21/02/2022
স্বামী স্ত্রী এর সম্পর্ক একটি মধুর সম্পর্ক।আল্লাহ এবং রাসূল (সাঃ) এর পরে একজন স্ত্রী এর কাছে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসার পাএ তার স্বামী। ইসলাম আল্লাহর মনোনীত পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। তাই ইসলামে যেভাবে নারীর অধিকার সংরক্ষিত হয়েছে, ঠিক তেমনি স্থান পেয়েছে স্বামীর অধিকারও।
বিবাহ স্বামী-স্ত্রীর মাঝে একটি সুদৃঢ় বন্ধন। আল্লাহ তাআলা এর চির স্থায়িত্ব পছন্দ করেন, বিচ্ছেদ অপছন্দ করেন।
মহান আল্লাহ বলেছেনঃ
"তোমাদের স্ত্রীরা হলো তোমাদের জন্য শস্য ক্ষেত্র। তোমরা যেভাবে ইচ্ছা তাদেরকে ব্যবহার কর। আর নিজেদের জন্য আগামী দিনের ব্যবস্থা কর এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাক। আর নিশ্চিতভাবে জেনে রাখ যে, আল্লাহর সাথে তোমাদেরকে সাক্ষাত করতেই হবে। আর যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে সুসংবাদ জানিয়ে দাও।" সূরা বাকারাঃ আয়াত-২২৩।
হাদিসে এসেছেঃ
"কোন স্ত্রী যদি তার স্বামীর বিছানা পরিহার করে রাত কাটায় তবে ফেরেশতারা সকাল পর্যন্ত তাকে অভিশাপ দিতে থাকে।" মুসলিমঃ ইংরেজী অনুবাদঃ ৩৩৬৬।
স্ত্রী স্বামীকে নাম ধরে ডাকতে পারে কি?
স্ত্রীর নিকট স্বামী হ’লেন সবচেয়ে সম্মানের পাত্র। অতএব যেভাবে ডাকলে স্বামী খুশি হবেন সেভাবে ডাকা উচিৎ। তবে স্বামী অসন্তুষ্ট না হলে স্ত্রী স্বামীর নাম ধরে ডাকতে পারে। যেমন যয়নব রাসূল (সাঃ) এর সামনে তার স্বামী আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) এর নাম ধরে কথা বলেছিলেন (বুখারী-১৪৬২)। তবে নাম ধরে না ডাকাই উত্তম কারন সে বয়সে বড় তাই বড় কে বড় মেনে চলা।
যে সব অধিকারের ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে সমানঃ
১) দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক সততা, বিশ্বস্ততা ও সদ্ভাব প্রদর্শন করা।
মহান আল্লাহ বলেছেনঃ "তাদের সাথে তোমরা সদ্ভাবে বা ভাল আচরণ কর।" সূরা নিসাঃ আয়াতঃ ৪:১৮।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ ‘তোমাদের মাঝে যে নিজের পরিবারের কাছে ভাল, সেই সর্বোত্তম। আমি আমার পরিবারের কাছে ভাল।’ ইবনে মাজাহঃ ১৯৬৭।
২) পরস্পর একে অপরকে উপভোগ করা।এর জন্য আনুষঙ্গিক যাবতীয় প্রস্তুতি ও সকল উপকরণ গ্রহণ করা। যেমন সাজগোজ, সুগন্ধি ব্যবহার এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাসহ দুর্গন্ধ ও ময়লা কাপড় পরিহার ইত্যাদি। স্বামী স্ত্রী প্রত্যেকের এ বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখা। অধিকন্তু এগুলো সদ্ভাবে জীবন যাপনেরও অংশ।
ইবনে আব্বাস (রাদিঃ) বলেছেনঃ ‘আমি যেমন আমার জন্য স্ত্রীর সাজগোজ কামনা করি, অনুরূপ তার জন্য আমার নিজের সাজগোজও পছন্দ করি।’ তবে, পরস্পর এ অধিকার নিশ্চিত করার জন্য উভয়কেই হারাম সম্পর্ক ও নিষিদ্ধ বস্তু হতে বিরত থাকতে হবে।
৩) বৈবাহিক সম্পর্কের গোপনীয়তা রক্ষা করা।সাংসারিক সমস্যা নিয়ে অন্যদের সাথে আলোচনা না করাই শ্রেয়। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে উপভোগ্য বিষয়গুলো গোপন করা।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
'কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে সর্ব-নিকৃষ্ট ব্যক্তি সে, যে নিজের স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং যার সাথে তার স্ত্রী মিলিত হয়, অতঃপর সে এর গোপনীয়তা প্রকাশ করে বেড়ায়।' মুসলিমঃ ২৫৯৭।
৪) পরস্পর শুভ কামনা করা, সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়া।আল্লাহর আনুগত্যের ব্যাপারে একে অপরকে সহযোগিতা করা। স্বামী-স্ত্রী উভয়ে একে অপর থেকে উপদেশ পাওয়ার অধিক হকদার। দাম্পত্য জীবন রক্ষা করা উভয়েরই কর্তব্য।আর এর অন্তরভূক্ত হচ্ছে, পরস্পর নিজ আত্মীয়দের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখার ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা করা ।সন্তানদের লালন-পালন ও সুশিক্ষার ব্যাপারে উভয়েই সমান, একে অপরের সহযোগী।
মহান আল্লাহ বলেছেনঃ
"তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার ব্যপারে পরস্পরকে সহযোগিতা কর।" সূরা মায়েদাঃ আয়াতঃ ৫:২।
স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কর্তব্যঃ
ভাল ও সৎ কাজ এবং আল্লাহর বিধান বিরোধী নয় এমন সকল বিষয়ে স্বামীর আনুগত্য করা। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর অবাধ্যতায় কোন সৃষ্টির আনুগত্য বৈধ নয়। যে নির্দেশ কিংবা চাহিদা পূরণে কোন ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা নেই, সে ব্যাপারে স্বামীর আনুগত্য করা।
আর এই কর্তব্যের মূল হলো স্বামীর প্রতি তার দায়িত্ব। তার উপর তার স্বামীর অধিকার অনেক বড়, যা তার পিতা-মাতার অধিকারের চেয়েও বেশি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার অধিকারের (হকের) পরেই তার অধিকারের শ্রেষ্ঠত্বের অবস্থান। আর এই অধিকারের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে এসেছে আল্লাহ তা‘আলার বাণী:
“পুরুষ নারীর কর্তা, কারণ আল্লাহ তাদের এককে অপরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন” সূরা আন-নিসা: ৩৪
# ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু আবূ আওফা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুআয সিরিয়া থেকে ফিরে এসে নাবী ﷺ কে সেজদা করেন। নাবী ﷺ বলেন হে মু‘আয! এ কী? তিনি বলেন, আমি সিরিয়ায় গিয়ে দেখতে পাই যে, তথাকার লোকেরা তাদের ধর্মীয় নেতা ও শাসকদেরকে সেজদা করে। তাই আমি মনে মনে আশা পোষণ করলাম যে, আমি আপনার সামনে তাই করবো। রসূলুল্লাহ ﷺ বলেন তোমরা তা করো না। কেননা আমি যদি কোন ব্যক্তিকে আল্লাহ্ ছাড়া অপর কাউকে সেজদা করার নির্দেশ দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার সেজদা সাজদাহ করতে। তিরমিযী ১৮৫৩
# নিজের ঘর এবং সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখা। স্বামীর সম্পদ সংরক্ষণ করা। স্বামীর সাধ্যের অতীত এমন কোন আবদার কিংবা প্রয়োজন পেশ না করা।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ 'স্ত্রী স্বীয় স্বামীর ঘরের জিম্মাদার। এ জিম্মাদারির ব্যাপারে তাকে জবাবদেহিতার সম্মুখীন করা হবে।’ বুখারীঃ ২৫৪৬।
# উম্মে সালমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন “নারীদের যে কেউ মারা যাবে এমতাবস্থায় যে তার স্বামী তার উপর সন্তুষ্ট, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
# আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হল: কোন নারী সবচেয়ে উত্তম? জবাবে তিনি বললেন ঐ নারীই উত্তম, যে নারী তার স্বামীকে আনন্দ দেয় যখন সে তার দিকে তাকায়; তার আনুগত্য করে, যখন সে নির্দেশ দেয় এবং তার নিজের ও সম্পদের ব্যাপারে সে যা অপছন্দ করে তার বিরুদ্ধাচরণ করে না।” (ইমাম নাসায়ী হাদিসখানা বর্ণনা করেন)।
# রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “দুনিয়াতে কোন স্ত্রী তার স্বামীকে কষ্ট দিলেই তার ডাগড় চক্ষুবিশিষ্ট হুরী স্ত্রী বলে উঠে: তুমি তাকে কষ্ট দেবে না; আল্লাহ তোকে ধ্বংস করুক! কারণ, সে তোর নিকট আগন্তুক, অচিরেই সে তোকে ছেড়ে আমাদের নিকট চলে আসবে।” (ইমাম তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ র. হাদিসখানা বর্ণনা করেন)।
# “যখন নারী তার পাঁচ ওয়াক্তের সালাত আদায় করবে; তার (রমযান) মাসের সাওম পালন করবে; তার লজ্জাস্থানের হেফাজত করবে এবং তার স্বামীর আনুগত্য করবে, তখন তাকে বলা হবে: তুমি জান্নাতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা কর, সে দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবশে কর।” (ইমাম আহমদ হাদিসখানা বর্ণনা করেন)।
# রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “স্বামীর উপস্থিতিতে তার অনুমতি ব্যতীত স্ত্রীর জন্য সাওম (নফল রোযা) পালন করা বৈধ নয়; আর স্বামীর অনুমতি ছাড়া অন্য কাউকে তার গৃহে প্রবেশ করতে দেবে না ।” ( ইমাম বুখারী ও মুসলিম র. হাদিসখানা বর্ণনা করেন)।
স্বামীর বাসস্থানে অবস্থান করা।
মহান আল্লাহ বলেছেনঃ "তোমরা স্ব স্ব গৃহে অবস্থান কর, প্রাচীন যুগের সৌন্দর্য প্রদর্শনের মত নিজেদের কে প্রদর্শন করে বেড়িও না।" সূরা আহযাবঃ আয়াতঃ ৩৩:৩৩।
# রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: যখন কোন পুরুষ তার স্ত্রীকে তার সাথে একই বিছানায় শোয়ার জন্য আহ্বান করে, আর তার স্ত্রী সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে, তবে সকাল পর্যন্ত ফেরেশতারা ঐ মহিলার উপর লা‘নত (অভিশাপ) বর্ষণ করতে থাকে।” (ইমাম বুখারী ও মুসলিম র. হাদিসখানা বর্ণনা করেন)।
# নিজের সতীত্ব ও সম্মান রক্ষা করা।
# স্বামীর অপছন্দনীয় এমন কাউকে তার ঘরে প্রবেশের অনুমতি না দেয়া। হোক না সে নিকট আত্মীয় কিংবা আপনজন। যেমনঃ ভাই বা আত্মীয় স্বজন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ ‘তোমাদের অপছন্দনীয় কাউকে বিছানায় জায়গা না দেয়া স্ত্রীদের কর্তব্য।’ মুসলিমঃ ২১৩৭।