26/03/2023
দুনিয়া ক্ষনস্থায়ী, তাই এখানকার সুখ-দুঃখও ক্ষনস্থায়ী। আখেরাত স্থায়ী, তাই ওখানকার সুখ-দুঃখও স্থায়ী। সেজন্য আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় বান্দাদের দুনিয়াতে তাদের ভুল-ত্রুটির শাস্তি দিয়ে আখেরাতের জন্য প্রস্তুত করেন। পক্ষান্তরে কাফেরদের দুনিয়াতে তাদের ভালো কাজের ফলস্বরূপ তাদের সুখসমৃদ্ধি দেন। আখিরাতে তাদের আর কোন অংশ থাকে না। এটা এজন্য যে, দুনিয়া আল্লাহর নিকট মূল্যহীন, তাই আল্লাহ দুনিয়াতে কাফেরদের অংশ দিয়ে দেন, আর আখেরাতকে শুধু মুমিনদের জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন।
সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ
" لَوْ كَانَتِ الدُّنْيَا تَعْدِلُ عِنْدَ اللَّهِ جَنَاحَ بَعُوضَةٍ مَا سَقَى كَافِرًا مِنْهَا شَرْبَةَ مَاءٍ " .
অর্থাৎ, আল্লাহ্ তা’আলার নিকট যদি এই পৃথিবীর মূল্য মশার একটি পাখার সমানো হত তাহলে তিনি কোন কাফিরকে এখানকার পানির এক ঢোকও পান করাতেন না।
[জামে' আত-তিরমিজি, হাদিস নং ২৩২০]
আল্লাহর কাছে এই দুনিয়ার জীবনের কোনো মূল্য নেই। এজন্য দেখা যায়, তাঁর প্রিয় বান্দাদের অনেকে না খেয়ে থাকে, বিপদ-আপদে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। অথচ অনেক পাপিষ্ঠ ও জালিম কোনো বাধা-বিপত্তি ছাড়াই প্রাচুর্যের মধ্যে জীবনযাপন করে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হয়, ‘হে আল্লাহর রাসুল! দুনিয়াতে সবচেয়ে বিপদগ্রস্ত কে?’ উত্তরে তিনি বলেন, ‘‘নবিগণ। অতঃপর যারা (বৈশিষ্ট্যে) তাঁদের নিকটবর্তী, অতঃপর যারা তাঁদের নিকটবর্তী। মানুষকে তার দ্বিন অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়। দ্বিনি অবস্থান পাকাপোক্ত হলে পরীক্ষা কঠিন হয়। দ্বিনি অবস্থান দুর্বল হলে পরীক্ষাও শিথিল হয়। বিপদ-আপদ ঈমানদার ব্যক্তিকে পাপশূন্য করে দেয়। একসময় সে দুনিয়াতে নিষ্পাপ অবস্থায় বিচরণ করতে থাকে।’’ [আলবানি, সহিহুল জামি’: ৯৯২; হাদিসটি সহিহ]
আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন, “যেদিন কাফিরদেরকে জাহান্নামের সামনে হাজির করা হবে (সেদিন তাদের বলা হবে), তোমরা তোমাদের দুনিয়ার জীবনেই যাবতীয় সুখ-সম্ভোগ নিঃশেষ করে ফেলেছো এবং সেগুলো উপভোগও করেছো। সুতরাং আজ তোমাদের দেওয়া হবে অপমানজনক শাস্তি; কারণ তোমরা জমিনে অন্যায়ভাবে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে এবং পাপাচার করতে।” [সুরা আহকাফ, আয়াত: ২০]
আল্লাহর কাছে দুনিয়ার মূল্য থাকলে তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকে সম্পদের পাহাড় দিতেন, প্রাচুর্যে ডুবিয়ে রাখতেন এবং সকল কষ্ট ও দুঃখ-বেদনা থেকে মুক্ত রাখতেন। কিন্তু আল্লাহ এমনটি করেন না। বরং তাদের প্রতিদান রেখে দেন আখিরাতের জন্য। সুতরাং, ঈমানদার ব্যক্তিদের হতাশ হওয়া উচিত নয়।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, ‘‘সুতরাং, ধৈর্য ধারণ করো। শুভ পরিণাম আল্লাহভীরুদের জন্যই।’’ [সুরা হুদ: আয়াত ৪৯]
উমার (রা.) বলেন, একবার আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাড়িতে প্রবেশ করি। তখন তিনি চাটাইয়ের উপর শুয়ে ছিলেন। তাঁর দেহ ও চাটাইয়ের মাঝখানে কোনো বিছানা ছিলো না। তাঁর শরীরে চাটাইয়ের স্পষ্ট দাগ পড়ে গিয়েছিলো। তাঁর পার্শ্বে ছিলো খেজুর গাছের চোকার বালিশ। তা দেখে উমার (রা.) কেঁদে ফেলেন। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করেন, ‘‘হে উমার! হঠাৎ কেঁদে উঠলে কেনো?’’ উমার (রা.) বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! পারস্য ও রোমের সম্রাট কত সুখ-বিলাসে বাস করছে। আর আপনি আল্লাহর রাসুল হয়েও এ অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন? আপনি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করুন, যেন তিনি আপনার উম্মতকে পার্থিব সুখ-সম্পদে সমৃদ্ধ করেন। পারস্য ও রোমের অধিবাসীদের আল্লাহ দুনিয়ার সুখ-সামগ্রী দান করেছেন, অথচ তারা তাঁর ইবাদত করে না!’ এ কথা শুনে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেলান ছেড়ে ওঠে বসলেন এবং বললেন, ‘‘হে উমার! এই ব্যাপারে তুমি এমন কথা বলছো? ওরা হলো এমন জাতি, যাদের সুখ-সম্পদকে এ জগতেই দ্রুত দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তুমি কি চাও না যে, ওদের সুখ ইহকালে আর আমাদের সুখ পরকালে হোক?’’ [বুখারি, আস-সহিহ: ৫১৯১; মুসলিম, আস-সহিহ: ৩৭৬৮]
এই হাদিসটি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিরাট পরিবর্তন এনে দিতে পারে। দুনিয়া নামক মরীচিকার পেছনে ছুটতে থাকা ব্যক্তিদের থমকে দিতে পারে। কিন্তু আমরা তো ইতোমধ্যে দুনিয়াতে মজে গিয়েছি। তাই, জীবন নিয়ে ভাববার মতো সময়টুকু আমাদের হয়ে ওঠে না।
কাফিররা এত সুখে আছে, মুসলিমরা কত কষ্টে জীবনযাপন করছে, এই দুঃখে যারা অস্থির, তাদের জন্য উপরের হাদিসটিতে উত্তর আছে। আমরা আখিরাতে বিশ্বাসী মুমিন। আমরা আল্লাহর অপরূপ সৃষ্টি জান্নাতে গিয়ে পরিপূর্ণ আনন্দ উদযাপন করবো ইনশাআল্লাহ্। দুনিয়াতে কাফেরদের চাকচিক্যে আমরা বিভ্রান্ত হবো না। আল্লাহ্ বলেন, ‘‘দেশে দেশে কাফেরদের চাল-চলন যেনো তোমাদের ধোঁকায় না ফেলে!’’ [সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯৬]
এক হাদিসে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘‘মুমিনের ব্যাপারটি বেশ আশ্চর্যজনক! কেননা, তার সকল কাজই কল্যাণময়। যদি সে কোনো মুসিবতে নিপতিত হয়, তাহলে ধৈর্যধারণ করে, যা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি কোনো নিয়ামতপ্রাপ্ত হয়, তাহলে (আল্লাহর) প্রশংসাসহ কৃতজ্ঞতা আদায় করে, এটিও তার জন্য কল্যাণকর হয়।’’ [মুসলিম, আস-সহিহ: ২৯৯৯]
আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন, “যেদিন কাফিরদের জাহান্নামের সামনে হাজির করা হবে (সেদিন তাদের বলা হবে), তোমরা তোমাদের দুনিয়ার জীবনেই যাবতীয় সুখ-সম্ভোগ নিঃশেষ করে ফেলেছো এবং সেগুলো উপভোগও করেছো। সুতরাং আজ তোমাদের দেওয়া হবে অপমানজনক শাস্তি; কারণ তোমরা জমিনে অন্যায়ভাবে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে এবং পাপাচার করতে।” [সুরা আহকাফ, আয়াত: ২০]
‘‘সুতরাং ধৈর্য ধারণ করো। শুভ পরিণাম মুত্তাকিদের জন্যই।’’ [সুরা হুদ: আয়াত ৪৯]