06/12/2020
আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আল-আরবিয়া মোজাহেরুল উলূম, চট্টগ্রাম-এর প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা ইসমাঈল রহ.-এর জীবন ও কর্ম
----------------------------------------
সলিমুদ্দিন মাহদি কাসেমী
শিক্ষক, আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া, চট্টগ্রাম।
-----------------------------------------------
পৃথিবী নশ্বর। পৃথিবীর সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী। কোন কিছুই পৃথিবীতে চিরস্থায়ী নয়। এখানে মানুষ আসে আর যায়। তবে পৃথিবীতে মানুষের আগমন হয় আমল-কাজ করার জন্য। কাজ-কৃতি দ্বারাই মানুষ বড় হয়। স্মরণীয় হয়। বরণীয় হয়। গ্রহণযোগ্য হয়। অপরের জন্য আদর্শ ও মডেল হয়। দুনিয়া-আখিরাতে সফলতার জন্য মানুষ তাকে আইডল মনে করে। তবে এ সুযোগ সকলের জীবনে নসীব হয় না।
কিছু মানুষ এমন হয়, যারা পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়ার পরও অমর হয়ে থাকেন। তারা নিজেদের কৃতির মাধ্যমে বেঁচে থাকেন। তেমনি একজন প্রথিতযশা মনীষীর নাম আল্লামা মুহাম্মদ ইসমাঈল রহ.। তিনি ধর্মীয় শিক্ষা-দিক্ষা ও উন্নত চরিত্রের মাধ্যমে সমাজ সংস্কারে অনস্বীকার্য ভূমিকা রেখে গেছেন। এ মহা মনীষী আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গেছেন আজ থেকে প্রায় ৫৩ বছর পূর্বে। তিনি জামিয়া মোজাহেরুল উলূমের মতো একটি প্রতিষ্ঠান উপহার দিয়ে গেলেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচিত হয়নি। এমনকি একটি আর্টিকেলও লেখা হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই।
কিছু দিন পূর্বে ‘আনোয়ারা থানার আলোকিত মনীষীদের’ জীবনী সংগ্রেহের একটি পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছিল। সেখানে সর্ব প্রথম যে মনীষীর নামটি স্থান পায়, তিনি হলেন, আল্লামা মুহাম্মদ ইসমাঈল রহ.। আমরা আমাদের সাধ্য মতে তাঁর কৃতি ও স্মৃতি সংগ্রহের ধারা অব্যহত রেখেছি। যেহেতু আগামীকাল জামিয়া মোজাহেরুল উলূমের সাবেক ছাত্রদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান, তাই মাওলানা ইসমাঈল রহ.-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী প্রকাশ করা হলো। এটি অপূর্ণাঙ্গ হলেও প্রকাশ করার উদ্দেশ্য হলো, যেন প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারাণা পাওয়া যায়। আর যাদের কাছে এ সম্পর্কে আরো অধিক তথ্য রয়েছে, তাদের কাছ থেকে তা সংগ্রহ করে উপকৃত হওয়া যায়। আশা করি, প্রবীণরা এ ক্ষেত্রে সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করবেন।
ব্যক্তিগত পরিচিতি :
নাম : মুহাম্মদ ইসমাঈল। পিতার নাম : জনাব আব্দুর রউফ। দাদার নাম : মাওলানা আমীরুযযামান।
বংশ পরিচয়:
তিনি ছিলেন সৈয়দ বংশ তথা খন্দকার বংশের একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। জন্মস্থান: তিনি আনোয়ারা থানার অর্ন্তগত চাতরী ইউনিয়নের ডুমুরিয়া-রূদুরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম তারিখ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
শিক্ষা-দিক্ষা:
তিনি পটিয়া থানার অর্ন্তগত কাজী পাড়ায় একজন খন্দকার আলেমের নিকট প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। অতঃপর হস্তশিল্প শেখার আগ্রহী হন। তাই তিনি হাইলধরের একজন দর্জীর তত্বাবধানে সেলাই কাজ শিখতে গেলেন। ঐ দর্জী কোন কারণে তাঁর উপর ক্ষিপ্ত হয়ে কেঁচি দিয়ে আঘাত করেন। অতঃপর তিনি রাগ করে সেখান থেকে চলে আসেন। আর এই রাগেই তাকে সফলতার পথ দেখায়। তিনি পেশা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলেন। পড়া-লেখা করে বড় আলেম হওয়ার মনস্থ করলেন। উপমহাদেশের ইলমে ওহির প্রাণ কেন্দ্র দারুল উলূম দেওবন্দ গমন করলেন। সেখানে কিছুদিন ছিলেন। পরবর্তীতে ‘মোজাহেরল উলূম সাহারানপূর’-এ ভর্তি হন এবং সেখান থেকে দাওরায়ে হাদীসের সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জন করে দেশে প্রত্যার্বতন করেন। সাহারানপূরে তিনি এমন একাগ্রচিত্তে পড়া-লেখা করেছিলেন যে, প্রায় আট বছর যাবৎ বাড়ি-ঘরের সাথে কোন প্রকারের যোগাযোগ পর্যন্ত রাখেননি। এমনকি বাড়ি থেকে অনেক চিঠিপত্র এসেছেন। কিন্তু তা তিনি কখনো খুলেও দেখেননি। বস্তুতঃ এমন ত্যাগ দিতে পারলেই প্রকৃত ইলমের উত্তরাধিকারী হওয়া যায়।
শিক্ষকমণ্ডলি ও আধ্যাত্মিক সাধনা:
তাঁর উল্লেখযোগ্য শিক্ষকমণ্ডলির মধ্যে রয়েছেন, হযরত মাওলানা খলীল আহমদ সাহারানপূরী রহ., মাওলানা আসাদ রহ.-সহ ভারতের মোজাহেরুল উলূম সাহারানপূরের তাঁদের সমসাময়িক বড় বড় মুহাদ্দিসগণ। তিনি মাওলানা আহমদ হাসান রহ.-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করেছেন। তাঁর দিক-নির্দেশনায় আধ্যাত্মিক সাধনা করে তাঁর কাছ থেকে খেলাফত ও ইজাযত হাসিল করেছেন। পরবর্তীতে তাঁর কাছে বায়আত গ্রহণ করে অনেকেই খেলাফতপ্রাপ্ত হয়েছেন।
কর্মজীবন:
তাঁর কর্মজীবনের সূচনা হয়েছিল ‘আল-জামিয়া আল-আরবিয়া জিরি’-এ শিক্ষাকতার মাধ্যমে। তিনি সেখানে প্রায় ২৮ বছর যাবৎ শিক্ষাকতা করেছেন। তিনি জামিয়া জিরির সিনিয়র মুহাদ্দিস ছিলেন। তৎকালীন মুহতামিম হযরতুল আল্লামা আহমদ হাসান রহ. –এর খুবই ঘনিষ্ট ও বিশ্বস্ত ছিলেন। তাই যখন মুহতামিম সাহেব বিভিন্ন সময় মাদরাসার কাজে বাইরে যেতেন, তখন তিনি মাদরাসা পরিচালনার দায়িত্বও পালন করতেন।
জামিয়া মোজাহেরুল উলূম প্রতিষ্ঠা ও ইতিহাস :
অতঃপর তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে চট্টগ্রাম বাকলিয়াস্থ আল-জামিয়া আল-আরবিয়া মোজাহেল উলূমে চলে আসেন। তখনও জামিয়া মোজাহের উলূম স্বপ্নের জগতে। মাদরাসা সূচনা করার পরিকল্পনা নিয়ে ১৯৪৭ সালে বেলায়ত খাঁ জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে ছোট্ট দীনি প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি রাখা হয়। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গরা উক্ত প্রতিষ্ঠানের দায়-দায়িত্ব জামিয়া আরবিয়া জিরি-এর তৎকালীন মুহতামিম আল্লামা আহমদ হাসান (রহ.)-এর হাতে ন্যস্ত করেন। তিনি জামিয়া আরবিয়া জিরি-এর মুহাদ্দিস, তাঁর বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ট ব্যক্তিত্ব, হযরত আল্লামা মুহাম্মদ ইসমাঈল (রহ.)-কে মাত্র ৩২ শিক্ষার্থীকে সাথে করে উক্ত প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পাঠান।
পরবর্তীতে মাদরাসার জন্য বেলায়ত খাঁ জামে মসজিদ সংলগ্ন স্থানটি অনুপযুক্ত মনে হলো। তাই তিনি সেখান থেকে মাদরাসা স্থান্তর করার মনস্থ করলেন। ঠিক তখনই জনাব মিয়াঁ খান সওদাগর হজ থেকে দেশে ফিরেছেন। আর তিনি মাদরাসার জন্য কিছু জায়গা দেয়ার প্রস্তাব দিলেন। মাওলানা ইসলামাঈল রহ. তাতে রাজি হলে তিনি তা ওয়াকফ করে দেন। তাঁর ওয়াকফনামাটি রেজিস্টার করা হয়েছিল জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরী-এর বাসায়। যেখানে উপস্থিত ছিলেন খতীবুল আজম আল্লামা সিদ্দিক আহমদ রহ.-সহ আরো অনেক বড় বড় মনীষীরা। বর্তমানে সে জায়গাটিতেই ‘আল-জামিয়া আল-আরবিয়া মোজাহেরুল উলূম’ অবস্থিত।
তিনি আনুমানিক ১৭ বছরের অক্লান্ত চেষ্টা-মেহনত ও একনিষ্ঠতার মাধ্যমে গড়ে তুললেন ‘আল-জামিয়া মোজাহেরুল উলূম’-এর পুষ্পদ্যোন। যার সুবাস দিগ-দিগন্তে ছড়িয়ে পড়লো। তিনি ইন্তিকালের কিছু দিন পূর্বে অসুস্থ হয়ে বাড়িতে চলে যান। তিনি বাড়িতে চলে যাওয়ার পূর্বে মাওলানা আবু সাঈদ সাহেব ও মাওলানা সালেহ আহমদ সাহেবদ্বয়ের নিকট মাদরাসার যিম্মাদারি হস্তান্তর করেন। এর কিছুদিন পরেই তিনি ইন্তিকাল করেন। তার পর মুহতামিম নিযুক্ত হন মাওলানা সালেহ আহমদ রহ.। তিনি সুষ্ট ও সুন্দরভাবে বেশ কিছুদিন পর্যন্ত মাদরাসা পরিচালনা করেন। অতঃপর তাঁর ইন্তিকালের পর মাদরাসা পরিচালনার দায়িত্ব আরোপিত হয় মাওলানা আব্দুশ শাকর রহ.-এর উপর। তাঁর পরিচালনা কালে দুইজন বিদগ্ধ আলেম নির্বাহী মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করেন। প্রথমজন হলেন, মাওলানা আবুল ওয়াফা রহ.। তিনি জামিয়া থেকে অব্যহতি গ্রহণের পর নির্বাহী মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করেন মাওলানা আব্দুল জলীল রহ.। ২০০৪ খৃষ্টাব্দে মাওলানা আব্দুশ শাকুর রহ.-এর ইন্তিকালের পর মুহতামিম নিযুক্ত হন মাওলানা আব্দুল জলীল রহ.। ২০০৬ সালে মাওলানা আব্দুল জলীল রহ. এর ইন্তিকাল করেন। তাঁর ইন্তিকালের পর মজলিসে শূরার সর্বসম্মত সিদ্ধান্তক্রমে মুহতামিম নির্বাচিত হন, বর্তমান মুহতামিম ও শায়খুল হাদীস মাওলানা লুকমান হাকীম (হাফিজাহুল্লাহ)। মহান আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ, তিনি যেন, প্রয়াত মুহতামিমগণকে জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম দান করেন এবং বর্তমান মুহতামিমসহ সকল শিক্ষকমণ্ডলীকে সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু দান করেন, আমীন। যারা আমীন বলবে, তাদেরকেও।
বর্তমানে জামেয়া মোজাহেরুল উলূম বাংলাদেশের একটি সুপ্রসিদ্ধ শিক্ষা নিকেতন। এখানে বর্তমানে শিশু শ্রেণী থেকে নিয়ে হিফজ-নাজেরাসহ, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক, স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পড়া-লেখার সুযোগ রয়েছে। সাথে সাথে তাজবীদ ও কিরাতে বিশেষ গবেষণার জন্য স্বতন্ত্র বিভাগও রয়েছে। বর্তমানে অর্ধশতাধিক শিক্ষক-কর্মচারী, প্রায় দেড় হাজারের মতো শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত আছে। আল্লাহ এ প্রতিষ্ঠানের মানকে সমুন্নত রাখেন এবং উত্তরোত্তর সফলতা দান করেন, আমীন।
তাঁর প্রসিদ্ধ ছাত্ররা :
তাঁর প্রসিদ্ধ ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন, জামিয়া পটিয়ার প্রতিষ্ঠাতা হযরত মাওলানা মুফতি আযীযুল হক রহ.। মাওলানা ইসমাঈল রহ.-এর ছোট ভাই হযরত মাওলানা মীর হোসাইন রহ., সাবেক মুহাদ্দিস, জামিয়া পটিয়া। হযরতম মাওলানা মুফতি নূরুল হক রহ., মুহতামিম, জামিয়া আরবিয়া জিরি। হযরত মাওলানা আলী আহমদ বোয়ালভী রহ., মুহাদ্দিস, জামিয়া পটিয়া। হযরত মাওলানা আবুল খাইর রহ., মুহতামিম, বোয়ালিয়া ইসলামিয়া মাদরাসা, আনোয়ারা।
বিবাহ-শাদী :
মাওলানা ইসমাঈল রহ. বিবাহ করেছেন পটিয়া উপজেলা থেকে। পটিয়া থানার অন্তর্গত ৪নং ওয়ার্ডের মাঝের ঘাটা নিবাসী মাওলানা হামিদুর রহমান রহ.-এর মেয়ের সাথে তাঁর শাদী হয়। তাঁর স্ত্রী জামিয়া মোজাহেরুল উলূমের সাবেক মুহাদ্দিস মাওলানা মাসউদুল হক রহঃ-এর বড় বোন।
সন্তান-সন্ততি:
একজন ছেলে ছিলো, শিশুকালেই সে ইন্তেকাল করে এবং তিনি তাঁর চারজন মেয়ে রেখে যান। তাঁর মেয়েরা ছিলেন অত্যন্ত পর্দানশীন, খুবই লাজুক ও দীনদার। এ জন্য প্রত্যেকের শাদি হয়েছিল দীনদার, চরিত্রবান ও জ্ঞানীদের সাথে। প্রথম জনের শাদি হয়েছে মাওলানা আতিকুর রহমান রহ.-এর সাথে, যিনি জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ার শিক্ষক ছিলেন। দ্বিতীয় মেয়ের শাদি হয়েছে মাষ্টার মাহবুব আহমদের সাথে, যিনি খুবই খোদাভীরু ও আল্লাহওয়ালা ছিলেন। তৃতীয় মেয়ের বিবাহ হয়েছে মাওলানা আবু সাঈদ রহ.-এর সাথে, যিনি জামিয়া মোজাহের উলূমের শিক্ষক ছিলেন এবং চতুর্থ মেয়ের নেকাহ হয়েছে মাওলানা নেযামুদ্দিন রহ.-এর সাথে, যিনি "আশরাফুল উলূম মাদরাসা, রূদুরা, আনোয়ারা" প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
মৃত্যুর ঘটনা ও তারিখ:
মৃত্যুর কিছু দিন পূর্বে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন বাড়িতে চলে যান এবং ১৯৬৭ খৃষ্টাব্দ মোতাবেক ১৩৬৮ হিজরীতে তিনি নিজ বাড়িতেই ইন্তিকাল করেন। অতঃপর আনোয়ারা, ডুমুরিয়া-রূদুরা হাজী চাঁদ মিয়া মসজিদের পার্শ্বের কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
তাঁর স্মৃতিচারণমূলক কিছু ঘটনা:
পথহারা উম্মতকে দ্বীনের পথে নিয়ে আসার জন্য সদা তিনি চেষ্টা চালিয়ে যেতেন। দ্বীনের দাওয়াত ও তাবলীগের জন্য নিজেকে সদা ব্যস্ত রাখতেন। মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ওয়াজ-নসীহতেও বেশ সময় দিতেন। উম্মাহকে দিক-নির্দেশনা দেয়ার জন্য দেশ-বিদেশে সফর করতেন। তিনি মায়ানমারের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে ওয়াজ-নসীহত করতেন। খুবই নিলোর্ভ ছিলেন। টাকা-পয়সা নয়, বরং আল্লাহকে সন্তষ্ট করার জন্য ওয়াজ-নসীহত করতেন। পার্থিব কোন সুযোগ-সুবিধার জন্য নয়, উম্মাহর কল্যাণে তাদেরকে উপদেশ দিতেন। তিনি এতো বেশী গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছেন যে, জামিয়া আহলিয়া হাটহাজারির বার্ষিক মাহফিলেও তিনি আলোচনা করতেন। আসরের পরের সময়টি তাঁর জন্যই বরাদ্দ রাখা হতো। তাঁর আলোচনায় বিমুগ্ধ হতো সকল শ্রোতা।
বির্তক অনুষ্ঠান :
তিনি দীনের খাতিরে বাতিলের সাথে মুনজারা ও তর্ক করতেন। তৎকালে শেরবাংলা ছিলো বিদআতের ধারক-বাহক ও প্রচারক। সে হক্কানী ওলামায়ে কেরামের সাথে মুনাজারা-বিতর্কে জাড়িয়ে যেতো। আনোয়ারা বটতলীতে তার সাথে মাওলানা ইসমাঈল রহ.-এর একটি মুনাজারা অনুষ্ঠিত হলো। শেরবাংলা ছিলো খুবই ধূর্ত। সে কিতাবের উপর হাতের লেখা একটি কাজ রেখে আরবী ইবারত পাঠ করছে। অথচ ঐ কিতাবে উক্ত ইবারত বিদ্যমান ছিলো না। যখন মাওলানা ইসমাঈল রহ. তার এই ধুকাবাজী বুঝতে পারলেন, তখন তিনি সাথে সাথে বলে উঠলেন, এটি কিতাবের ইবারত না, এটি হলো তার বানানো ইবারত। সে চোর। চুরি কারার জন্য নিজের পক্ষ থেকে ইবারত বানিয়ে বলছে। তখন শেরেবাংলা রেগে গিয়ে বলে, সে আমাকে চোর কেন বলল? আমি আর তাদের সাথে মুনাজারা করবো না। এ বলে, মুনাজারাস্থল ছেড়ে চলে যায়। কারণ তার ধূর্ততা প্রকাশ পাওয়ার পর এক মুর্হূতও থাকা নিরাপদ মনে করেনি। পরাজয়ের গ্লানি মাথায় নিয়ে পালিয়ে গেলো। এভাবে তারা কষ্ট করে আমাদের এ দেশ থেকে বিদআত-কুসংস্কার নির্মূল করেছেন। আল্লাহ তাঁদেরকে উত্তম প্রতিদান দান করেন।
মিতব্যয়ী :
মিতব্যয়ী হওয়া মুমিনের একটি বড় গুণ। রাসূলুল্লাহ সা. বলেনছেন, মিতব্যয়ী হওয়ার মাধ্যমে মানুষ অর্ধেক উপার্জন হাসিল করতে পারে। তাই মরহুম মাওলানা ইসমাঈল রহ. ছিলেন খুবই মিতব্যয়ী। বিশেষত মাদরাসা ফান্ড থেকে ব্যয় করতে খুবই সাবধানতা অবলম্বন করতেন। তিনি মাদরাসার কাজে শহরের বিভিন্নস্থানে যেতেন। তবে তিনি পারত পক্ষে রিক্সায় না গিয়ে পায়ে হেঁটে যেতেন। মাদরাসা থেকে খাতুনগঞ্জ পর্যন্ত রাস্তাটি প্রায় সময় কাঁদাযুক্ত থাকতো। তারপরও তিনি সেখানে পায়ে হেঁটে যেতেন। জনৈক সাওদাগর নিজের পক্ষ থেকে রিক্সা ভাড়া দেয়ার কথা বললেও তিনি তাতে রাজি হন নি।
ইবাদত-বন্দেগী:
তিনি সবসময় আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল থাকতেন। গভীর রাত পর্যন্ত তিলাওয়াত করতেন। বিশেষত রমযান মাসে তারাবীর পর সেহেরী পর্যন্ত তিলাওয়াতে মগ্ন থাকতেন। ফজরের নামায পড়ে কিছুক্ষণ আরাম করতেন। তিনি তিলাওয়াতের সময় খুব বেশী কান্নাকাটি করতেন। তাই, অনেকই তাঁকে ‘কাঁদুনে’ বলে ডাকতো।
মাদরাসা পরিচালনায় তাঁর বৈশিষ্ট্য :
তিনি একদিকে যেমন ছাত্রদের পড়া-লেখার উন্নয়নের ব্যাপারে সোচ্চার ছিলেন, তেমনি অর্থনৈথিক উন্নয়নের জন্যও সচেষ্ট ছিলেন। বিশেষত তাঁর স্বচ্ছতা ও আমানতদারী ছিলো খুবই লক্ষণীয়। তিনি প্রতিদিন বাদে এশা হিসাব নিরক্ষণের জন্য মাষ্টার আব্দুল কুদ্দুস সাহেবকে ডেকে আনতেন। সকল হিসাবপত্র শেষ করেই তিনি ঘুমাতে যেতেন। কখনো কখনো হিসাব মিলাতে গিয়ে রাত শেষ হয়ে যেতো। তারপরও হিসাবপত্রে কোন ধরনের ক্রটি রাখতেন না। চাঁদা ফান্ড ও সাদকা ফন্ডের টাকা রাখার জন্য পৃথক পৃথক ব্যবস্থা ছিলো। নিজের টাকার সাথে মাদরাসার টাকাকে কখনো মেশাতেন না।
বিশেষ দ্রষ্টব্য : হযরত মাওলানা ইসমাঈল রহ. এর জীবনী সংগ্রহ করতে যারা সহযোগিতা করেছেন আল্লাহ তাঁদের সকলকে জাযায়ে খায়র দান করেন। বিশষত হযরত মাওলানা হাফেজ শোয়াইব সাহেব, শিক্ষক জামিয়া পটিয়া ও মাওলানা ইউনুস সাহেব হাফিজাহুল্লাহ, শিক্ষক কৈয়গ্রাম মাদরাসা। তিনি দীর্ঘদিন মাওলানা ইসমাঈল সাহেব রহ. এর খাদেম ছিলেন। এ ছাড়াও জামিয়া মোজাহেরুল উলূমের সিনিয়র শিক্ষক মাওলানা শাহাদাত হোসাইন হাফিজাহুল্লাহ-সহ আরো যারাই সহযোগিতা করেছেন, তাদের সকলের জন্য দুআ করি, আল্লাহ যেন তাদের প্রত্যেককেই উত্তম প্রতিদান দান করেন। অবশিষ্ট আরো অনেক বিষয় সংযুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে। আশা করি, মন্তব্য ও পরামর্শের মাধ্যমে সহযোগিতা করবেন। জাযাকুমুল্লাহু খায়রান।