25/05/2026
মরুভূমির তপ্ত বালুকা রাশি আজ যেন এক স্বর্গীয় সুবাসে আমোদিত। আকাশ ছুঁয়ে নামছে রহমতের ফল্গুণধারা। আজ জিলহজের নয় তারিখ 'পবিত্র ইয়াওমে আরাফাহ’। মহিমান্বিত এই দিনটি কেবল হজের একটি রোকন মাত্র নয়, এটি মূলত মানব ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগঘন, সবচেয়ে পবিত্র এক মহিমান্বিত ক্ষণ।
এটি সেই দিন, যেদিন মর্ত্যের ধূলিকণায় নেমে আসে আরশের মালিকের অসীম করুণা।
আরাফাতের ময়দান আজ সাদা কাফনসদৃশ ইহরামের কাপড়ে মোড়ানো এক শুভ্র সমুদ্র। যেখানে রাজা আর প্রজা, ধনী আর দরিদ্র, আরব আর আজম (অন আরব)— সব ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে দাঁড়িয়ে গেছে। সবার পরনে এক পোশাক, সবার মুখে এক আওয়াজ: “লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক...” (আমি হাজির, হে আল্লাহ! আমি হাজির)।
এই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় হাশরের ময়দানের কথা, যেখানে কোনো আভিজাত্য টিকবে না, কেবল টিকে থাকবে আমল আর আল্লাহর দয়া। আরাফাহ হলো দুনিয়ার বুকে হাশরের এক জীবন্ত মহড়া, অহংকার চূর্ণ করার এক ঐশ্বরিক আঙিনা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন, বছরের অন্য কোনো দিন শয়তানকে এত বেশি লজ্জিত, অপমানিত ও ছোট দেখায় না, যতটা এই আরাফাতের দিনে দেখায়। কারণ, আজ আকাশের দরজাগুলো উন্মুক্ত। করুণাময় রব তায়ালা আজ বান্দার দিকে দয়ার দৃষ্টিতে তাকান। কোটি কোটি ক্রন্দনরত চোখ, অনুতপ্ত হৃদয় আর আকাশের দিকে তুলে ধরা হাজারো আকুল হাতকে রব তায়ালা আজ শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেন না।
আজকের দিনটি হলো ‘ইয়াওমুল ইতকি মিনান নার’— অর্থাৎ জাহান্নাম থেকে দলে দলে মুক্তি পাওয়ার দিন। পাহাড়সম গুনাহের বোঝা নিয়ে যারা আজ প্রভুর দুয়ারে এসে দাঁড়ায়, সূর্যাস্তের আগেই তারা নিষ্পাপ শিশুর মতো পবিত্র হয়ে ফিরে যায়।
যাঁরা আজ মক্কার পবিত্র প্রান্তরে উপস্থিত হতে পারেননি, দয়াময় আল্লাহ তাঁদেরও বঞ্চিত করেননি। দূর প্রান্তরে বসেও আমরা এই দিনের বরকত কুড়াতে পারি দুটি শ্রেষ্ঠ আমলের মাধ্যমে:
১. একটি রোজায় দুই বছরের গুনাহ মাফ:
প্রিয় নবী (সা.) এর পবিত্র জবানীর সুসংবাদ— আরাফাহর দিনের একটি রোজা বিগত এক বছর এবং আগামী এক বছরের ছোট গুনাহগুলোর কাফফারা হয়ে যায়। সুবহানাল্লাহ! কী বিশাল অফার! তৃষ্ণার্ত ঠোঁটে একটুখানি ধৈর্য আমাদের এনে দিতে পারে দুই বছরের পবিত্রতা।
২. আকুল প্রার্থনার শ্রেষ্ঠ প্রহর:
আজকের দিনের সেরা উপহার হলো ‘দোয়া’। দুপুরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়টুকু যেন এক জাদুকরী মুহূর্ত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, শ্রেষ্ঠ দোয়া হলো আরাফাত দিবসের দোয়া। তাই আজ ফেসবুকে স্ক্রোল করার চেয়ে, দুনিয়ার গল্পে মজে থাকার চেয়ে অনেক বেশি উত্তম— নির্জনে বসে চোখের জল ফেলা। নিজের জন্য, মা-বাবার জন্য, প্রিয়জনদের জন্য এবং ব্যথিত ও ক্ষতবিক্ষত মুসলিম উম্মাহর জন্য আজ হাত তোলার দিন।
আসুন, আজ বিকেলের আলো যখন ম্লান হয়ে আসবে, যখন সূর্য ডুবে যাওয়ার ক্ষণ ঘনিয়ে আসবে, আমরা যেন অলসতায় সময় না কাটাই। জায়নামাজে বসে, হৃদয়ের সবটুকু আকুতি ঢেলে দিয়ে বলি,
হে আরশের মালিক! আমরা আরাফাতের ময়দানে পৌঁছাতে পারিনি সত্যি, কিন্তু আমাদের মন তো আজ সেখানেই পড়ে আছে। আমাদের অনুতপ্ত হৃদয় আজ আপনার রহমতের ভিখারি। আপনি আরাফাতবাসীকে যেভাবে ক্ষমা করছেন, দূর দূরান্তে থাকা আমাদের মতো গুনাহগারদেরও আপনার ক্ষমার চাদরে জড়িয়ে নিন। দুনিয়ার সকল মুসলমানদের ঋণগ্রস্ততা, সন্তান হীনতা, বেকারত্ব, অসুস্থতা, মিথ্যা মামলা ও অন্যান্য সকল পেরেশানি থেকে মুক্তি দিন।