12/05/2024
"যিনা একটি ঋণ যা অবশ্যই পূরণ করা হবে" একটি কুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থী ভ্রান্ত কথা!
"যিনা হচ্ছে ঋণ, হয় তোমার স্ত্রীর দ্বারা, না হয় তোমার বোন দ্বারা, না হয় তোমার মেয়ে দ্বারা পূরণ করা হবেই।" এ কথাটি দ্বারা বুঝানো হয়েছে, কোনো পুরুষ যিনা করলে কোনো এক সময় তার স্ত্রী, মেয়ে কিংবা বোন অন্য কারো সাথে যিনায় লিপ্ত হবেই হবে। (নাউযুবিল্লাহ)
বেশ কয়েক জন ভাই-বোন আমাদের কাছে বিষয় টি সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। এ বিষয়ে একটু অনলাইন ঘেটে দেখার চেষ্টা করে যেটা বুঝলাম, আজকাল ফেসবুকে কথাটি কেউ কেউ প্রচার করছেন, কিছু দ্বিনী ভাই - বোন অজ্ঞতার কারণে এ ধরণের কুফরি কথা শেয়ার দিচ্ছেন। কেউ কেউ আবার মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলেমের নামে চালিয়ে দিচ্ছেন।
অথচ এটা সঠিক নয়, বরং মারাত্মকভাবে কুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থী, ভ্রান্ত ও অযৌক্তিক কথা। এ ধরণের কথা কেউ বিশ্বাস রাখলে সে ইসলাম থেকে বিপথে চলে যাবে।
কোনো বিষয়ে জ্ঞান না থাকা সত্বেও সেটা কোরআন ও হাদিসের নামে চালিয়ে দেয়া ভয়াবহ পাপ। রাসূল সঃ বলেন,
"কেউ নিজের মনগড়া কথা রাসূলের (কোরআন ও হাদিসের) নামে চালিয়ে দিলে, তার ঠিকানা জাহান্নাম।"
(বুখারী : ১১০)
"এ হাদিসটি প্রায় ১০০ জন সাহাবী বর্ণনা করেছেন। আর কোনো হাদীস এত বেশি সংখ্যক সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়নি।" (ফাতহুল বারী ১/১৯৯)
দেখেছেন কত জটিল বিষয়? এদিকে আপনি সঠিক ভাবে কোরআন-সুন্নাহ না জেনে, ইসলামের নামে যা তা প্রচার করছেন, যেখানে যা দেখছন সেটাই শেয়ার দিচ্ছেন। এতে স্বয়ং নিজেকেই বিপদে ফেলছেন।
"মানুষ এমন কথা বলে, যার ফলে সে জাহান্নামের এত দূরে নিক্ষিপ্ত হয় যা পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্তের মধ্যস্থিত ব্যবধানের চেয়ে অধিক।"
(মুসলিম : ২৯৮৮)
উপরের বাণীটি শায়খ আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলিল হাফিঃ সুন্দরভাবে ব্যখ্যা করেছেন, শায়েখের বক্তব্য তুলে ধরা হলো -
১) এ কথায় কোন সন্দেহ নেই যে, যিনা-ব্যভিচার ধ্বংসাত্মক কবিরা গুনাহ এবং ইসলামের সবচেয়ে কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু তা এমন ঋণ নয় যে, তা অবশ্যই তার পরিবারের সদস্যদের দ্বারা হলেও পূরণ করা হবে। কেননা একজনের অপরাধে আরেকজনকে শাস্তি দেওয়া বা অন্যজন থেকে প্রতিশোধ নেওয়া অথবা একজনের গুনাহের কারণে অন্যজনকে গুনাহে লিপ্ত করা আল্লাহর হেকমত পরিপন্থী।
“যে সৎকাজ করে সে তার নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে এবং কেউ মন্দ কাজ করলে তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে। আপনার রব তাঁর বান্দাদের প্রতি মোটেই যুলুমকারী নন।”
[ফুসসিলাত: ৪৬; আল-জাসিয়াহ: ১৫]
মহান আল্লাহ বলেন,
"একজনের অপরাধের বোঝা আরেকজন বহন করবে না।"
[সূরা ফাতির : ১৮]
২) এ কথার দ্বারা একজন নিরাপরাধ মানুষের প্রতি অহেতুক কুধারণা সৃষ্টি হতে পারে।
যেমন: কারো পরিবারের কোন সদস্য (স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি, বোন ইত্যাদি) দ্বারা যদি যিনার মত জঘন্য অপরাধ সংগঠিত হয়ে থাকে (নাউজুবিল্লাহ) তাহলে মানুষ তার প্রতি কুধারণা করতে পারে যে, তার স্বামী কিংবা বাবা হয়তো পূর্বে যিনা করেছিল। এ কারণে তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যিনা সংঘটিত হয়েছে।
৩) এ কথার অর্থ দাঁড়ায়, কোন ব্যক্তি যদি কুপ্রবৃত্তির তাড়ানোয় বা শয়তানের ওয়াসওয়াসায় পড়ে কখনো যিনা করে ফেলে, তারপর অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর দরবারে খাঁটিভাবে তওবা করে নেয় তারপরও তার পরিবারের সদস্যদের দ্বারা যিনা সংঘটিত হবেই। কারণ যিনা একটি ঋণ, যা অবশ্যই পরিশোধ করা হবে!! (নাউযুবিল্লাহ) আল্লাহ আমাদের ভ্রান্ত ধারণা থেকে হেফাজত রাখুন।
৪) এটি মূলত তওবাকারীকে আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমার প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী।
অতএব এটা শরিয়া বিরোধী, অযৌক্তিক ও ভ্রান্ত কথা।
৫) এটা কোনো হাদিস নয় বরং এর বিরুদ্ধে কোরআন-সুন্নাহর স্পষ্ট দলিল মজুদ আছে, চার মাহযাবের কোনো ইমাম এমন কোনো কিছু কখনোই বলেন নি, এ ধরণের অস্পষ্ট কথা কোরআন ও সুন্নাহর নামে প্রচার করলে ইসলাম বিদ্বেষীরা ইসলাম নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ পাবে। এ ধরণের কথাগুলোকে তারা লুফে নিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাবে। দূর্বল ঈমানের ও নন-প্রাক্টিসিং মুমিনদের মন ইসলামের বিরুদ্ধে বিষিয়ে তুলবে।
৬) কেউ কেউ বলছেন, বাণীটি কোনো এক আলেম তার কোনো এক বইয়ে উল্লেখ করেছেন এবং এই বাণীটি দিয়ে তিনি উদাহরণসহ ভিন্ন কিছু বুঝিয়েছেন। তাহলে বলব, আপনি এই বাণীটি একশ জন মানুষকে দেখান, এরপর প্রশ্ন করুন তারা কি বুঝলো, সবাই বলবে এর দ্বারা বুঝিয়েছে, "যিনা হচ্ছে ঋণের মতো। আজ কেউ যিনা করলে পরবর্তীতে তার অধিনস্থ কেউ অবশ্যই জিনা করবে।" (নাউযবুবিল্লাহ)
তো যে জিনিস অস্পষ্ট, যে কথা বললে সমাজে ফিতনা বাড়ে, সেটা খন্ডাংশ আকারে কাটছাট করে প্রচার করাও হারাম। বলতে হলে, তিনি এর দ্বারা কি বুঝিয়েছেন সেটা স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করে প্রচার করুন।
তাই ভাইয়া-আপুদের উদ্দেশ্য করে বলব, দ্বীন প্রচার করতে এসে যেন মিথ্যা কিংবা প্রতারণার আশ্রয় না নেই। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।
(আল্লাহ আ'লাম)