04/07/2021
স্বামী বিবেকানন্দের প্রয়ান
১৯০২ সালের ৪ জুলাই মৃত্যু হয় স্বামী বিবেকানন্দের। তাঁর নশ্বর দেহ পঞ্চভূতে বিলীন হলেও তাঁর অমর বাণীগুলি চিরদিন বেঁচে থাকবে।
স্বামী বিবেকানন্দের শরীরটা ভালো যাচ্ছে না, খুব দুর্বল।হাঁটলে পায়ে ব্যথা হয়, উপবাসে শরীর দিনকে দিন দূর্বল হয়ে পড়েছে , হাঁপানীর টানেও কষ্ট পান।
গতকাল উপোস ছিলেন, আজও খাবার ইচ্ছা নাই। শুধু একগ্লাস ঠান্ডা দুধ চাইলেন, ঘোরধরা চোখের সামনে উঁকি দিয়ে গেল নরেনের (বিবেকানন্দের আগের নাম) পুরানো স্মৃতি।গ্লাসটা পড়ে চুরমার হয়ে ভেঙে গেল।
ব্রহ্মানন্দ, যিনি তাঁর বাল্যকালের বন্ধু বললেন কি হলো নরেন, শরীর খারাপ লাগছে? তারপর তাঁকে জোর করে উপরে নিয়ে শুইয়ে দিলেন। তাঁর সেবার জন্য একজনকে রাখা হলো, তিনি বই পড়তে চেষ্টা করলেন কিন্তু বার বার তন্দ্রাচ্ছন হয়ে ঘুমিয়ে পড়ছেন।
পরদিন শরীর পুরা ঝরঝরা, হাঁটলে পায়ে ব্যথাবোধ নাই, চোখের দৃষ্টি ঝকঝকে, রোগ বালাইয়ের কোন চিহ্নই নাই, নিজেকে খুব টাটকা মনে হলো তাঁর।
তিনঘন্টা জপ করার পরে তাঁর ক্ষুধা লাগলো। তিনি ঠিক করলেন, আজ তিনি ভাতের সাথে ঝাল মশলা দেওয়া খাবার খাবেন, অম্বল ও খাবেন। না খেয়ে খেয়ে শরীরটা খুব জীর্ণ হয়ে পড়েছে।
সেদিন বেলুড়ঘাটে জেলের নৌকো ভিড়েছিল। সোনায় সোহাগার মতো সে সময় মঠের জন্য গঙ্গায় ধরা ইলিশ কিনছিলেন প্রেমানন্দ। তিনি সেখানে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং নিজে পছন্দ করে বড় বড় গঙ্গার ইলিশ কিনলেন।
ব্রজেন নামের শিষ্যটি পূর্ববঙ্গের, তিনি বললেন, কিরে বাঙ্গাল তোদের দেশে এতো বড় বড় ইলিশ পাওয়া যায়?
ব্রজেন গর্ব করে বললো, আমাদের পদ্মার ইলিশ আরও অনেক বড়!
হ্যাঁরে তোদের ওখানে নাকি ইলিশের পূজা করা হয়?
ব্রজেন বললো, সেতো স্বরস্বতী পূজার পর। দূর্গা পূজার বিজয়া দশমীর পর ইলিশ খাওয়া বারন,স্বরস্বতী পূজার পর আবার জোড়া ইলিশ ঘরে আনতে হয়।
স্বামীজি নির্দশ দিলেন, ভাজা ইলিশ, ঝোল ইলিশ আর অম্বল ইলিশের।
তিনি পূজার ঘরে কয়েকঘন্টা কাটানোর পর বাইরে বেরিয়ে এলেন। আজ তাঁর কন্ঠের কোন জড়তা নেই, নেই হাঁপানির টান।
খাবার ঘন্টা বাজতেই বললেন, ওরে চল চল, ইলিশ মাছের ঝোল ঠান্ডা করা মহাপাপ, আবার গরম করলে সেই স্বাদ থাকেনা।
অনেকদিন পর তিনি খুব তৃপ্তি করে খেলেন ভাজা ইলিশ আর মাছের ঝোল দিয়ে। একটু ঝাল কম হওয়ায় পাতে কাঁচামরিচ ডলে নিলেন।আঙ্গুলে অম্বলের ঝোল চাটতে চাটতে বললেন, একাদশীর উপবাস করে করে কি রকম ক্ষিদে পেয়েছে দ্যাখ! থালা, বাটি, গ্লাশ ও যে খেয়ে ফেলিনি সেটাই রক্ষে!
খাওয়ার পর ঘন্টাখানেক বিশ্রাম নিয়ে প্রেমানন্দকে ডেকে তুলে বললেন, ওঠ, ওঠ, সন্যাসীদের জন্য দিবানিদ্রা ভালোনা। আমার মাথাটা ব্যথা করছে, অনেকক্ষন ধ্যান করেছি তো তাই ব্রেন উইক হয়েছে মনে হয়,ঘুমই এলোনা।
চল পড়াশুনা করি, তাহলে মাথা ঠিক হয়ে যাবে।
লাইব্রেরিতে এসে দেখলেন তরুন সন্যাসীরা পড়ায় ব্যস্ত, তিনি বললেন তোরা ভালো করে বেদ পড়বি।সংস্কৃতটা আগে শেখা দরকার। পাণিনি ( পাণিনি ছিলেন প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃত ব্যাকরণবিদ) ছাড়া কোন উপায় নাই, আজ আমরা সবাই মিলে পাণিনি পড়বো।
তিনঘন্টা পড়ানোর পর প্রেমানন্দ তাঁকে উঠিয়ে নিয়ে গেলেন মুক্ত বায়ু সেবনে, মাঠ পেরিয়ে রাস্তায় নেমে এলেন, চলে এলেন বেলুড় বাজার পর্যন্ত।স্বামীজি হেসে বললেন, ইলিশ মাছ খেয়ে শরীরে যেন যুবকের মতো শক্তি ফিরে এসেছে।
ফেরার পথে তিনি প্রেমানন্দকে বললেন, এখানে একটা বেদ বিদ্যালয় করা দরকার।
এই যুগে বেদ পড়ে কি হবে?
বেদ পড়লে কমপক্ষে কুসংস্কারগুলি দুর হবে। অনেকেই বেদ গ্রন্থটি চোখেই দেখেনি। মুসলমানদের বাড়িতে কোরান-শরীফ থাকে, খ্রীষ্টানদের বাড়িতে বাইবেল থাকে, কয়টা হিন্দুর বাড়িতে বেদ থাকে বল?
অশিক্ষিত পুরুতগুলি কথায় কথায় বলে, বেদে এই আছে সেই আছে অথচ তারা কোনদিন বেদ পড়েই দেখেনি।
আমাদের দেশে যে স্ত্রী - পুরুষ ভেদে নারীশিক্ষা দেয়া হয়না, এতো বেদ বিরুদ্ধ।যে দেশে, যে জাতে, মেয়েদের সম্মান করেনা, সেই দেশ কখনও বড় হতে পারেনা।
আজ যেন তিনি কথায় মেতে উঠেছেন।
ফিরে এসে উপাসনার জন্য যাবার সময় ব্রজেনকে বললেন, শরীরটা বড্ড হাল্কা লাগছে, তুই আমার জপের মালা দুটি নিয়ে বাইরে বসে থাক, দরকার মনে করলে ডাকবো।
কিছুক্ষন পরেই তিনি ব্রজেনকে ডেকে বললেন, এতো গরম লাগছে কেন, মেঘ জমেছে নাকি ?
ব্রজেন বললো আজ তো মেঘ নেই, আকাশ পরিস্কার।
স্বামীজি ঘামছেন, সব জানালা খুলে দে, বাতাস কর।
স্বামীজি শুয়ে পড়লেন, তাঁর মনে হলো অনেক হাঁটার জন্য মনে হয় পা দুটি ভার ভার লাগছে।
আরো জোরে বাতাস কর। গরমে যেন পুড়ে যাচ্ছে শরীরটা।
স্বামীজির দুইচোখে ঘুম। শিষ্য নিষ্ঠার সাথে গুরুর সেবা করছে।পা টেপা বন্ধ করে বাতাস করছে। স্বামীজি একটু পরে ঘুমের মধ্যে শিশুর মতো কেঁদে উঠলেন, ডান হাতটা কেঁপে উঠলো। একটা গভীর নিশ্বাস ফেলে মাথাটা বালিশ থেকে গড়িয়ে গেলো।দুই মিনিট পর আবার চিত হয়ে শুলেন।খুব গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে শরীরটা স্তব্ধ হয়ে গেলো চিরতরে।
মুখ এতোটুকুও বিকৃত হয়নি, চোখদুটি জবা ফুলের মতো টকটকে লাল, নাক ও মুখের দুপাশে রক্তের রেখা।
স্বামী বিবেকানন্দের দেহকে গঙ্গাজলে স্নান করিয়ে, নতুন কাপড় পরিয়ে, প্রচুর ফুলের মালা দিয়ে সাজিয়ে নীচে নামানো হলো। বেলগাছের নীচে ঘি আর চন্দন কাঠের চিতার লকলকে আগুনে তাঁর নশ্বর শরীরটা পঞ্চভূতে মিলিয়ে গেল।