06/11/2025
জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা এতটাই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ি যে, তখন যদি আমাদের পাশে কোনো মেন্টর না থাকে, তবে বাস্তবতার সাথে লড়াই করে টিকে থাকাটাই দুষ্কর হয়ে ওঠে। 😔💔
আপনি যদি জীবনে বাস্তবতার সেই চরম পর্যায়ে গিয়ে হারতে না চান, তবে আমাদের **** পেজটি ফলো করে রাখতে পারেন। 🌟✨
ইনশাআল্লাহ, আমাদের শেয়ার করা মোটিভেশনাল ভিডিও এবং পোস্টগুলো আপনার জীবনে এক অনন্য মেন্টর হিসেবে কাজ করবে। 📽️💡
ধন্যবাদ আপনাকে! 🥰❤️
মিথ্যা, তুমি দশ পিপড়া!
আমার দৃষ্টিতে মিথ্যাবাদী দুই প্রকার:
১. প্রফেশনাল,
২. অকেশনাল।
প্রফেশনাল মিথ্যাবাদী সর্বদা মিথ্যার রসে জিহ্বা চাটে। মিথ্যা এদের দিন-রাত, মিথ্যা এদের স্বপ্ন-সাধনা। কারণে-অকারণে এরা মিথ্যা বলে। মানুষ ঠকিয়ে বিকৃত এক সুখে তারা মত্ত থাকে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—তারা ভাবে, তারা সঠিক পথেই আছে! এই প্রজাতি তাদের কৃতকর্মের জন্য বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত নয়।
অন্যদিকে, অকেশনাল মিথ্যাবাদী তার কর্মের জন্য আংশিক দায়ী। তারা পরিবেশ-পরিস্থিতির শিকার হয়ে মিথ্যা বলে। মনের কোণে সত্য বলার তীব্র বাসনা থাকলেও, বাস্তবের নিষ্ঠুরতা সেই সাহসটুকু কেড়ে নেয়।
তারা মিথ্যাকে মোটেও ভালোবাসে না, কিন্তু সত্য উচ্চারণের শক্তি তাদের কণ্ঠে থেমে যায়। তবে ঘুমন্ত বিবেক যখন জেগে ওঠে, তখন অনুশোচনার আগুনে তারা পুড়ে কয়লা-কাবাব হয়ে যায়।
এবার আসি আমার কথায়।
আমি নিখুঁত বা নির্দোষ নই, তবে মিথ্যার সঙ্গে আপস করাটা কখনোই আমার স্বভাবের অংশ ছিল না। আমার জীবনও আবর্তিত হয়েছে সত্য ও মিথ্যার সূক্ষ্ম দ্বন্দ্বে। মিথ্যা বলা কখনোই আমার রুচির অনুরূপ ছিল না; বরং সত্যের দীপ্ত আলোয় পথ চলার প্রত্যয় নিয়েই জীবনের যাত্রা শুরু করেছিলাম। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় বইয়ের পাতার মতো সরল হয় না।
জীবনের পথচলায় কখনো কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, যেখানে সত্য বলা মানে নিজেকে বিপদে ফেলা, কিংবা ন্যায়ের পক্ষেও দাঁড়ানো দুরূহ হয়ে উঠেছে।
আমি জানি, মিথ্যা বলার জন্য যুক্তি খোঁজা মানে বিবেকের দরজায় ধূলি জমতে দেওয়া, তবে আমি ইচ্ছা করে মিথ্যার আশ্রয় নিইনি—বরং চেষ্টা করেছি সত্যের পথে থাকার।
কিন্তু কিছু বাস্তবতা, সমাজ-প্রণালী, আর পেশাগত চাপ আমাকে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে, যা আমার মন থেকে নয়, পরিস্থিতির চাহিদা থেকে এসেছে।
মহান আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে, জীবনের প্রথম চাকরিটা পেয়েছিলাম, আবুল খায়ের গ্রুপের মতো দেশসেরা প্রতিষ্ঠানে। একে তো জীবনের প্রথম চাকরি, তার ওপর ঈর্ষণীয় বেতন। আমিও নতুন করে জীবনের অর্থ খুঁজে পেলাম। কর্মস্থল প্রথমে সিরাজগঞ্জ, তার এক মাস পর গাইবান্ধা। তবে আমার ঘোর কাটতে বেশি সময় লাগেনি।
জীবনটা তামা-তামা হওয়ার সব রসদ যেন জমা ছিল এই চাকরিটাতেই। ফলাফল—চাকরি থেকে সাড়ে পাঁচ মাস পরেই ইস্তফা দিলাম।
চাকরিকালীন আমার সকাল শুরু হতো মিথ্যা দিয়ে, আর রাত ঘুমাতে যেতাম মিথ্যা বলে। প্রথম প্রথম সত্য বলতাম। মনে মনে প্রতিজ্ঞা ছিল—দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেব না। কিন্তু আমার আশায় গুড়ে বালি।
প্রতিদিন সকালে ফোন দিয়ে বস বলতেন:
– নাসির, আজ টেরিটরি টার্গেট কত?
– জি স্যার, ৩ লাখ!
– আজ কত সেলস করবেন?
– স্যার, ইনশাআল্লাহ ৪ লাখ বেচব!
(মনে মনে বলতাম: ১ লাখ সেলস করতেই তো নাকের পানি-চোখের পানি এক হয়ে যায়, ৪ লাখ তো স্বপ্নেও দেখি না!)
দুপুরে আবার ফোন:
– নাসির, ইনিশিয়াল সেলস কত?
– স্যার, ১ লাখ ১০ হাজার।
(বলেই ভাবি, এবার খিস্তি শোনার পালা!)
বস শুরু করলেন রাগ সংগীত...
(ফাজি*, বে***, আপনার বা*** কোম্পানি, বসে বসে **** ছিঁড়েন সারাদিন .................ব্লা ব্লা ব্লা!)
রাতে বেলায়ও দিনের খিস্তি পুনঃপ্রচার হতো। সত্য বললে ঝাড়ি, মিথ্যা বললে বাহবা!
আমার অবস্থা এমন হয়ে গেল যে মনে হতো, "মিথ্যার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, সত্য যেন এক টুকরো ঝলসানো রুটি!"
সিরাজগঞ্জে থাকাকালীন সময়ে, আমার অধীনস্থ এক ছেলেকে খুব স্নেহ করতাম। সেও আমাকে অনেক শ্রদ্ধা করত। একদিন সন্ধ্যায়, উদভ্রান্ত চেহারা নিয়ে সে এলো। বলল, তার মা গুরুতর অসুস্থ। ঢাকায় নিতে হবে, কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার টাকা নেই। অনেক কাকুতি-মিনতি করে আমার কাছে ১ হাজার টাকা চাইল। তখন সদ্য চাকরিতে যোগ দিয়েছি, বাড়ি থেকে টাকা এনে খরচ করি। কিন্তু তার কথায় মন গললো। নিজেকে তার জায়গায় কল্পনা করলাম, আমার মায়ের মুখ ভেসে উঠলো। ১ হাজার দিতে পারিনি, দিলাম ৭০০ টাকা।
কয়েকদিন পর সে আমার অফিস রুমে আসলো, চেহারায় তীব্র অস্থিরতা, চোখে আতঙ্কের ছায়া, কাচুমাচু মুখ নিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বরফ গলানোর খাতিরে আমি আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম: কিছু বলবে?
কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে সে বললো: স্যার, আমাকে মাফ করে দেবেন। আমি আপনার সঙ্গে মিথ্যা বলেছি। সেদিনের টাকাটা আমার মায়ের জন্য নিইনি। আমার ব্যক্তিগত প্রয়োজনে নিয়েছি। টাকাটা আমার খুব দরকার ছিল। তাই, ভেবেছিলাম ‘মায়ের’ কথা বললে আপনি ফিরিয়ে দেবেন না।
কথাগুলো যেন হাওয়ায় ভেসে এসে আমার হৃদয়ের ভেতর আঘাত করল। শুনে আমি স্তব্ধ, হতবাক হয়ে বসে রইলাম। আমার ভেতরে যেন কিছু একটা ভেঙে পড়ল—একটা দেয়াল, যেটা বিশ্বাস দিয়ে গড়া হয়েছিল। মনে হলো, আমি ঠকেছি। শুধু টাকার কারণে নয়, বরং একটা নিষ্পাপ সম্পর্কের ভেতরে, মনে হলো বিষ ঢেলে দিলো সে।
যেহেতু তাকে খুব পছন্দ করতাম, এই আঘাত আমার কাছে অসহনীয় ছিল। আপনজনের প্রতারণা বুকে এমন বিষ ঢেলে দেয়, যা নিঃশব্দে প্রাণ কাড়ে।
আমি তাকে আর কিছু বলিনি, শুধু আহত হৃদয় নিয়ে মাথা নিচু করে ছিলাম, কিন্তু সে বুঝেছিল—আমি কতটা আহত এবং আমি কী বলতে চাই।
এই ঘটনার প্রাসঙ্গিকতায় দার্শনিক ফ্রিডরিখ নীটশের একটি উক্তি মনে পড়ে:
“কেউ আমার সঙ্গে মিথ্যা বলেছে—এই কারণে আমি হতাশ নই।
বরং আমি এ কারণে হতাশ যে, এখন থেকে আমি আর তাকে বিশ্বাস করতে পারব না।”
ছেলেবেলায় আমরা “Lieutenant” বানান মনে রাখতাম এইভাবে:
“মিথ্যা তুমি দশ পিপড়া!”
কিন্তু আমি বলি—মিথ্যা, তুমি দশ পিপড়া নও, তুমি লক্ষ কোটি বিষ পিপড়া!
মিথ্যা, তোমার বিষাক্ত মরণ কামড়, নীল রঙা করে দেয় আমার বিশ্বাসের সাদা চাদর!
মিথ্যা, তোমায় ঘৃণা করি। খুব বেশি ঘৃণা করি।
নাসির আহমেদ খান
১৮.০৪.২০২৫