11/07/2026
Topic:
“মানব চোখ—আল্লাহর বিস্ময়কর সৃষ্টি; কিন্তু এই দৃষ্টিশক্তির হিসাবও দিতে হবে”
প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে আমরা চোখ খুলি। পরিচিত ঘর দেখি, প্রিয় মানুষের মুখ দেখি, আকাশ দেখি, লেখা পড়ি, রাস্তা চিনে চলি। এত সহজে সবকিছু দেখতে পাই যে কখনো কখনো মনে হয়—দেখতে পাওয়া যেন খুব সাধারণ একটি ব্যাপার।
কিন্তু একটি দৃশ্য আমাদের চোখ থেকে মস্তিষ্কে পৌঁছানোর পেছনে কত স্তরের সমন্বয় কাজ করছে, আমরা কি কখনো থেমে তা ভেবেছি?
আলো প্রথমে চোখের স্বচ্ছ সামনের অংশ কর্নিয়া দিয়ে প্রবেশ করে। এরপর আইরিস প্রয়োজন অনুযায়ী চোখের মণির খোলা অংশ দিয়ে কতটা আলো প্রবেশ করবে, তা নিয়ন্ত্রণ করে। লেন্স আলোকে সঠিকভাবে রেটিনায় কেন্দ্রীভূত করতে সাহায্য করে। রেটিনার আলোকসংবেদনশীল কোষ সেই আলোকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে, আর অপটিক নার্ভ সেই সংকেত মস্তিষ্কে নিয়ে যায়। তারপর মস্তিষ্ক সেই সংকেত থেকে আমাদের দেখা ছবিটি উপলব্ধি করে।
একটি ক্ষুদ্র চোখের মধ্যে কর্নিয়া, আইরিস, চোখের মণি, লেন্স, সিলিয়ারি বডি, কাচিক পদার্থ, রেটিনা, কোরয়েড, স্ক্লেরা ও অপটিক নার্ভ—প্রতিটি অংশ আলাদা দায়িত্ব পালন করছে। একটি অংশের কাজ বিঘ্নিত হলেই পরিষ্কারভাবে দেখা কঠিন হয়ে যেতে পারে। চোখের সাদা বাইরের আবরণ স্ক্লেরা চোখের আকৃতি ও সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে, আর চোখের ভেতরের স্বচ্ছ জেলজাতীয় কাচিক পদার্থ তার ভেতরের জায়গা পূর্ণ করে রাখে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ
“নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম গঠনে।”
— সূরা আত-তীন, ৯৫:৪
এই আয়াতটি শুধু চোখের শারীরিক গঠন ব্যাখ্যা করার জন্য নাজিল হয়নি; এটি মানুষের সামগ্রিক উত্তম গঠন, সামর্থ্য ও মর্যাদার কথা বলে। তবে চোখের মতো একটি জটিল ও সমন্বিত ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তা করলে আয়াতটির সামনে আমাদের বিস্ময় ও বিনয় আরও গভীর হয়।
একবার ভাবুন—আপনি কোনো লেখা পড়ছেন। অথচ আপনার অজান্তে আলো বাঁকছে, চোখের মণি সংকুচিত বা প্রসারিত হচ্ছে, লেন্স focus করছে, রেটিনা সংকেত তৈরি করছে এবং অপটিক নার্ভ সেই তথ্য মস্তিষ্কে পৌঁছে দিচ্ছে।
আপনি কোনো নির্দেশ দিচ্ছেন না।
কোনো button চাপছেন না।
কোনো system চালু করছেন না।
আপনার রব এই ব্যবস্থা চালিয়ে রাখছেন।
আল্লাহ বলেন—
“আল্লাহ তোমাদের মাতৃগর্ভ থেকে বের করেছেন এমন অবস্থায় যে, তোমরা কিছুই জানতে না। আর তিনি তোমাদের দিয়েছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও অন্তর—যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও।”
— সূরা আন-নাহল, ১৬:৭৮
খেয়াল করুন, দৃষ্টিশক্তি দেওয়ার পর আল্লাহ শুধু দেখতে বলেননি; বলেছেন—যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও।
কৃতজ্ঞতা কি শুধু “আলহামদুলিল্লাহ” বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ?
না। এই চোখকে আল্লাহর আনুগত্যে ব্যবহার করাও কৃতজ্ঞতা। কুরআন পড়া, উপকারী জ্ঞান অর্জন করা, মা-বাবার দিকে মমতার চোখে তাকানো, সৃষ্টি দেখে রবকে স্মরণ করা—এসব চোখের শুকরিয়া।
আর হারাম দৃশ্য, অশ্লীলতা, মানুষের গোপন বিষয় খোঁজা, ঈর্ষাভরে অন্যের জীবন দেখা কিংবা এমন content-এ চোখ ডুবিয়ে রাখা, যা ধীরে ধীরে অন্তরকে অন্ধকার করে দেয়—এসব এই নেয়ামতের অপব্যবহার।
রাসূলুল্লাহ ﷺ সতর্ক করে বলেছেন, চোখেরও যিনা রয়েছে, আর তা হলো নিষিদ্ধ কামনাময় দৃষ্টি।
— সহিহ মুসলিম, ২৬৫৭b
আজ আমাদের চোখের সামনে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি দৃশ্য। ফোন খুললেই endless feed। একটি video শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি। আমরা অনেক সময় হারাম কিছু খুঁজতে যাই না; algorithm-ই তা আমাদের সামনে এনে দেয়।
কিন্তু সামনে আসা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে তাকিয়ে থাকা এক বিষয় নয়।
প্রথম নজর হঠাৎ পড়ে যেতে পারে। কিন্তু দ্বিতীয়বার দেখা, থেমে দেখা, zoom করা, profile খোঁজা, save করা—এসব আমাদের সিদ্ধান্ত।
যে চোখ এত সূক্ষ্ম ব্যবস্থায় সৃষ্টি হয়েছে, তাকে কি আমরা কয়েক সেকেন্ডের নোংরা আনন্দের কাছে সমর্পণ করে দেব?
আরেকটি প্রশ্ন—
আমরা কি শুধু হারাম দৃশ্য থেকেই চোখ বাঁচাব, নাকি অনর্থক দৃশ্য থেকেও?
কারণ সব বৈধ content-ও সবসময় উপকারী নয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষের জীবন, ঘর, পোশাক, সম্পদ ও সফলতা দেখতে দেখতে নিজের নিয়ামত ছোট মনে হওয়া শুরু করতে পারে। চোখের মাধ্যমে যে তুলনা ভেতরে প্রবেশ করে, তা কখনো ঈর্ষা, হতাশা ও অকৃতজ্ঞতায় পরিণত হয়।
তাই চোখের হেফাজত মানে শুধু অশ্লীলতা থেকে বাঁচা নয়। এর অর্থ হলো—আমি কী দেখব, কতক্ষণ দেখব এবং সেই দৃশ্য আমার অন্তরে কী তৈরি করছে—সেটা সচেতনভাবে ঠিক করা।
আজ নিজের screen time খুলে দেখুন।
গত সাত দিনে আপনার চোখ কত ঘণ্টা screen-এর সামনে ছিল?
সেই সময়ের কতটুকু কুরআন, জ্ঞান, কাজ বা উপকারী বিষয়ে গেছে?
আর কতটুকু এমন দৃশ্যে হারিয়ে গেছে, যার কোনো স্মৃতি নেই, উপকার নেই—শুধু সময় ও অন্তরের প্রশান্তি কমিয়েছে?
এই চোখ একদিন দুর্বল হয়ে যাবে। যে লেখা আজ পরিষ্কার দেখা যায়, একসময় তা ঝাপসা হতে পারে। যে মুখগুলো আজ সামনে আছে, একদিন হয়তো আর থাকবে না।
তাই দৃষ্টিশক্তি থাকা অবস্থাতেই তার হক আদায় করা দরকার।
আজ অন্তত তিনটি সিদ্ধান্ত নিই—
হারাম কিছু সামনে এলে সঙ্গে সঙ্গে চোখ ফিরিয়ে নেব।
প্রতিদিন কিছু সময় কুরআন দেখে পড়ব।
অনর্থক scrolling-এর জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমা রাখব।
একটি চোখের প্রতিটি স্তর আমাদের বলে—আমরা ঘটনাক্রমে সৃষ্টি হইনি। আর এই দৃষ্টিশক্তি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা দায়িত্বহীনও নই।
আল্লাহ আমাদের চোখকে তাঁর নিদর্শন দেখে ঈমান বাড়ানোর মাধ্যম বানান। কুরআন, উপকারী জ্ঞান ও হালাল সৌন্দর্যের দিকে তাকানোর তাওফিক দিন। হারাম ও অন্তর ধ্বংসকারী দৃশ্য থেকে আমাদের দৃষ্টি ও হৃদয়কে হেফাজত করুন।
আমিন।
১. চোখ শুধু নেয়ামত নয়—এটি একটি আমানতও।
২. সামনে এসে যাওয়া আর ইচ্ছা করে তাকিয়ে থাকা এক নয়।
৩. আপনার চোখ আজ কী বেশি দেখছে—কুরআন, নাকি endless feed?
৪. চোখের শুকরিয়া হলো তাকে আল্লাহর আনুগত্যে ব্যবহার করা।
৫. দৃষ্টি হেফাজত করলে অন্তরও অনেক fitnah থেকে নিরাপদ থাকে।
🌿 চোখের হেফাজতের ৫টি বাস্তব উপায়
১. হারাম দৃশ্য সামনে এলে সঙ্গে সঙ্গে scroll করে চলে যান।
২. অপ্রয়োজনীয় page ও account unfollow করুন।
৩. রাতে একা scrolling-এর জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করুন।
৪. প্রতিদিন কিছু সময় কুরআন দেখে তিলাওয়াত করুন।
৫. যা দেখছেন, নিজেকে জিজ্ঞেস করুন—এটি কি আমার অন্তর পরিষ্কার করছে, নাকি নষ্ট করছে?।
💬 Comment : আপনার চোখের সবচেয়ে বেশি সময় এখন কোথায় ব্যয় হয়—কুরআন, কাজ, শেখা, নাকি scrolling-এ?
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━