14/02/2020
প্রসংগঃ তথাকথিত বিশ্ব ভালোবাসা দিবস - দ্বীন ইসলাম কি বলে।
_______________________
পূর্বকথাঃ সবচেয়ে বড় কষ্টের বিষয় হলো, প্রতি বছর এই "বিশেষ দিনগুলো"র আগে এই পোষ্টগুলো শেয়ার করি আমরা অনেকেই। বিশেষ লাভ হয় না তাতে। অনেক ভাইবোন প্রথম লাইন দেখেই স্কিপ করবেন।
তারপরেও দাওয়াহর কাজ চালু রাখতে হবে। পাঠককুল এর কাছে অনুরোধ - নিজের ঘর থেকেই শুরু করুন বুঝানো। একদিন আমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবো ইনশাআল্লাহ। যতো দ্রুত, ততোই মঙ্গল।
__________________________
বিশ্ব ভালোবাসা দিবস-এর ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে "এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা" সহ আরো বহু রেফারেন্স থেকে জানা যায়, “রোমান এক খ্রিস্টান পাদ্রি সেন্ট ভ্যালেন্টাইন। চিকিৎসা বিদ্যায় সে ছিলো অভিজ্ঞ। খ্রিস্টধর্ম প্রচারের অভিযোগে ২৭০ খ্রিস্টাব্দে রোমের সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াসের আদেশে ভ্যালেন্টাইনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। সে যখন বন্দি ছিলো তখন তরুণ-তরুণীরা তাকে ভালবাসা জানিয়ে জেলখানায় জানালা দিয়ে চিঠি ছুড়ে দিতো। বন্দি অবস্থাতেই সেন্ট ভ্যালেন্টাইন জেলারের অন্ধ মেয়ের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেয়ার চিকিৎসা করে। মেয়েটির সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে উঠে। মৃত্যুর আগে মেয়েটিকে লেখা এক চিঠিতে সে লিখে যে, “ফ্রম ইউর ভ্যালেন্টাইন।”
অনেকের মতে, সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের নামানুসারেই পোপ প্রথম জুলিয়াস ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ডে’ হিসেবে ঘোষণা দেয়। ইতিহাস দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, তথাকথিত ভালোবাসা দিবস কখনোই এদেশীয় সংস্কৃতির অংশ ছিলো না। আর মুসলমানদের তো নয়ই।
বর্তমান অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগে স্যাটেলাইটের কল্যাণে মুসলিম সমাজ পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুসরণ করছে। নিজেদের স্বকীয়তা-স্বাতন্ত্র্যকে ভুলে গিয়ে, ধর্মীয় অনুশাসনকে উপেক্ষা করে তারা আজকে প্রগতিশীল হওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে তাদের কর্মকান্ডে মুসলিম জাতির উঁচু শির নত হচ্ছে। অথচ এটা বহুপূর্বে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিষেধ করে গেছেন।
আবু আকিদ (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) খায়বার যাত্রায় মূর্তিপূজকদের একটি গাছ অতিক্রম করলেন। তাদের নিকট যে গাছটির নাম ছিল ‘জাতু আনওয়াত’। এর উপর তীর টানিয়ে রাখা হতো। এ দেখে কতক সাহাবী রাসূল (সাঃ)-কে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের জন্যও এমন একটি ‘জাতু আনওয়াত’ নির্ধারণ করে দিন। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ক্ষোভ প্রকাশ করলেন, "সুবহানাল্লাহ, এ তো মূসা (আঃ)-এর জাতির মত কথা। আমাদের জন্য একজন প্রভু তৈরি করে দিন, তাদের প্রভুর ন্যায়। আমি নিশ্চিত, আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, তোমরা পূর্ববর্তীদের আচার-অনুষ্ঠানের অন্ধানুকরণ করবে"।
[জামে' আত-তিরমিযী, হাদীস ৫৪০৮; সহীহ]
অন্য হাদীসে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি যে জাতির অনুকরণ করবে, সে ব্যক্তি সেই জাতিরই একজন বলে গণ্য হবে’।
[সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস ৪০৩১, মুসনাদে আহমাদ, ২/৫০; সহীহ]
মানুষের অন্তর যদিও অনুকরণপ্রিয়, তবুও মনে রাখতে হবে ইসলামী দৃষ্টিকোণ বিচারে এটি গর্হিত, নিন্দিত। বিশেষ করে অনুকরণীয় বিষয় যদি হয় আক্বীদা, ইবাদত, ধর্মীয় আলামত বিরোধী, আর অনুকরণীয় ব্যক্তি যদি হয় বিধর্মী, বিজাতী। দুর্ভাগ্য যে, মুসলমানরা ক্রমশ ধর্মীয় আচার, অনুষ্ঠান ও বিশ্বাসে দুর্বল হয়ে আসছে এবং বিজাতীদের অনুকরণ ক্রমান্বয়ে বেশি বেশি আরম্ভ করছে। যার অন্যতম ১৪ ফেব্রুয়ারী বা ভালোবাসা দিবস। মুসলমানদের জন্য এসব দিবস পালন জঘন্য অপরাধ।
ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, "কাফিরদের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান উপলক্ষে তাদের শুভেচ্ছা জানানো একটি কুফরী কাজ। কারো দ্বিমত নেই এতে। যেমন তাদের ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে ‘শুভেচ্ছা’ বলা, শুভ কামনা জানানো। এগুলো কুফরী বাক্য না হলেও ইসলামী দৃষ্টিকোণ হতে হারাম। কারণ এর অর্থ হলো, একজন লোক ক্রুশ, মূর্তি ইত্যাদিকে সিজদা করছে, আর আপনি তাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন। এটা একজন মদ্যপ ও হত্যাকারীকে শুভেচ্ছা জানানোর চেয়েও জঘন্য।"
অনেক ভাইবোন অবচেতনভাবেই এ সকল অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, অথচ তারা জানেও না, কত বড় অপরাধ তারা করে যাচ্ছে। শিরক ও কুফরে লিপ্ত ব্যক্তিদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছে, ধন্যবাদ দিচ্ছে। এভাবে আল্লাহর শাস্তিতে নিপতিত হচ্ছে।
মুসলমানদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন ও কাফিরদের সাথে সম্পর্ক ছেদন হচ্ছে আমাদের পথিকৃৎ সাহাবা, নেককার পূর্ব পুরুষদের একটি বৈশিষ্ট্য। সুতরাং যারাই বিশ্বাস করে, ‘আল্লাহ এক, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ তাঁর রাসুল’ – তাঁদের উচিত ও কর্তব্য, মুসলমানদের মুহাববত করা, কাফিরদের ঘৃণা করা, তাদের সাথে বৈরিভাব পোষণ করা, তাদের আচার-অনুষ্ঠান প্রত্যাখ্যান করা। এতেই আমরা নিরাপদ, এখানেই আমাদের কল্যাণ, অন্যথা সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।
কেউ কেউ হয়তো বলবে, আমরা তাদের আক্বীদা বিশ্বাস গ্রহণ করি না, শুধু আপোষে মুহাববত, ভালোবাসা তৈরি করার নিমিত্তে এ দিনটি পালন করি। অথচ এর মাধ্যমে সমাজে অশ্লীলতা ছড়ায়, ব্যভিচার প্রসার লাভ করে। একজন সতী-সাধ্বী পবিত্র মুসলিম নারী বা পুরুষ এ ধরনের নোংরামির সাথে কখনো জড়িত হতে পারে না।
এ দিনটি উদযাপন কোন স্বভাব সিদ্ধ ও স্বাভাবিক ব্যাপার নয়। বরং একজন ছেলেকে একজন মেয়ের সাথে সম্পর্ক জুড়ে দেয়ার পাশ্চাত্য কালচার আমদানীকরণ। আমরা জানি, তারা সমাজকে চারিত্রিক পদস্খলন ও বিপর্যয় হতে রক্ষা করার জন্য কোন নিয়ম-নীতির ধার ধারে না। যার কুৎসিত চেহারা আজ আমাদের সামনে স্পষ্ট। তাদের অশালীন কালচারের বিপরীতে আমাদের অনেক সুষ্ঠু-শালীন আচার-অনুষ্ঠান রয়েছে।
মুসলিম সমাজে এক সময় নীতি-নৈতিকতার মূল্য ছিল সীমাহীন। লজ্জাশীলতা ও শুদ্ধতা ছিল এ সমাজের অলংকার। কোন অপরিচিত মেয়ের সাথে রাস্তায় বের হবার চেয়ে পিঠে বিশাল ভার বহন করা একটা ছেলের জন্য ছিল অধিকতর সহজ। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে তা চিন্তা করারও অবকাশ ছিল না। অথচ সেই অবস্থা থেকে আজ আমরা কোথায় এসে পৌঁছেছি! এটা হচ্ছে ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’-র মত অশ্লীলতার কুফল। এসবের দ্বারা সরল, পুণ্যবান, নিষ্কলঙ্ক মানুষ বিপথগামী হচ্ছে।
আমেরিকা ও ইউরোপ এর লোকজন একই উৎসবে মেতে উঠতে পারে। কারণ তারা এক জাত, এক সভ্যতা, এক সংস্কৃতি, এক ধর্ম এবং একই ধারার লোক। এক দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, তাই আনন্দ-বেদনার অনুভূতি সর্বত্র অভিন্ন। কিন্তু আমাদের দেহ পৃথক, ওদের চেয়ে আমরা পৃথক প্রায় সব ক্ষেত্রে। তথাপি কেন আমরা নাচি যখন তারা ডুগডুগি বাজায় নিজেদের জন্য। বিলাতের ভ্যালেন্টাইন ঐতিহ্যকে অনুসরণ করে মুসলিমরাও যদি একইভাবে এ দিবসটি পালন করে, তাহলে তাদের ও আমাদের মধ্যে পার্থক্য থাকল কোথায়? আমরা মুসলিম। ভ্যালেন্টাইন আমাদের নয়, ওদের- এ জ্ঞানটুকুও নেই, এটাই আজ আমাদের জন্য বড় ট্রাজেডি!
অতএব যেকোন মূল্যে এসমস্ত #অপসংস্কৃতি থেকে বেঁচে থাকা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব। মহান আল্লাহ আমাদের হিদায়াত দান করুন।
আমীন।