06/01/2025
প্রচলিত গণতন্ত্র ও খিলাফত
-নুরুল সাখওয়াত ফাহিম
পাশ্চাত্য শাসননীতি সবসময় শোষণের পক্ষেই ছিল। তারা কখনো ইনসাফ চায়নি, চেয়েছে কৌশলে মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করার বিভিন্ন সূত্র। এসব সূত্র প্রয়োগে তারা বারবার সফল হয়েছে। কিন্তু মানবের তৈরীকৃত এসব মানবিকতার আড়ালে হয়েছে অমানবিকতা ।
অধিকারের নামে হয়েছে অধিকার হরণের চেষ্টা।
ন্যায়ের কথা দিয়ে করা হয়েছে জুলুম। বিশ্ব রাজনৈতিক কালচারে জনপ্রিয় মোড়ক এখন গণতন্ত্র, এ গণতন্ত্রকে পুঁজি করে ক্ষমতাসীনরা তাদের আখের গুছিয়ে নিতে পারলেও এ মোড়ক লোকসমাজে একটি অজানা ট্রমা হিসেবে কাজ করছে। পক্ষেবিপক্ষে নানা জনের নানা মত, অজানা লোকসমাজ চরম বিভ্রান্তির আড়ালে পড়ে আছে। আজকের দুনিয়ায় শাসননীতিতে গণতন্ত্র একটি বহুল প্রচলিত শাসনব্যবস্থা। তবে এ শাসনব্যবস্থার কিছু পয়েন্ট যেগুলো নৈতিকতা ও ন্যায় ইনসাফের সাথে সাংঘর্ষিক। আল্লাহর কালাম ও তার কর্তৃত্বর সাথেও সাংঘর্ষিক। তবে কতটুকু সাংঘর্ষিক আর কতটুকু সাংঘর্ষিক নয় সে জ্ঞানও আমাদের অনেকের আয়ত্তহীন।
সে বিষয়ে একদিন আলাপ হবে ইনশাআল্লাহ। তবে আজকে যে আলাপ সেটা হবে কতটুকু সাংঘর্ষিক নয় সে বিষয়ে। জনগণের শাসন জনগণের সার্বভৌমত্বই গণতন্ত্র, এটা ইসলামের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
গণতন্ত্র নামের এ মতবাদের স্রস্টা ছিলেন আব্রাহাম লিংকন। বাস্তবে এই মতবাদটি একটি ফেইক। যা প্র্যাক্টিকালি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যারা ক্ষমতায় আসে তারা নিজেদের দলীয় আদর্শ বাস্তবায়ন করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবে। আর জনগণকে ততটুকু গুরুত্ব দিবে যতটুকু গুরুত্ব দিলে তাদের ক্ষমতা অক্ষুন্ন থাকবে।
আর নিজেদের দলীয় আদর্শ পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করে ফেলতে পারলেই তখন তারা জনগণকেও পাত্তা দিবে না। ক্ষমতা ব্যবহার করে জোরপূর্বক দমিয়ে রাখবে। উদাহরণ সরূপ বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল গুলোর দিকে লক্ষ রাখলে বুঝতে বেশ কষ্ট হয় না ।
আওয়ামী লীগ সরকার ১৫ বছরের রাজত্বে তারা বঙ্গবন্ধুকে বাঙালির আইকন হিসেবে উপস্থাপন করেছে, আর জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু এটি তাদের কালিমা ছিল। আর এই বাক্যটা কেউ উচ্চারণ করতে না চাইলে তাকে সরাসরি রাজাকার হিসেবে ট্যাগ দেওয়া হয়েছিল। ঠিক একইভাবে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে তারা জিয়াউর রহমানকে বাংলার আইকন হিসেবে উপস্থাপন করবে, অতীতে তারাও একি কাজ করেছিল, এটা কেউ লিমিটে রেখেছে আর কেউ লিমিট ক্রস করার সাহস দেখিয়ে গর্তে পড়েছে।
আর ইসলামিক কোন দল ক্ষমতায় আসলে সেখানে তারা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাবে আল্লাহকে মানুষের প্রভু হিসেবে উপস্থাপন করতে এবং আল্লাহর বিধানের মাধ্যমে মানুষের জীবন বিধান পরিচালনা করতে ।
যদিও বাংলাদেশের সংবিধানের ভিত্তি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষবাদ ও সমাজতন্ত্র মতবাদের রচিত। ইসলামী দল গুলো এককভাবে নির্বাচন করার ক্ষমতা না রাখলেও জোটগতভাবে সরকার গঠন করতে পারলে সাংবিধানিক পরিবর্তন আসার সুযোগ আছে।
আংশিকভাবে হলেও মানুষ ইনসাফের পরিবেশ পাবে। দুর্নীতি ও জুলুমের পরিমাণ কমে আসবে।
আর যদি কুফরি শক্তি গুলো একক রাজত্ব কায়েম করে তাহলে ইনসাফ তো দুরের আলাপ মানুষে চরিত্র থেকে ইসলামের আদব সংস্কৃতিটাও কেড়ে নিবে।
অতীতের ইসলামবিরোধী কার্যকলাপ কারো লোকচক্ষুর অন্তরালে হয়নি। সালাম দেওয়ার রীতিকে জঙ্গিবাদী বচন বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ইসলামের ফরজ বিধান নিয়ে আল্লাহর শানে বেয়াদবি করা হয়েছে। নাস্তিকতার উত্থান হয়েছে। আর না বাড়ালাম। এসব কিছু পর্দার আড়ালে সংগঠিত হয়নি ।
এবার আসি নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে।
একটা দেশের জনগণ তাদের নিজেদের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন করেন তাদের রাষ্ট্র সরকার ।
শাসক বা নেতা নির্বাচনের এই পদ্ধতি ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। খিলাফত ও নবীর যুগেও মতামত নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে শিখেছে এটার স্বয়ং ইসলাম । অতীতে দুনিয়ার অধিকাংশ রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল রাজতন্ত্র একনায়কতন্ত্র যা গণতন্ত্রের চাইতেও বিষাক্ত। ইসলামই সর্বপ্রথম দেখিয়েছে জনগণের মাধ্যমে তাদের সরকার নির্বাচন ইতিহাসের সাক্ষ্য, তৃতীয় খলিফা ওসমান (রা.) এবং পঞ্চম খলিফা উমর ইবনে আব্দুল আজিজ (রা.) এর নির্বাচন পদ্ধতি নজর দেয়া যায়। অর্থাৎ শুরা বৈঠকের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়নি।
যদি কারো কাছে সাংঘর্ষিক হয়ে থাকে তাহলে আপনি কোরআন এবং হাদিস দিয়ে সেটা প্রমাণ করে দেখান । পাশাপাশি এটাও প্রমাণ করে দেখাতে হবে একটা আমীর অথবা একটা রাষ্ট্রের খলিফা নির্বাচন করার সুনির্দিষ্ট সুন্নাহ পদ্ধতি কি? থাকলে চার খলিফার নির্বাচন একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে হয়নি কেন। ইসলাম আমাদেরকে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছে ঠিক কিন্তু নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত সম্পর্কে যেভাবে বিস্তারিত সূক্ষ্ম বিধান দিয়েছে তা একজন খলিফা কিভাবে নির্বাচন করবে আর খেলাফত কিভাবে প্রতিষ্ঠা করবে এর বিধান বিস্তারিত ধারাবাহিক ভাবে দেওয়া হয়নি কেন? কারণ একটা দেশের ভৌগলিক অবস্থান পরিবেশ পরিস্থিতি এক এক দেশের ক্ষেত্রে একেক রকম একটা নির্দিষ্ট পদ্ধতি সব দেশে এপ্লাই করতে পারবেন না। যেমন নির্বাচন পদ্ধতিটা কিছু নির্দিষ্ট দেশে এপ্লাই করতে পারবেন না উদাহরণ ভারত, আমেরিকা, চীন, রাশিয়া ইত্যাদি। একইভাবে কিছু কিছু রাষ্ট্রে সরাসরি সশস্ত্র পদ্ধতি এপ্লাই করা যাবে না উদাহরণ বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিশর, তুরকি ইত্যাদি।আবার কিছু কিছু রাষ্ট্রে সরাসরি যুদ্ধ ছাড়া কোন বিকল্প নাই উদাহরণ ফিলিস্তিন, আফগান, ইরান, সিরিয়া, ইত্যাদি ।
যদি আপনি বলেন আমি পরিস্থিতির দোহায় দিচ্ছি সুন্নাহ পদ্ধতির বাহিরে কোন কল্যাণ নেই।
খিলাফাত প্রতিষ্ঠা করার সুন্নাহ পদ্ধতি কি? রাসুল সা যে রাষ্ট্রে খিলাফত কায়েম করেছিলেন সেটা কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ছিল না (রাজতন্ত্রিক ছিল) সশস্ত্রে যুদ্ধ করা ছাড়া তাদের হাত থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়ার কোন বিকল্প পদ্ধতি ছিলো না। আর যাদের সাথে যুদ্ধ করেছেন তারা স্পষ্ট কাফের বা মুশরিক ছিলো।
যেহেতু বাংলাদেশে পুর্ব থেকে প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এখানে ক্ষমতা পরিবর্তন করার সুযোগ আছে আর এখানের মানুষ (স্পষ্ট মুশরিক বা কাফের নয়) অর্থাৎ তাদের সাথে সশস্ত্র যুদ্ধ করার কোন সুযোগ নেই সেই ক্ষেত্রে এখানে খিলাফত কায়েম করার সুন্নাহ পদ্ধতি কি? রাসুল সা যুদ্ধ করেছেন তলোয়ার, তীর, মিনজানিক দিয়ে তাহলে পরিস্থিতির দোহায় দিয়ে আপনারা নিউক্লিয়ার, মিসাইল, জন্য মরিয়া হয়ে যাচ্ছেন কেন? যেহেতু সুন্নাহ পদ্ধতির বাহিরে কোন কল্যাণ নেই আর এই মিসাইল বা নিউক্লিয়ারের আক্রমণে এমন মানুষ ও মারা যেতে পারে যারা সরাসরি ইসলামের শত্রু নয়।
রাসূল সা, খন্দক যুদ্ধে মাটি খনন করেছেন যাতে শত্রুরা মুসলমানদের এরিয়ায় প্রবেশ করতে না পারে আজকে আপনারা কার সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে মাটি খনন করবেন?
এই পদ্ধতিতে যাওয়ার কারণ আমি মনে করি এই মুহূর্তে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করার কোন সুযোগ নেই দাওয়াতি কাজ ছাড়া আবার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের এই প্রতিযোগিতা থেকে যে মুসলমানদেরকে সরিয়ে নিচ্ছেন তাহলে এ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যাদের হাতে উন্মুক্ত হয়ে যাচ্ছে তাদের কাছে দ্বীন ইসলাম এবং মুসলমানরা নিরাপদ কিনা? তারা ক্ষমতায় আসার পর ইসলাম ও মুসলমানদের উপর যে আগ্রাসন চালাবে তার দায়ভার আপনাদের বহন করতে হবে কারণ আপনারা নিজেরাই ক্ষমতা দখলের এই প্রতিযোগিতা থেকে আমাদেরকে সরিয়ে নিয়ে আল্লাহর এই জমিনকে পরিচালনা করার জন্য ইনডাইরেক্টলি এই জালেম ফাসেকদের হাতে তুলে দিয়েছেন।
এখন আমার প্রশ্ন হল এই পদ্ধতিতে যাওয়া কি বড় অপরাধ নাকি এখান থেকে সরে এসে এই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এই ক্ষমতালোভী ফাসেকদের হাতে তুলে দেওয়া বড় অপরাধ?
এই বিতর্কের সহজ সমাধান অবশ্যই একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের চূড়ান্ত খিলাফত প্রতিষ্ঠা করার জন্যই সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে প্রতি পাঁচ বছর পর পর এই নির্বাচন পদ্ধতিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে নেওয়া আর খিলাফত আলা মিনহাজিন নবুওয়াত অর্থাৎ চূড়ান্ত খিলাফত কায়েম করার মধ্যে আঁকাশ পাতাল ব্যবধান আছে ।
আমরা এই নির্বাচন পদ্ধতিকে এই চূড়ান্ত খিলাফত এর বিকল্প মনে করি না বরং এই চূড়ান্ত খিলাফত প্রতিষ্ঠা করার একটা সহজ মাধ্যম হিসেবে মনে করি,যেহেতু সশস্ত্র যুদ্ধ করার কোন সুযোগ নেই আমাদের। যদি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এই শয়তান প্রকৃতির লোকদের হাতে থাকে তখন চূড়ান্ত খেলাফত প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হতে পারে। আর যদি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা মুসলমানদের হাতে থাকে তাহলে ইসলামবিদ্বেষীরা এবং ফাসেক মুসলমানরা একটা দুর্বল যেনে থাকবে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মুসলমানরা দাওয়াতের মাধ্যমে সর্বস্তরের জনশক্তিদের উপর চূড়ান্তভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থরে মুসলমানরা আস্তে আস্তে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। এই সময়ে মুসলমানদেরকে ঐক্য বদ্ধ করার বিরাট একটা সুযোগ তৈরি হবে। এই সর্বস্তরের সাধারণ মুসলমানদের দ্বীনী শিক্ষা ও বাস্তবে অনুশীলন করার জন্য প্রত্যেকটা মসজিদ কে কাজে লাগানো যাবে ।
আর যদি আমরা এই ক্ষমতা দখলের এ প্রতিযোগিতা থেকে সরে যাই কাল্পনিক পদ্ধতিতে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করার আশায়। তাহলে আজীবন আমাদেরকে ক্ষমতায় থাকা এই শয়তান প্রকৃতির লোকগুলোর কাছে বন্দী শিকলে আবদ্ধ থাকতে হবে। তখন আমাদেরকে ইমাম মাহদীর জন্য তাসবিহ গননা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবেনা।
প্রথমত এই বিতর্কের সমাধানের পথ হতে পারে নির্বাচন পদ্ধতিতে ক্ষমতায় আসলে সাথে সাথে পরিপূর্ণভাবে খেলাফত প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবেনা এটি চূড়ান্ত সত্য কথা। চূড়ান্ত খিলাফত প্রতিষ্ঠা করার এটি একটি মাধ্যম মাত্র বলতে পারি, বিকল্প নয় ।
দ্বিতীয়ত এই নির্বাচন পদ্ধতিকে ব্যবহার করে তুলনামূলক কম ক্ষতিকর কোন শাসক ক্ষমতায় আসাটা চূড়ান্ত খিলাফত প্রতিষ্ঠা হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা নয় বরং তা ত্বরান্বিত হবে দ্রুত যা কোন স্বৈরাচার ফাসেকদের হাতে থাকলে সম্ভব নয়।
উদাহরণ: রাসূল সা, মক্কায় থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যখন আল্লাহ দ্রোহীদের হাতে ছিল, তখন তিনি সেখানে তাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী কোন উম্মত তৈরি করতে পারেনি এবং তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। বরং এটি সম্ভব হয়েছে মদিনায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পাওয়ার পর। যার জন্য মুসলমানদের হিজরত করাটা ফরজ হয়ে গিয়েছিল। আর রাসূল (সা) মদিনা গিয়ে হুট করে বসতি স্থাপন করেননি। এর জন্য পূর্ব থেকে মদিনা বাসীদের জনসমর্থন প্রয়োজন ছিল ।
এই মুহূর্তে আমাদের কোথাও হিজরত করার কোন সুযোগ নেই কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পরিবর্তন করার সুযোগ আছে । এখন আপনি কি এই সুযোগটাকে কাজে লাগাবেন নাকি ইমাম মাহাদির আশায় বসে থাকবেন সেই সিদ্ধান্ত আপনার উর্বর মস্তিষ্কের উপর ছেড়ে দিলাম ।