03/05/2026
উগ্রবীর গণ্ডভেরুণ্ড-নৃসিংহদেব
কর্তৃক শিবের শরভাবতার নাশ !!
ভগবান নৃসিংহদেবের শ্রেষ্ঠত্ব শ্রুতি, স্মৃতি, তন্ত্র সর্বত্রেই বর্ণিত। শ্রীনৃসিংহদেব হলেন পরমব্রহ্মে শ্রীকৃষ্ণের পূর্ণাবতার। নৃসিংহতাপনী উপনিষদ ও বিভিন্ন মহাপুরাণ ও উপপুরাণে তাকে অপরাজেয়, অবিনশ্বর ঈশ্বর বলে সম্বোধন করা হয়েছে। আর অন্যদিকে শিব গরুড়পুরাণে ভগবান নৃসিংহদেবকে বলেন, আপনি সহস্ররুদ্রের (সহস্র শিব) ন্যায় তেজস্বী।অথাৎ এক পরমেশ্বর বিষ্ণুরূপী নৃসিংহদেব সহস্র শিবের শক্তি প্রদর্শন করেন।
'সহস্ররুদ্রতেজস্ক সহস্রব্রহ্মসংস্তুত।
[গরুড়পুরাণ, পূর্ব্বখণ্ড, ২৩৬/১৮]
অনুবাদ:হে ভগবান! আপনি সহস্ররুদ্রের ন্যায় তেজস্বী, সহস্র ব্রহ্মা আপনার স্তুতি করেন।
তাহলে শিবপুরাণ ও লিঙ্গপুরাণ নামক তমোগুণময়ী পুরাণে ভগবান নৃসিংহদেবের পরাজয় নিয়ে যে কথা আছে, তা কিভাবে সত্য হতে পারে? উত্তর - কখনো সত্য হতে পারে না, এবং স্বয়ং শিবও তা পদ্মপুরাণে মাতা পার্বতীর নিকট ব্যক্ত করেছেন। বৈষ্ণবশ্রেষ্ঠ শিবজী মহারাজ কেন ভগবান শ্রীহরির নৃসিংহ অবতার নিয়ে এরূপ মোহনবাক্য প্রয়োগ করেছেন তা এ পোস্টের শেষাংশে বর্ণিত হয়েছে। প্রথমে চলুন আমরা প্রামাণ্য শাস্ত্রসমূহ হতে জেনে নি, বাস্তবে কি ঘটেছিলো-
শ্রীমদ্ভাগবতের সপ্তম স্কন্ধের বর্ণনা অনুযায়ী, হিরণ্যকশিপুকে হত্যার সময় নৃসিংহদেব যে ক্রোধ প্রকাশ করেছিলেন, হিরণ্যকশিপুকে হত্যার পরও সে ক্রোধ কমে নি। তখন ব্রহ্মা,শিব ইত্যাদি দেবগণের নির্দেশে প্রহ্লাদ মহারাজ নৃসিংহদেবের ক্রোধ দমন করেন।কিন্তু শ্রীব্রহ্মান্ড মহাপুরাণে অন্য এক মন্বন্তরের একটি কাহিনী বর্ণিত আছে, যেখানে হিরণ্যকশিপুকে বধের পর ভগবান নৃসিংহদেবের ক্রোধ কিছুতেই শান্ত হচ্ছিল না। তখন ব্রহ্মাদি দেবতারা ভয় ভীত হয়ে বৈষ্ণবশিরোমণি শিবের নিকট গিয়ে নৃসিংহদেবের ক্রোধ নিবারণের ব্যবস্থা করতে বলেন। তখন শিবজী মহারাজ নিজের দেহ সম্ভূত এক অতিকায় জীবের সৃজন করলেন, যা 'শরভ' নামে পরিচিত। শিবের এ শরভাবতার নৃসিংহদেবের সাথে যুদ্ধ করতে আসলে শ্রীনৃসিংহদেব তা দেখে পূর্বাপেক্ষা অধিক ক্রোধান্বিত হয়ে উঠেন এবং তিনি শরভের চেয়েও ভয়ংকর রূপ ধারণ করেন, যে রূপটি 'গণ্ডভেরুণ্ড নৃসিংহ' নামে বন্দনীয়। ভগবান গণ্ডভেরুণ্ড নৃসিংহদেব শরভাবতারের সাথে ১৮ দিন পর্যন্ত অবিরাম যুদ্ধ করেন এবং একপর্যায়ে তিনি শরভাবতারকে ধরে তাঁর ব্রজতীক্ষ্মনখের দ্বারা শরভের বক্ষ চিঁড়ে শরভকে হত্যা করেন। শরভাবতার যখন ব্যর্থ হলেন তখন দেবতাদের অনুরোধে মহাভয়ংকরী শ্রীনৃসিংহদেবের ক্রোধ নিবারণ করেন ভক্তশ্রেষ্ঠ প্রহ্লাদ মহারাজ। চলুন দেখে নেওয়া যাক, শ্রীব্রহ্মান্ড মহাপুরাণে কি বলা আছে-
তো যুধ্যমানৌ তু তদা চিরেণ বলবত্তরৌ ।
ন শমং জগ্মতুর্দেবৌ নৃসিংহশরভাকৃতী ॥ ৬৯ ॥
ততঃ ক্রুদ্ধো মহাকাযো নৃসিংহো ভীমনিস্স্বনঃ ।
সহস্রকরজৈস্ত্রস্তস্য গাত্রাণি পীডযন্ ॥ ৭০ ॥
ততঃ স্ফুরচ্ছটাচোটো রুদ্রং শরভরূপিণম্ ।
ব্যদারযন্নখৈস্তীক্ষ্ণৈর্হিরণ্যকশিপুং যথা ॥ ৭১ ॥
[ ব্রহ্মান্ড পুরাণ, ক্ষেত্রমাহাত্ম্যখন্ডম, অধ্যায় ৮, শ্লোক ৬৯-৭১; তেলেগু সংস্করণ ]
অনুবাদ: অতঃপর দুই পরাক্রমশালী শক্তি অর্থাৎ নৃসিংহ ও শরভের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যা দীর্ঘকাল (১৮ দিন) চলতে থাকে এবং বিধ্বংসী এ যুদ্ধে কেউই কিছুতে শান্ত হচ্ছিলেন না। অতঃপর ভগবান নৃসিংহদেব তার মহাবিকট মহাক্রোধী রূপ ( #গণ্ডভেরুণ্ড নৃসিংহরূপ ) ধারণ করলেন এবং তাঁর সহস্র হাতে রুদ্রের এই শরভাবতারকে ধরে তাঁর তীক্ষ্ণ ও মারাত্মক নখ দিয়ে শরভের বক্ষটি ছিঁড়ে ফেলেছিলেন, ঠিক যেভাবে তিনি হিরণ্যকশিপুকে হত্যা করেছিলেন।
ব্রহ্মান্ডপুরাণের দক্ষিণ ভারতীয় সংস্করণ থেকে রেফারেন্স-
तो युध्यमानौ तु तदा चिरेण बलवत्तरौ ।
न शमं जग्मतुर्देवौ नृसिंहशरभाकृती ॥ ६९ ॥
ततः क्रुद्धो महाकायो नृसिंहो भीमनिस्स्वनः ।
सहस्रकरजैस्त्रस्तस्य गात्राणि पीडयन् ॥ ७० ॥
ततः स्फुरच्छटाचोटो रुद्रं शरभरूपिणम् ।
व्यदारयन्नखैस्तीक्ष्णैर्हिरण्यकशिपुं यथा ॥ ७१ ॥
-[ ब्रह्माण्ड पुराण, क्षेत्र महात्म्यखंडम ८।६९-७१ ]
অনুবাদ: এরপর দুই শক্তিমান এবং তাদের শক্তিশালী শক্তি দ্বারা, অর্থাৎ নৃসিংহ এবং শরবের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে এবং উভয়েই শান্ত হননি এবং তীব্র লড়াই করেন। এরপর ভগবান নৃসিংহ, ক্রোধে পরিপূর্ণ এবং বিশাল শারীরিক রূপ ধারণ করে, তাঁর হাজার হস্তের নক দ্বারা এই শরবকে ধরেন এবং রুদ্র কর্তৃক সৃষ্ট শরবের বক্ষ ছিঁড়ে ফেলেন, তাঁর ধারালো এবং মারাত্মক নক ব্যবহার করে এবং হিরণ্যকশিপুকে যেভাবে হত্যা করেছিলেন, ঠিক সেভাবেই শবকে হত্যা করেন।
[ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ, ক্ষেত্র মাহাত্ম্য খণ্ড, অধ্যায় ৮, শ্লোক ৬৯-৭১]
শ্রীনৃসিংহদেবের প্রলয়ংকারী রূপ যে শরভের চেয়েও ভয়ংকর তা শ্রীপদ্মপুরাণে বর্ণনা করা হয়েছে-
দংষ্ট্রাসু সিংহশার্দ্দূলাঃ শরভাশ্চ মহোরগাঃ।
কন্ঠে চ দৃশ্যতে মেরুঃ স্কন্ধেষ্বপি মহাদ্রয়ঃ।।
[ পদ্মপুরাণ, উত্তরখন্ড, অধ্যায় ২৩৮, শ্লোক ১০৪ ]
অনুবাদ: ভগবান নৃসিংহদেবের দাঁতগুলো সিংহ, বাঘ এমনকি #শরভ ও মহাসর্প সমূহের উৎপত্তিস্থল (অর্থাৎ অত্যন্ত ভয়ংকর), নৃসিংহদেবের বজ্রকন্ঠ এদের চেয়েও ভয়ানক, মেরুপর্বতের মতো সুদৃঢ় , ভগবানের স্কন্ধও বিশাল পর্বতের মত।
শিবাবতার বিধ্বংসী শ্রীনৃসিংহদেবকে পদ্মপুরাণে তাই 'বীরভদ্রজিৎ' নৃসিংহরূপে বন্দনা করা হয়েছে-
জগদেকস্বরূপায় নৃসিংহায় নমোহস্ত তে।
ভালে দধার যো দেবো নৃসিংহো #বীরভদ্রজিৎ।।
[ পদ্মপুরাণ, উত্তরখন্ড, অধ্যায় ১৭৪, শ্লোক ৮৫ ]
অনুবাদ: যে #বীরভদ্রজিৎ নৃসিংহ দেব ললাটে সুতপ্ত দ্বাদশ সূর্যবিম্ব ধারণ করেন, সে জগদেকস্বরূপ নৃসিংহদেবকে নমস্কার করি।।
শৈব সর্বস্ব খন্ডনম্ গ্রন্থে শ্রীবিজয়েন্দ্রতীর্থ কিছু পুরাণের উদ্ধৃতি প্রদান করেন, যার মাধ্যমে প্রমাণ করা হয়েছে, নৃসিংহদেব শিবের শরভ অবতারকে নিধন করেন।
নিকৃত্য বাহূরুশিরা বজ্রকল্পমুখৈর্নখৈঃ |
মেরুপৃষ্ঠে নৃসিংহেন শরভশ্চাথ সোঽপতৎ ||
[বামন পুরাণ]
অনুবাদ: নৃসিংহদেব বজ্রের ন্যায় তীক্ষ্ণ নখসমূহ দ্বারা শরভের বাহু, উরু ও মস্তক ছিন্নভিন্ন করে দিলেন; ফলে শরভ মেরু পর্বতের পৃষ্ঠে (শিখরে) পতিত হলো।
স চঞ্চুপঞ্চাননমষ্টপাদং পক্ষদ্বয়াঢ্যং ঘননীলগাত্রম্ |
স্ফুরন্মহাতীব্রসহস্রহস্তং সহস্রশস্ত্রং শরভস্বরূপম্ ||
করদাদয় প্রত্যেকং মুখং চঞ্চুপুটদ্বয়ম্ |
বিদার্য চ নৃসিংহস্তং হিরণ্যকশিপুং যথা ||
[ কূর্ম পুরাণ]
অনুবাদ: যার চঞ্চু (পাখির ঠোঁট) ও সিংহের ন্যায় মুখ, আটটি পা, দুটি ডানা এবং ঘন নীল বর্ণের শরীর—সেই সহস্র হাত ও সহস্র অস্ত্রধারী শরভরূপী প্রাণীকে নৃসিংহদেব তিনি যেভাবে হিরণ্যকশিপুকে বিদীর্ণ করেছিলেন, ঠিক সেভাবেই শরভের চঞ্চুযুক্ত মুখ ও অঙ্গসমূহ বিদীর্ণ করলেন।
ততঃ ক্ষণেন শরভো নাদপূরিতদিঙ্মুখঃ |
অভ্যাশমগমদ্বিষ্ণোর্ব্যনদদ্ভৈরবস্বনম্ ||
স তমভ্যাগতং দৃষ্ট্বা নৃসিংহঃ শরভং রুষা |
নখৈবিদারয়ামাস হিরণ্যকশিপুং যথা ||
[ অগ্নি পুরাণ ]
অনুবাদ: তৎক্ষণাৎ শরভ সমস্ত দিক প্রকম্পিত করে গর্জন করতে করতে এবং ভয়ংকর শব্দ করতে করতে বিষ্ণুর (নৃসিংহের) অভিমুখে ধাবিত হলো। তাকে ধেয়ে আসতে দেখে নৃসিংহদেব ক্রুদ্ধ হলেন এবং যেভাবে হিরণ্যকশিপুকে বিদীর্ণ করেছিলেন, ঠিক সেভাবেই নখ দিয়ে শরভকে বিদীর্ণ করলেন।
এছাড়াও লক্ষ্মী নারায়ণ সংহিতা,শাণ্ডিল্য সংহিতা ইত্যাদি পঞ্চরাত্র শাস্ত্র এবং বিষ্ণুযামল তন্ত্রে
বর্ণিত হয়েছে, নৃসিংহদেব শিবের শরভ অবতারকে নিধন করেন।
যৎপ্রভাবাচ্চ শরভং রূপং বৈ ধৃতবান্ হরঃ । ৬০ ॥
[লক্ষ্মী নারায়ণ সংহিতা ১.৩৮০.৬০]
অনুবাদ: যার(বিষ্ণু) প্রভাবেই শিব শরভ রূপ ধারণ করেছিলেন।
সহস্রভুজদণ্ডস্য নৃসিংহস্য মহোজসি।
শরভঃ শলভো জাতস্ততঃ কোহন্যঃ পরো হরেঃ॥ ২২॥
[শাণ্ডিল্য সংহিতা (ভক্তি খণ্ড) ৩.২.২২]
অনুবাদ: সহস্র বাহুযুক্ত ভগবান নৃসিংহের মহাতেজের সামনে সেই শরভেশ্বর একটি সামান্য পতঙ্গের (পোকার) মতো মনে হলো। হরি (বিষ্ণু) ব্যতীত আর কে পরমেশ্বর হতে পারে ?
হন্তংভ্যাগতম্ রৌদ্রং শরভং নরকেসরী। নখৈর্বিদারয়ামাস হিরণ্যকশিপুং যথা।।
[শেষ-সংহিতা ২৩/১৪]
অনুবাদ: ভগবান নরকেসরী শরভরূপী রুদ্রকে বধ করার জন্য এগিয়ে আসলো এবং হিরণ্যকশিপুর ন্যায় শরভকেও নখ দ্বারা বিদারণ করলেন।
ওঁ নমো ভগবন্ বিষ্ণো আদিবৈকুণ্ঠনায়ক।
পরাৎপরায় দেবায় পরেশায় নমো নমঃ॥ ১॥
পরব্রহ্মায় বিশ্বায় বিশ্বনাথায় তে নমঃ।
পরমাত্মায় গুহ্যায় জগজ্জননহেতবে।
সৃষ্টিস্থিত্যন্তরূপায় আদিভূতায় তে নমঃ॥ ২॥
নমস্তে নারসিংহায় গণ্ডভেরুণ্ডরূপিণে।
নমস্তে ব্যাঘ্রবক্ত্রায় সর্বদুঃখবিনাশিনে॥ ৩॥
নমস্তে অশ্ববক্ত্রায় সর্ববিদ্যাপ্রদায়িনে। নমো
বরাহবক্ত্রায় সর্বসম্পৎপ্রদায়িনে॥ ৪॥
নমো বানরবক্ত্রায় সর্বশত্রুবিনাশিনে।
নমো গরুড়বক্ত্রায় দুষ্টপন্নগহারিণে॥ ৫॥
নমো ভল্লুকবক্ত্রায় শত্রুস্তম্ভনকারিণে।
অষ্টাস্য গণ্ডভেরুণ্ডরূপায় শীঘ্রগামিনে॥ ৬॥
কল্পান্তকালনির্ঘোষগর্জিতায়োগ্ররূপিণে।
অনেকেকোটি শরভভক্ষণায় মহাত্মনে॥ ৭॥
দ্বাত্রিংশৎকোটিহস্তায় দ্বাত্রিংশায়ুধধারিণে।
মহতে ভীমরূপায় নারসিংহায় তে নমঃ॥ ৮॥
[বিষ্ণুযামল তন্ত্র, অষ্টমুখগন্ডভেরুণ্ড নৃসিংহ কল্প, ব্রহ্মসনৎকুমার সংবাদ, শরভশিবকৃত স্তব, শ্লোক ১-৮]
বঙ্গানুবাদঃ ওঁ, আদি বৈকুণ্ঠের অধিপতি ভগবান বিষ্ণুকে প্রণাম। যিনি সর্বোচ্চেরও ঊর্ধ্বে, সেই পরম প্রভুকে আমি প্রণাম করি।১। হে পরম ব্রহ্ম, আপনি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সর্বজনীন প্রভু। হে রহস্যময় পরমাত্মা, আপনিই বিশ্ব সৃষ্টির কারণ। আপনাকে প্রণাম, যিনি সৃষ্টি, স্থিতি এবং লয়ের মূল রূপ।২।আপনাকে প্রণাম, যিনি গণ্ডভেরুণ্ড রূপে নৃসিংহ। হে ব্যাঘ্র-বদন (বাঘের মুখবিশিষ্ট) প্রভু, আপনি সমস্ত দুঃখ বিনাশ করেন।৩
আপনাকে প্রণাম, যার অশ্বের (ঘোড়ার) ন্যায় মুখ এবং যিনি সমস্ত জ্ঞান প্রদান করেন। আপনাকে প্রণাম, যার বরাহের (শূকরের) ন্যায় মুখ এবং যিনি সমস্ত
ঐশ্বর্য প্রদান করেন।৪। বানর-বদন প্রভুকে প্রণাম, যিনি সমস্ত শত্রুকে বিনাশ করেন। গরুড়-বদনকে প্রণাম, যিনি দুষ্ট সর্পদের ধ্বংস করেন।৫। আপনাকে প্রণাম, যিনি ভল্লুকবক্ত্র এবং যিনি শত্রুকে স্তম্ভিত করেন। হে অষ্ট-মুণ্ডধারী, আপনি গণ্ডভেরুণ্ড রূপ ধারণ করেছেন এবং আপনি দ্রুত গমন করেন।৬। হে প্রলয়কালের বা যুগান্তের প্রচণ্ড বজ্রনির্ঘোষ রূপী। হে মহাত্মা, আপনি লক্ষ লক্ষ শরভ (পৌরাণিক প্রাণী) গ্রাস করেছেন।৭।
তিনি বত্রিশ কোটি হাত এবং বত্রিশটি অস্ত্র ধারণ করেন। হে ভগবান নৃসিংহের মহান এবং ভীতিপ্রদ রূপ, আমি আপনাকে সশ্রদ্ধ প্রণাম নিবেদন করি।৮।
তাহলে পরমবৈষ্ণব শিবজী মহারাজ কেন শিবপুরাণ ও লিঙ্গপুরাণে নিজ আরাধ্যদেব শ্রীহরির বিরুদ্ধে এরূপ মোহনবাক্য প্রয়োগ করে বিভ্রাট সৃষ্টি করলেন?
তার উত্তরে স্বয়ং শিব নিজেই পার্বতীকে বলেছেন। পদ্মপুরাণে যোগেশ্বর শিব মাতা পার্বতীকে বলেছেন, তিনি নিজের ইচ্ছাতে এরূপ করেন নি, তিনি শ্রীহরির নির্দেশে অসুরমোহনার্থে তামসিক পুরাণসমূহে নিজেকে শ্রীহরির চেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার জন্য এসকল মোহন বাক্য বলেছেন, যাতে জগতের আসুরিক লোকেরা বিষ্ণুভক্তির পথ থেকে সরে গিয়ে বেদবিরুদ্ধ পন্থাকে আশ্রয় করে বিনাশ প্রাপ্ত হয়।
অসুরেরা বিষ্ণুভক্তির ছল করে তপস্যা দ্বারা শক্তি লাভ করে সে শক্তি দিয়ে দেবলোকাদি দখল করার উপক্রম হলে দেবতারা শ্রীহরির নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেন। সে সময় শ্রীহরি শিবকে নির্দেশ দেন, তিনি যেন জগতে শিবপুরাণ, লিঙ্গপুরাণাদি তামসিক পুরাণ, তামসিক স্মৃতি ও পাশুপত শাস্ত্র প্রচার করেন এবং শৈব ও মহাশৈব নামক বেদবিরুদ্ধ পাষন্ড সম্প্রদায় সৃষ্টি করেন। শিবের এ প্রচারণায় তখন যারা প্রকৃতই অসুর, বিষ্ণুভক্তির ছল করছে, তারা বিষ্ণুবিমুখ হয়ে যাবে এবং তাদের পতন ঘটানো দেবতাদের পক্ষে সহজ হবে।
পুরাণানি চ শাস্ত্ৰাণি ত্বয়া সত্ত্বেন বৃংহিতাঃ।
কপালচৰ্ম্মভস্মাস্থিচিহ্নাসমরসৰ্ব্বশঃ। ৩০
ত্বমেব ধৃতবান্ লোকান্ মোহয়ম্ব জগত্ৰয়ে ।
তথা পাশুপতং শাস্ত্ৰং ত্বমেব কুরু সৎস্কৃতঃ ॥৩১
কঙ্কালশৈবপাষণ্ডমহাশৈবাদিভেদতঃ।
অলক্ষ্যঞ্চ মত সম্যগ্বেদবাহ্যং নরাধমাঃ ॥ ৩২
ভস্মাস্থিধারিণঃ সর্ব্বে ভবিষ্যন্তি হচেতসঃ।
ত্বাং পরত্বেন বক্ষ্যন্তি সৰ্ব্বশাস্ত্রেষু তামসাঃ ॥৩৩
তেষাং মতমধিষ্ঠায় সর্ব্বে দৈত্যাঃ সনাতনাঃ।
ভবেয়ুস্তে মদ্বিমুখাঃ ক্ষণাদেব ন সংশয়ঃ ॥৩৪
অহপ্যবতারেষু ত্বাঞ্চ রুদ্র মহাবল।
তামসানাং মোহনার্থং পূজয়ামি যুগেযুগে।
মতমেতদবষ্টভ্য পতস্ত্যেব ন সংশয়ঃ ॥৩৫
(পদ্মপুরাণ, উত্তরখন্ড, অধ্যায় ২৩৫, শ্লোক ৩০-৩৫)
অনুবাদ : শ্রীহরি শিবকে বললেন- "হে শিব! তুমি সংকোচ পরিত্যাগ করে জগতে #তামসিক_পুরাণ ও অন্যান্য তামসশাস্ত্রের প্রচার করো। তুমি কপাল, চর্ম্ম, ভস্ম ও অস্থি চিহ্ন ধারণ করে ত্রিজগতের অখিল লোককে মোহিত কর। তুমি পাশুপাত্ শাস্ত্ৰ প্রণয়ন করে তা প্রচার কর। তুমি কঙ্কাল, শৈব, পাষণ্ড ও মহাশৈব প্রভৃতি বিভিন্ন সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠিত করে বেদবিরুদ্ধ মত অলক্ষ্যে প্রবর্তিত কর। এইরূপ করলে সকলে ভস্মাস্থিধারণ করে অধম হবে ও জ্ঞানহীন হয়ে যাবে। তখন তারা তামসিক হয়ে তোমাকেই সকল শাস্ত্রে শ্রেষ্ঠ বলে কীৰ্ত্তন করবে। (যারা বিষ্ণুভক্তির ছল করে ত্রিলোকে উৎপাত সৃষ্টি করে) সে সকল সনাতন দানবগণ এ বেদবিরুদ্ধ মত গ্রহণ করে ক্ষণকাল মধ্যে নিঃসংশয় বিষ্ণুবিমুখ হয়ে যাবে। হে মহাবল রুদ্র ! আমিও যুগে যুগে অবতার পরিগ্রহ করে তামসিক লোকদের মোহিত করার জন্য তোমার পূজা করব। তা দেখে দানবেরাও সেই মতের অনুবর্তী হইয়া নিঃসংশয় পতিত হইবে।
এটুকু বর্ণনার পর এর পরের অধ্যায়ে ভক্তপ্রবর শিবজি মহারাজ তার দ্বারা প্রচারিত তামসিক পুরাণসমূহের নাম বর্ণনা করেছেন এবং স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন- ' তামসিক পুরাণ অনুসারীগণ নিশ্চিতভাবে নরকপ্রাপ্ত হন।
মাৎস্যং কৌৰ্ম্মং তথা লৈঙ্গং শৈবং স্কান্দং তথৈব চ।
অগ্নেয়ঞ্চ ষড়েতানি তামসানি নিবোধ মে॥ ১৮।।
( পদ্মপুরাণ, উত্তরখন্ড, অধ্যায় ২৩৬, শ্লোক- ১৮ )
অনুবাদ : শিব বললেন, "মৎস্যপুরাণ, কুৰ্ম্মপুরাণ, লিঙ্গপুরাণ, শিবপুরাণ, স্কন্দপুরাণ ও অগ্নিপুরাণ - এই ছয়খানি পুরাণ তামসিক পুরাণ।"
সাত্ত্বিকা মোক্ষদাঃ প্রোক্তা রাজসাঃ সর্ব্বদা শুভাঃ।।২১
তথৈব তামসা দেবি নিরয়প্রাপ্তিহেতবঃ ॥২২।।
(পদ্মপুরাণ, উত্তরখন্ড, অধ্যায় ২৩৬, শ্লোক ২১- ২২)
অনুবাদ: শিব পার্বতীকে বললেন, হে দেবি ! পদ্মপুরাণাদি সাত্ত্বিক পুরাণসমূহ মোক্ষ প্রদান করে। ব্রহ্মান্ডপুরাণাদি রাজসিক পুরাণ সর্ব্বদা শুভ এবং #শিবপুরাণ, #লিঙ্গপুরাণাদি তামসিক পুরাণগুলো নিশ্চিতভাবে #নরক প্রাপ্তির কারণ বলে নির্দিষ্ট।
পদ্ম পুরাণে ছয়টি সাত্ত্বিক এবং ছয়টি রাজসিক পুরাণের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে
ব্রহ্মান্ড, মার্কণ্ডেয় ইত্যাদি রাজসিক পুরাণ সর্বদা শুভ বা মঙ্গলবিধান করে।তাই তা সর্বদা মান্য। আর ভাগবত, বিষ্ণু, পদ্মপুরাণ ইত্যাদি সাত্ত্বিক পুরাণ মোক্ষ বা মুক্তি প্রদান করে। অপপ্রচারকারীর দাবী হল বৈষ্ণবগণ নাকি তামসিক পুরানের সাথে সাথে রাজসিক পুরাণকে মানে না। কিন্তু এটি তাদের ভূল প্রচার। আমরা কোথাও এ ধরনের কথা বলি নি। কেননা শাস্ত্রই আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে ব্রহ্মান্ড ইত্যাদি রাজসিক পুরাণ পরম মঙ্গলময়ী।
আর বিষ্ণুভক্তির শিক্ষা দিচ্ছে স্কন্ধ ইত্যাদি তামসিক পুরাণের শিক্ষাকে আমরা সাদরে গ্রহণ করি।কিন্তু শিব,রুদ্র ইত্যাদি তামসিক পুরাণে বিস্তৃতভাবে বিষ্ণুভক্তির বিপরীত কথা বলে হয়েছে, তাই শাস্ত্র নির্দেশে তা সর্বতোভাবে পরিত্যজ্য।
বৈষ্ণবং নারদীয়ঞ্চ তথা ভাগবতং শুভম্।
গারুড়ঞ্চ তথা পাদ্মং বরাহং শুভদর্শনে। ১৯।।
সাত্ত্বিকানি পুরাণানি বিজ্ঞেয়ানি শুভানি বৈ।
ব্রহ্মাণ্ডং ব্রহ্মবৈবর্তং মার্কণ্ডেয়ং তথৈব চ ।। ২০।।
ভবিষ্যং বামনং ব্রাহ্মং রাজসানি নিবোধ মে।
সাত্ত্বিকা মোক্ষদাঃ প্রোক্তা রাজসাঃ সর্ব্বদা শুভাঃ।।২১। তথৈব তামসা দেবি নিরয়প্রাপ্তিহেতবঃ।। ২২।।
(পদ্মপুরাণ, উত্তরখন্ড, অধ্যায় ২৩৬, শ্লোক ১৯ - ২২)
অনুবাদ: বিষ্ণু, নারদীয়, মঙ্গলময় শ্রীমদ্ভাগবত, গরুড়, পদ্ম ও বরাহ- এই শুভ সপ্ত পুরাণ সাত্ত্বিক বলে জ্ঞাত হও। ব্রহ্মাণ্ড, ব্রহ্মবৈবর্ত্ত, মার্কণ্ডেয়, ভবিষ্য, বামন ও ব্রহ্ম এই সকল পুরাণ রাজস বলে জানবে। হে দেবি! সাত্ত্বিক পুরাণ সকল মোক্ষ বলে উক্ত হয়েছে। রাজসিক পুরাণ সর্ব্বদা শুভ এবং তামস পুরাণ নরকপ্রাপ্তির হেতু বলে নিদির্ষ্ট।
~ সদ্গুণ মাধব দাস