14/08/2020
বুদ্ধের বত্রিশ মহাপুরুষ লক্ষণ ও সেসব উদ্ভবের কারণ
এস. জ্ঞানমিত্র ভিক্ষু
:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
কঠিন কঠোর এ ধরণীতলে কালেভদ্রে মহাপুরুষগণের আবির্ভাব হয়। তাঁদের জন্মে ধন্য হয় এ পৃথিবী। উপকৃত হয় সমগ্র জীবকুল তথা প্রকৃতি। নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণে মহাপুরুষদের গুণাপনা বিশ্লেষণের মাধ্যমে এটা স্বীকৃত যে, সম্যক সম্বুদ্ধগণই সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। কেননা, সকলের এটা বিশ্বাস যে, বুদ্ধ এবং বুদ্ধানুসারী ব্যতীত অন্য ধর্মযাজক এবং তাঁর অনুসারীগণ ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তা কতৃক প্রেরিত। এখানে বুদ্ধ এবং তাঁর মতবাদে আস্থাশীলদের মতে বুদ্ধগণ স্ব-স্ব কুশল কর্মের পরিপূর্ণতার মাধ্যমে তাঁরা মহাপুরুষে পরিণত হন। অন্যদিকে অপরাপর ধর্ম-বেত্তাগণ সৃষ্টিকর্তা কতৃক আরোপিত গুণেই মহাপুরুষ রূপে মনোনীত। আর তাই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তৎপ্রণীত ‘বুদ্ধদেব’ গ্রন্থে বুদ্ধকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন নিজের অন্তরের মধ্য উপলব্দিত সর্বশ্রেষ্ঠ মানব বলে। আব্দুল আতাহিয়া নামক এক প্রখ্যাত কবি বলেছেন, If you desire to see the most noble of mankind, look at the king in beggar’s clothing; it is He whose sanctity is great among men. অর্থাৎ, যদি মানব জাতির মধ্যে সবচেয়ে মহৎ ব্যক্তিকে দেখতে চান তাহলে ভিক্ষুকের আবরণে ঐ রাজপুত্রের দিকে তাকান-যাঁর সাধুতাই মানুষের মাঝে অতি মহান। প্রফেসর সুন্দরস্ বলেন, Lord Buddha could be very easily singled out as the one person known to man who received homage from the greatest number of mankind. অর্থাৎ,অপরিমেয় মানবজাতির শ্রদ্ধার্ঘ লাভ করতে পেরেছেন এরকম একজন ব্যক্তিকে যদি সহজেই বেছে নিতে হয়, তাহলে বুদ্ধকে নিতে হবে। এভাবে কার্ল মাক্স, ওপেনহাইমার, আইনস্টাইন, আবুল ফজল,স্বামী বিবেকানন্দ, হযরত ইনায়েত খান, বিশপ গোর প্রমুখ বিশ্বখ্যাত মনীষীগণ বুদ্ধের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করেছেন অকপটে। কিভাবে বুদ্ধ কারো আরোপিত গুণসম্পন্ন এবং প্রেরিত দূত না হয়েও এমনতরো সর্বোচ্চ স্থানে উপনীত হয়েছেন এবং তাঁর শরীরে অসাধারণ ভাবে বত্রিশ মহাপুরুষ লক্ষণ প্রকটিত হয়েছে তা সত্যিই মানব জাতির জন্য বিস্ময়কর বিষয় এবং শিক্ষণীয়ও মনে করি।
বুদ্ধগণের অতীত জীবনকে বোধিসত্ত্ব জীবন বলা হয়। তাঁরা দান, শীল, নৈষ্ক্রম্য, প্রজ্ঞা, বীর্য, ক্ষান্তি, সত্য, অধিষ্ঠান, মৈত্রী ও উপেক্ষা এ দশবিধ পারমী পূর্ণ করার মাধ্যমে অন্তিম জন্মে সম্যক সম্বুদ্ধ রূপে পৃথিবীতে উৎপন্ন হয়ে জীবনের(প্রজ্ঞার)পরিপূর্ণতা সাধন এবং সর্বজীবের কল্যাণ করেন। তো যে জন্মে বেধিসত্ত্বগণ সম্যক সম্বুদ্ধত্ব অর্জন করেন সে জন্মে তাঁদের শরীরে বত্রিশ প্রকার মহাপুরুষ লক্ষণ ও অশীতি অনুব্যঞ্জন লক্ষণ পরিস্ফুষ্ট হয়। এ প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় হল তথাগতের বত্রিশ মহাপুরুষ লক্ষণ ও এ লক্ষণ গুলো কোন কোন কুশল কর্মের ফলে উদ্ভুত হয়েছে তা।
সিদ্ধার্থ গৌতমের জন্মের পর যে ব্রাহ্মণগণ তাঁর ভবিষ্যৎ গণনা করেছিলেন, তাঁরা তাঁর শরীরে বত্রিশ প্রকার মহাপুরুষ লক্ষণের আভাস পেয়ে সিদ্ধার্থের সম্যক সম্বুদ্ধত্ব লাভ অথবা গৃহবাসী হবার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। পক্ষান্তরে মহাযতি কালদেবল এবং কৌ-ঞ্ঞ নামক ব্রাহ্মণ বলেছিলেন “এ শিশু নিশ্চয়ই বুদ্ধ হবেন।” বুদ্ধত্ব লাভান্তে তথাগত যখন বিদেহ প্রদেশে ধর্মপ্রচারে রত ছিলেন তখন মিথিলা নিবাসী ব্রহ্মায়ু নামীয় ব্রাহ্মণ প-িত ও তদীয় শিষ্য উত্তর মানবক বুদ্ধের বত্রিশ মহাপুরুষ লক্ষণ অনুসন্ধান করে দেখেছিলেন এবং পরে বুদ্ধের প্রতি প্রসন্নচিত্ত হয়েছিলেন, যা ইতিহাস স্বীকৃত। তথাগত বুদ্ধ গৌতমও ভিক্ষুদেরকে জেতবনের অনাথপিন্ডিক শ্রেষ্ঠী নির্মিত বিহারে অবস্থানকালীন সময়ে স্বীয় বত্রিশ মহাপুরুষ লক্ষণ সম্বন্ধে ব্যক্ত করেছিলেন।
এবার বুদ্ধের বত্রিশ মহাপুরুষ লক্ষণ ও এর উৎপত্তির কারণসমূহ নিম্নে ক্রমানুসারে বর্ণিত করা গেল-
১। #সুপ্পতিট্ঠিতপাদো- সুপ্রতিষ্ঠিত পদ বা সমতল বিশিষ্ট পদতল। তিনি সমভাবে ভূমিতে পদক্ষেপ করেন, সমভাবে পদ উত্তোলন করেন, সমভাবে সম্পূর্ণ পদতলের দ্বারা ভূমি স্পর্শ করেন।
বুদ্ধগণ বোধিসত্ত্বাবস্থায় কায়িক-বাচনিক ও মানসিক সৎকর্ম সম্পাদন করেন, তাঁরা দান দেন, শীল (সচ্চরিত্রতা) রক্ষা করেন। আদিগুরু মাতা-পিতা ও শ্রমণ-ব্রাহ্মণগণের প্রতি সম্মান-শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন তথা বহুবিধ কুশলকর্ম সম্পাদন করেছিলেন। তাঁরা সত্য, ধর্ম, দম, সংযম, পরিচ্ছন্ন, শীল, উপোসথ, দান সম্পাদন, অহিংসা অনুশীলন, বলপ্রয়োগে বিরত, দৃঢ় সংকল্পের সাথে সমতার আচরণ করেছিলেন। আর তজ্জন্য অন্তিম জন্মে তাঁরা সুপ্রতিষ্ঠিত পাদ হয়ে সমভাবে মাটিতে পদক্ষেপ, সমভাবে উত্তোলন ও সমভাবে সম্পূর্ণ পদতল দ্বারা ভূমি স্পর্শ করতে পারেন, এটি তথাগতের প্রথম মহাপুরুষ লক্ষণ।
২। #পাদতলেসু চক্কানি- দুই পদতলে দুটি চক্র। চক্রদুইটি সহস্র অর (চাকার নাভি ও নেমির সংযোগ শলাকা কাঠ), নেমি(পরিধি, চাকার বেড়) ও নাভিযুক্ত, এবং পদতল সর্ব্বাকার-পরিপূর্ণ সুবিভক্ত।
বুদ্ধগণ বোধিসত্ত্বাবস্থায় জীবগণের সুখবিধান করেন তাদের ভয়, সন্ত্রাস, চিন্তা, যথাসম্ভব দূরীভূত করেন। আশ্রয়হীনকে আশ্রয়, অন্নহীনকে অন্ন(ক্ষুধার্তকে আহার), ভয়ার্তকে ভয় হতে মুক্তি, জীবদেরকে ধর্মানুযায়ী রক্ষার ব্যবস্থা, যান, প্রদীপ, পুষ্পমালা, প্রদীপ, সুগন্ধ, আবাস, সাধ্যমত সর্ব প্রয়োজনীয় বস্তু প্রদান পূর্বক প্রাণীর স্বস্তি বিধান করেন। আর সে কারণেই তাঁরা অন্তিম জন্মে স্বীয় পদতলে সহস্র অর, নেমি, নাভিযুক্ত, সর্বাকারে পরিপূর্ণ সুবিভক্ত চক্র সমন্বিত হন। এটি তথাগতগণের দ্বিতীয় মহাপুরুষ লক্ষণ।
৩। #আযতপণ্হি - চোখের পাতার লম্বা লম্বা লোম।
৪। #দীঘঙ্গুলি- হাত ও পায়ের আঙুল সমূহ সাধারণ অপেক্ষা দীর্ঘ।
৫। #ব্রহ্মজ্জুগত্তো- ব্রহ্মার ন্যায় দিব্য ঋজুতা সম্পন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ।
(আযতপণ্হি=)তথাগতগণ বেধিসত্ত্বকালে জীবের সুখ বিধান করেন, প্রাণী হত্যা হতে বিরত থাকেন, অস্ত্র-শস্ত্র হাতে নেন না। পাপে ঘৃণা ও ভয় করেন। (ব্রহ্মজ্জুগত্তো+দীঘঙ্গুলি=) প্রাণীকে আঘাত করেন না হেতু সমস্ত প্রাণীর প্রতি দয়াবান থাকেন, ফলতঃ তাঁরা পরিপূর্ণ পায়ের পরিপূর্ণ গোড়ালি, সাধারণ অপেক্ষা দীর্ঘাঙ্গুলি ও দিব্য ঋজুতা, সরল, সোজা সম্পন্ন দেহের অধিকারী হন।
৬। #সত্তুস্সদো- সপ্তস্থানে উন্নত। উভয় হাত, উভয় পায়ে, উভয় কাঁধে এবং ধড়/মধ্য শরীরে স্ফীততা পরিলক্ষিত হয়।
ভগবান বুদ্ধ পূর্ব পূর্ব জন্মে জনগণকে সুমিষ্ট খাদ্য, ভোজ্য, লেহ্য, পানীয় দান করেছিলেন। তদ্বেতু তাঁর দুই হস্তপৃষ্ট, দুই পদপৃষ্ট, দুই স্কন্ধ ও গ্রীবা হয়েছিল মাংসল।
৭। #মৃদুতলুুহত্থপাদো- হস্ত-পদতল মৃদু কোমল।
৮। জালহত্থপাদো- হাত ও পায়ের তালুতে রেখা চিহ্নের দ্বারা জাল অঙ্কিত; এবং ব্রহ্মায়ু সূত্র-মধ্যম নিকায় দ্বিতীয় ভাগ অনুসারে আঙুলগুলো সমপ্রমাণ।
তথাগতগণ অতীত জন্মে দান করেন, প্রিয় ও সুভাষিত বাক্য বলেন, অর্থচর্যা (পরের মঙ্গল সাধন) ও সমানাত্মাতারূপ (নিরপেক্ষমনা) চতুর্বিধ বিষয় দ্বারা মানুষের হিত সাধন করেন এবং ফলতঃ তাঁদের সপ্তম ও অষ্টম লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়।
৯। #উসস্ঙ্খপাদো - পায়ের গোড়ালি নরম ও পুরোপুরি বৃত্তাকার নয় বরং ডিম্বাকৃতি।
১০। #উদ্ধলোমো- অঞ্জন (এখানে নীলাঞ্জন হবে, সম্ভবত অঞ্জন নামক এক ধরণের বৃক্ষে নীল রঙের ফুল ফোটে সেই অঞ্জনের রঙের কথাই বলা হয়েছে।) ফুলের মতন নীল ও দক্ষিণমুখী কু-লিত লোম সমূহের অগ্রভাগ ঊর্দ্ধমুখী।
তথাগতগণ বোধিসত্ত্বাবস্থায় মানবগণের অর্থবহ, ধর্মযুক্ত, হিতকর কল্যাণমূলক উপদেশের মাধ্যমে অনেকের বিবিধ মঙ্গল সাধন করেন; সে কারণে শেষ জন্মে গমনকালে সম্মুখ ও পশ্চাৎ হতে পদতল দৃষ্ট হত। সাধারণ মানব হতে ভিন্নতর হয়ে দেহের লোমসমূহ হয়েছিল ঊর্দ্ধমুখী। পাদগ্রন্থি সমূহ ছিল সুব্যবস্থিত, তদুপরি মাংস ও রক্তসহ বিস্তৃত ত্বক শোভিত হয়েছিল।
১১। #এণিজঙ্ঘো- জঙ্ঘা এণীর (কৃষ্ণসার হরিণের ন্যায় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যুক্ত) ন্যায় মাংসল।
বুদ্ধ অতীত অতীত জন্মে শিক্ষাকামী, শিক্ষানুরাগী, শিক্ষাদাতা ছিলেন; কিভাবে শিক্ষার বিষয় শ্রীঘ্র জানতে পারা যায়, শ্রীঘ্র শিক্ষা করতে পারা যায়, শ্রীঘ্র শিক্ষার অনুমান হয়, দীর্ঘকাল কষ্টভোগ করতে না হয় এ চিন্তা করে সযত্নে শিল্প, বিদ্যা, আচরণ এবং কর্ম শিক্ষাপূর্বক লোকদের শিক্ষা দিয়ে তা সঞ্চয়, বাহুল্য ও প্রবৃদ্ধি করেছিলেন। তাই তাঁর জঙ্ঘা এণী মৃগের মত মাংসল ও প্রত্যেক লোমকূপ হতে একটি মাত্র লোম উদ্গত হয়েছিল।
১২। #সুখুমচ্ছবি- অতিশয় মসৃণ ও স্নিগ্ধ ত্বক।
তথাগত পূর্বজন্মে, পূর্বভবে, পূর্ব নিবাসে শ্রমণ-ব্রাহ্মণগণের নিকট উপনীত হয়ে বিভিন্নভাবে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতেন। যেমন- ভন্তে, কুশল কি? অকুশল কি? নিন্দনীয় ও অনিন্দনীয় কি? সেবিতব্য ও অসেবিতব্য কি? কোন কোন কর্ম করলে অহিত সাধন ও দুঃখ ভোগ করতে হয়? কোন কাজ করলে হিত সাধন হয় ও সুখলাভ করা যায়? এ সকল কারণে তিনি সুমসৃণ ত্বক সম্পন্ন হন, ত্বক অতি সুক্ষèতার দরূণ দেহে ধুলি ও মল লিপ্ত হতনা এরকম মহাপুরুষ লক্ষণে বিভূষিত হন।
১৩। #সুবণ্নবণ্নো- স্বর্ণবর্ণ ও কাঞ্চন সদৃশ ত্বক, এবং এই ত্বক এতই সূক্ষ্ম যে ধূলি ও মল উহাতে লিপ্ত হয় না।
বুদ্ধ অতীত জন্মে বোধিসত্ত্ব কালে ক্রোধহীন ও শান্তচিত্ত ছিলেন, বহু বাক্যের বিষয়ীভূত হলেও ক্ষোভ, কোপ, দ্বেষ, বিরোধের বশবর্তী হতেন না। কোপনতা, দ্বেষভাব ও শোক-দুঃখভাব প্রকাশ করতেন না। তিনি সুক্ষ্ম, সুচিক্কন ও মৃদু ক্ষৌম, ঔর্ণ (মেষলোম জাত) আস্তরণ ও আচ্ছাদন দান করতেন। তদ্বেতু তিনি সুবর্ণ বর্ণ ও কাঞ্চনের মতোন ত্বক সমন্বিত হন।
১৪। #কোসোহিত বত্থগুযেহা- উপস্থ বা জনেন্দ্রিয় বারণ বৃষভের ন্যায় চর্মাভ্যন্তরে লুকায়িত, কোষাচ্ছাদিত জননেন্দ্রিয়।
তথাগত অতীত অতীত জন্মে হারিয়ে যাওয়া, চির-প্রবাসী জ্ঞাতিমিত্র, সুহৃদ, বন্ধু তথা সখাগণকে পুনর্মিলিত করে দেন, মাতা-পিতা, পুত্র পরিজন, ভ্রাতা-ভগ্নি সকলকে সম্মিলন করে প্রত্যেকের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করেন। এহেন শুভ কর্মের দরুণ তার গুপ্তেন্দ্রিয় ছিল চর্ম-দ্বারা আচ্ছাদিত।
১৫। #নিগ্রোধ পরিমন্ডলো- বটবৃক্ষ সদৃশ দীর্ঘ-প্রস্থে আপাদমস্তক ও প্রসারিত বাহুর পরিমাণে সম শরীর।
১৬। #অননোমন্তো - অবনমিত শরীর, দাঁড়ানো অবস্থায়ই অবনত না হয়ে উভয় হস্ততল দ্বারা হাঁটু স্পর্শ ও মর্দনে সক্ষম ।
তথাগত অতীত জন্মে জনগণের মঙ্গলকারী, কল্যাণকামী হয়ে তুলনা ও বিচার বিবেচনার মাধ্যমে নির্দিষ্ট করতেন এই ব্যক্তি এই কাজের যোগ্য; তিনি মানুষের সাম্য-বৈষম্য বুঝতেন, মানবের আচরণ গতি প্রকৃতি অবধারণ করতেন। তদ্বেতু তিনি অনেকের সন্তোষ সাধন করতে পারতেন। এবম্বিধ কুশল কর্মের ফলে তিনি ন্যগ্রোধ বা বটবৃক্ষের মত অঙ্গসৌষ্ঠব সম্পন্ন হন এবং দাঁড়ানো অবস্থায়ই অবনত না হয়ে দু’ হাতেই স্বীয় হাঁটু বা জানুদেশ স্পর্শ ও মর্দন করতে পারতেন।
১৭। #সীহপুব্বদ্ধকায়ো - সিংহের সম্মুখাংশ অঙ্গের ন্যায় পরিপূর্ণ শরীর।
১৮। #চিতন্তরংসো- পৃষ্ঠদেশ অবিভক্ত বা মাংসপটলে পরিপূর্ণ উন্নত বক্ষ।
১৯। #সমবত্তখন্ধো- সমগোলাকার গ্রীবা।
ভগবান বুদ্ধ অতীত অতীত জন্মে বহু লোকের অর্থাকাঙ্ক্ষী, হিতকামী, সুখাকাঙ্ক্ষী ও নিরাপত্তাকামী ছিলেন এবং কিভাবে সকলের শ্রদ্ধা, শীল বা চরিত্র, শ্রুত জ্ঞান সমৃদ্ধি হয়, ত্যাগ, ধর্ম-প্রজ্ঞা-ধনধান্য, ক্ষেত্র সম্পত্তি, দ্বিপদ-চতুষ্পদ-পুত্র-স্ত্রী, দাস কর্মকার, জ্ঞাতিমিত্র-বন্ধুবান্ধব ইত্যাদি কল্যাণকর বিষয় বৃদ্ধি পায় তা চিন্তা করতেন এবং তজ্জন্য সচেষ্ট থাকতেন। ফলতঃ তিনি সিংহ পূর্ব্বার্দ্ধ কায়, উন্নত বক্ষ এবং সমবর্ত্ত স্কন্ধ সম্পন্ন হয়েছিলেন।
২০। #রসগ্গসগ্গি- (রসনা) জিহ্বার শিরাস্নায়ুগুলো ঊর্দ্ধাগ্র হয়ে গ্রীবাদেশ হতে উৎপন্ন এবং সমভাবে বিক্ষিপ্ত।
বুদ্ধ বোধিসত্ত্বাবস্থায় হস্ত, প্রস্তর বা পাথর খন্ড, দন্ড বা অস্ত্র-শস্ত্র দ্বারা প্রাণীর প্রতি হিংসাচরণ করেন নি, তদ্বেতু তাঁর রস বাহিনী স্নায়ু ঊর্দ্ধাগ্র হয়ে গ্রীবাদেশে জাত এবং সমভাবে বিক্ষিপ্ত ও তাতেই তিনি সপ্তশত রস অনুভব করতেন।
২১। #অভিনীলনেত্তো- অতি বিশুদ্ধ নীলবর্ণ চক্ষু।
২২। #গোপখুমো- সদ্যজাত রক্তবর্ণ গো-বৎসের ন্যায় চক্ষু কোটর।
বুদ্ধ পূর্ব পূর্ব জন্মে কারো প্রতি বক্র, তিয্যক বা প্রচ্ছন্ন দৃষ্টি দিতেন না, তিনি সোজা ও অকপট দৃষ্টি সম্পন্ন ছিলেন, উদার, মৈত্রী চিত্তে প্রিয় চক্ষুর দ্বারা দর্শন বা দৃষ্টিপাত করতেন। তৎজন্য তিনি অন্তিম কালে সম্যক সম্বুদ্ধ হয়ে গাঢ়-নীল নেত্রধারী ও সদ্যজাত বাছুরের মত পরিপূর্ণ ও নয়নাভিরাম চক্ষু কোটর সম্পন্ন হয়েছিলেন।
২৩। #উণ্হীসসীসো- উষ্ণীষ (শিরোভূষণ, মস্তকাচ্ছাদক পরিধেয় বিশেষ, পাগড়ি) সদৃশ শির বা মাথা।
তথাগত অতীত অতীত জন্মে বিবিধ কুশল কর্ম যেমন দান, শীলাচরণ, মাতৃ-পিতৃ সেবা, উপোসথ পালন, শ্রমণ-ব্রাহ্মণদের প্রতি পূজার্ঘ প্রদান, কুল জ্যেষ্ঠদের প্রতি সম্মান প্রভৃতি বহুবিধ হিতকর কর্ম সম্পাদন করেছিলেন। তৎ প্রভাবে অন্তিম জন্মে তিনি উষ্ণীষ মস্তকধারী অর্থাৎ প্রকৃতিগত ভাবে তথাগতের মস্তক ভূষণ সম্বলিত হয়েছিলেন। তাঁর মস্তক ছিল জল বুদ্ বুদ্ সদৃশ গোলাকার।
২৪। #উণ্না- উর্ণালোম বা ভ্রু-মধ্যস্থ শ্বেত রোমাবর্ত।
২৫। #একেকলোমো- প্রত্যেক লোমকূপে এক এক খানা লোম।
করুণাসিন্ধু বুদ্ধ অতীত জন্মে মিথ্যা বাক্য বলতেন না। সত্যবাদী, সত্যাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও প্রত্যয়যোগ্য বাক্যভাষী ও অবিসংবাদী ছিলেন। তৎজন্য তিনি উপরোক্ত দুটি মহাপুরুষ লক্ষণ লাভ করেন।
২৬। #চত্তালীসদন্তো- দু’পাটিতে বিশটি বিশটি চল্লিশটি দাঁত।
২৭। #অবিবরদন্তো- অবিবর বা ছিদ্রহীন সুসজ্জিত দন্ত।
শাস্তা ভগবান বোধিসত্ত্বাবস্থায় পিশুন বা পরস্পরের প্রতি বিচ্ছেদ সৃজনকারী বাক্য ত্যাগ পূর্বক জীবন যাপন করতেন। এক স্থানে গিয়ে সেখানে শ্রুত আলাপ আলোচনা অন্য স্থানে ভেদ উৎপাদনের নিমিত্তে প্রকাশ করতেন না। যারা কলহলিপ্ত, মতানৈক্যে মগ্ন তাদের মধ্যে মৈত্রীতা বৃদ্ধিতে সচেষ্ট থাকতেন। তজ্জন্য উপরোক্ত দুই মহাপুরুষ লক্ষণে তিনি বিভূষিত হন।
২৮। #পহুতজিব্হো- মৃদু, দীর্ঘ ও বিস্তৃত ত্রি-লক্ষণ সম্পন্ন জিহ্বা।
২৯। #ব্রহ্মস্সরো- মহাব্রহ্মার কণ্ঠস্বর সদৃশ বিশুদ্ধ সুমধুর স্বর।
তথাগত পূর্ব জন্মে কর্কশ বাক্য না বলে সুমধুর, শ্রুতি মধুর, নমনীয়, হৃদয়গ্রাহী, বিনীত, বহুলোকের প্রীতি-আনন্দ উৎপাদক ও মনোজ্ঞ বাক্য ভাষণ করতেন। ফলতঃ তিনি উপরোক্ত লক্ষণদ্বয় প্রাপ্ত হন।
৩০। #সীহহনু- সিংহের নিন্মস্থ হনু বা চোয়াল সদৃশ পরিপূর্ণ হনু (চোয়াল, চিবুক)।
ভগবান পূর্ব পূর্ব জন্মে কালবাদী, ভুুতবাদী, ধর্মবাদী, বিনয়বাদী হয়ে যথাকালে যুক্তিপূর্ণ, অর্থবহ, সুবিভক্ত, সুবোধ্য ও মূল্যবান বাক্য বলতেন। এ হেতুতে তাঁর চিবুক ছিল সিংহের চিবুকের মত।
৩১। #সমদন্তো- এক সমান দন্ত।
৩২। #সুসুক্কদাঠো- শুক তারার জ্যোতিঃ হতেও অত্যধিক সমুজ্জ্বল শুভ্র দন্ত।
ভগবান তথাগত অতীত অতীত জন্মে পঞ্চবাণিজ্য যথা- মাংস, প্রাণী, অস্ত্র, বিষ ও মাদক বাণিজ্য তথা মিথ্যা বাণিজ্য পরিত্যাগপূর্বক সম্যক জীবিকায় জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি তুলা (ভারের পরিমাণ), কংস (মুদ্রা বিশেষ) ও মান (ওজন) সমন্বিত প্রবঞ্চনা, উৎকোচ বা ঘুষ গ্রহণ, শঠতা, ছেদনবধ-বন্ধন, দস্যুতা, লুন্ঠন ও আক্রমণ ইত্যাদি হতে বিরত ছিলেন। তদ্বেতু তিনি উপরোক্ত দুটি মহাপুরুষ লক্ষণ প্রাপ্ত হন।
বত্রিশ মহাপুরুষ লক্ষণ উদ্ভূতের কারণ সমূহের মত সৎকর্মাদি সম্পাদনের প্রেক্ষাপটে তিনি সুগতিতে গমন করতেন এবং তথায় দিব্য আয়ু, বর্ণ, সুখ, যশ, আধিপত্য, রূপ, শব্দ, গন্ধ, রস ও স্পর্শ এই দশবিধ বিষয়ে অন্যান্য জন হতে শ্রেষ্ঠ হয়ে অবস্থান করতেন। বুদ্ধের অপরিসীম গুণাপনা তথা মহাপুরুষত্ব কারো আরোপিত নয় বরং তিনি তা স্বকীয় কার্যের ফলশ্রুতিতে অর্জন করেছেন।
#আকর উৎস:
০১। দীর্ঘ নিকায় (তৃৃতীয় খন্ড)। অনুবাদক, ভিক্ষু শীলভদ্র। কলিকাতা: মহাবোধি সোসাইটি, ১৯৫৪।
০২। সম্পাদক, শৈলেন্দ্র বিশ্বাস, ড. শশীভূষণ দাশগুপ্ত ও দীনেশচন্দ্র ভট্টাচার্য। সংসদ বাংলা
অভিধান। কলিকাতা: সাহিত্য সংসদ, ১৯৯৪।
০৩। সম্পাদক, ড. মুহাম্মদ এনামুল হক, শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী ও স্বরোচিষ সরকার। ব্যবহারিক বাংলা অভিধান। ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ২০১২।
০৪। ললিত বিস্তর(ভগবান বুদ্ধের জীবনী)। অনুবাদক, জয়দেব গঙ্গোপধ্যায় শাস্ত্রী। কলিকাতা: সংস্কৃত পুস্তক ভান্ডার, ১৯৯৯।
০৫। মধ্যম নিকায় (২য় ভাগ)। অনুবাদক, মহাস্থবির, ধর্মাধার । রেঙ্গুন: শ্রী ত্রিপিটক প্রকাশনী প্রেস, ১৯৫৯।
০৬। মহাথের, জ্যোতিঃপাল। রবীন্দ্র সাহিত্য বৌদ্ধ সংস্কৃতি ।
০৭। মহাস্থবির, শান্তরক্ষিত। পালি-বাংলা অভিধান (প্রথম খন্ড)। ঢাকা: বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট, ২০০১
০৮। ভিক্ষু, ড. জিনবোধি । বৌদ্ধ দর্শনে প্রজ্ঞাতত্ত্ব ও বিমুক্তি মার্গ।
০৯। বড়ুয়া মানু, অধ্যাপক অভিজিৎ, সম্পাদক। বোধি। চট্টগ্রাম: পূর্বা প্রেস, ২০০২ ।
১০। সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান, সম্পাদক-আহ্মদ শরীফ।
১১। ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। বুদ্ধদেব। চট্টগ্রাম: প্রজ্ঞা প্রিন্টার্স, ২০০৫।
১২। দশ পারমী ও চরিয়া পিটক (সানুবাদ)। সম্পাদক, ডাঃ সিতাংশু বিকাশ বড়ুয়া, চট্টগ্রাম: মিন্টো প্রেস।
১৩।Dhammananda, K Sri. Buddhism in the Eyes of Inteletuals, Kualalampur: Buddhist Missionary Society.
14. https://suttacentral.net/pi/dn30
15. https://suttacentral.net/en/dn30
16. Dīgha Nikāya: The Long Discourses of the Buddha. Trans. Walshe, Maurice. Boston: Wisdom Publication, 1995.
17. Aṅguttara Nikāya: The Numerical Discourses of the Buddha. Trans. Bhikkhu Bodhi. Boston: Wisdom Publications, 2012.
18. Saṃyutta Nikāya: The Connected Discourses of the Buddha. Trans. Bhikku Bodhi. Boston: Wisdom Publications, 2000.
19. http://www.onmarkproductions.com/Signs-of-Buddha-32-80.htm