06/04/2026
আদি বাল্যশিক্ষার প্রসার ও রামসুন্দর বসাক: আমাদের প্রথম পাঠের ইতিহাস।
বাঙালির জ্ঞানচর্চা এবং শিক্ষিত হওয়ার প্রথম ধাপটি মোটেও আজকের মতো ঝকঝকে কিংবা রঙিন ছিল না। প্রাচীন এবং মধ্যযুগের টোল ও মক্তবভিত্তিক পড়াশোনার গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ ঘরের সন্তানদের বর্ণপরিচয় ও নীতিশিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে একসময় অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছিল কিছু কালজয়ী গ্রন্থ। এই ধারায় উনিশ শতকে কলকাতার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের 'বর্ণপরিচয়' যেমন পশ্চিমবঙ্গ কাঁপিয়েছিল, তেমনি তৎকালীন পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশ) ঘরে ঘরে আলো ছড়িয়েছিল রামসুন্দর বসাকের 'আদি বাল্যশিক্ষা'। এটি নিছক কোনো বই ছিল না, এটি ছিল হাজার হাজার বাঙালির শিক্ষিত হয়ে ওঠার প্রথম প্রবেশদ্বার।
বইটির প্রসারতা ও ঐতিহাসিক প্রভাব
১৮৭৭ সালের জুন মাসে ঢাকার সুলভ প্রেস থেকে মাত্র ৪৭ পৃষ্ঠার ক্ষুদ্র একটি বই প্রথম প্রকাশিত হয়, যার দাম ছিল মাত্র ১ আনা ৫ পাই। প্রথম সংস্করণে মাত্র ৩,০০০ কপি ছাপা হলেও পরবর্তীতে এই বইটির লাখ লাখ কপি সারা বাংলাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
এই বইটিতে শুধুমাত্র স্বরবর্ণ কিংবা ব্যঞ্জনবর্ণেরই মেলবন্ধন ছিল না, বরং এতে ছিল ছড়া ও পদ্যের ঢঙে নীতিশিক্ষা, গদ্যের দ্রুতপাঠ, অঙ্ক শিক্ষার প্রাথমিক নিয়ম (যেমন: কড়া-গণ্ডার প্রাচীন ধারাপাত হিসেব) এবং সন-তারিখের নিয়মাবলি। পূর্ববঙ্গের 'ইনস্পেক্টর অব স্কুলস্' এবং 'ঢাকা স্কুল কমিটি'র অনুমোদন পাওয়ার পর বইটির জনপ্রিয়তা এতটাই তীব্র আকার ধারণ করেছিল যে, এটি গ্রামীণ পাঠশালা ও সাধারণ মানুষের অন্দরমহলের জন্য এক প্রকার বাধ্যতামূলক বই হয়ে উঠেছিল। প্রাচীন শিক্ষিত সমাজ এই একটি বইয়ের হাত ধরেই জীবনের প্রথম অক্ষরজ্ঞান এবং নীতিশিক্ষার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছিল।
নেপথ্যের কারিগর: লেখক রামসুন্দর বসাক
রামসুন্দর বসাক ছিলেন তৎকালীন পূর্ববঙ্গ তথা ঢাকা অঞ্চলের একজন অত্যন্ত পণ্ডিত, দায়িত্বশীল শিক্ষক এবং নিষ্ঠাবান পাঠ্যপুস্তক রচয়িতা। তিনি তৎকালীন ঢাকার ঐতিহ্যবাহী 'নর্মাল স্কুল'-এর শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
তৎকালীন সময়ে আধুনিক মুদ্রণ শিল্প ও শিক্ষা যখন সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের বাইরে চলে যাচ্ছিল, তখন রামসুন্দর বসাক সহজ ও সাবলীল ভাষায় এই 'বাল্যশিক্ষা' রচনা করে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটান। তিনি সাধারণ পরিবারগুলোর মনস্তত্ত্ব বুঝতেন এবং খুব সহজ ও গ্রামীণ ছন্দের সাহায্যে শিশুদের অক্ষর চেনার প্রক্রিয়াকে আনন্দময় করে তুলেছিলেন। সে অর্থে তিনি ছিলেন তৎকালীন পূর্ববঙ্গের লক্ষ কোটি মানুষের আধ্যাত্মিক এবং প্রাথমিক শিক্ষার প্রধান দিকপাল।
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন
কালের নিয়মে কাগজের চটি বইগুলো হারিয়ে গেছে। চাররঙা প্রচ্ছদ, আধুনিক ডিভাইস আর ইন্টারনেটের এই যুগে 'আদি বাল্যশিক্ষা' হয়তো আজ অনেকটাই ম্লান। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আজ আমরা সমাজে যে জ্ঞানের দীপ্তি ছড়াচ্ছি, তার শুরুটা কিন্তু এই জরাজীর্ণ ও হলুদ হয়ে যাওয়া বইগুলোর পাতাতেই হয়েছিল। এই ঐতিহ্যই আমাদের বাংলার শিক্ষার ভিতকে শক্ত রেখেছে, যা বর্তমানেও আমাদের মধ্যে প্রবহমান রয়েছে।
আসুন, আধুনিকতার মাঝেও আমরা আমাদের এই গৌরবময় অতীতকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। আমাদের পূর্বসূরিদের জ্ঞানার্জনের এই প্রাচীন আলোকবর্তিকা যেন আমাদের মনে আজীবন বেঁচে থাকে।