26/03/2026
https://www.facebook.com/share/p/14YH4KnnGSD/
আচার্য্য-সান্নিধ্যে/১৯৮
১৯শে মাঘ, ১৪৩১, রবিবার(ইং ০২-০২-২০২৫)
বেলা বারটার দিকে ফিলানথ্রপি-সমুখস্থ মণ্ডপে আচার্য্যদেব গুপ্তিপুরের মন্দির নির্মাণ-সংক্রান্ত ব্যাপারে সেখান থেকে আগত কয়েকজন দাদাদের প্রতি বলছেন—দুটো কর্ম্মীর মধ্যে মত-পার্থক্য হতেই পারে, এক-একজনের এক-একরকম প্রকাশ থাকে। সবার ক্ষেত্রেই হতে পারে। দুটো মানুষ সহজে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এরকম না। কোন কার্যক্রমে বা প্রেক্ষিতে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন যখন হয়ে যায়, তখন যতই আমরা দেবতার প্রতিষ্ঠা করতে যাই, দেবতা কিন্তু আমার সাথে থাকেন না। তখন ঐ অহংকার play করে। কারো সাথে বিবাদ রেখে যদি মন্দিরে যাও, দেবতার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠবে, ঠাকুরের বাণীতেই আছে। তাঁর গাম্ভীর্য্যতার কারণ কি? আমরা কি কখনও ভেবে দেখেছি? আসলে আমরা বুঝতেই পারিনি যে আমার অহংকার আমাকে নাচাচ্ছে। বিবাদ-বিসম্বাদ তখনই তৈরী হয় যখন অহংকারটা তীব্র হয়। দুপক্ষেরই তাদের মত অহংকার তৈরী হয়ে যায়। একদল বলে আমরা বেশী সঙ্গ করেছি, বেশী বুঝি, ওরা কম সঙ্গ করেছে, ওরা কম বোঝে। এটার কোনটাই healthy না। ওরা আর আমরা গল্প রচনা করতে গেলে আর একটা জিনিস আছে, হয়তো উভয়পক্ষের কিছু-কিছু ফাঁক আছে, ধরা যায়, কাউকে হয়তো বাবা(শ্রীশ্রীদাদা)বললেন, এখানে একটা জমি পাওয়া যায় না? তারা হয়তো এটা প্রচার করল---, আবার এক মা কিছুটা দূরে জমি দিতে চান। এখন কোনটা ন্যায় কোনটা অন্যায়, সেটার মধ্যে গভীর তত্ত্ব এসে যাবে। ভাল করে বুঝতে হবে বিষয়টা। এটা বিচক্ষণতার গল্প হচ্ছে। ধরা যাক্, দুটো কেন্দ্র-মন্দিরই রচনা হল, দুটো অহংকারের মন্দির রচনা হল, দেবতার নামে অহংকারের মন্দির রচনা হল। এটা আমাদের অহংকারের project, ওটা ওদের অহংকারের project, একটা অহংকার বলল যে আমি তো আমার গুরুজনের নির্দেশ মেনেই এটা করেছি, ‘গুরুজনের নির্দেশ’ এটাতেও এটা অহংকারের বিষয় এসে যাচ্ছে। উভয়পক্ষেই একই কথা বলছে, ‘গুরুর নির্দেশ পালন করছি’, আর সেইজন্যেই এটা করা উচিত। আমি পালন করছি মানে তুমি পালন করছ না। এই গল্পটা প্রচ্ছন্নভাবে এসেই যায়। আবার এটাও এসে যাবে যে, আমরা ওখানেই ভাল আছি, ওদের সাথে থাকলে ওদের এত বড় কাজ, আমাদের বাড়তে দেবে না। এটাও অহংকার। উভয়পক্ষেরই একটা সমস্যা দাঁড়াবে। এখন, আধা কিলোমিটারের মধ্যে দুখানা কেন্দ্র তৈরী হবে যদি এই সমস্যাগুলো আসে। ভবিষ্যৎ-প্রজন্ম কি করবে? যদি এই দুটো কেন্দ্র চলতে হয়, minimum একটা খরচ আছে। ওখানের গুরুভাইরা মধ্যবিত্ত মানের, সবাই চাষবাস করে থাকেন, সবাই খুব সাধারণ মানের, মানে কোটি-কোটি টাকা উড়ছে, কাজ করছে, বিশাল কিছু আছে, এরকম না। অর্থনৈতিক অবস্থা সাধারণ। চাষবাস না করলে আয়-উপার্জন নাই। সেখানে দুটো কেন্দ্র-মন্দির চালানো সমস্যা। যদি বা মন্দির করে নিলাম যোগাড়যন্ত্র করে, কিন্তু পরে তা maintain হবে কি করে!
তাহলে দুটো অহংকারের মন্দির হবে, নচেৎ একটা এমন জায়গা নির্বাচন করতে হয় যে জায়গা নির্বাচন করলে সবাই মিলে একসাথে আমরা করতে পারি। একটা হচ্ছে ঠাকুর-প্রতিষ্ঠা, আর একটা হচ্ছে ‘তোমার সাথে থাকা যায় না’-এর প্রতিষ্ঠা। এখন কোনটা প্রতিষ্ঠা হবে এই দুটোর মধ্যে? হয়, ঠাকুর-প্রতিষ্ঠা করব, না হয় ‘তোমার সাথে থাকা যায় না’-এর প্রতিষ্ঠা করব। এই দুটোর মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। যদি ঠাকুর-প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাহলে সবাই একসাথে বসে ধার্য্য করতে হয়, কারো কারো কিছু বক্তব্য আছে, কোন জমি এমন জায়গায় আছে, যেটা আর বৃদ্ধি করা যাবে না। বড় রাস্তার উপরে না-থাকার দরুণ গ্রামের মধ্যে ঢুকতে হবে, এটা একটা সমস্যা। এবং যদি এক জায়গায় করা ধার্য্য হয়, তাহলে যিনি জমি দেবেন, তার সন্তানাদি যারা আছে, তাদের সাথে কথা বলতে হবে।
আচার্য্যদেব কয়েকটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত করলেন, যেখানে জমি দিতে চাইলে তিনি পরামর্শ দেন, ঐ জমি বিক্রি করে নিকটবর্ত্তী যেখানে মন্দির নির্মিত হচ্ছে তার পাশের জমি কিনে দিতে। তাতে ইষ্টপ্রতিষ্ঠার সহায়ক হবে।
সবকিছু সবিস্তার জানিয়ে তিনি আরও বলছেন, আমি যা বলছি, একদম যুক্তি আর বুদ্ধি দিয়ে। তাছাড়া এখানে খামখা লড়াই করা যায়। কেন না, দুদিন বাদে আমরা থাকব না পৃথিবীতে, তাই সবাই মিলে একসাথে বসতে হয়, যাদের সাথে বসা যায়নি, সে জায়গাটা ঠিক করে কি করে এক প্লাটফর্মে আনা যায়। আমাদের মধ্যে যাই হোক্, ঠাকুর নিয়েই থাকতে হবে।
দাদারা তাঁর ইচ্ছার প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করে বললেন, আজ্ঞে আমরা ঠাকুর নিয়েই থাকব।
আচার্য্যদেব—জগতে যত কিছু দেখা যায় সবকিছু অন্যের আলোতে। অন্যের উদ্ভাসে আমার কাছে সবকিছু দৃশ্যমান হয়। কিন্তু সূর্য্যকে দেখতে হলে সূর্য্যের আলোই লাগে। সেইরকম তোমাকে বুঝতে গেলে তোমার আলোতেই তোমাকে বুঝতে হবে। নচেৎ আমি হাজার ঠাকুরের কথা বললেও তাঁর সম্পর্কে কী বলব! কোন্ কথা তাঁকে স্পর্শ করবে! আমি যা প্রয়াস করি, একদম ব্রহ্মজ্ঞানী হয়ে গেলাম, -- তাও তোমাকে বোঝা যাবে না। তেপান্তরের মাঠে দিগন্তে এগোলে যা দশা হয়, দিগন্ত ক্রমশঃ এগোতে থাকে, লোকে বলবে ‘সে আর লালন একখানে রয়’, কিন্তু লালন জানে ‘লক্ষ যোজন ফাঁক’। তুমি পিছিয়ে পড়েছ বলে বলছ সে আর লালন একখানে রয়। তোমার বোকার চোখ, তুমি তো এগোওনি! পিছিয়ে আছ, তুমি যদি আমার সহবর্ত্তী হতে তাহলে দেখতে যে ওখানে আর একটা দিগন্ত আছে। ঠাকুর অত সহজ না! ‘দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ওপারে/আমার সুরগুলি পায় চরণ, আমি পাইনে তোমারে’। আমার প্রয়াসটা তোমাকে স্পর্শ করতে পারে, কিন্তু আমি তোমাকে পেতে পারি না। আমি যেটুকু বুঝি আমার ঠাকুরবোধে তা এই। সংকলক—সুভাষ মুসিব।