17/07/2026
'ভগবৎপাদ্ শঙ্করাচার্য কর্তৃক পুরীধামে জগন্নাথদেবের পুনঃপ্রতিষ্ঠা'
দিগ্বিজয় যাত্রাকালে মরুঙ্ঘ পরিত্যাগ করে আচার্য শঙ্কর অন্ধ্রপ্রদেশের নানা স্থানে ভ্রমণ করতে করতে কতিপয় কলিঙ্গদেশবাসীর অনুরোধে ক্রমে ক্রমে পুরীধামে এসে উপস্থিত হলেন। এসময় কেশরীবংশীয় রাজগণ পুরীধামে রাজত্ব করছিলেন। এরা কখন মগধের অধীনতা স্বীকার করে, কখনও বা পূর্বচালুক্যগণের অধীনতা স্বীকার করে একপ্রকার স্বাধীনতা রক্ষা করে আসছিলেন। এখানে এসে আচার্য জগন্নাথদেবের মন্দিরেই অবস্থান করতে লাগলেন এবং পদ্মপাদাদি শিষ্য সমেত শাস্ত্রার্থ ও হিতোপদেশ দিতে প্রবৃত্ত হলেন। তাঁর সেই বিশাল দিগ্বিজয় বাহিনী পুরীর সমুদ্রতীরে অবস্থান করতে লাগলেন।
আচার্য দেখলেন এখানে পূর্ববর্তী বৌদ্ধধর্মের প্রভাব অনেক বেশি, জগন্নাথ মন্দিরে পূজাদি হয় বটে, কিন্তু কোন বিগ্রহ নেই। পরে শুনলেন পূর্বে কালযবনের অত্যাচারকালে লুণ্ঠনভয়ে মন্দিরের সেবায়েত পাণ্ডাগণ জগন্নাথ বিগ্রহের উদর প্রদেশ স্থিত রত্নপেটিকা চিল্কা হ্রদের তীরে ভূগর্ভে লুকিয়ে রাখেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় কালক্রমে উক্ত স্থানের লোকেরা ভুলে যান রত্নপেটিকা রাখার স্থানটিকে। আর সেইকারণে পূর্বপ্রচলিত দারুময় বিগ্রহেরও প্রতিষ্ঠা হয় নি। শালগ্রাম শিলা প্রভৃতিতে ভগবানের পূজা হতে থাকে।
পুরীবাসী কতিপয় ব্যক্তি আচার্য শঙ্করের নিকট নিবেদন করলেন—'ভগবন্। আপনার কীর্তিকলাপের কথা বর্তমানে ভারতবর্ষে যেরূপ শুনছি, তাতে মহাভাগ্যক্রমে আপনার দর্শন পেলাম। আপনি যোগবলে জগন্নাথের রত্নপেটিকা রাখার স্থানটিকে নির্ধারণ করে দেন, আমরা তাঁর পূজা করে ধন্য হয়।' আচার্য প্রফুল্ল চিত্তে বললেন—'আপনাদের সৎ সঙ্কল্প ভগবৎ ইচ্ছায় অবশ্যই পূর্ণ হবে।'
এই বলে আচার্য স্নানাদি সমাপনপূর্বক গভীর ধ্যানমগ্ন হলেন। তারপর 'জগন্নাথ স্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে।'—এরূপ একটি মনোমুগ্ধকর স্তোত্র রচনা করে ভগবানের নিকট তাঁর দর্শন প্রার্থনা করলেন। যোগবলে অবিলম্বে আচার্যের মানসপটে চিল্কা হ্রদের তীরে ভূগর্ভে রত্নপেটিকার বিস্মৃত স্থানটি প্রতিফলিত হল। আচার্য পুরীবাসীদের বললেন—'আপনারা যে হ্রদের কথা বলছেন, তার তীরে একটি সর্বাপেক্ষা বৃহৎ বটবৃক্ষ দেখবেন, তারই তলে মৃত্তিকা গর্ভে রত্নপেটিকা আছে, খননপূর্বক উদ্ধার করুন।'
জগদ্গুরুর উপদেশে রাজপুরুষগণ ঐ দিনই হ্রদতীরবর্তী যেটা বৃহৎ বটবৃক্ষ তার তলে খননপূর্বক রত্নপেটিকা উদ্ধার করলেন। পুরীবাসীগণ আশ্চর্য হলেন, তাঁদের আনন্দের আর সীমা রইল না। তাঁরা মহাসমারোহে আচার্যের সমীপে আসলেন। জগন্নাথদেব ও শঙ্করাচার্যের জয়ধ্বনিতে মুখরিত হয়েছিল গোটা প্রাঙ্গণ। অনন্তর যথারীতি শুভতিথিতে মন্দিরে ভগবান্ জগন্নাথদেবের প্রতিষ্ঠাকার্য সম্পন্ন হল। আচার্য যথাবিধি শ্রীভগবানের পূজা-অর্চনাদি সম্পন্ন করলেন। এই দিব্য ঘটনার পর থেকে শ্রীক্ষেত্রে বৌদ্ধধর্মের প্রভাব কমে বৈদিক সনাতন ধর্মের শ্রীবৃদ্ধি হল। নীলাদ্রি বিজয় করে অনন্তর শঙ্করাচার্য পুরীতে অদ্বৈতসিদ্ধান্তসম্মত পঞ্চদেবতার পূজা এবং পঞ্চমহাযজ্ঞের প্রবর্তন করে দিগ্বিজয়বাহিনী সমেত মগধ রাজ্যের অভিমুখে প্রস্থান করলেন।......
তথ্যসূত্রঃ-
আচার্য শঙ্কর ও রামানুজ, লেখক- রাজেন্দ্রনাথ ঘোষ (স্বামী চিদ্ঘনানন্দ পুরী), উদ্বোধন কার্যালয় কলকাতা। এই বইটিতে মাধবাচার্যের সটীক শঙ্কর বিজয়ম, চিদ্বিলাসযতি রচিত শঙ্কর বিজয় বিলাস, অনন্তানন্দগিরি বিরচিত শঙ্কর-দ্বিগ্বিজয়, শঙ্কর জন্মভূমিতে প্রাপ্ত শঙ্করের কোন জ্ঞাতিপন্ডিত বিরচিত শঙ্করচরিত, সদানন্দ বিরচিত শঙ্করজয় অনুসারে ভগবান্ শঙ্করাচার্যের জীবনী বিষয়ে অসংখ্য তথ্য দেয়া হয়েছে।