05/05/2026
#শোয়াইব_আঃ_এর_জীবনী_এবং_আমাদের_শিক্ষা
মাদইয়ান ছিল তৎকালীন এক সমৃদ্ধ জনপদ, যা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত ছিল। কিন্তু বাহ্যিক চাকচিক্য থাকলেও তাদের সমাজ ছিল নৈতিকভাবে পচে যাওয়া। শিরক (আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করা) এবং অর্থনৈতিক দুর্নীতির এক চরম শিখরে পৌঁছেছিল তারা। ঠিক সেই মুহূর্তে মহান আল্লাহ তাদের হেদায়েতের জন্য হযরত শুয়াইব (আঃ)-কে প্রেরণ করেন, যাঁকে তাঁর সুন্দর বাচনভঙ্গির জন্য 'খতিবুল আম্বিয়া' বা নবীদের বক্তা বলা হতো।
পবিত্র কুরআনে তাঁর সেই আহ্বানের কথা এসেছে:
"হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ নেই।" (সূরা আল-আ’রাফ: ৮৫)
২. ব্যবসায়িক সততা: ইসলামের এক মহান মানদণ্ড
শুয়াইব (আঃ)-এর দাওয়াতের একটি অনন্য দিক ছিল ব্যবসায়িক লেনদেনে স্বচ্ছতা আনা। মাদইয়ানবাসী ওজনে কম দিত এবং মানুষের সাথে প্রতারণা করত। তিনি তাদের সতর্ক করে বলেছিলেন যে, আল্লাহ প্রদত্ত হালাল রিজিকেই বরকত থাকে।
তিনি আদেশ দিলেন:
"তোমরা মাপ ও ওজন পূর্ণ করো এবং মানুষকে তাদের প্রাপ্য জিনিস কম দিও না। আর পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।" (সূরা আল-আ’রাফ: ৮৫)
শিক্ষা: ইসলাম কেবল ইবাদতখানায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাজার, আদালত এবং ব্যক্তিগত লেনদেনেও সততার শিক্ষা দেয়। ব্যবসায়িক সততা আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম।
৩. অবাধ্যতার দেয়াল ও পূর্ববর্তী ধ্বংসের স্মৃতিচারণ
শুয়াইব (আঃ) অত্যন্ত দয়ার সাথে তাঁর জাতিকে বোঝাতে চাইলেন। তিনি তাদের নূহ (আঃ), হূদ (আঃ) এবং সালেহ (আঃ)-এর জাতির ওপর নেমে আসা সেই ভয়াবহ শাস্তির কথা মনে করিয়ে দিলেন। তিনি বারবার তাদের তওবা করার এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান জানান।
তিনি বলতেন:
"তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তাঁর দিকে ফিরে এসো। নিশ্চয়ই আমার রব পরম দয়ালু ও অতি স্নেহশীল।" (সূরা হূদ: ৯০)
কিন্তু ক্ষমতাবান ও দাম্ভিক মাদইয়ানবাসীরা তাঁর কথা শুনল না। উল্টো তারা তাঁকে এবং তাঁর অনুসারীদের দেশান্তরী করার হুমকি দিল এবং তাঁকে "যাদুগ্ৰস্ত" বলে উপহাস করল।
৪. সেই ভয়াবহ ধ্বংস ও অলৌকিক মুক্তি
যখন তাদের অবাধ্যতা ও জুলুম সীমা ছাড়িয়ে গেল, তখন আল্লাহর ফয়সালা চলে এল। শুয়াইব (আঃ) এবং তাঁর মুমিন অনুসারীদের আল্লাহ এক নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিলেন। আর সেই দাম্ভিক জাতির ওপর নেমে এল এক প্রলয়ংকরী আজাব।
হঠাৎ এক প্রচণ্ড শব্দ (গর্জন) এবং ভূমিকম্পে তাদের ঘরবাড়ি লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। আকাশ থেকে নেমে আসা উত্তাপ ও অগ্নিকুণ্ড তাদের গ্রাস করে নিল। তারা এমনভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল, যেন তারা কোনোদিন সেখানে বাসই করেনি।
পবিত্র কুরআন বর্ণনা করে:
"অতঃপর যখন আমার আদেশ আসল, তখন আমি শুয়াইবকে ও তাঁর সাথে যারা ঈমান এনেছিল তাদের আমার রহমতে রক্ষা করলাম।" (সূরা হূদ: ৯৪)
৫. নৈতিক শিক্ষা: দুর্নীতির করুণ পরিণতি
হযরত শুয়াইব (আঃ)-এর এই কাহিনী আমাদের জন্য এক বিশাল সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করে যে:
অর্থনৈতিক দুর্নীতি: ওজনে কারচুপি বা অবৈধ পন্থায় সম্পদ উপার্জন কেবল সামাজিক অপরাধ নয়, এটি আল্লাহর গজব ডেকে আনার একটি কারণ।
আল্লাহর ক্ষমা: যত বড় অপরাধই হোক না কেন, তওবার দরজা সবসময় খোলা। কিন্তু সেই সুযোগ নষ্ট করলে পরিণতি হয় ভয়াবহ।
মুমিনদের বিজয়: সত্যের পথ কঠিন হতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় মুমিনদের জন্যই নির্ধারিত।
উপসংহার:
মাদইয়ানের ধ্বংসাবশেষ আজ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের তৈরি অট্টালিকা বা সম্পদ তাকে আল্লাহর পাকড়াও থেকে রক্ষা করতে পারে না। আমাদের উচিত আমাদের লেনদেনে স্বচ্ছ হওয়া এবং সর্বদা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
✒️নূর বুকস এর পেজ থেকে।