15/05/2026
🕋ইসলামের ইতিহাস ,বর্তমান উন্নত সভ্যতা ও তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নে মুসলিম মনীষীদের অবদান নিচে তুলে ধরা হলো।
🕋পর্ব---৯
🕋বাদিউজ্জামান আবু-আল ইজ্জ ইবনে ইসমাঈল আল জাজারি((রাহি:) এর অবদান ও উম্মাহর খেদমত তুলে ধরা হলো।
🕋বাদি উজ্জামান আবু আল-ইজ্জ ইবনে ইসমাইল আল-জাজারি (রহ.), যিনি সংক্ষেপে আল-জাজারি নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত, ছিলেন ইসলামের স্বর্ণযুগের (দ্বাদশ শতাব্দী) অন্যতম সেরা একজন গণিতবিদ, উদ্ভাবক, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এবং কারিগর। ১১৩৬ সালে মেসোপটেমিয়ার (বর্তমান তুরস্কের জিজরে অঞ্চলে) জাজিরা ইবনে উমর নামক স্থানে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁকে আধুনিক যুগের "রোবোটিক্সের জনক" (Father of Robotics) এবং "মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জনক" বলা হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাসে আল-জাজারির অবদান আধুনিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা (Automation), কম্পিউটার হার্ডওয়্যারের মেকানিজম এবং তথ্য প্রযুক্তির ভিত্তি গঠনে অনবদ্য ভূমিকা রেখেছে।
তাঁর সামগ্রিক অবদানকে নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
১. মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও রোবোটিক্সে অবদান
আল-জাজারিই ইতিহাসে প্রথম ব্যক্তি যিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারে এমন যন্ত্র বা "Automata" (যা আজকের যুগের রোবটের আদি রূপ) তৈরি করেছিলেন।
• বিশ্বের প্রথম প্রোগ্রামযোগ্য রোবট (Programmable Robot): তিনি রাজকীয় ভোজসভার বিনোদনের জন্য একটি স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম পানির নৌকা তৈরি করেছিলেন। এতে চারজন যন্ত্রী (রোবট) ছিল, যারা ঢোল এবং ড্রাম বাজাতে পারত। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ড্রামের ছন্দ বা বাজানোর গতি পরিবর্তন করার জন্য এতে মেকানিক্যাল ড্রাম ক্যাসেট বা পিন ব্যবহার করা হয়েছিল। এটিই ছিল ইতিহাসের প্রথম মেকানিক্যাল প্রোগ্রামিং বা কোডিং-এর ধারণা।
• স্বয়ংক্রিয় হাত ধোয়ার রোবট: তিনি রাজা বা মেহমানদের হাত ধোয়ার জন্য একটি স্বয়ংক্রিয় পুতুল তৈরি করেছিলেন। এটিতে একটি হাতলে টান দিলে প্রথমে পানি আসত, পানি শেষ হলে পুতুলটি নিজ থেকেই মেহমানকে তোয়ালে এবং সাবান এগিয়ে দিত।
২. আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি ও হার্ডওয়্যারে আল-জাজারির মেকানিজম
আজকের কম্পিউটার, আইটি হার্ডওয়্যার এবং অটোমোবাইল শিল্পে ব্যবহৃত অনেক গুরুত্বপূর্ণ মেকানিক্যাল লজিক বা যন্ত্রাংশ আল-জাজারির মস্তিষ্কপ্রসূত।
• ক্র্যাঙ্কশ্যাফট (Crankshaft) এবং কানেক্টিং রড: এটি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ইতিহাসের অন্যতম সেরা আবিষ্কার। আল-জাজারি প্রথম ঘূর্ণন গতিকে (Rotational motion) রৈখিক গতিতে (Linear motion) রূপান্তর করার জন্য এই পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। আজকে আমরা যে গাড়ির ইঞ্জিন, ট্রেনের ইঞ্জিন কিংবা পিস্টন চালিত পাম্প দেখি, তার মূল ভিত্তি এই ক্র্যাঙ্কশ্যাফট।
• ক্যামশ্যাফট (Camshaft): রোবটের কার্যপদ্ধতি বা টাইমিং নিয়ন্ত্রণের জন্য তিনি ক্যামশ্যাফট ব্যবহার করেছিলেন। কম্পিউটারের প্রসেসরের ভেতরের টাইমিং লজিক বা মেকানিক্যাল সুইচের আদি ধারণা এখান থেকেই আসে।
• সেগমেন্টাল গিয়ার (Segmental Gear): গিয়ারের গতি পরিবর্তন করার প্রযুক্তি তিনিই প্রথম তাঁর জলঘড়িতে ব্যবহার করেন।
৩. পানিসম্পদ ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন
মুসলিম সাম্রাজ্যের কৃষি ও সাধারণ মানুষের পানির অভাব দূর করতে তিনি দারুণ কিছু মেকানিজম তৈরি করেন।
• পানি তোলার স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র: তিনি এমন কিছু স্বয়ংক্রিয় পাম্প বা চাকা (যেমন- Saqiya chain pump) তৈরি করেছিলেন যা পশুর সাহায্য ছাড়াই প্রবাহিত নদীর পানির গতিশক্তিকে ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি তুলে উঁচুতে থাকা সেচনালায় পৌঁছে দিত।
• ডাবল-অ্যাক্টিং পিস্টন পাম্প: তিনি প্রথম সাকশন পাইপ ও পিস্টন ব্যবহার করে পানি তোলার পাম্প বানান, যা আধুনিক ভালভ প্রযুক্তির সূচনা করে।
৪. জ্যোতির্বিজ্ঞান ও বিখ্যাত "হাতি ঘড়ি" (The Elephant Clock)
আল-জাজারির অন্যতম সেরা মাস্টারপিস হলো তাঁর তৈরি হাতি ঘড়ি। এটি কেবল সময় দেখাত না, বরং এটি ছিল প্রকৌশল ও বিভিন্ন সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিলনমেলা (এতে ভারতীয় হাতি, মিশরীয় ফিনিক্স পাখি, চৈনিক ড্রাগন এবং আরবীয় রোবটের প্রতিকৃতি ছিল)।
এই ঘড়িটি পানির ওজনের ভারসাম্য এবং গিয়ারের সাহায্যে প্রতি আধা ঘণ্টা পর পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে শব্দ করত, ড্রাগনের মুখ থেকে বল পড়ত এবং ভেতরের রোবটটি চালকের মতো হাত নাড়াত। এটি সে যুগের জন্য একটি মহাবিস্ময় ছিল।
৫. কালজয়ী গ্রন্থ: 'কিতাব ফিল মা’রিফাত আল-হিয়াল আল-হান্দাসিয়া'
১২০৬ সালে তিনি তাঁর আজীবনের সমস্ত আবিষ্কার ও নকশা লিপিবদ্ধ করে একটি বই লেখেন, যার নাম "The Book of Knowledge of Ingenious Mechanical Devices" (প্রকৌশল কৌশলের জ্ঞানের বই)।
• এই বইটিতে তিনি প্রায় ৫০টি জটিল স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের নকশা এবং সেগুলো কীভাবে তৈরি করতে হয় তা বিস্তারিত রঙিন চিত্রসহ ধাপে ধাপে লিখে গেছেন।
• এটি কেবল থিওরি ছিল না, বরং ব্যবহারিক নির্দেশিকা ছিল, যার কারণে একে মধ্যযুগের "Do It Yourself" (DIY) ম্যানুয়াল বলা চলে।
৬. ইসলাম ও বিজ্ঞানের সমন্বয়
আল-জাজারি একজন নিষ্ঠাবান মুসলিম ছিলেন এবং তাঁর অনেক আবিষ্কারের মূল উদ্দেশ্যই ছিল ধর্মীয় ও মানবিক কাজ সহজ করা।
• ওযুর স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র: তিনি মুসলিমদের ওযু করার সুবিধার্থে এবং পানি অপচয় রোধ করতে স্বয়ংক্রিয় পানির পাত্র বা ময়ূর-আকৃতির যন্ত্র তৈরি করেছিলেন, যা নির্দিষ্ট পরিমাপে পানি সরবরাহ করত।
• মসজিদের জন্য ঘড়ি: নামাজের সঠিক সময় নির্ধারণের জন্য তিনি বেশ কিছু সূক্ষ্ম সূর্যঘড়ি ও জলঘড়ি তৈরি করেছিলেন, যা মসজিদের সাথে যুক্ত থাকত।
সমাপনী
🕋পাশ্চাত্যের অনেক বিজ্ঞানী স্বীকার করেছেন যে, আল-জাজারি যদি দ্বাদশ শতাব্দীতে ক্র্যাঙ্কশ্যাফট, গিয়ার এবং মেকানিক্যাল অটোমেশনের ভিত্তি তৈরি না করতেন, তবে ইউরোপের শিল্প বিপ্লব (Industrial Revolution) আরও কয়েক শতাব্দী পিছিয়ে যেত। ইসলামের স্বর্ণযুগের এই মহান মনীষী প্রমাণ করে গেছেন যে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চর্চা ইসলামের শিক্ষারই একটি অংশ।
ইঞ্জিনিয়ারিং, রোবোটিক্স এবং পানির পাম্পের মতো সুপরিচিত আবিষ্কারগুলোর বাইরেও আল-জাজারি (রহ.)-এর এমন কিছু সূক্ষ্ম, তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক অবদান ছিল যা আধুনিক মেটালার্জি (ধাতুবিদ্যা), সেফটি ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ডিজাইন প্রযুক্তির ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। নিচে তাঁর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলো আলোচনা করা হলো:
১. মেটাল কাস্টিং ও ধাতুবিদ্যায় অবদান (Metallurgy)
যন্ত্রপাতি তৈরির জন্য আল-জাজারি ধাতু গলানো এবং ছাঁচে ঢালাই করার পদ্ধতিতে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটিয়েছিলেন।
• বদ্ধ ছাঁচ পদ্ধতি (Closed-Mold Casting): তিনি ব্রোঞ্জ, তামা এবং পিতল নিখুঁতভাবে গলিয়ে যন্ত্রের ছোট ছোট গিয়ার এবং ভালভ তৈরি করার জন্য বিশেষ গ্রাফাইট ও মাটির ছাঁচ ব্যবহার করতেন। এই পদ্ধতিটি ইউরোপে আরও অনেক পরে প্রচলিত হয়।
• অ্যান্টি-ফ্রিকশন বা ঘর্ষণ কমানোর কৌশল: যন্ত্রের ধাতব অংশগুলো যেন একে অপরের সাথে ঘষা খেয়ে দ্রুত নষ্ট না হয়ে যায়, সেজন্য তিনি বিভিন্ন প্রাণিজ চর্বি এবং তেলের মিশ্রণ ব্যবহার করে প্রথম 'লুব্রিকেন্ট' বা পিচ্ছিলকারক ব্যবস্থার ধারণা দেন।
২. লক ও সিকিউরিটি সিস্টেম (Mechanical Locks)
আজকে আমরা ব্রিফকেস বা লকারে যে 'কম্বিনেশন লক' বা পাসওয়ার্ড যুক্ত তালা ব্যবহার করি, তার আদি নকশাকার ছিলেন আল-জাজারি।
• চার অক্ষরের কম্বিনেশন লক: তিনি রাজকীয় কোষাগার এবং গুরুত্বপূর্ণ বাক্স সুরক্ষার জন্য এমন একটি তালা তৈরি করেছিলেন, যা নির্দিষ্ট ৪টি অক্ষরের ডায়াল বা চাকা ঘুরিয়ে সঠিক কোড না মেলালে খুলত না। এটিই ছিল ইতিহাসের প্রথম মেকানিক্যাল পাসওয়ার্ড সিস্টেম।
৩. লিকুইড কন্ট্রোল এবং সেফটি ভালভ (Fluid Dynamics)
তরল পদার্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করার ক্ষেত্রে তাঁর কিছু অনন্য আবিষ্কার ছিল:
• ফ্লোট ভালভ (Float Valve): তাঁর তৈরি জলঘড়িগুলোতে পানির উচ্চতা সবসময় সমান রাখার জন্য তিনি একটি ভাসমান বল বা 'ফ্লোট ভালভ' ব্যবহার করতেন। পানি কমে গেলে ভালভটি খুলে যেত এবং পানি নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যেত। মজার ব্যাপার হলো, আজকের যুগে আমাদের বাসার পানির ট্যাঙ্কের ফ্লাশ বা কার্বুরেটরে ঠিক এই একই মেকানিজম ব্যবহার করা হয়।
• নন-রিটার্ন ভালভ (Check Valve): পাম্পের পানি যেন উল্টো পথে আবার নিচে নেমে না যায়, সেজন্য তিনি একমুখী ভালভ তৈরি করেন, যা আধুনিক প্লাম্বিং ও পাইপলাইনের অপরিহার্য অংশ।
৪. সূক্ষ্ম ক্যালিব্রেশন ও পরিমাপ বিজ্ঞান (Metrology)
তিনি যেকোনো মেকানিজমে একদম নিখুঁত পরিমাপ বা 'অ্যাকুরেসি'র ওপর জোর দিতেন।
• টাইমিং মেকানিজম: তাঁর ঘড়িগুলোতে সময়ের হিসাব নিখুঁত রাখার জন্য তিনি তামার পাত্রের নিচে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ছিদ্র করতেন (যাকে ক্যালিব্রেশন বলা হয়)। এই ছিদ্র দিয়ে প্রতি ঘণ্টায় ঠিক কত ফোঁটা পানি পড়বে, তা তিনি গাণিতিকভাবে হিসাব করে বের করেছিলেন, যাতে ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে পানির ঘনত্বের তারতম্য হলেও সময়ের হিসাব ভুল না হয়।
৫. থ্রি-ডি মডেলিং এবং ভিজ্যুয়াল ডিজাইন (Industrial Design)
আজকের ইঞ্জিনিয়াররা যেমন কোনো যন্ত্র বানানোর আগে কম্পিউটারে 3D Model বা ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করেন, আল-জাজারি ১২০০ শতাব্দীতেই কাগজের ওপর সেই কাজটির সূচনা করেছিলেন।
• রঙিন জ্যামিতিক নকশা: তাঁর বিখ্যাত বইটিতে তিনি শুধু যন্ত্রের বিবরণ দেননি, বরং অর্থোগ্রাফিক প্রজেকশন (Orthographic Projection) ব্যবহার করে যন্ত্রের ভেতরের অংশগুলো কোনটির পর কোনটি বসবে, তা নিখুঁত রঙ ও জ্যামিতিক স্কেল দিয়ে এঁকে দেখিয়েছেন। তাঁর এই ত্রিমাত্রিক ড্রয়িং শৈলী পরবর্তী যুগের প্রকৌশলীদের জন্য একটি মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
৬. বিনোদন ও রাজকীয় ফোয়ারা (Automated Fountains)
তিনি সুলতানের প্রাসাদের সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য এমন কিছু স্বয়ংক্রিয় ফোয়ারা (Fountains) তৈরি করেছিলেন, যা নির্দিষ্ট সময় পর পর নিজ থেকেই পানির ধারা পরিবর্তন করত। কখনো পানি সোজা ওপরে উঠত, আবার কিছুক্ষণ পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানির ধারাটি কুন্ডলী পাকিয়ে বা ছাতার মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত। পুরো প্রক্রিয়াটি চলত কোনো মানুষের স্পর্শ ছাড়াই, সম্পূর্ণ মেকানিক্যাল টাইমিং গিয়ারের মাধ্যমে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, আল-জাজারি কেবল একজন বিজ্ঞানী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন ডিজাইনার, ধাতুবিদ, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং দূরদর্শী চিন্তাবিদ। আধুনিক জীবনের প্রতিটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতির ভেতরেই তাঁর কোনো না কোনো ফর্মুলা আজinvisible অবস্থায় কাজ করে যাচ্ছে।
🕋আল-জাজারি (রহ.)-এর জীবন ও কাজ নিয়ে আলোচনা করার সময় একটি বিষয় অত্যন্ত বিস্ময়কর—তা হলো, তিনি তাঁর সমসাময়িক অন্য অনেক বিজ্ঞানীর মতো শত শত বই লেখেননি। তিনি তাঁর দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময়ের প্রকৌশল জীবন, সমস্ত গবেষণা, নকশা এবং আবিষ্কারকে একটি মাত্র প্রধান গ্রন্থে রূপ দিয়ে গেছেন।
তবে সেই একটি মাত্র কিতাবই ছিল এতটাই সমৃদ্ধ, বিস্তারিত এবং যুগান্তকারী যে, সেটিই তাঁকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ইতিহাসে অমর করে রেখেছে। নিচে তাঁর এই কালজয়ী কিতাব এবং এর ভেতরের অধ্যায় বা শ্রেণীবিভাগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
প্রধান ও কালজয়ী গ্রন্থ: কিতাব ফি মা'রিফাত আল-হিয়াল আল-হান্দাসিয়া
বইটির মূল আরবি নাম: كتاب في معرفة الحيل الهندسية
(উচ্চারণ: Kitab fi ma'rifat al-hiyal al-handasiya)
ইংরেজি অনুবাদ: এই বইটি পাশ্চাত্যে "The Book of Knowledge of Ingenious Mechanical Devices" (প্রকৌশল কৌশলের জ্ঞানের বই) নামে পরিচিত। ১৯৭৪ সালে ব্রিটিশ প্রকৌশলী ডোনাল্ড আর. হিল এটি ইংরেজিতে নিখুঁতভাবে অনুবাদ করেন।
বইটি লেখার প্রেক্ষাপট:
আল-জাজারি যখন দিয়ারবাকিরের আরতুকিদ রাজবংশের সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদের দরবারে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন, তখন সুলতান তাঁর তৈরি করা অদ্ভুত ও চমৎকার সব যন্ত্র দেখে মুগ্ধ হন। সুলতান তাঁকে বলেন, "তুমি এত চমৎকার সব যন্ত্র তৈরি করেছ, কিন্তু এগুলো যদি লিখে না রাখো, তবে তোমার পরে এই জ্ঞান হারিয়ে যাবে।" সুলতানের এই অনুরোধ ও পৃষ্ঠপোষকতায় ১২০৬ সালে আল-জাজারি তাঁর এই মাস্টারপিস বইটি সম্পন্ন করেন।
বইটির অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ (কেন এটি এত বিখ্যাত?)
১. ব্যবহারিক গাইড বা DIY Manual: মধ্যযুগের বেশিরভাগ বিজ্ঞানী কেবল তাত্ত্বিক (Theoretical) আলোচনা করতেন। কিন্তু আল-জাজারি এই বইটিতে প্রতিটি যন্ত্র কীভাবে তৈরি করতে হবে, তার ব্যবহারিক নির্দেশিকা দিয়েছেন।
২. রঙিন ও নিখুঁত ইলাস্ট্রেশন: বইটিতে প্রায় ৫০টিরও বেশি যন্ত্রের ৫০-এর অধিক নিখুঁত ত্রিমাত্রিক (3D-style) রঙিন চিত্র রয়েছে। যন্ত্রের ভেতরের গিয়ার, ভালভ বা পিস্টন কীভাবে একে অপরের সাথে যুক্ত থাকবে, তা বোঝার জন্য তিনি ভিন্ন ভিন্ন রঙ ব্যবহার করেছিলেন।
৩. ধাপ-ভিত্তিক বিবরণ: তিনি প্রতিটি যন্ত্রাংশ তৈরির জন্য কী কী উপাদান (যেমন—তামা, পিতল, কাঠ) লাগবে এবং তা কীভাবে জুড়তে হবে, তা ধাপে ধাপে বর্ণনা করেছেন।
বইটির ভেতরের ৬টি প্রধান অধ্যায় (Categories)
আল-জাজারি তাঁর বইটিকে মূলত ৬টি প্রধান ভাগে (Types) বিভক্ত করেছেন এবং এতে মোট ৫০টি মেকানিক্যাল যন্ত্রের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন:
অধ্যায় ১: জলঘড়ি এবং মোমবাতি ঘড়ি (১৬টি আবিষ্কার)
এই অংশে তিনি সময়ের নিখুঁত হিসাব রাখার জন্য জটিল সব ঘড়ির নকশা দেখিয়েছেন।
• এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো তাঁর হাতি ঘড়ি (The Elephant Clock) এবং দুর্গ ঘড়ি (The Castle Clock)। এই ঘড়িগুলো পানি ও ওজনের ভারসাম্যের সাহায্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলত এবং নির্দিষ্ট সময় পর পর পুতুল বা রোবট নড়াচড়া করে সময় জানান দিত।
অধ্যায় ২: রাজকীয় ভোজসভার বিনোদনমূলক পাত্র (১০টি আবিষ্কার)
সুলতান ও তাঁর অতিথিদের বিনোদনের জন্য তৈরি করা বিভিন্ন পাত্র ও জাদুকরী যন্ত্রের বিবরণ এখানে রয়েছে।
• যেমন: এমন কিছু পাত্র যা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বা নির্দিষ্ট বিরতিতে পানীয় বা শরবত ঢালত।
অধ্যায় ৩: হাত ধোয়া এবং ওযুর স্বয়ংক্রিয় পাত্র (১০টি আবিষ্কার)
এই অধ্যায়ে বর্ণিত যন্ত্রগুলো ছিল একই সাথে ধর্মীয় ও স্বাস্থ্যগত দিক থেকে অত্যন্ত দরকারী।
• এর মধ্যে রয়েছে ময়ূর-আকৃতির ওযুর পাত্র এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি ও তোয়ালে এগিয়ে দেওয়া "হিউম্যানয়েড রোবট" বা পুতুলের নকশা।
অধ্যায় ৪: স্বয়ংক্রিয় ফোয়ারা এবং মিউজিক্যাল অটোমেটা (১০টি আবিষ্কার)
প্রাসাদের বাগান বা হলের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য তৈরি ফোয়ারা।
• এতে এমন কিছু মেকানিজম ছিল যা মানুষের স্পর্শ ছাড়াই বাতাসের চাপ ও পানির ফ্লো ব্যবহার করে নির্দিষ্ট সময় পর পর ফোয়ারার পানির দিক এবং উচ্চতা পরিবর্তন করত। এছাড়া কৃত্রিম বাঁশি বা বাদ্যযন্ত্রের নকশাও এখানে ছিল।
অধ্যায় ৫: পানি তোলার এবং সেচ ব্যবস্থার পাম্প (৫টি আবিষ্কার)
কৃষিকাজ এবং কুয়া বা নদী থেকে সহজে পানি তোলার জন্য তৈরি ভারী যন্ত্রপাতির নকশা।
• এখানেই তিনি তাঁর বিখ্যাত ক্র্যাঙ্ক-কানেক্টিং রড মেকানিজম এবং ডাবল-অ্যাক্টিং সাকশন পাম্পের বিবরণ দিয়েছেন, যা আধুনিক সেচ ব্যবস্থা ও ইঞ্জিনের ভিত্তি।
অধ্যায় ৬: বিবিধ মেকানিক্যাল নকশা (৫টি আবিষ্কার)
এই শেষ অধ্যায়ে তিনি অন্যান্য কিছু বিশেষ মেকানিজমের কথা বলেছেন।
• এর মধ্যে রয়েছে রাজকীয় কোষাগারের সুরক্ষার জন্য তৈরি বিখ্যাত ৪-অক্ষরের কম্বিনেশন লক (তালা) এবং একটি বিশাল মেকানিক্যাল জ্যামিতিক কোণ পরিমাপক যন্ত্র।
বইটির বর্তমান অবস্থা
১২০৬ সালে বইটি সমাপ্ত করার কিছুদিনের মধ্যেই এই মহান বিজ্ঞানী ইন্তেকাল করেন। তাঁর মূল পাণ্ডুলিপিটি সময়ের সাথে হারিয়ে গেলেও, পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে তাঁর বইটির বেশ কয়েকটি অত্যন্ত নিখুঁত অনুলিপি বা কপি (Manuscript) তৈরি করা হয়েছিল।
বর্তমানে এই ঐতিহাসিক কিতাবের বিভিন্ন অংশ ও পৃষ্ঠা বিশ্বের নামী-দামী জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে, যার মধ্যে অন্যতম:
• তোপকাপি প্যালেস মিউজিয়াম (ইস্তাম্বুল, তুরস্ক) - এখানে বইটির সবচেয়ে প্রাচীন ও সেরা অনুলিপিটি রয়েছে।
• মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট (নিউইয়র্ক, আমেরিকা)।
• মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টস (বোস্টন, আমেরিকা)।
• লুভর মিউজিয়াম (প্যারিস, ফ্রান্স)।
এক কথায়, আল-জাজারির এই একটি মাত্র কিতাবই মধ্যযুগীয় মুসলিম বিশ্বের প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের সবচেয়ে বড় দলিল।
🕋আল-জাজারি (রহ.)-এর জীবনের শেষভাগ ছিল তাঁর কর্মজীবনের শ্রেষ্ঠ সময় এবং একই সাথে এক চরম প্রাপ্তির মুহূর্ত। তবে অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো এবং মৃত্যুর সঠিক বিবরণ ইতিহাসের পাতায় খুব বেশি দীর্ঘ নয়। সমসাময়িক ইতিহাসবিদদের রেকর্ড থেকে তাঁর শেষ জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কে যা জানা যায়, তা নিচে তুলে ধরা হলো:
শেষ জীবন: এক যুগের অবসান ও মাস্টারপিস সৃষ্টি
আল-জাজারি তাঁর জীবনের প্রায় ২৫ থেকে ২৬ বছর কাটিয়েছিলেন দিয়ারবাকিরের (Diyarbakir) আরতুকিদ রাজবংশের সুলতানদের প্রধান প্রকৌশলী (Chief Engineer) হিসেবে। তিনি পর পর তিনজন সুলতানের অধীনে কাজ করেছিলেন।
তাঁর শেষ জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল তাঁর বিখ্যাত কিতাব 'কিতাব ফি মা'রিফাত আল-হিয়াল আল-হান্দাসিয়া' সমাপ্ত করা। ১২০৬ সালের শুরুর দিকে তিনি এই বইটির কাজ শেষ করেন। দীর্ঘ তিন দশকের অক্লান্ত পরিশ্রম, গবেষণা এবং আবিষ্কারগুলোকে একটি বইয়ে রূপ দেওয়ার পর তিনি মানসিকভাবে বেশ তৃপ্ত ছিলেন। কারণ তিনি তাঁর জীবদ্দশাতেই নিজের আবিষ্কারগুলোর রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্বীকৃতি দেখে যেতে পেরেছিলেন।
মৃত্যু: কোথায় এবং কখন হয়েছিল?
ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর এই কালজয়ী কিতাবটি সম্পন্ন করার মাত্র কয়েক মাস পরেই তিনি ইন্তেকাল করেন।
• মৃত্যুর স্থান: আল-জাজারি (রহ.) তুরস্কের জিজরে (Cizre) নামক স্থানে মৃত্যুবরণ করেন। এটি তাঁর জন্মস্থানও ছিল (তৎকালীন মেসোপটেমিয়ার জাজিরা ইবনে উমর)।
• মৃত্যুর সাল: তিনি ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে (হিজরি ৬০২ সন) মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল আনুমানিক ৭০ বছর।
• সমাধি: তুরস্কের সিরনাক (Şırnak) প্রদেশের জিজরে জেলাতেই এই মহান মুসলিম বিজ্ঞানীর সমাধি বা মাজার অবস্থিত, যা আজ অবধি সংরক্ষিত রয়েছে।
শেষ জীবনের একটি আফসোস ও তাঁরlegacy
আল-জাজারি তাঁর শেষ জীবনে একটি আক্ষেপের কথা বইয়ের ভূমিকায় লিখে গেছেন। তিনি বলেছিলেন, তিনি তাঁর জীবনের বহু বছর এমন অনেক যন্ত্র তৈরিতে ব্যয় করেছেন, যা কেবল রাজদরবারের বিনোদন বা সৌন্দর্যের কাজে লাগত (যেমন- রাজকীয় পাত্র বা ফোয়ারা)। তাই শেষ জীবনে তিনি এমন কিছু পাম্প এবং কৃষি সরঞ্জাম তৈরিতে বেশি মনোযোগ দিয়েছিলেন, যা সরাসরি সাধারণ মানুষের ও কৃষকদের উপকারে আসে।
বইটি লিখে শেষ করার পরপরই তাঁর মৃত্যু হওয়ায় তিনি নিজে হয়তো এর বিশ্বব্যাপী প্রভাব দেখে যেতে পারেননি, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর এই বইটির মেকানিজম পুরো ইউরোপ ও এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, যা পরবর্তীকালে বিশ্বকে আধুনিক শিল্প বিপ্লবের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।