06/08/2026
সারনাথ শুধু একটি প্রাচীন প্রত্নস্থল নয়, এটি বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সাক্ষী। বোধগয়ায় বোধিলাভের পর গৌতম বুদ্ধ এখানেই প্রথম ধর্মদেশনা দিয়েছিলেন এবং এখান থেকেই শুরু হয় বৌদ্ধ সংঘের পথচলা। প্রাচীন ঋষিপত্তন বা মৃগদায় নামে পরিচিত এই স্থান প্রায় ২,৫০০ বছর ধরে বিশ্বের বৌদ্ধদের অন্যতম প্রধান তীর্থক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত।
সম্রাট অশোকের নির্মিত সিংহস্তম্ভের শীর্ষভাগ, যা আজ ভারতের জাতীয় প্রতীক, সেটিও এই সারনাথেই অবস্থিত। এবার ইউনেস্কোর ৪৮তম ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির সিদ্ধান্তে সারনাথ ভারতের ৪৫তম ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ প্রপার্টি হিসেবে স্বীকৃতি পেল। কেন এই স্বীকৃতি এত গুরুত্বপূর্ণ? সারনাথের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং ভারতের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক নিয়েই আজকের এই প্রতিবেদন।
----
সারনাথের নাম তুমি নিশ্চয়ই শুনেছ, কিন্তু এই প্রাচীন বৌদ্ধ তীর্থক্ষেত্র এবার এমন এক স্বীকৃতি পেল, যা ভারতের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করল। দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির ৪৮তম অধিবেশনে, ২৫ জুলাই ২০২৬ তারিখে ঘোষণা করা হয়েছে যে, প্রাচীন বৌদ্ধ স্থাপনা সারনাথ এখন ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ প্রপার্টি। এর ফলে ভারতের মোট ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ প্রপার্টির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৪৫। দীর্ঘ মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শেষে এই স্বীকৃতি মিলেছে, যা সারনাথের ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বকে আন্তর্জাতিক স্তরে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করল।
উত্তরপ্রদেশের বারাণসীর কাছে অবস্থিত সারনাথ সেই স্থান, যেখানে গৌতম বুদ্ধ বোধগয়ায় বোধিলাভের পর খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে তাঁর প্রথম ধর্মদেশনা প্রদান করেন। বৌদ্ধধর্মে এই ঘটনাকে ধর্মচক্র প্রবর্তন বলা হয়। এখানেই তাঁর প্রথম পাঁচ শিষ্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় এবং বৌদ্ধ সংঘের সূচনা ঘটে। সেই কারণেই সারনাথকে বৌদ্ধধর্মের জন্মলগ্নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ধরা হয়। প্রাচীন বৌদ্ধ গ্রন্থে এই স্থানের উল্লেখ ঋষিপত্তন, ঈশিপত্তন এবং মৃগদায় নামে পাওয়া যায়। মৃগদায়ের অর্থই হরিণ উদ্যান, কারণ এক সময় এই অঞ্চল হরিণের জন্য পরিচিত ছিল।
বৌদ্ধধর্মের চারটি প্রধান তীর্থস্থানের মধ্যে সারনাথ একটি। অন্য তিনটি হল লুম্বিনী, যেখানে গৌতম বুদ্ধের জন্ম; বোধগয়া, যেখানে তিনি বোধিলাভ করেন; এবং কুশীনগর, যেখানে তিনি মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। এই চারটি স্থান বুদ্ধের জীবনের চারটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। সেই কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতি বছর অসংখ্য বৌদ্ধ ভিক্ষু, গবেষক ও পর্যটক সারনাথে আসেন। প্রায় ২,৫০০ বছর ধরে এই স্থানে নিরবচ্ছিন্নভাবে তীর্থযাত্রা ও ধর্মীয় কার্যক্রম চলেছে, যা বিশ্বের খুব কম ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থানের ক্ষেত্রেই দেখা যায়।
সারনাথ শুধু ধর্মীয় কারণে নয়, প্রত্নতাত্ত্বিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে মৌর্য, কুষাণ ও গুপ্ত যুগের বহু স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ এখনও সংরক্ষিত রয়েছে। সম্রাট অশোক খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে এখানে একটি বিখ্যাত স্তম্ভ নির্মাণ করান। সেই স্তম্ভের সিংহমূর্তির শীর্ষভাগই আজ ভারতের জাতীয় প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। একই স্তম্ভের ধর্মচক্র ভারতের জাতীয় পতাকার মাঝখানেও স্থান পেয়েছে। ফলে সারনাথের গুরুত্ব শুধু বৌদ্ধ ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ নয়, আধুনিক ভারতের জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতির ফলে সারনাথের ঐতিহ্য সংরক্ষণ, প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক পর্যটনের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ফলে এই স্থানের সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বের সামনে ভারতের প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও এই স্বীকৃতি বিশেষ গুরুত্ব বহন করবে।