01/02/2026
শবে বরাত নিয়ে বিস্তারিত - 🍀
আমাদের দেশে শবে বরাত নিয়ে মৌলিকভাবে তিনটি বিষয়ে বিতর্ক হয়ে থাকে।
এক. শবে বরাতের ফজিলত থাকা ও না থাকা নিয়ে।
দুই. শবে বরাতে একাকী বা সম্মিলিতভাবে ইবাদত করা ও না করা নিয়ে। তিন. শবে বরাতের পরের দিন রোজা রাখা ও না রাখা নিয়ে।
পাশাপাশি শবে বরাতকে কেন্দ্র করে আরেকটি শ্রেণি বিভিন্ন রুসম-রেওয়াজ ও বিদআত নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, যা কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফের আমল থেকে প্রমাণিত নয়। মোটকথা, এটা নিয়ে মানুষের মাঝে প্রচুর পরিমাণে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি রয়েছে। প্রত্যেকেই নিজ ঘরানার বড়দের কথা বা ফতোয়াকে দলিল হিসেবে পেশ করে, যার কারণে নিরপেক্ষ শ্রেণির লোকেরা এ ব্যাপারে সঠিক ফয়সালা জানতে পারে না। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধটিতে আমরা পাঁচটি অধ্যায়ে এ ব্যাপারে দালিলিকভাবে বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরছি।
# প্রথম অধ্যায় : শবে বরাতের প্রামাণ্যতা ও ফজিলত #
‘শবে বরাত’ ফারসি শব্দ। ‘শব’ অর্থ রাত, আর ‘বরাত’ অর্থ সৌভাগ্য। অবশ্য ‘বরাত’ যদি আরবি হিসেবে নেওয়া হয়, তাহলে এর অর্থ হবে মুক্তি। সুতরাং এর অর্থ দাঁড়াল সৌভাগ্য বা মুক্তির রজনী। যেহেতু এ রাতে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের গুনাহ থেকে মুক্ত করে সৌভাগ্যের চাদরে আচ্ছাদিত করেন, তাই এ রাতকে শবে বরাত বলা হয়। তবে মনে রাখা দরকার যে, এটি ইসলামি বা শরয়ি কোনো পরিভাষা নয়। এ রাতের ক্ষেত্রে হাদিসে ব্যবহৃত শব্দ হচ্ছে, ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বা মধ্য শাবানের রজনী। এটির উচ্চারণ অধিকাংশ লোকের নিকট নতুন ও কঠিন হওয়ায় প্রবন্ধটিতে আমরা এ রাত বুঝাতে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ এর পরিবর্তে ‘শবে বরাত’ ব্যবহার করেছি। এখন আমাদের দেখার বিষয় হলো, কুরআন-সুন্নাহয় এ ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বা শবে বরাতের অস্তিত্ব ও এর কোনো ফজিলতের কথা এসেছে কিনা। এ ব্যাপারে সঠিক মত হলো, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কুরআনে এর কোনো আলোচনা আসেনি। তবে সহিহ হাদিস দ্বারা এ রাতের ফজিলত ও গুরুত্বের বিষয়টি প্রমাণিত। কিছু মানুষ সুরা দুখানের একটি আয়াত দ্বারা কুরআনে ‘শবে বরাত’ এর অস্তিত্ব প্রমাণের চেষ্টা করে। কিন্তু এটা অধিকাংশ মুফাসসিরের মত ও নির্ভরযোগ্য তাফসিরের পরিপন্থী। তাই তাদের এ প্রচেষ্টা সঠিক নয়; বরং অপব্যাখ্যার শামিল।
সুরা দুখানে ইরশাদ হয়েছে :
إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنْذِرِينَ
‘নিশ্চয়ই আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রাতে। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী।’ (সুরা আদ-দুখান : ৩)
বিশুদ্ধ মতানুসারে এ আয়াতে لَيْلَة مُبَارَكَة বা বরকতময় রাত বলতে শবে কদর উদ্দেশ্য, শবে বরাত নয়। যেহেতু এ ব্যাপারে সকলেই একমত যে, কুরআন শবে কদরে অবতীর্ণ হয়েছে। আর এ আয়াতে বরকতময় রাতে কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার কথাই বলা হয়েছে। অতএব, এ আয়াতে উদ্ধৃত ‘লাইলাতুম মুবারাকা’ বা বরকতময় রাত বলতে শবে কদর উদ্দেশ্য হবে, শবে বরাত নয়। এটাই অধিকাংশ মুফাসসিরের মত।
ইমাম কুরতুবি রহ. বলেন :
اللَّيْلَةُ الْمُبَارَكَةُ لَيْلَةُ الْقَدْرِ... وَقَالَ عكرمة: الليلة المباركة ها هنا لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ. وَالْأَوَّلُ أَصَحُّ لِقَوْلِهِ تعالى: إِنَّا أَنْزَلْناهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ
‘বরকতময় রাত হলো শবে কদর। ...ইকরামা রহ. বলেছেন, বরকতময় রাত বলতে এখানে শবে বরাত উদ্দেশ্য। তবে প্রথম মতটিই অধিক বিশুদ্ধ। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আমি কুরআন শবে কদরে অবতীর্ণ করেছি।”’ (তাফসিরুল কুরতুবি : ১৬/১২৬, প্রকাশনী : দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যা, কায়রো)
ইমাম ইবনে কাসির রহ. বলেন :
يَقُولُ تَعَالَى مُخْبِرًا عَنِ الْقُرْآنِ الْعَظِيمِ إِنَّهُ أَنْزَلَهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ، وَهِيَ ليلة القدر كما قال عَزَّ وَجَلَّ: إِنَّا أَنْزَلْناهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ... وَمَنْ قَالَ: إِنَّهَا لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ كَمَا رُوِيَ عَنْ عِكْرِمَةَ فَقَدْ أَبْعَدَ النُّجْعَةَ، فَإِنَّ نَصَّ الْقُرْآنِ أَنَّهَا فِي رَمَضَانَ.
‘আল্লাহ তাআলা কুরআনের ব্যাপারে জানিয়ে দিলেন যে, এটাকে তিনি বরকতময় রাতে অবতীর্ণ করেছেন। আর সেটা হলো শবে কদর। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই আমি কুরআন শবে কদরে অবতীর্ণ করেছি।” ...আর যারা বলে যে, এ রাতটি হলো, মধ্য শাবানের রাত তথা শবে বরাত -যেমনটি ইকরামা রহ. থেকে বর্ণিত হয়েছে- তারা প্রকৃত সত্য থেকে অনেক দূরে। কেননা, কুরআনের সুস্পষ্ট ভাষ্য হলো, শবে কদর রমজান মাসে হয়।’ (তাফসিরু ইবনি কাসির : ৭/২২৫, প্রকাশনী : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
ইমাম রাজি রহ. বলেন :
وَأَمَّا الْقَائِلُونَ بِأَنَّ الْمُرَادَ مِنَ اللَّيْلَةِ الْمُبَارَكَةِ الْمَذْكُورَةِ فِي هَذِهِ الْآيَةِ، هِيَ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، فَمَا رَأَيْتُ لَهُمْ فِيهِ دَلِيلًا يُعَوَّلُ عَلَيْهِ، وَإِنَّمَا قَنِعُوا فِيهِ بِأَنْ نَقَلُوهُ عَنْ بَعْضِ النَّاسِ، فَإِنْ صَحَّ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيهِ كَلَامٌ فَلَا مَزِيدَ عَلَيْهِ، وَإِلَّا فَالْحَقُّ هُوَ الْأَوَّلُ.
‘যারা উল্লিখিত আয়াতে বরকতময় রাত বলতে শবে বরাত বুঝেছেন, তাদের পক্ষে আমি নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ দেখি না। তারা এ ব্যাপারে কতিপয় লোক থেকে বর্ণিত উক্তির ওপর নির্ভর করেছে। যদি এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কোনো বর্ণনা প্রমাণিত হতো, তাহলে এর ওপর অতিরিক্ত কোনো কথা বলার সুযোগ ছিল না। নচেৎ প্রথম মতটিই বিশুদ্ধ ও সঠিক।’ (তাফসিরুর রাজি : ২৭/৬৫৩, প্রকাশনী : দারু ইহইয়াইত তুরাসিল আরাবিয়্যি, বৈরুত)
ইমাম তাবারি রহ. বলেন :
وَاخْتَلَفَ أَهْلُ التَّأْوِيلِ فِي تِلْكَ اللَّيْلَةِ، أَيُّ لَيْلَةٍ مِنْ لَيَالِي السَّنَةِ هِيَ؟ فَقَالَ بَعْضُهُمْ: هِيَ لَيْلَةُ الْقَدْرِ.... وَقَالَ آخَرُونَ: بَلْ هِيَ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ وَالصَّوَابُ مِنَ الْقَوْلِ فِي ذَلِكَ قَوْلُ مَنْ قَالَ: عَنَى بِهَا لَيْلَةَ الْقَدْرِ.
‘মুফাসসিরগণ এ বরকতময় রাতের ব্যাপারে মতানৈক্য করেছেন যে, তা বছরের কোন রাত? কারও মতে তা হলো শবে কদর। ...আর কারও মতে, বরং সেটা হলো শবে বরাত। তবে এক্ষেত্রে তাদের মতটিই সঠিক, যারা বলেন, এদ্বারা শবে কদর উদ্দেশ্য।’ (তাফসিরুত তাবারি : ২২/৭-৮, প্রকাশনী : মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
আল্লামা আলুসি রহ. বলেন :
لَيْلَة مُبارَكَة هي ليلة القدر على ما روي عن ابن عباس وقتادة وابن جبير ومجاهد، وابن زيد والحسن وعليه أكثر المفسرين والظواهر معهم.
‘বরকতময় রাত হলো শবে কদর; যেমনটি ইবনে আব্বাস রা., কাতাদা রহ., ইবনে জুবাইর রহ., মুজাহিদ রহ., ইবনে জাইদ রহ. ও হাসান রহ. থেকে বর্ণিত হয়েছে। আর অধিকাংশ মুফাসসিরের মত এমনই। সুস্পষ্ট প্রমাণাদিও এদের পক্ষে কথা বলে।’ (রুহুল মাআনি : ১৩/১১০, প্রকাশনী : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
এ থেকে থেকে প্রমাণিত হলো যে, সুরা দুখানে যে বরকতময় রাতে কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেটা হলো শবে কদর, শবে বরাত নয়। এতে সামান্য একটু মতানৈক্য থাকলেও ‘শবে বরাত’ হওয়ার দাবিটি গুটিকয়েকজনের মত ও প্রমাণহীন হওয়ায় অধিকাংশ মুফাসসিরই তা গ্রহণ করেননি। অতএব, কুরআন থেকে শবে বরাত সাব্যস্ত হয় না। এরপরও যারা কুরআন থেকে জোর করে ‘শবে বরাত’ সাব্যস্ত করতে চায়, তারা মূলত শাজ বা বিচ্ছিন্ন এক মতের ভিত্তিতে কথা বলে, যা মুহাক্কিক আলিমদের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
#এবার আমরা দেখব, হাদিসে এর অস্তিত্ব আছে কিনা। নির্ভরযোগ্য হাদিসের গ্রন্থাদি অধ্যয়ন করলে দেখা যায়, শবে বরাত-সংক্রান্ত বেশ কিছু হাদিস পাওয়া যায়। সনদগত দিক থেকে হাদিসগুলোর সনদ জইফ হলেও সামগ্রিক বিবেচনায় সব মিলে হাদিস সহিহ হয়ে যায়।
সহিহ ইবনে হিব্বানে বর্ণিত হয়েছে :
عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: يَطْلُعُ اللَّهُ إِلَى خَلْقِهِ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِجَمِيعِ خَلْقِهِ إِلَّا لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ.
‘মুআজ বিন জাবাল রা. সূত্রে রাসুলুল্লাহ সা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা শাবান মাসের পনেরো তারিখ রাতে তাঁর সৃষ্টিকূলের দিকে (বিশেষ রহমতের) দৃষ্টি দেন। অতঃপর মুশরিক ও হিংসুক ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (সহিহু ইবনি হিব্বান : ১২/৪৮১, হা. নং ৫৬৬৫, প্রকাশনী : মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
এ হাদিসটির সনদ জইফ বা দুর্বল হলেও একাধিক সাহাবি সূত্রে এর আরও অনেক সনদ থাকায় হাদিসটি ‘সহিহ’ এর মানে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, যা আহকাম বা ফাজায়িল সব ক্ষেত্রেই প্রমাণযোগ্য।
শাইখ আলবানি রহ. এ হাদিসটির ব্যাপারে মন্তব্য করেন :
حديث صحيح، روي عن جماعة من الصحابة من طرق مختلفة يشد بعضها بعضا وهم معاذابن جبل وأبو ثعلبة الخشني وعبد الله بن عمرو وأبي موسى الأشعري وأبي هريرة وأبي بكر الصديق وعوف ابن مالك وعائشة.
‘হাদিসটি সহিহ। এক দল সাহাবি থেকে বিভিন্ন সূত্রে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে, যার একটি অপরটিকে শক্তিশালী করে। সে সকল সাহাবিগণ হলেন, মুআজ বিন জাবাল রা., আবু সালাবা রা., আব্দুল্লাহ বিন উমর রা., আবু মুসা আশআরি রা., আবু হুরাইরা রা., আবু বকর সিদ্দিক রা., আওফ বিন মালিক রা., আয়িশা সিদ্দিকা রা.। (সিলসিলাতুস আহাদিসিস সহিহা : ৩/১৩৫, হা. নং ১১৪৪, প্রকাশনী : মাকতাবাতুল মাআরিফ, রিয়াদ)
শাইখ শুআইব আরনাউত রহ. বলেন :
حديث صحيح بشواهده، وهذا إسناد ضعيف.
‘এর সনদ দুর্বল হলেও অন্যান্য সমার্থক হাদিসগুলোর কারণে হাদিসটি সহিহ বলে বিবেচিত।’ (আত-তালিক আলা মুসনাদি আহমাদ : ১১/২১৭, হা. নং ৬৬৪২, মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত)
এ হাদিসটি আরও অনেক হাদিসগ্রন্থে সামান্য কয়েকটি শব্দের ভিন্নতায় বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে। আমরা এখানে কয়েকটি হাদিসগ্রন্থের উদ্ধৃতি দিচ্ছি এবং এসব হাদিস থেকে প্রাপ্ত অতিরিক্ত কথাগুলোও শেষে উল্লেখ করে দিচ্ছি।
(১) মুসনাদু ইসহাক বিন রাহুইয়াহ : ৩/৯৮১, হা. নং ১৭০২
(২) সুনানু ইবনি মাজাহ : /৪৪৫, হা. নং ১৩৯০
(৩) আস-সুন্নাহ, ইবনু আবি আসিম : ১/২২৩, হা. নং ৫১০
(৪) মুসনাদুল বাজ্জার : ৭/১৮৬, হা. নং ২৭৫৪
(৫) মুসতাখরাজুত তুসি আলা জামিইত তিরমিজি : ৩/৩৮৭, হা. নং ৬১/৬৮৪
(৬) আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি : ৭/৩৬, হা. নং ৬৭৭৬
(৭) আল-মুজামুল কাবির, তাবারানি : ২০/১০৮, হা. নং ২১৫
(৮) মুসনাদুশ শামিয়্যিন, তাবারানি : ১/১২৮, হা. নং ২০৩
(৯) শুআবুল ইমান, বাইহাকি : ৯/২৪, হা. নং ৬২০৪
(১০) মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা : ৬/১০৮, হা. নং ২৯৮৫৯
এসব কিতাবে বর্ণিত হাদিসগুলোর সারমর্ম প্রায় সব একই। তবে এ রাতে আল্লাহ যাদের ক্ষমা করবেন না, তাদের আরও কয়েকটি শ্রেণির নাম জানা যায়। সামগ্রিকভাবে সব হাদিস অনুসন্ধান করে মোট সাত শ্রেণির লোকের কথা পাওয়া যায়, যাদেরকে আল্লাহ শবে বরাতের এ বিশেষ রাতেও ক্ষমা করবেন না। তারা হলো, (১) মদ্যপায়ী বা নেশাগ্রস্ত। (২) মুশরিক বা শিরকে লিপ্ত। (৩) কোনো মুমিন ভাইয়ের সাথে অন্যায়ভাবে বিদ্বেষ পোষণকারী। (৪) আত্মহত্যাকারী। (৫) আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী। (৬) টাখনুর নিচে কাপড় পরিধানকারী। (৭) পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান।
#সুতরাং এতগুলো হাদিসের সমষ্টিতে বুঝা গেল যে, হাদিসের আলোকে শবে বরাত সুসাব্যস্ত একটি বিষয়। এমনকি আহলে হাদিসগণ যাকে মান্যবর বলে মনে করেন, সেই শাইখ আলবানি রহ.-ও এর স্বীকৃতি দিয়েছেন।
শাইখ আলবানি রহ. বলেন :
وجملة القول أن الحديث بمجموع هذه الطرق صحيح بلا ريب والصحة تثبت بأقل منها عددا ما دامت سالمة من الضعف الشديد كما هو الشأن في هذا الحديث، فما نقله الشيخ القاسمي رحمه الله تعالى في "إصلاح المساجد" (ص 107) عن أهل التعديل والتجريح أنه ليس في فضل ليلة النصف من شعبان حديث صحيح، فليس مما ينبغي الاعتماد عليه، ولئن كان أحد منهم أطلق مثل هذا القول فإنما أوتي من قبل التسرع وعدم وسع الجهد لتتبع الطرق على هذا النحو الذي بين يديك. والله تعالى هو الموفق.
‘সারকথা হলো, এত সব সনদের সমষ্টিতে হাদিসটি নিঃসন্দেহে সহিহ বলে বিবেচিত। মারাত্মক দুর্বলতা না থাকলে তো এর চেয়ে কম সনদেও হাদিস সহিহ সাব্যস্ত হয়ে যায়, যেমনটি এ হাদিসের ক্ষেত্রে ঘটেছে। সুতরাং শাইখ কাসিমি রহ. তাঁর “ইসলাহুল মাসাজিদ” গ্রন্থে (পৃ. ১০৭) প্রাজ্ঞ মুহাদ্দিসদের থেকে শবে বরাতের ফজিলতের ব্যাপারে কোনো সহিহ হাদিস না থাকার যে দাবি করেছেন তা সঠিক নয়। আর যদি কেউ এমন কথা বলেও থাকেন তাহলে তা তাড়াহুড়াবশত ও আমাদের এই পদ্ধতিতে পূর্ণভাবে সকল সূত্র তালাশ না করেই বলে থাকবেন হয়তো।’ (সিলসিলাতুল আহাদিসিস সহিহা : ৩/১৩৯, হা. নং ১১৪৪, প্রকাশনী : মাকতাবাতুল মাআরিফ, রিয়াদ)
এছাড়াও সালাফে সালিহিনের আরও অনেকেই এ রাতের ফজিলতের কথা স্পষ্টভাবে বলে গেছেন। দ্বিতীয় অধ্যায়ে আমরা এ রাতের ফজিলত ও আমলের বিষয়ে সালাফের অনেকের বক্তব্য উল্লেখ করব ইনশাআল্লাহ। এখানে আমরা কয়েকজন বিজ্ঞ ফকিহ ও আলিমের নাম উল্লেখ করছি, যারা আহলে হাদিসদের কাছেও মান্যবর; অথচ তারা শবে বরাতের ফজিলতের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন :
ليلة النصف من شعبان، فقد روى في فضلها من الأحاديث المرفوعة والآثار ما يقتضي أنها ليلة مفضلة وأن من السلف من كان يخصها بالصلاة فيها.
‘শবে বরাতের ফজিলতের ব্যাপারে অনেক মারফু হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, এটা ফজিলতপূর্ণ একটি রাত। সালাফের অনেকে বিশেষভাবে এ রাতে (নফল) নামাজ পড়তেন।’ (ইকতিজাউস সিরাতিল মুসতাকিম : ২/১৩৬-১৩৭, প্রকাশনী : দারু আলামিল কুতুব, বৈরুত)
হাফিজ ইবনে হাজার হাইসামি রহ. বলেন :
وَالْحَاصِلُ أَنَّ لِهَذِهِ اللَّيْلَةِ فَضْلًا وَأَنَّهُ يَقَعُ فِيهَا مَغْفِرَةٌ مَخْصُوصَةٌ وَاسْتِجَابَةٌ مَخْصُوصَةٌ وَمِنْ ثَمَّ قَالَ الشَّافِعِيُّ - رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ - إنَّ الدُّعَاءَ يُسْتَجَابُ فِيهَا.
‘সারকথা হলো, শবে বরাতের ফজিলত সুসাব্যস্ত একটি বিষয়। এ রাতে বিশেষভাবে ক্ষমা করা হয় এবং বিশেষভাবে দুআ কবুল করা হয়। এ ভিত্তিতেই ইমাম শাফিয়ি রহ. বলেছেন, এ রাতে দুআ করা মুসতাহাব।’ (আল-ফাতাওয়াল ফিকহিয়্যাতুল কুবরা : ২/৮০, প্রকাশনী : আল-মাকতাবাতুল ইসলামিয়্যা)
আল্লামা আব্দুর রহমান মুবারকপুরি রহ. বলেন :
اعْلَمْ أَنَّهُ قَدْ وَرَدَ فِي فَضِيلَةِ لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ عِدَّةُ أَحَادِيثَ مَجْمُوعُهَا يَدُلُّ عَلَى أَنَّ لَهَا أَصْلًا.
‘জেনে রেখো যে, শবে বরাতের ফজিলতের ব্যাপারে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে, সমষ্টিগতভাবে যা প্রমাণ করে যে, এর ভিত্তি আছে।’ (তুহফাতুল আহওয়াজি : ৩/৩৬৫, প্রকাশনী : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
তিনি আরও বলেন :
فَهَذِهِ الْأَحَادِيثُ بِمَجْمُوعِهَا حُجَّةٌ عَلَى مَنْ زَعَمَ أَنَّهُ لَمْ يَثْبُتْ فِي فَضِيلَةِ لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ شَيْءٌ.
‘সামগ্রিকভাবে এ হাদিসগুলো ওই সব লোকদের বিপরীতে দলিল হবে, যারা ধারণা করে যে, শবে বরাতের ফজিলতের ব্যাপারে কোনো কিছু প্রমাণিত নয়।’ (তুহফাতুল আহওয়াজি : ৩/৩৬৭, প্রকাশনী : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
#দ্বিতীয় অধ্যায় : শবে বরাতের আমল ও ইবাদত #
শবে বরাতের ফজিলত সহিহ হাদিসের আলোকের সুসাব্যস্ত হলেও এ রাতে আমল করা যাবে কিনা, তা নিয়ে সালাফের মাঝে বেশ ইখতিলাফ দেখা যায়। আমরা এখানে তাদের মধ্যকার ইখতিলাফ উল্লেখ করে এ ব্যাপারে সঠিক ও প্রাধান্যপ্রাপ্ত মতটি দালিলিকভাবে তুলে ধরছি।
মুলত এ রাতে ইবাদত করার বিষয়ে দুটি মত পাওয়া যায়। এক. হিজাজের ফুকাহায়ে কিরাম। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন আতা রহ., ইবনে আবি মুলাইকা রহ., মালিক রহ. ও মদিনার ফকিহগণ। তারা বলেন, এ রাতে আলাদাভাবে কোনো অতিরিক্ত ইবাদত করা বিদআত হবে। কারণ, এ ব্যাপারে কোনো নস পাওয়া যায় না। দুই. সিরিয়ার ফুকাহায়ে কিরাম। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, মাকহুল রহ., খালিদ বিন মাদান রহ., লুকমান বিন আমির রহ., আওজায়ি রহ., ইসহাক বিন রাহুয়াহ রহ. প্রমুখ। তারা বলেন, এ রাতে ইবাদত করা যাবে। তবে ঘরে বসে ব্যক্তিগতভাবে নাকি মসজিদে এসে সবাই মিলে, এটা নিয়ে আবার দুটি মত পাওয়া যায়। ইমাম ইসহাক রহ.-এর মত হলো মসজিদে এসে সবাই মিলে ইবাদত করা যাবে। আর ইমাম আওজায়ি রহ.-এর মত হলো, না, এটা বরং ঘরে একাকী ও ব্যক্তিগতভাবে করতে হবে, মসজিদে এসে এলান করে ইবাদত করার অনুমতি নেই।
হাফিজ ইবনে রজব হাম্বলি রহ. এ রাতের ইবাদতের ব্যাপারে মতানৈক্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন :
وليلة النصف من شعبان كان التابعون من أهل الشام كخالد بن معدان ومكحول ولقمان بن عامر وغيرهم يعظمونها ويجتهدون فيها في العبادة وعنهم أخذ الناس فضلها وتعظيمها... وأنكر ذلك أكثر علماء الحجاز منهم عطاء وابن أبي مليكة ونقله عبد الرحمن بن زيد بن أسلم عن فقهاء أهل المدينة وهو قول أصحاب مالك وغيرهم وقالوا: ذلك كله بدعة.
‘আর তাবিয়িদের মধ্য হতে মাকহুল রহ., খালিদ বিন মাদান রহ. ও লুকমান বিন আমির রহ. প্রমুখ শবে বরাতকে সম্মানিত রাত মনে করতেন এবং এ রাতে বিশেষভাবে ইবাদত করতেন। তাঁদের থেকে লোকেরা এ রাতের মর্যাদা ও সম্মানের বিষয়টি গ্রহণ করেছে। ...কিন্তু হিজাজের অধিকাংশ উলামায়ে কিরাম এটাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, আতা রহ., ইবনে আবি মুলাইকা রহ.। আব্দুর রহমান বিন জাইদ রহ. এ মতটি মদিনার ফকিহদের থেকে বর্ণনা করেছেন। আর এটাই ইমাম মালিক রহ.-এর অনুসারী ও অন্যান্যদের মত। তারা বলেন, এগুলো সব বিদআত।’ (লাতায়িফুল মাআরিফ : পৃ. নং ১৩৭, প্রকাশনী : দারু ইবনি হাজাম)
এ দুটি মত হতে শক্তিশালী মত হলো, ব্যক্তিগতভাবে একাকী ঘরে বসে ইবাদত করা যাবে, তবে দলবদ্ধভাবে বা একাকী মসজিদে এসে জমায়েত হওয়া যাবে না। কারণ, একটি গ্রহণযোগ্য মুরসাল হাদিসে এ রাতে ঘরে বসে ইবাদত করার বিষয়ে বর্ণনা পাওয়া যায়। তাই ইবাদত বিষয়ক মাসআলায় অতিরিক্ত কিয়াস না করে এ হাদিসের ওপর ভিত্তি করে যারা বলেছেন যে, ঘরে একাকী ও ব্যক্তিগতভাবে ইবাদত করার যাবে, তাদের মতটিই অধিক শক্তিশালী।
হাদিসটি ইমাম বাইহাকি রহ. বর্ণনা করেছেন। তিনি নিজ সনদে বলেন :
أَخْبَرَنَا أَبُو نَصْرِ بْنُ قَتَادَةَ، حَدَّثَنَا أَبُو مَنْصُورٍ مُحَمَّدُ بْنُ أَحْمَدَ الْأَزْهَرِيِّ الْهَرَوِيُّ، حَدَّثَنَا الْحُسَيْنُ بْنُ إِدْرِيسَ، حَدَّثَنَا أَبُو عُبَيْدِ اللهِ ابْنُ أَخِي ابْنِ وَهْبٍ، حَدَّثَنَا عَمِّي، حَدَّثَنَا مُعَاوِيَةُ بْنُ صَالِحٍ، عَنِ الْعَلَاءِ بْنِ الْحَارِثِ، أَنَّ عَائِشَةَ، قَالَتْ: قَامَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ اللَّيْلِ يُصَلِّي فَأَطَالَ السُّجُودَ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ قَدْ قُبِضَ، فَلَمَّا رَأَيْتُ ذَلِكَ قُمْتُ حَتَّى حَرَّكْتُ إِبْهَامَهُ فَتَحَرَّكَ، فَرَجَعْتُ، فَلَمَّا رَفَعَ رَأْسَهُ مِنَ السُّجُودِ، وَفَرَغَ مِنْ صَلَاتِهِ، قَالَ: " يَا عَائِشَةُ أَوْ يَا حُمَيْرَاءُ ظَنَنْتِ أَنَّ النَّبِيَّ خَاسَ بِكِ؟ "، قُلْتُ: لَا وَاللهِ يَا رَسُولَ اللهِ وَلَكِنِّي ظَنَنْتُ أَنَّكَ قُبِضْتَ لِطُولِ سُجُودِكَ، فَقَالَ: " أَتَدْرِينَ أَيَّ لَيْلَةٍ هَذِهِ؟ "، قُلْتُ: اللهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ: " هَذِهِ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ يَطْلُعُ عَلَى عِبَادِهِ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِلْمُسْتَغْفِرِينَ، وَيَرْحَمُ الْمُسْتَرْحِمِينَ، وَيُؤَخِّرُ أَهْلَ الْحِقْدِ كَمَا هُمْ
‘আয়িশা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো এক রাতে নামাজ পড়তে লাগলেন। নামাজে সিজদা এত দীর্ঘায়িত করলেন যে, আমি ধারণা করছিলাম, তিনি বোধহয় দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করেছেন। আমি এটা দেখার পর উঠে গিয়ে তার বৃদ্ধাঙ্গুলে নাড়া দিলাম। এরপর তিনি নড়ে উঠলে আমি নিজের জায়গায় ফিরে আসলাম। এরপর যখন সিজদা থেকে মাথা উঠিয়ে নামাজ শেষ করলেন, তখন বললেন, হে আয়িশা, তুমি ধারণা করেছিলে, আল্লাহর নবি তোমার সাথে অঙ্গিকার ভঙ্গ করবেন? আমি বললাম, সত্যিই না, ইয়া রাসুলাল্লাহ। তবে আমি আপনার দীর্ঘ সিজদা দেখে ধারণা করেছিলাম, আপনার মৃত্যু হয়ে গেছে। তখন তিনি বললেন, তুমি কি জানো, আজ কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তার রাসুলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, আজ হলো মধ্য শাবানের রজনী (১৫ তারিখের রাত তথা শবে বরাত)। আল্লাহ তাআলা মধ্য শাবানের রজনীতে বান্দাদের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেন, অতঃপর ক্ষমাপ্রার্থীদের ক্ষমা করে দেন, দয়াপ্রত্যাশীদের দয়া করেন, কিন্তু বিদ্বেষ পোষণকারীদের আপন অবস্থায় রেখে দেন অর্থাৎ তাদের ক্ষমা করেন না।’ (শুআবুল ইমান : ৫/৩৬১-৩৬২, হা. নং ৩৫৫৪, প্রকাশনী : মাকতাবাতুর রুশদ, রিয়াদ)
ইমাম বাইহাকি রহ. হাদিসটিকে গ্রহণযোগ্য আখ্যা দিয়ে বলেন :
قُلْتُ: هَذَا مُرْسَلٌ جَيِّدٌ وَيُحْتَمَلُ أَنْ يَكُونَ الْعَلَاء بْنُ الْحَارِثِ أَخَذَهُ مِنْ مَكْحُولٍ وَاللهُ أَعْلَمُ،
‘আমি বলব, এটা ভালো মুরসাল একটি হাদিস। সম্ভাবনা আছে যে, আলা বিন হারিস রহ. হাদিসটি মাকহুল রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহই ভালো জানেন।’ (শুআবুল ইমান : ৫/৩৬২, হা. নং ৩৫৫৪, প্রকাশনী : মাকতাবাতুর রুশদ, রিয়াদ)
সাধারণত কোনো তাবিয়ি কর্তৃক কোনো একটি হাদিস সাহাবির সূত্র উল্লেখ না করে সরাসরি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করা হলে সে হাদিসকে মুরসাল বলা হয়। অবশ্য কখনো ‘মুনকাতি’ বা সূত্রবিচ্ছিন্ন হাদিসকেও মুরসাল বলে পরিচয় দেওয়া হয়। এখানে দ্বিতীয় অর্থে মুরসাল বলা হয়েছে। এ হাদিসটি মুরসাল তথা সূত্রবিচ্ছিন্ন হলেও ইমাম বাইহাকি রহ. যেহেতু হাদিসটিকে জাইয়িদ বা ভালো বলে মন্তব্য করেছেন; এতে বুঝা যায়, এটা গ্রহণযোগ্য ও আমলযোগ্য। এর কারণও তিনি ইঙ্গিতে বলে দিয়েছেন যে, আলা বিন হারিস রহ. হাদিসটি সম্ভবত মাকহুল রহ. সূত্রে আয়িশা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন। আর এমনটা হলে তো হাদিসটি নিয়ে কারও কোনো কথা থাকে না। আর এজন্যই এটাকে তিনি সরাসরি সহিহ না বলে জাইয়িদ বলেছেন, যা হাসান স্তরের হাদিস। আর সহিহ ও হাসান উভয় স্তরের হাদিস দিয়েই শরিয়তের মাসআলা সাব্যস্ত করা যায়। আর ফাজায়িলের ক্ষেত্রে তো দুর্বল হাদিসও গ্রহণযোগ্য।
সুতরাং শবে বরাতে ব্যক্তিগতভাবে একটু ভালোভাবে সময় নিয়ে ইবাদত করা যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সাব্যস্ত হলো তখন এটাকে বিদআত বলার অবকাশ নেই। তাই এ মাসআলায় হিজাজের ফুকাহায়ে কিরামের চাইতে সিরিয়ার ফুকাহায়ে কিরামের মতই অধিক শক্তিশালী হবে। তবে ইবাদতের ক্ষেত্রে যেহেতু নিয়ম হলো, এতে নিজের পক্ষ থেকে কিয়াস বা অনুমান করে কোনো কিছু বাড়তি-কমতি করা যাবে না; বিধায় এ রাতে ইবাদতের নামে মসজিদে একত্রিত হওয়া এবং সবাই মিলে সেখানে রাত জেগে ইবাদত করা ঠিক হবে না। বরং এটা একটি অতিরিক্ত রুসুমে পরিণত হবে, যার কোনো প্রমাণ কুরআন ও সুন্নাহয় নেই।
#এ রাতে অতিরিক্ত কিছু নফল ইবাদত ও দুআ করার ব্যাপারে আরও অনেক সালাফ ও ইমামের মত পাওয়া যায়। আমরা এখানে তাদের কয়েকজনের থেকে এ বিষয়ে মতামত উল্লেখ করছি।
ইবনে উমর রা. বলেন :
خَمْسُ لَيَالٍ لَا تُرَدُّ فِيهِنَّ الدُّعَاءَ: لَيْلَةُ الْجُمُعَةِ، وَأَوَّلُ لَيْلَةٍ مِنْ رَجَبٍ، وَلَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، وَلَيْلَتَيِ الْعِيدَيْنِ
‘পাঁচ রাতের দুআ প্রত্যাখ্যাত হয় না। এক. জুমআর রাতে। দুই. রজবের প্রথম রাতে। তিন. মধ্য শাবানের রাতে। চার. ইদুল ফিতরের রাতে। পাঁচ. ইদুল আজহার রাতে।’ (মুসান্নাফু আব্দির রাজ্জাক : ৪/৩১৭, হা. নং ৭৯২৭, প্রকাশনী : আল-মাজলিসুল ইলমি, ভারত)
ইমাম শাফিয়ি রহ. বলেন :
وَبَلَغَنَا أَنَّهُ كَانَ يُقَالُ: إنَّ الدُّعَاءَ يُسْتَجَابُ فِي خَمْسِ لَيَالٍ فِي لَيْلَةِ الْجُمُعَةِ، وَلَيْلَةِ الْأَضْحَى، وَلَيْلَةِ الْفِطْرِ، وَأَوَّلِ لَيْلَةٍ مِنْ رَجَبٍ، وَلَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ... (قَالَ الشَّافِعِيُّ) : وَأَنَا أَسْتَحِبُّ كُلَّ مَا حُكِيَتْ فِي هَذِهِ اللَّيَالِيِ مِنْ غَيْرِ أَنْ يَكُونَ فَرْضًا.
‘আমাদের কাছে এ বর্ণনা পৌঁছেছে যে, বলা হয়, পাঁচ রাতে দুআ কবুল হয়। এক. জুমআর রাতে। দুই. ইদুল আজহার রাতে। তিন. ইদুল ফিতরের রাতে। চার. রজবের প্রথম রাতে। পাঁচ. মধ্য শাবানের রাতে। ...(ইমাম শাফিয়ি রহ. বলেন,) আর আমি এসব রাতের ব্যাপারে যা বর্ণনা করলাম, তা করা (অর্থাৎ দুআ করা) পছন্দ করি। তবে এটা আবশ্যক কিছু নয়।’ (আল-উম্মু : ১/২৬৪, প্রকাশনী : দারুল মারিফা, বৈরুত)
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন :
وَأَمَّا لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَفِيهَا فَضْلٌ، وَكَانَ فِي السَّلَفِ مَنْ يُصَلِّي فِيهَا، لَكِنَّ الِاجْتِمَاعَ فِيهَا لِإِحْيَائِهَا فِي الْمَسَاجِدِ بِدْعَةٌ وَكَذَلِكَ الصَّلَاةُ الْأَلْفِيَّةُ.
‘শবে বরাতের ব্যাপারে কথা হলো, এ রাতের ফজিলত আছে। সালাফের মধ্যে অনেকেই এ রাতে (নফল) নামাজ পড়তেন। কিন্তু রাত্রি জাগরনের উদ্দেশ্যে এ রাতে মসজিদে একত্রিত হওয়া বিদআত। এভাবে আলফিয়া বা হাজার রাকআত নামের বিশেষ নামাজও বিদআত।’ (আল-ফাতাওয়াল কুবরা : ৫/৩৪৪, প্রকাশনী : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত)
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. আরও বলেন :
ليلة النصف من شعبان، فقد روى في فضلها من الأحاديث المرفوعة والآثار ما يقتضي أنها ليلة مفضلة وأن من السلف من كان يخصها بالصلاة فيها، وصوم شهر شعبان قد جاءت فيه أحاديث صحيحة. ومن العلماء: من السلف من أهل المدينة، وغيرهم من الخلف، من أنكر فضلها، وطعن في الأحاديث الواردة فيها، كحديث: «إن الله يغفر فيها لأكثر من عدد شعر غنم كلب». وقال: لا فرق بينها وبين غيرها. لكن الذي عليه كثير من أهل العلم، أو أكثرهم، من أصحابنا وغيرهم -على تفضيلها، وعليه يدل نص أحمد، لتعدد الأحاديث الواردة فيها، وما يصدق ذلك من الآثار السلفية، وقد روي بعض فضائلها في المسانيد والسنن. وإن كان قد وضع فيها أشياء أخر.
‘শবে বরাতের ফজিলতের ব্যাপারে অনেক মারফু হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, এটা ফজিলতপূর্ণ একটি রাত। সালাফের অনেকে বিশেষভাবে এ রাতে (নফল) নামাজ পড়তেন। আর শাবান মাসে রোজা রাখার ব্যাপারে অনেক সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। সালাফের মধ্য হতে মদিনার উলামায়ে কিরাম ও পরবর্তী কিছু উলামায়ে কিরাম এ রাতের ফজিলত অস্বীকার করেছেন এবং এসংক্রান্ত বর্ণিত হাদিসগুলোর ব্যাপারে বিতর্ক করেছেন। যেমন এ হাদিস যে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা এ রাতে কালব গোত্রের ছাগলের পালের চেয়েও অধিকসংখ্যক লোককে ক্ষমা করে দেন।’ তাঁরা বলেন, এ রাত ও অন্যান্য রাতের মাঝে তেমন পার্থক্য নেই। কিন্তু আমাদের ও অন্যান্য মাজহাবের অনেক বা অধিকাংশ উলামায়ে কিরামের মত হলো, এ রাতের আলাদা ফজিলত আছে। ইমাম আহমাদ রহ.-এর ভাষ্য এমনটাই বুঝায়। কেননা, এ রাতের ফজিলতের হাদিসগুলো একাধিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তাছাড়াও (এ ব্যাপারে) সালাফের আসার ও আমলও তা সত্যায়ন করে। এ রাতে কিছু ফজিলত মুসনাদ ও সুনানের কিতাবসমূহে বর্ণিত হয়েছে; যদিও এ ব্যাপারে বেশ কিছু মওজু হাদিসও আছে।’ (ইকতিজাউস সিরাতিল মুসতাকিম : ২/১৩৬-১৩৭, প্রকাশনী : দারু আলামিল কুতুব, বৈরুত)
ইমাম নববি রহ. বলেন :
وَاسْتَحَبَّ الشَّافِعِيُّ وَالْأَصْحَابُ الْإِحْيَاءَ الْمَذْكُورَ مَعَ أَنَّ الْحَدِيثَ ضَعِيفٌ لِمَا سَبَقَ فِي أَوَّلِ الْكِتَابِ أَنَّ أَحَادِيثَ الْفَضَائِلِ يُتَسَامَحُ فِيهَا وَيُعْمَلُ عَلَى وَفْقِ ضَعِيفِهَا
‘ইমাম শাফিয়ি রহ. ও তার অনুসারীগণ উল্লিখিত (দুই ইদের রাত, জুমআর রাত, রজবের প্রথম রাত ও মধ্য শাবানের রাত ইত্যাদি) রাত্রি জাগরণকে মুসতাহাব বলেছেন; অথচ এ ব্যাপারে বর্ণিত হাদিসটি দুর্বল। কারণ হলো, কিতাবের শুরুতে পূর্বেই গত হয়েছে যে, ফজিলত-সংক্রান্ত হাদিসসমূহের ক্ষেত্রে একটু শিথিলতা করা হয়ে থাকে এবং দুর্বল হাদিস অনুসারে আমল করার অবকাশ থাকে।’ (আল-মাজমু শারহুল মুহাজ্জাব : ৫/৪৩, প্রকাশনী : দারুল ফিকর, বৈরুত)
হাফিজ ইবনে হাজার হাইসামি রহ. বলেন :
وَالْحَاصِلُ أَنَّ لِهَذِهِ اللَّيْلَةِ فَضْلًا وَأَنَّهُ يَقَعُ فِيهَا مَغْفِرَةٌ مَخْصُوصَةٌ وَاسْتِجَابَةٌ مَخْصُوصَةٌ وَمِنْ ثَمَّ قَالَ الشَّافِعِيُّ - رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ - إنَّ الدُّعَاءَ يُسْتَجَابُ فِيهَا.
‘সারকথা হলো, শবে বরাতের ফজিলত সুসাব্যস্ত একটি বিষয়। এ রাতে বিশেষভাবে ক্ষমা করা হয় এবং বিশেষভাবে দুআ কবুল করা হয়। এ ভিত্তিতেই ইমাম শাফিয়ি রহ. বলেছেন, এ রাতে দুআ করা মুসতাহাব।’ (আল-ফাতাওয়াল ফিকহিয়্যাতুল কুবরা : ২/৮০, প্রকাশনী : আল-মাকতাবাতুল ইসলামিয়্যা)
আল্লামা ইবনে নুজাইম মিসরি রহ. মুনইয়াতুল মুসল্লি গ্রন্থের উদ্ধৃতিতে বলেন :
وَمِنْ الْمَنْدُوبَاتِ إحْيَاءُ لَيَالِي الْعَشْرِ مِنْ رَمَضَانَ وَلَيْلَتَيْ الْعِيدَيْنِ وَلَيَالِي عَشْرِ ذِي الْحِجَّةِ وَلَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ كَمَا وَرَدَتْ بِهِ الْأَحَادِيثُ.
‘রমজানের (শেষ) দশ রাত, দুই ইদের রাত, জিলহজের (প্রথম) দশ রাত ও মধ্য শাবানের রাত্রি জাগরণ মুসতাহাব ও উত্তম; যেমনটি হাদিসসমূহে এসেছে।’ (আল-বাহরুর রায়িক : ২/৫৬, প্রকাশনী : দারুল কিতাবিল ইসলামি, বৈরুত)
মূলত এখানে আরও অনেক সালাফের নাম উল্লেখ করা যেত। কিন্তু এভাবে লিস্ট করলে কলেবর অনেক বড় হয়ে যাবে। যে দলিলগুলো উল্লেখ করা হয়েছে, হকপ্রত্যাশীদের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ। মোটকথা, শবে বরাতে নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি না বানিয়ে, নামাজের বিশেষ কোনো রাকআত-সংখ্যা বা নিয়ম তৈরি না করে, দলবদ্ধভাবে বা মসজিদে জমায়েত না হয়ে এককভাবে ঘরে কিছু নফল ইবাদত-বন্দেগি করার বিষয়টি হাদিস, সালাফের আমল ও ফুকাহায়ে কিরামের ফতোয়া থেকে প্রমাণিত। আর এটা যেহেতু নফল ও মুসতাহাব একটি বিষয়, তাই এ নিয়ে কোনো পক্ষেরই বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। আমলকারীরাও বিপরীত মতের লোকদের কটাক্ষ করবে না এবং আমল থেকে নিবৃত্ত থাকা ব্যক্তিরাও আমলকারীদের বিষয়ে কোনো কটু কথা বলতে পারবে না। এভাবে উভয় পক্ষ শান্ত থেকে কাজ করলে তবেই হবে তা শরয়ি দাবি ও তাকাজার বাস্তবায়ন। তা না করে উভয় পক্ষের যারাই এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করে, মুসতাহাবকে ফরজ মনে করবে কিংবা শরিয়া-অনুমোদিত কাজকে বিদআত বলে হাঙ্গামা করে, এরা সবাই মূলত প্রান্তিকতার শিকার। অতএব, সবাইকে এ বিষয়ে সংযত থাকতে হবে।
(শাইখ মুফতি তারেকুজ্জামান তারেক এর লিখা হতে)
(বিঃদ্রঃ শাইখের পুরো লিখাটা অনেক বড়
তাই সংক্ষেপে জানানো হচ্ছে যে,
শবে বরাতে রোজা রাখার আলাদা কোন ফজিলত নেই, সে রাতের পরদিন রোজা রাখার হাদিস অধিক দুর্বল তাই অধিক বিশুদ্ধ মতানুযায়ী তা আমলযোগ্য না সুতরাং এই দিন উপলক্ষে রোজা না রেখে শা'বান মাসে যতদিন সম্ভব রোজা রাখা যায় বা আইয়ামে বীযের রোজা রাখা যায় অভ্যাস অনুযায়ী)
-লিখাটা কপি/শেয়ার করতে পারেন
যাতে আরো মানুষের কাছে পৌছায়।