঙ্খার শেষ নেই । তবে আমাদের সাধারণ লােকের নিকট ইন্দ্রিয়গত ভােগ - সুখই সবচেয়ে বড় সুখ । এর সাথে বস্তুগত সুখ তাে আছেই । এছাড়া বিত্ত - সম্পদ , ক্ষমতা , সম্মান ও স্বাস্থ্যসুখ সবার কাম্য । কিন্তু এ সবের মধ্যে কি সত্যিকারের সুখ নিহিত ? কারও কাছে যা সুখ , অপরের নিকট তা সুখ না হতেও পারে । মাংস ও মদ হয়তাে কারও কাছে সুখকর ভােজন হতে পারে , কিন্তু অন্যের নিকট তা বিষবৎ পরিতাজ্য । ভগবান তথাগত পৃথগৃজনের চার প্রকার সুখের কথা বলেছেন । যথা- ১। অত্থি সুখ, ২। ভােগ সুখ, ৩। অনন সুখ, ও ৪। অনবজ্জ সুখ ।
১। অত্থি সুখ (Bliss of ownership): অত্থি মানে আছে অর্থাৎ কিছু থাকা , যেমন ধন - সম্পদ , বিষয় - সম্পদ , স্বাস্থ্য - সম্পদ , সৌন্দর্য - সম্পদ , মনের আনন্দভাব , দীর্ঘায়ু , দৈহিক বল বা শক্তি - সামর্থ্য , পুত্র - কন্যা ইত্যাদি থাকা ।
২। ভােগ সুখ (Bliss of enjoyment) এ উল্লিখিত সম্পদের ভােগসুখই হচ্ছে দ্বিতীয় প্রকার সুখ । সাধারণ নর - নারী এ সব ভােগসুখেই রত থাকতে চায় । তাই বুদ্ধ কোন সময় সাংসারিক সুখ - ভােগ ত্যাগ করে নির্জনে ধ্যান - সাধনা করার জন্যে সবাইকে উপদেশ দিতেন না । বুদ্ধ বলতেন- ঐশ্বর্যের উন্মাদনায় যার চিত্ত অভিভূত , তার পক্ষে সেটা বর্জন করাই শ্রেয় । কিন্তু ধনের প্রতি যার আসক্তি নেই , যিনি অকুণ্ঠ চিত্তে স্বীয় সম্পদ মানবকল্যাণে বিতরণ করতে পারেন , তাঁর সম্পত্তি পরিত্যাগ করার কোন আবশ্যকতা নেই । তথাগতের ধর্ম কাকেও অকারণে গৃহহীন হতে বলে না । এ ধর্ম ভােগ - বিলাসের আতিশয্য ও চরম কৃচ্ছসাধন এ দুয়ের মধ্যবর্তী মধ্যম পন্থা শিক্ষা দিয়ে থাকে । গৃহত্যাগী ভিক্ষুও যদি নিরুদ্যম , নিবীর্য , অলস ও বিলাসপ্রিয় হয় , তাহলে তাঁর পক্ষে শ্রেয়েলাভ অসম্ভব । কি গৃহী , কি গৃহহীন ভিক্ষু , পবিত্র ধর্ম - ভাবনা দ্বারা যার চিত্ত ভাবিত হয় , নিঃসন্দেহে তিনিই পরম শান্তি নির্বাণ লাভে কৃতার্থ হন ।
৩। অনন সুখ (Bliss of debtlessness): ঋণগ্রস্ত না হওয়া এটাকেই বলা হয় অনন সুখ বা অনন্য সুখ । আমি যদি মিতব্যয়ী হই এবং আমার যা আছে তাতে সন্তুষ্ট থাকি , তাহলে কারও কাছে ঋণ করার প্রয়ােজন নেই । ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিরা দুঃসহ যন্ত্রণার মধ্যে জীবন কাটায় । তারা তাদের ঋণদাতার বাধ্য । গরীব হলেও ঋণমুক্ত থাকা উচিত । তবেই মনের সুখে জীবন যাপন করা যায় ।
৪। অনবজ্জ সুখ (Bliss of blamelessness): অনবজ্জ সুখ মানে দোষমুক্ত জীবন যাপনের সুখ । একজন পৃথগজনের পক্ষে দোষমুক্ত বা অনিন্দিত জীবন যাপন করাই পরম সুখ । নিন্দাহীন বা নিষ্কলঙ্ক ব্যক্তি নিজ - পর উভয়ের আশীর্বাদ স্বরূপ । তিনি সকলের দ্বারা প্রশংসিত হন ; সকলেই তাকে শ্রদ্ধা করে । এটা সত্য যে সকলের থেকে সুনাম পাওয়া বড়ই কঠিন ব্যাপার । সুখের স্বাদ মধুর , কিন্তু দুঃখের স্বাদ বড়ই তিক্ত , সহ্য করা কঠিন । বৃদ্ধ বয়সে মানুষ দুঃখ কষ্ট ভােগ করে এটা স্বাভাবিক । এ দুঃখ থেকেও বেশী কষ্টকর হল রােগ - ভােগ । রােগ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় , তাহলে দুঃখের সীমা থাকে না , তখন মরণই কাম্য । এমনকি সামান্য দন্তশূল বা মাথা কামড়ি মাঝে মধ্যে অসহনীয় হয়ে উঠে । আমাদের নিকটতম ব্যক্তির বিচ্ছেদে আমরা হতাশ হয়ে পড়ি , মনঃকষ্ট বেড়ে যায় । কিন্তু আমাদের বুঝা উচিত সকলকেই চলে যেতে হবে । ভেঙ্গে পড়লে চলবে না । তখনই মনের সমভাব সৃষ্টির উপযুক্ত সময় , সংসারের মধ্যে সবচেয়ে বড় দুঃখ হচ্ছে আপন জনের মৃত্যু । কিন্তু এই মৃত্যু - দুঃখ সহ্য করতে হবে কর্মকে স্বীকার করে । বুদ্ধের উপদেশ - ‘ সব্বে সত্ত্বা কম্মস্সকা । সকল জীব কর্মাধীন ।
পটাচারা তার পিতামাতা , স্বামী , ভ্রাতা ও দুই ছেলে হারিয়ে পাগলের ন্যায় জীবন যাপন করতে বাধ্য হন । কিন্তু বুদ্ধের সান্ত্বনা বাক্যে শুনে ভিক্ষুণী হয়ে অর্হত্ব লাভ করতে সক্ষম হন । কৃশা গৌতমী তার একমাত্র মৃত শিশু - সন্তানকে বাঁচানাের জন্যে বুদ্ধ নির্দেশিত মৃত্যুহীন গৃহে সরিষা বীজের সন্ধানে ঘুরে বেড়ান । কিন্তু সরিষা বীজ পেলেও মৃত্যুহীন গৃহ তৎকালীন শ্রাবস্তীতে খুঁজে পাননি । তাই তিনি বুঝতে পারলেন যে মৃত্যু সবার অনিবার্য পরিণতি । তিনিও ভিক্ষুণী হয়ে অৰ্হত্ব লাভে জীবন সার্থক করেন । একজন মাকে প্রশ্ন করা হল , কেন তিনি তার একমাত্র সন্তানের মর্মান্তিক মৃত্যুতে কান্নাকাটি করেননি । উত্তরে তিনি বলেন , “ বিনা আমন্ত্রণে সে এসেছিল , সবার অজ্ঞাতে সে চলে গেল । সে যেভাবে এসেছিল , সেভাবেই চলে গেল । আমরা কেন তার জন্যে কান্না করব ? কান্না কারাে উপকারে আসবে ? ” বৃক্ষে ফল ধরে ঝড়ে যায়- তা পক্ক অবস্থায়ও হতে পারে , অপক্ক অবস্থায়ও হতে পারে । আমাদের জীবনও তাই । আমরা প্রত্যেকে মরব , কেহ শিশুকালে , কেহ যৌবনে অথবা কেহ বৃদ্ধকালে , মৃত্যুর কোন ব্যতিক্রম হবে না এটা হবেই । জীবন অনিশ্চিত কিন্তু মৃত্যু নিশ্চিত । তাই সর্বাবস্থায় চিত্তের সমভাব রক্ষা করা দরকার । পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ লাভ , যশ , প্রশংসা ও সুখে উন্নত ও বিহ্বল হয়ে যায় । আবার অলাভ , অখ্যাতি (অযশ) , নিন্দা ও দুঃখের দ্বারা অবনত ও মিয়মান হয়ে পড়ে । কিন্তু বুদ্ধ বলেছেন-
ফুট্ঠস্স লােকধম্মেহি চিত্তং যস্স ন কম্পতি, অসােকং বিরজং খেমং, এতং মঙ্গলমুত্তমং। (মঙ্গল সূত্র)
এ অষ্টবিধ লােকধর্মে যার চিত্ত বিচলিত হয় না , শােকহীন থাকে , রজঃ বা লােভ - দ্বেষ মােহহীন থাকে এবং ভয়হীন থাকে -- এতে হয় উত্তম মঙ্গল । তাই সর্বাবস্থায় মনের সমভাব বজায় রাখার প্রচেষ্টা চালানাে দরকার ।