01/10/2026
দ্যা কেস অ্যাবাউট গড: “স্রষ্টাকে নিয়ে ভাবার সময় নেই”
আমি এমন অনেক মানুষকে দেখেছি, যাঁরা বাস্তব জীবনে কোনো বিষয়ের গুরুত্ব বিচার করেন সেটি তাঁদের তাৎক্ষণিক কাজে লাগছে কি না, তার ভিত্তিতে। তাঁদের ভাবনা অনেকটা এমন: কোনো বিষয় আমার জন্য উপকারী বা প্রয়োজনীয় হলে সেটি নিয়ে আমি কনসার্ন হবো; অন্যথায় ভাবার প্রয়োজন নেই।
এখানে প্রয়োগবাদ বা Pragmatism-এর সঙ্গে কিছুটা মিল রয়েছে। যদিও তারা আসলে জানেনা প্রয়োগবাদ (Pragmatism) আসলে কী, কি বলে এই মতবাদে। মনের আজান্তেই তারা প্রত্যেকে অন্তত এই ক্ষেত্রে প্রয়োগবাদী (Pragmatists)।
স্রষ্টার ব্যাপারে এ-ধরণের মানুষের মনোভাব এমন: “আমি সকালে ঘুম থেকে উঠি, ব্রাশ করি, নাস্তা করি, অফিসে যাই, কাজ করি। বাসায় ফিরে পরিবার ও বন্ধুবান্ধবকে সময় দিই। রাতে ঘুমাই, পরদিন আবার একই জীবন শুরু করি। এই জীবনচক্রের কোথাও তো আমার গডের প্রয়োজন হচ্ছে না। তাহলে গড আছেন কি নেই, তা নিয়ে এত চিন্তা করার কী আছে? আমি নিজেকে সময় দেব, নিজের জন্য কাজ করব, নিজের উন্নতি করব। গড নিয়ে চিন্তা করে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন দেখি না।”
কিন্তু এখানে মৌলিক বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।
আপনি স্রষ্টাকে নিয়ে চিন্তা না করেও চলতে পারছেন, আর স্রষ্টা ছাড়াই আপনার অস্তিত্ব সম্ভব হয়েছে, এই দুটি কথা এক নয়। কোনো বিষয় আমার কাছে প্রয়োজনীয় মনে হচ্ছে কি না এবং সেটি বাস্তবে সত্য কি না, দুটি আলাদা প্রশ্ন। প্রথম কথাটি আপনার দৈনন্দিন অভ্যাস সম্পর্কে। দ্বিতীয়টি আপনার অস্তিত্বের উৎস সম্পর্কে। কাজেই, প্রথমটি বলে দ্বিতীয়টির মীমাংসা করা যায় না।
আপনি ঘুম থেকে ওঠা থেকে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত কী করেন, তার বিবরণ দিলেন। কিন্তু যে মানুষটি এসব করছে, তার অস্তিত্বের ব্যাখ্যা তো দিলেন না। জীবন কীভাবে কাটাচ্ছেন, সেই উত্তর দিয়ে জীবন কেন আছে, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
এ ধরনের অবস্থানের সমস্যা হলো, দৈনন্দিন ব্যস্ততার আড়ালে জীবনের মৌলিক প্রশ্নগুলো চাপা পড়ে যায়। আর কেউ যদি সচেতনভাবে এসব প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে বলেন, “এগুলো নিয়ে ভাবার কিছুই নেই”, তাহলে বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা ঘটে। শুধু তাই-না, এখানে অকৃতজ্ঞতার দিকও বিবেচনা করা দরকার।
ধরুন, আপনার থাকার জায়গা ছিল না, খাবারের ব্যবস্থাও ছিল না। একজন মানুষ আপনাকে জায়গা দিলেন, বাড়ি করে দিলেন, খাবারের ব্যবস্থা করে দিলেন। আপনি সেখানে স্বচ্ছন্দে থাকতে শুরু করলেন। এরপর বললেন, “আমার জীবন তো ভালোই চলছে। ওই মানুষটিকে নিয়ে ভাবার কী প্রয়োজন?”
আপনার বর্তমান স্বাচ্ছন্দ্য কি তাঁর অবদান মুছে দিয়েছে? বরং যে স্বাচ্ছন্দ্য দেখিয়ে তাঁকে অপ্রয়োজনীয় বলছেন, সেটিই তো তাঁর উপকারের ফল। আপনি হয়তো প্রশ্ন করবেন, “স্রষ্টাকে নিয়ে আমার আগ্রহ নেই, এর সঙ্গে এই উদাহরণের সম্পর্ক কী?”
সম্পর্কটি হলো, কারও দেওয়া সুযোগ ব্যবহার করতে করতে সেই সুযোগের উৎসকে অপ্রয়োজনীয় ভাবা একটি বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা এবং অকৃজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ।
তবে এই উদাহরণ দিয়ে স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণ করতে চাচ্ছি এমনটা ভাববেন না।
আগে ভাবতে হবে, আমাদের অস্তিত্ব কোনো স্রষ্টার দান কি না। আর যদি তিনিই (স্রষ্টা) আপনার অস্তিত্বের উৎস, তারপরও তাঁর প্রতি কোনো কৃতজ্ঞতার প্রয়োজন নেই মনে করেন, তাকে নিয়ে ভাবার প্রয়োজন নেই মনে করেন, তখন অকৃতজ্ঞতার প্রশ্নটি আসে।
এবার মূল কথাতে ফিরে আসি। তারা বলছে, “আমি নিজেকে সময় দেব, নিজের জন্য কাজ করব, নিজেকে উন্নতির উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাব।”
খুব ভালো। কিন্তু যে ‘নিজেকে’ নিয়ে এত চিন্তা করছেন, সেই ‘নিজে’ আসলে কে?
তাদের নিজেকে একবার জিজ্ঞেস করা উচিত, যে শরীরকে আমি ‘আমার শরীর’ বলছি, সেটি কীভাবে অস্তিত্বে এসেছে? এর গঠন, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং ডিএনএ কি আমি নিজে নির্ধারণ করেছি?
আমি কোথায় জন্মাব, কার ঘরে জন্মাব, কোন সময়ে জন্মাব, এগুলোর কোনোটিই তো আমি নিজে ঠিক করিনি। এমনকি আমার মৃত্যু ঠিক কখন ও কোথায় হবে, তার ওপরও আমার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই।
তাহলে যাকে আমি ‘আমি’ বা ‘Myself’ বলছি, সেই সত্তাটি সম্পর্কে আমি কতটুকু ভেবেছি?
আমার জন্মের জৈবিক প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু যে প্রাকৃতিক ব্যবস্থা ও নিয়মের মাধ্যমে আমার জন্ম সম্ভব হলো, সেগুলোর চূড়ান্ত ব্যাখ্যা কী? আমার অস্তিত্বের কোনো উদ্দেশ্য আছে কি? আমার জীবন কি শুধু ভোগ, কাজ, অর্জন এবং মৃত্যুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ?
ফান্ডামেন্টাল কুয়েশ্চন হলো, কেন এই ‘আমি’ নামক সত্তার অস্তিত্ব আছে? এর অস্তিত্বের উদ্দেশ্য কী? ‘আমি’ কে? কোথা থেকে এলো এই আমি? আমার উদ্দেশ্য কী?
কুরআন মানুষকে নিজের সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করতে আহ্বান করে এবং তার অস্তিত্বের উদ্দেশ্য সম্পর্কে উত্তর দেয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আপনার এই পরিচয়টাই সামনে এনে প্রশ্ন করতে বলেছেন।
তিনি (আল্লাহ) বলেন,
আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সংমিশ্রিত শুক্রবিন্দু থেকে তাকে পরীক্ষা করার জন্য, এজন্য তাকে করেছি শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তির অধিকারী।
সূরা আল-ইনসান, ৭৬:২
কাজেই, আপনি নিজেকে অস্তিত্বে আনেননি। আপনার অস্তিত্বের সূচনা আপনার নিজের সিদ্ধান্তে হয়নি। আপনার শরীর, শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি আপনি নিজে তৈরি করেননি। ইসলাম এই বাস্তবতাকে সামনে এনে মনে করিয়ে দেয়।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
“অতএব মানুষের চিন্তা করে দেখা উচিত, তাকে কী থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে।”
এখানে নিজের উৎস নিয়ে চিন্তা করতে বলা হচ্ছে। যে ‘আমি’কে নিয়ে আমাদের এত পরিকল্পনা, সেই ‘আমি’র শুরু সম্পর্কে ভাবতে বলা হচ্ছে।
আমাদের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
“যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন যাতে তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে পারেন যে, কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম। আর তিনি মহাপরাক্রমশালী, অতিশয় ক্ষমাশীল।”
সূরা আল মুলক, ৬৭:২।
কাজেই জীবন শুধু আয় করা, খাওয়া, ঘুমানো এবং অর্থনৈতিক উন্নত করার নাম নয়।
আমাদের গন্তব্য সম্পর্কেও কুরআনে বলা হয়েছে:
“নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁর কাছেই ফিরে যাব।”
সূরা আল বাকারা, ২:১৫৬।
আর সেই প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে রয়েছে জবাবদিহি:
“অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে। এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও দেখতে পাবে।”
সূরা আয যিলযাল, ৯৯:৭–৮।
যিনি কুরআনকে আল্লাহর বাণী বলে মানেন না, তাঁর কাছে এই আয়াতগুলো উদ্ধৃত করা অনর্থক মনে হতে পারে। তবে আমি বলব, এই আলোচনায় আমরা একজন স্রষ্টার অস্তিত্বকে সত্য ধরে আর্গুমেন্টেশন করছি। স্রষ্টা আসলে আছেন কি-না? এটা আলাদা প্রশ্ন। ইতোমধ্যে আমি এসব নিয়ে অনেক আলোচনা করেছি। এই বিষয়ে কারো সংশয় থাকলে বা কেউ স্রষ্টাকে অস্বীকার করলে তার সাথে শুরুতে তা নিয়েই আলোচনা হবে। এখানে আমাদের কনসার্ন সেসব মানুষ যারা স্রষ্টা আছে নাকি নেই তা কেয়ার করেনা তারা।
তাহলে মূল প্রশ্নটি হলো, যে নিজেকে সৃষ্টি করেনি, নিজের শরীরের প্রাথমিক গঠন নির্ধারণ করেনি, নিজের জন্ম বেছে নেয়নি এবং নিজের মৃত্যুর ওপরও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখে না, সে কীভাবে নিজেকেই চূড়ান্ত ও সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ অবলম্বন ধরে নিতে পারে?
নিজের ওপর বিশ্বাস রাখা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু নিজের সামর্থ্যে বিশ্বাস রাখা আর নিজেকে কারও ওপর নির্ভরশীল নয় বলে ধরে নেওয়া এক কথা নয়। নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করাও যুক্তিবোধের অংশ।
ইসলামের আহ্বান হলো, যিনি আপনাকে অস্তিত্ব দিয়েছেন, দেখার ও শোনার ক্ষমতা দিয়েছেন এবং আপনার জীবনের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেছেন, তাঁর ওপর বিশ্বাস রাখুন, কৃতজ্ঞতা স্বীকার করুন।
তাই “গড নিয়ে চিন্তা করার সময় নেই” বলার আগে নিজের কাছে সৎ হওয়া দরকার। আমি কি যুক্তি ও প্রমাণ বিচার করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি? নাকি প্রশ্নটির উত্তর আমার জীবনে দায়িত্ব নিয়ে আসতে পারে বলেই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাচ্ছি?
“আমি এখনো জানি না” একটি সৎ স্বীকারোক্তি হতে পারে। কিন্তু “আমি জানতে চাই না, বিষয়টি প্রয়োজনী নয়” কোনো সৎ অবস্থান নয়।
জীবনে স্রষ্টার কী প্রয়োজন, সেই প্রশ্ন করার আগে তাই একবার ভাবুন:
Who am I?
আমি কে?
Why do I exist?
কেন আমার অস্তিত্ব আছে?
And who gave me this existence in the first place?
এই অস্তিত্ব কি কোনো স্রষ্টার দান? যদি হয়, তিনি কে, এবং তাঁর প্রতি আমার দায়িত্ব কী?