26/08/2025
✅ আর্যসমাজ 'কলুর বলদ' হয়ে থাকবে আর কতদিন ?
🔹 ইতিহাস থেকে বর্তমান : প্রবঞ্চনা
🔹 দ্বিচারিতার সমাজে 'ইউজড' হওয়া
🔹 মুখোশের আড়ালে নামধারী বৈদিক
আর্যসমাজের জন্ম সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কল্যাণেই। ভগবৎপাদ মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী আর্যসমাজের যে ১০টি মূলনীতি প্রণয়ন করেছিলেন তার প্রত্যেকটির ভিত্তি ছিল বৈদিক দার্শনিক চিন্তাধারার উপর ভিত্তি করে ব্যক্তিগত-সামাজিক-বৈশ্বিক এই ৩ স্তরে জাগতিক ও পারমার্থিক কল্যাণ। আর্যসমাজের শিক্ষার উপর ভিত্তি করে বিশ্বের নানা স্থানে সংস্থা গড়ে উঠেছে। আর্যসমাজ নিজেদের উদারনীতির কারণে সর্বত্র সহযোগীতা করে এসেছে, এখনো করছে ও ভবিষ্যতেও করবে। আমি এখানে আলোচনায় আর্যসমাজ বলতে মূলনীতির সমর্থক সব সংস্থাকেই বুঝিয়েছি।
কিন্তু আর্যসমাজ বিনিময়ে কী পেয়েছে ? পেয়েছে প্রবঞ্চনা, লাঞ্ছনা, বিশ্বাসঘাতকতার এক রক্তাক্ত ইতিহাস। ইতিহাসে সনাতন ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে অরাজনৈতিক হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক টানাপোড়েনে সব থেকে বেশী 'ব্যবহার' হয়েছে আর্যসমাজ। কারণ যেহেতু আর্যসমাজের অধিকাংশ উচ্চ ব্যক্তিই যুক্তবিদ্যার সামান্যতম জ্ঞান রাখেন তাই ডানপন্থী ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের কাছে আর্যসমাজ একটা বেশ ভালো ভোট ব্যাংক।
আর্যসমাজের ইতিহাস যদি আমরা দেখি তা কেবল আত্মোৎসর্গের ইতিহাস। মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী, স্বামী শ্রদ্ধানন্দ, পণ্ডিত লেখরাম তাঁদের অমূল্য প্রাণের বলিদান দিয়েছেন সনাতন ধর্মের বাইরের জনগোষ্ঠীর হাতে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও মাতা সীতার যখন অপমান হচ্ছিল তখন এই আর্যসমাজই প্রত্যুত্তর দিয়েছিল যার বিনিময়ে মূল্য দিতে হয়েছিল মহাশয় রাজপালকে নিজের জীবন দিয়ে। কিন্তু বিনিময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ বলিদান দিবসে ২টি ভালো কথা বলা বাদে কী করেন ? আর বর্তমান রাজনীতির মোহজালে আবদ্ধ ব্যক্তিবর্গরাও সেই ভালো কথা শুনে সারল্যবশতঃই(?) সম্ভবত আনন্দিত হন। অর্থাৎ জীবন দিচ্ছে আর্যসমাজীরা কিন্তু স্বীকৃতি নেই। এমন কেন হবে ? আর্যসমাজ কেন 'ব্যবহৃত' হবে ?
কিন্তু যে মহর্ষি দয়ানন্দ, স্বামী শ্রদ্ধানন্দ, পণ্ডিত লেখরাম জাতিভেদ, শিক্ষায় অগ্রাধিকার, নারীকল্যাণের দিকে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন সেই বিষয়ে কেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ নীরব থাকেন? কারণ তারাও জানেন, জাতিভেদ উঠে গেলে গোষ্ঠীগত যে দলিত ভোটব্যাংক ছিল সেটাও থাকবে না।
আর্যসমাজের মতো শুদ্ধাচারে যুক্তিগতভাবে একটি সংস্থাও নেই যারা নিজেদের পূর্বমহাপুরুষদের যুক্তির কষ্টিপাথরে বিচার করে বাইরের জগতে পরিশুদ্ধ রূপে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু পরিবর্তে তারা আখ্যায়িত হয়েছে 'শ্রীরাম, শ্রীকৃষ্ণ মানে না' এই দায়ে। এই দায় কেন আর্যসমাজ নেবে ? শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরামচন্দ্র যাদের পূর্বজ, যাদের নিকট অবতার বলে স্বীকৃট আর্যসমাজের উচিত সেসব প্রশ্ন যা বাইরে সম্মুখীন হতে হয় সেসব আবার তোলা, সমাধানসহ। যাতে যারা নিজেদের শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরামের সোল এজেন্ট হিসেবে উপস্থাপন করে তারা যেন বাধ্য হয় মেনে নিতে। পুরাণ, ইতিহাস প্রতিটি স্থানে যেখানে যা যা আছে তা তুলে ধরা আর্যসমাজ ও তদানুগত গোষ্ঠীর একান্ত কর্তব্য। কারণ রোগ হলে তা সমূলে উৎপাটন করাই সঙ্গত, নাহলে ক্ষুদ্রতম সংক্রমণও আবার বৃহৎ আকার ধারণ করবে এবং পূর্বের সমস্ত পরিশ্রমকেই মাটি করবে।
বাংলাদেশে প্রচার-প্রসারের কাজে বেশ কিছু সাধারণ শব্দ আমরা শুনি। পরম্পরা, ইতিহাস, আবেগ, সংস্কৃতি ইত্যাদি। অথচ ১০০% থেকে ৮% হওয়া গোষ্ঠী এখন পর্যন্ত এই কথাগুলো বলে নিজেদের বিনাশ কেন ঠেকাতে পারছে না ? কেন ইতিহাস ঐতিহ্যের বুলি যা আর্যসমাজকে দেওয়া হয় তা নিয়ে বিধর্মী-বাম কাউকেই নাস্তানাবুদ করা সম্ভব হচ্ছে না? কারণ তারাও জানেন নিজের ঘরে গায়ের জোর দেখিয়ে চুপ করানো সোজা কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আপনি যতই মানুষের সামনে রূপক, আধ্যাত্মিক, প্রক্ষিপ্ত বলুন না কেন আপনি নিজেই যেখানে নিজের ঘরে আর্যসমাজকে একই জিনিস 'আক্ষরিক' তথা বাস্তব বলে দাবি করেন সেটা সমাজে কোনো প্রভাবই রাখে না। বাইরের মানুষের কাজে মদ সনাতন ধর্মে নিষিদ্ধ বলে সেটাকে পূজার উপকরণ কেন করা হয়েছে এই বিষয়ে আর্যসমাজের সাথে যুক্তিতর্ক অর্থহীন। আর্যসমাজেরও উচিত বৈদিক বনাম অন্যাদি অবৈদিক গ্রন্থে অশ্লীলতা, মদ্য, ব্যভিচার সামগ্রিক যত নেতিবাচক বিষয় রয়েছে তা সমূলে উপরে ফেলা। ঔষধ কটূ লাগলেও এটাই একমাত্র পথ।
আমরা প্রচার কাজের সময় বেদের নানা বিষয় সম্পর্কে লেখালেখি করি। কিছু বিষয় সাধারণভাবেই বিতর্ক তৈরি করবে, উদাহরণ - প্রতিমাপূজা, পশুবলি, অবতারবাদ ইত্যাদি। সনাতন সমাজে পূর্ব নানা 'মহাপুরুষ' প্রতিমাপূজাকে সর্বোত্তম মানেননি বা বৈদিক স্বীকার করেননি। অথচ তাদের শিষ্যরাই আজ সব থেকে বড় প্রতিমাপূজক এবং তা বৈদিক প্রমাণে সচেষ্ট। যদিও সেটা তাদের সম্প্রদায়গত দ্বিচারিতা, আমাদের মাথাব্যথার কারণও নয়, তবুও প্রশ্ন আসে একই কথা আর্যসমাজ বললে আপত্তি কীসের ? পশুবলির বেলাতেও যখন বিধর্মীদের পশু বধোৎসব চলে তখনই 'গো' একমাত্র মাতা স্মরণ হয় ও জাগতিক পশুর প্রতি প্রেমভাব উথলে উঠে কিন্তু নধর কচি পাঁঠাটির বেলায় কেন নয়? তার থেকে আর্যসমাজই শুদ্ধ সাত্ত্বিকভাবে সর্বজীবে প্রেম রাখছে সেটিই উৎকৃষ্ট নয় কি ?
আর্যসমাজকে এবং তাদের শাস্ত্র-যুক্তি-লোকবলকে সমাজে ব্যবহার করা হয়েছে ভিন্ন মতাবলম্বীদের দ্বারা। যখন কোনো অহিন্দু বিধর্মী সনাতন সমাজের উপর আঙুল তুলেছে তখন আর্যসমাজ ও তাদের সিদ্ধান্তকে এগিয়ে এনে পিঠ বাঁচানো হয়েছে। অনেকেই এই কথায় আপত্তি করতে পারেন। তাদের প্রতি প্রশ্ন তাহলে আর্যসমাজ কেন সব সময় বিধর্মীদের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে থাকে? কেন আপনাদের এতো এতো সংস্থা গিয়ে বিধর্মীদের খণ্ডন বা প্রত্যুত্তর দিতে পারছে না। কেন সেসব সংস্থা নিজেরা প্রত্যুত্তরের নামে যে প্রহসন প্রসব করে তা নিজেদের ব্যক্তিগত প্রচারণার জায়গা ব্যতীত উন্মুক্তভাবে নিয়ে কাজ করে না। কারণ সহজ। এগুলো কোনটাই ধোপে টেকার মতো না। উদাহরণ ? যখন বিধর্মীরা অশ্বমেধ যজ্ঞে রাজমহিষীর সাথে মৃত অশ্বের যৌনসমাগম উল্লেখ করবে তখন বিনিয়োগের পিণ্ডি চটকানো হবে, কিন্তু যখন আর্যসমাজ তন্ত্রের বিরোধ করবে তখন সেই ভাষ্যানুবাদ দেখিয়েই আর্যসমাজের বিরোধ করতে হবে। সুন্দর নয়? বিধর্মীদের সামনে নারীর বেদাধিকার, সব মানুষ সমান দেখাতে হবে কিন্তু আর্যসমাজের প্রসঙ্গ এলেই বর্ণাশ্রম নিয়ে বিতর্ক বা কর্মকাণ্ড নিয়ে কুতর্ক করা আবশ্যক হয়ে উঠবে। সুন্দর নয়?
কথা বললে অনেক কিছু চলে আসে। দীর্ঘায়িত না করি। তবে আর্যসমাজের সব থেকে বেশি ক্ষতি যারা করেছে নামধারী আর্য বা বৈদিকরা। তারা বৈদিক সনাতন ধর্মের সেই অংশটাই প্রচার করবে বা নেবে যা দেখতে সুন্দর। উদাহরণ, নারীর অধিকার, সাম্যবাদ, বৈদিক বিজ্ঞান, গীতার জ্ঞানের বাস্তবিক প্রয়োগ। মানুষও পছন্দ করে। কিন্তু এতে সমাজের কোনো লাভ হয় না রূট লেভেলে। কারণ কী? কারণ সবাই তো এমনিতেই মুখে মুখে বেদ-গীতা-উপনিষদ মানে। উপস্থাপনার ও আধুনিকতার কারণে যদিও এসব ব্যক্তিবর্গ পরিচিতি পায় কিন্তু সমাজে এদের মূল জীবিকা হলো দ্বিচারিতা। উদাহরণ, বেদে সরস্বতী লক্ষ্মী বা গণেশ এক পরমাত্মার নাম। এই সিদ্ধান্ত বা অনুবাদও আর্যভাষ্যেই আসবে। কিন্তু তারা পৌরাণিক বিষয়াবলীতেও তা যুক্ত করবে। যদি সত্যিই আর্য হয় তাহলে আর্যের মতো হোক আর যদি পৌরাণিক হও তবে সেভাবেই নিজস্ব তত্ত্ব অনুসরণ করো।
কিন্তু এই যে বৈদিক-পৌরাণিক মিশ্রিত চমৎকার বকচ্ছপ জগাখিচুড়ির পরিবেশকদের মূল উদ্দেশ্য ব্যক্তিপ্রচার। সমাজে এরা আর্যসমাজের সামগ্রিক উপাদান আত্মসাৎ করে একটি দ্বিচারিতাপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। যাতে বাহ্যিক সজ্জা অনেক আছে, কিন্তু অন্তঃসার শুন্য। তারা কোনোদিন সমাজের কোনো ভেদাভেদ, বাস্তবিক বৈদিক তত্ত্ব নিয়ে কাজ করবে না কারণ তারা জানে এদের তাদের যে একটি অডিয়েন্স আছে সেটা নষ্ট হবে। তারা সেটা চায় না। ফলে সমাজের উন্নতির কোনো আশা নেই। তাদের সমৃদ্ধি হলেও সমাজ যেখানে ছিল ঘুরেফিরে সেখানেই আবার ফিরে আসে।
আর্যসমাজ এখন কোন দিকে? কথা তো অনেক, সমস্যাও অনেক। আর্যসমাজের প্রাণ হলো বৈদিকতা। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা এখানে কট্টর থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের অগ্রগতি হবে। কিন্তু যদি তারা আপোস করে নেয় তাহলেই ধ্বংস সুনিশ্চিত। আমাদের মনে রাখতে হবে, ব্যাধি সংক্রামক। রোগীর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া আর রোগাক্রান্ত অবস্থাকে সুস্বাস্থ্য বলে মেনে নেওয়া এক নয়। আমাদের সব মতাদর্শ ও সবার প্রতি সহানুভূতি থাকবে। ব্যক্তি ও সম্প্রদায় হিসেবে সহাবস্থান থাকবে। কিন্তু যা আদর্শিক পরিপন্থী তা উপস্থাপন আগে করতে হবে। এরপর খণ্ডনের প্রশ্ন। মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী সত্যার্থ প্রকাশে ১০ সমুল্লাস আগে মণ্ডন করেছেন ও তারপর শেষ ৪ সমুল্লাসে খণ্ডন। আমাদের একমাত্র কর্তব্য যেটুকু করা আছে তাতে সীমাবদ্ধ না থাকা। বরং আরো অধিক বৈদিক তত্ত্ব প্রচার ও প্রসার করা। আর্যসমাজের মূলনীতিই এটি। পারিপার্শ্বিকভাবে খণ্ডনের যদি অবস্থা আসে তবে মূল গ্রন্থাদির মাধ্যমে উক্ত মতের খণ্ডন করা উচিত। ব্যক্তিগত আক্ষেপ না করে দার্শনিক ও ব্যবহারিক সমালোচনা জরুরী। তবেই উন্নতি হবে। নতুবা নয়। মনে রাখতে হবে ধর্ম নিজে আচরণ করে অন্যকে শিক্ষা দিতে হবে।
🖋 শ্রী দীপংকর সিংহ দীপ
ব্যাকরণ - বেদান্ত - স্মৃতি - পৌরোহিত্যতীর্থ
শিক্ষা ও শাস্ত্রার্থ সমন্বয়ক
বাংলাদেশ অগ্নিবীর