13/05/2026
মৃত্যুর পর যমদূত, পিণ্ডদান ও আত্মার গতি নিয়ে শাস্ত্রীয় মীমাংসা।
মৃত্যুর পর “যমদূত এসে আত্মাকে ধরে নিয়ে যায়”, “যমরাজ বিচার করেন”, অথবা “পিণ্ডদান” করালে মৃতের মুক্তি হয়” এই ধরনের ধারণা সনাতন সমাজে বহুল প্রচলিত। বিশেষত পুরাণ, লোককথা ও কল্পনানির্ভর বর্ণনার মাধ্যমে এই বিশ্বাসগুলো সাধারণ মানুষের মনে গভীরভাবে গেঁথে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো— এই ধারণাগুলোর প্রকৃত বৈদিক ভিত্তি কতটুকু? বেদ, উপনিষদ ও দর্শনশাস্ত্র কী সত্যিই এমন কোনো যমদূত-তত্ত্ব শিক্ষা দেয়? নাকি এগুলো পরবর্তীকালের কল্পনা ও লোকবিশ্বাস? সনাতন বৈদিক ধর্ম মূলত কর্মতত্ত্ব, নৈতিকতা ও আত্মজ্ঞানভিত্তিক একটি দর্শন। প্রথমেই বলি, সনাতন ধর্ম আব্রাহামিক ধর্মগ্রন্থগুলোর মতো ভয় ভীতি প্রদর্শন পূর্বক আলিফ লায়লার উপন্যাস নয়।
তাই মৃত্যুর পর আত্মার গতি সম্পর্কে বৈদিক শাস্ত্র কী বলে, তা বিচার করতে হলে আমাদের বেদ, উপনিষদ ও দর্শনের মূল বক্তব্যের দিকে ফিরে যেতে হবে।
🌿যম কে?
(য়মু উপরমে) এই ধাতু হইতে 'যম' শব্দ সিদ্ধ হয়, য়ঃ সর্বান্ প্রাণিনো নিয়চ্ছতি স য়মঃ” যিনি সকল প্রাণীর কর্মফল দানের ব্যবস্থা করেন এবং সকল অন্যায় হইতে পৃথক থাকেন, এই কারণে সেই পরমেশ্বরের নাম 'যম'।
পবিত্র বেদে বলা আছে-
★ষলিদ্ য়মা ঋষয়ো দেবতা ইতি। [ঋগ্বেদ ১/১৬৪/১৫]
এই মন্ত্রে ঋতুগুলির নাম যম।
★শকেম বাজিনো য়মম্। [ঋগ্বেদ 2/5/1]
এই মন্ত্রে পরমেশ্বরের নাম যম।
★য়মায় জুহুতা হবিঃ। য়মং হ যজ্ঞো গচ্ছত্যগ্নিদ্যতো অরঙ্কৃতঃ। [ঋ১০/১৪/১৩]
এই মন্ত্রে অগ্নির নাম যম।
★য়মঃ সূয়মানো বিষ্ণুঃ সম্ভ্রিয়মাণো বায়ুঃ পূয়মানঃ। [যজু ৮/৫৭]
এই মন্ত্রে বায়ু, বিদ্যুৎ ও সূর্যের নাম যম।
★ য়মং মাতরিশ্বানমাহুঃ [ঋগ্বেদ ১/১৬৪/৪৬]
এই মন্ত্রেও পরমেশ্বরের নাম যম।
অর্থাৎ বেদাদি শাস্ত্রে যম বলতে পরমেশ্বর, বায়ু, বিদ্যুৎ, সূর্য, ঋতু, অগ্নি ইত্যাদি বোঝায়। এবং যিনি বিশ্বজগতকে নিয়মে পরিচালনা করেন, সকল জীবকে তাদের কর্ম অনুযায়ী ফল দেন তিনিই যম। এখানে কোথাও এমন কোন দেবতার কথা লেখা নাই যে দূত পাঠিয়ে আত্মাকে নিয়ে যান।
🌿 পিণ্ডদান ও শ্রাদ্ধ : বৈদিক নাকি পরবর্তী প্রথা?
সমাজে প্রচলিত ধারণা হলো— মৃত্যুর পর পিণ্ডদান, শ্রাদ্ধ বা ব্রাহ্মণ ভোজন করালে মৃত আত্মার সদগতি হয়। কিন্তু বেদ ও স্মৃতিশাস্ত্র এই বিষয়ে কী বলে?
বায়ুরনিলমমৃতমথেদং ভস্মান্তং শরীরম্।
ওম্ ক্রতো স্মর। ক্লিবে স্মর। কৃতং স্মর।।
[ যজুর্বেদ ৪০/১৫ ]
পদার্থ:- (বায়ুরনিলমমৃতমথেদং) প্রানস্বরূপ বায়ু অবিনাশি কিন্তু (ভষ্মান্তং) ভষ্মেই অন্ত (শরীরম্) শরীরের
অর্থঃ---প্রাণস্বরূপ বায়ু তথা আত্মা অবিনাশী কিন্তু শরীর বিনাশী ভষ্ম তথা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মাধ্যমেই ইহার অন্ত হইয়া থাকে।
নিষেকাদিঃ শ্মশানান্তো মন্ত্রৈর্যস্যোদিতো বিধিঃ। [মনুস্মৃতি ২/১৬]
নিষেক থেকে আরম্ভ করে শ্মশানকৃত্য অর্থাৎ দাহকালীন অন্তেষ্টি পর্যন্ত সমস্ত বিধান বা কর্তব্যতা ... মন্ত্রের দ্বারা নির্বাহিত হয়।
এই দুই প্রমাণে আমরা দেখি মৃতদেহকে দাহ করার মাধ্যমেই তার সমস্ত সংস্কারকাজ সমাপ্ত হয়ে যায়। তাহলে এই পিণ্ডদান ইত্যাদি কর্মের ভিত্তি কী? মনে হয় না কোনো ভিত্তি আছে কোনো কপোলকল্পিত পুরাণ ছাড়া। বস্তুত, আত্মার গতি নির্ধারিত হয় তার কর্মের মাধ্যমে। এটাই সনাতন ধর্মের অতি সূক্ষ্ম তত্ত্ব। এ ব্যাপারে বৃহদারণ্যক উপনিষদেই স্পষ্ট বলা হয়েছে। যথা-
"যথাকারী যথাচারী তথা ভবতি সাধুকারী সাধুর্ভবতি পাপকারী পাপো ভবতি পুণ্যঃ পুণ্যেন কর্মণ্য ভবতি পাপঃ পাপেন৷ অথো খল্বাহুঃ কামময় এবায়ং পুরুষ ইতি স যথাকামী ভবতি তৎক্রতুর্ভবতি যৎক্রতুর্ভবতি তৎকর্ম কুরুতে যৎ কর্ম কুরুতে তদভিসংপদ্যতে৷।"
[বৃহদারণ্যক উপনিষদ ৪।৪।৫]
অনুবাদঃ যে ব্যক্তি যেরকম কাজ করে ও যে আচরণ করে, সে ব্যক্তি সেই রকম হয়৷ শুভকর্মকারী সাধু হয়, পাপচারী পাপী হয়, পুণ্যকর্মের ফলে পুণ্যবান হয় এবং পাপকর্মের ফলে পাপী হয়৷ আবার অনেকে বলেন, 'এই পুরুষ কামনাময়'। সে যেমন কামনা করে সেই রকম সংকল্পযুক্ত হয়৷ যেমন সংকল্পযুক্ত হয়, সেই রকম কর্ম করে৷ সে যেমন কর্ম করে, তেমন ফল পায়৷
অতএব, জীবিত থাকতে সদ কর্ম করার অনুপ্রেরণা না দিয়ে মৃত্যুর পর অহেতুক পিণ্ডদান প্রভৃতি ব্যাবস্থা করা নিরর্থক। অধিকার ব্যাক্তিরা মনে করে থাকেন যে, মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধ, তর্পন, পিণ্ডদান নাকি বৈদিক কর্ম। কিন্তু এটা যে পুরোই অজ্ঞতা ও মূর্খতার দাবি, তা বেদ পাঠ করলে বুঝতে পারবেন। তাহলে আসুন এ ব্যাপারে সরাসরি বেদ থেকে দেখে নিই।
অপাঙ্প্রাঙেতি স্বধয়া গৃভীতোঽমর্ত্যো মর্ত্যেনা সয়োনিঃ।
তা শশ্বন্তা বিষূচীনা বিয়ন্তা ন্যন্যং চিক্যুর্ন নি চিক্যুরন্যম্ ॥
[ঋগ্বেদ ১/১৬৪/৩৮]
বঙ্গানুবাদঃ- জীবাত্মা অশুভ কার্য করিয়া নীচ গতি প্রাপ্ত হয় এবং শুভ কার্য করিয়া উর্দ্ধগতি প্রাপ্ত হয়। সে মৃত্যুহীন, কিন্তু মরণশীল ভৌতিকদেহের সহিত একস্থানে বাস করে ও অন্ন জলাদি গ্রহণ করে। জীবাত্মা শরীর হইতে সর্বদা পৃথক। কর্মফল ভোগের জন্য সে লোক লোকান্তর গমন করে। সে সর্বত্র গমনশীল। মননশীল মনুষ্য জীবাত্মাকে শরীর হইতে পৃথক মনে করে না।
এবার আসুন উপনিষদ থেকে উদ্ধৃতি
যোনিমন্যে প্রপদ্যস্তে শরীরত্বায় দেহিনঃ । স্থানুমনোহনুসংযন্তি যথাকর্ম যথাশ্রুতম্।।
[কঠোপনিষদ ২/২/৭]
সরলার্থ – নিজ নিজ পূর্ব জন্মের কর্ম ও জ্ঞান অনুসারে কোন কোন জীবাত্মা মাতৃগর্ভে কোন প্রাণীরূপে জন্মগ্রহণ করেন। অপর কেহ কেহ তাহার কর্মানুসারে বৃক্ষাদি স্থাবর জন্ম গ্রহণ করেন।
🍀অনেকে মধ্যে উৎপন্ন হয় যে মৃত্যু ব্যাক্তির উদ্দেশ্যে পিণ্ড দিলে বা ব্রাহ্মণকে গরু দান, তীর্থ গমন ইত্যাদি করলে ঈশ্বর খুশি হয়ে মৃত্যু ব্যক্তিকে বৈকুণ্ঠধামে পাঠাবে। কিন্তু এক আত্মার কর্মফল অন্য আত্মা পায় না 👇
আত্মান্তরগুণানামাত্মান্তরে কারণত্বাত্
[বৈশেষিক দর্শন ৬/৫/১]
অর্থাৎ এক আত্মার গুণ অন্য আত্মার পরিস্থিতির কারণ হতে পারে না অর্থাৎ আপনার যেকোনো ধরনের কর্মের ফল অপর আত্মা পেতে পারে না।
তাই কেউ ব্রাহ্মণ ভোজন করালেন বা গরুদান করলেন— এর ফল অন্য মৃত আত্মা ভোগ করবে, এমন ধারণার মিথ্যা। ঈশ্বরই প্রকৃত ফলদাতা,
য়চ্চ স্বভাবং পচতি বিশ্বযোনি: পাচ্যাংশ্চ সর্বান পরিণাময়েদ্য:।
সর্বমেতদ্বিশ্বমধিতিষ্ঠত্যেকো গুণাংশ্চ সর্বান বিনিয়োজয়েদ্য:।।
[শ্বেতাশ্বেতর উপনিষদ ৫/৫]
অনুবাদঃ সমস্ত জগতের কারণ যেই ব্রহ্ম জীবদের কৃতকর্মের ফল প্রদান করেন , তথা কার্যরূপে আগত সমস্ত তত্বকে পরিণত করেন , যিনি এই সম্পূর্ন বিশ্বের অধিষ্ঠাতা , উহাই একমাত্র ব্রহ্মতত্ব - সত্ব , রজ , তম - এইসব প্রকৃতিরূপ গুন সমূহকে নিজের নিজের কার্যে প্রযুক্ত করেন । উনিই এইসবের নিয়ামক ।।
যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ বলেছে-
নাদত্তে কস্যচিতপাপং ন চৈব সুকৃতং বিভুঃ।
অজ্ঞানেনাবৃতং জ্ঞানং তেন মুহ্যন্তি জন্তবঃ''
[গীতা ৫/১৫]
অর্থঃ ঈশ্বর জীবের পাপ এবং পূর্ণ কিছুই গ্রহন করেন না। অজ্ঞানের দ্বারা আবদ্ধ হওয়ার ফলে জীবসত্তা এই প্রকৃত জ্ঞান সম্পর্কে মোহাচ্ছন্ন হয়ে থাকে।।
ঋষি ব্যাসদেব বলেছে -
য়থা ধেনুসহস্রেষু বসো বিন্দতি মাতরম্। এবং পূর্বকৃতং কর্ম কর্তারমনুগচ্ছতি।।২২।। অচোদ্যমানানি য়থা পুষ্পাণি চ ফলানি চ স্বকালং নাতিবর্তন্তে তথা কর্ম পুরা কৃতম্।২৩৷৷ [মহাভারত অনুশাসন পর্ব, ৭ অধ্যায়, ২২,২৩ শ্লোক]
অনুবাদঃ যেমন বাছুর কে তার মা হাজারো গরুর মধ্যে থেকে খুঁজে বের করে, ঠিক তেমনই পূর্বের কৃতকর্ম কর্তা খুঁজে বের করে তাকে অনুসরণ করে অর্থাৎ কর্তা কে প্রাপ্ত হয়। যেমন ফুল এবং ফল নিজের সময়ের উলঙ্ঘন করে না, ঠিক তেমনই পূর্বের কৃতকর্মের ফল সময় অনুসারে অবশ্যই ভোগ করতে হবে।
মানুষের মুক্তি নির্ভর করে তার নিজ কর্ম, জ্ঞান ও চরিত্রের উপর; মৃত্যুর পরের আচার নয়, জীবিত অবস্থার নৈতিক জীবনই প্রকৃত পথ নির্ধারণ করে।
ও৩ম্ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।