10/07/2026
একটা দেয়াল ভাঙলে রহমত, আরেকটা টিকে থাকলে রহমত
--------------------------------------------------
প্রতি জুমায় আমরা অনেকেই সূরা কাহাফ তিলাওয়াত করি। গুহার তরুণদের ঘটনা, দুই বাগানের মালিক, মুসা (আ) আর খিজিরের সফর, যুল-কারনাইনের অভিযান—চারটা ঘটনাই আমাদের মুখস্থপ্রায়। কিন্তু একটু দাঁড়ান। কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এই চারটা আলাদা আলাদা গল্প আসলে একটা প্রশ্নেরই চারটা উত্তর?
প্রশ্নটা হলো—আল্লাহর হস্তক্ষেপ কখন দেখা যায়, আর কখন যায় না?
উস্তাদ নোমান আলী খান সূরা কাহাফের কাঠামো বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, এই সূরার মূল বার্তা হলো: অদেখা বাস্তবতা, চোখের সামনের দেখা বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। দৃশ্যমান জগতে কাজ করছে পদার্থবিজ্ঞান, মাধ্যাকর্ষণ, রসায়ন। আর অদৃশ্য জগতে নিরন্তর কাজ করছেন স্বয়ং আল্লাহ। চারটা ঘটনা এই একটা সত্যকেই চার দিক থেকে দেখায়।
প্রথম ঘটনা: গুহার তরুণেরা। এখানে আল্লাহর হস্তক্ষেপ ছিল প্রকাশ্য—কয়েকজন তরুণ শত শত বছর ঘুমিয়ে থাকলেন, যা বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব। আর ফলাফলও ছিল প্রকাশ্য পরিত্রাণ। আল্লাহর হস্তক্ষেপ দেখা গেল, আর সেই হস্তক্ষেপেই এলো মুক্তি।
দ্বিতীয় ঘটনা: বাগানের মালিক। এখানেও আল্লাহর হস্তক্ষেপ প্রকাশ্য—আকাশ থেকে নেমে আসা দুর্যোগে গোটা বাগান ধ্বংস। কোনো মানুষ আগুন দেয়নি, কেউ কেটে ফেলেনি। কিন্তু এবার ফলাফলটা দেখতে বিপর্যয়। আল্লাহর হস্তক্ষেপ দেখা গেল, আর সেই হস্তক্ষেপে সব চলে গেল।
সত্যিই কি কেড়ে নিলো? লোকটা বাগান হারিয়ে কী বলেছিল, মনে আছে?
يَا لَيْتَنِي لَمْ أُشْرِكْ بِرَبِّي أَحَدًا
"হায়! আমি যদি আমার রবের সাথে কাউকে শরিক না করতাম!" (১৮:৪২)
বাগান গেল, কিন্তু তওবা এলো। উস্তাদ বলেন—এটা আসলে দুঃসংবাদ নয়, সুসংবাদ। কারণ গুহার তরুণরা যদি বেঁচে ফিরেও ঈমান হারাতেন, সেই "পরিত্রাণ"-ই হতো আসল বিপর্যয়। পার্থিব রক্ষা পাওয়াটা আসল কল্যাণ নয়; ঈমানের উপর টিকে থাকাটাই আসল কল্যাণ।
এবার তৃতীয় ঘটনায় খেলাটা ঘুরে যায়। মুসা (আ) দেখলেন—খিজির নৌকা ফুটো করছেন, একটা বালককে হত্যা করছেন, বিনা পারিশ্রমিকে দেয়াল তুলে দিচ্ছেন। প্রতিটা কাজ ঘটছে মানুষের হাতে। আল্লাহর হস্তক্ষেপ কোথাও চোখে পড়ছে না। স্বয়ং মুসা (আ)-ও ধৈর্য রাখতে পারলেন না। অথচ সফরের শেষে খিজির পর্দাটা সরিয়ে দিলেন:
وَمَا فَعَلْتُهُ عَنْ أَمْرِي
"আমি এসব নিজের ইচ্ছায় করিনি।" (১৮:৮২)
যা দেখতে মানুষের কাজ, তা আসলে ছিল আল্লাহরই পরিকল্পনা—শুধু হস্তক্ষেপটা ছিল অদৃশ্য।
চতুর্থ ঘটনা এর উল্টো পিঠ। যুল-কারনাইন পৃথিবী চষে বেড়াচ্ছেন, অন্যায়ের বিচার করছেন, এক জাতিকে ইয়াজুজ-মাজুজ থেকে বাঁচাতে লোহা-তামার বিশাল প্রাচীর তুলে দিচ্ছেন। এবারও সব ঘটছে মানুষের হাতে—তবে এবার ঘটছে কল্যাণ। আর এখানেই সবচেয়ে বড় ফাঁদ। ভালো কিছু যখন আমাদের হাত দিয়ে ঘটে, আমরা ভাবতে শুরু করি—এ তো আমারই কৃতিত্ব। যুল-কারনাইন সেই ফাঁদে পা দেননি। প্রাচীর শেষ করেই তিনি ঘোষণা দিলেন:
هَٰذَا رَحْمَةٌ مِّن رَّبِّي
"এটা আমার রবের পক্ষ থেকে রহমত।" (১৮:৯৮)
এখন সবচেয়ে চমকপ্রদ মিলটা দেখুন। মুসা (আ)-এর সফর শেষ হয়েছিল একটা দেয়াল দিয়ে, যুল-কারনাইনের সফরও শেষ হলো একটা দেয়াল দিয়ে। খিজিরের দেয়ালটা তোলা হয়েছিল দুই এতিমের গুপ্তধন আড়াল করতে—সেই দেয়াল একদিন ভেঙে পড়বে, এতিমরা বড় হয়ে নিচ থেকে সম্পদ বের করবে। ভেঙে পড়াটাই সেখানে রহমত। আর যুল-কারনাইনের দেয়াল ঠেকিয়ে রেখেছে ইয়াজুজ-মাজুজকে—যতদিন দাঁড়িয়ে আছে, ততদিনই রহমত; যেদিন ভাঙবে, নেমে আসবে মহাবিপর্যয়।
একটা দেয়াল ভাঙলে রহমত। আরেকটা টিকে থাকলে রহমত। আর দুটোর পরিণতিই আল্লাহ বেঁধে দিয়েছেন একই শব্দে—খিজির বললেন "রাহমাতাম মির রাব্বিক", যুল-কারনাইন বললেন "রাহমাতুম মির রাব্বি", আর দুই দেয়ালের ভবিষ্যৎ নিয়েই এসেছে "ওয়া'দু রাব্বি"—আমার রবের প্রতিশ্রুতি। ভাঙা-গড়া কোনোটাই এলোমেলো নয়; সবটাই এক মহাপরিকল্পনার অংশ।
তাহলে সূরা কাহাফ আমাদের কী শেখালো? আল্লাহর হস্তক্ষেপ কখনো চোখে দেখা যায়, কখনো যায় না। যখন আসে, কখনো তাকে মনে হয় পরিত্রাণ, কখনো মনে হয় বিপর্যয়। কিন্তু এই পৃথিবীতে যা-ই ঘটুক—সেটা পুরস্কারও নয়, শাস্তিও নয়। আসল পুরস্কার আর আসল শাস্তি আখিরাতে। এখানে সবকিছুই শুধু পরীক্ষা— আল্লাহর হস্তক্ষেপ দেখা যাক, আর না-ই যাক।
এক প্যারায় মনে রাখুন: সূরা কাহাফের চার ঘটনা আসলে একটাই ছক—গুহার তরুণদের বেলায় আল্লাহর হস্তক্ষেপ দৃশ্যমান, ফলাফল পরিত্রাণ; বাগানওয়ালার বেলায় হস্তক্ষেপ দৃশ্যমান, ফলাফল দেখতে বিপর্যয় (আসলে তওবার দরজা); খিজিরের বেলায় হস্তক্ষেপ অদৃশ্য, কষ্টগুলো আসে মানুষের হাত ধরে; যুল-কারনাইনের বেলায় হস্তক্ষেপ অদৃশ্য, কল্যাণও আসে মানুষের হাত ধরে। দুই সফরের শেষেই দেয়াল—একটা ভাঙলে রহমত, আরেকটা টিকে থাকলে রহমত। শিক্ষা একটাই: দুনিয়ায় যা ঘটে সবই পরীক্ষা, প্রকৃত ফলাফল আখিরাতে।
ইয়া আল্লাহ! আপনার পরিকল্পনা যখন চোখে দেখা যায় না, তখনও আপনার উপর সুধারণা রাখার তৌফিক দিন। আমাদের জীবনের ভাঙা দেয়ালগুলোকে রহমত বানিয়ে দিন। আমিন।
—নোমান আলী খানের আলোচনা অবলম্বনে