15/04/2026
বঙ্গজননী সুদেষ্ণার কথা
বঙ্গ বা বাঙালি জাতির উৎপত্তি এবং প্রাচীনতা নিয়ে বর্তমানে অনেক অপব্যাখ্যা দেখা যায়। একশ্রেণির বাঙালি জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে এ অপব্যাখ্যার সাথে যুক্ত। তাদের যুক্তি, বঙ্গ বা বাঙালির উৎপত্তি হয়েছে ১২০৪ খ্রিস্টাব্দ পরবর্তী মুসলিম শাসনামলে। কিন্তু তথ্যটি সত্য নয়। বঙ্গের উৎপত্তিকথা ভারতবর্ষে মুসলিম আগমনের বহুপূর্বে মহাভারতেই বর্ণিত হয়েছে। দীর্ঘতমা মুনির আশীর্বাদে রাজা বলির সহধর্মিণী সুদেষ্ণার গর্ভে সূর্যের ন্যায় মহাতেজস্বী পঞ্চপুত্রের জন্ম হয়। সেই পঞ্চপুত্র অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র, এবং সুহ্ম এ পাঁচটি জনপদের রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হয়ে পঞ্চজনপদ শাসন করেন। সেই মহাপরাক্রমশালী পঞ্চপুত্রের নাম অনুসারেই ভারতবর্ষের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাঁচটি জনপদের নাম হয় অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র, এবং সুহ্ম।
তাং স দীর্ঘতমাঙ্গেষু স্পৃষ্ট্বা দেবীমথাব্রবীৎ ।
ভবিষ্যন্তি কুমারাস্তে তেজসাদিত্যবর্চসঃ ॥
অঙ্গো বঙ্গঃ কলিঙ্গশ্চ পুণ্ড্রঃ সুহ্মশ্চ তে সুতাঃ ।
তেষাং দেশাঃ সমাখ্যাতাঃ স্বনাম প্রথিতা ভুবি ॥ অঙ্গস্যাঙ্গোঽভবদ্দেশো বঙ্গো বঙ্গস্য চ স্মৃতঃ। কলিঙ্গবিষয়শ্চৈব কলিঙ্গস্য চ স স্মৃতঃ ॥
পুণ্ড্রস্য পুণ্ড্রাঃ প্রখ্যাতাঃ সুহ্মাঃ সুহ্মস্য চ স্মৃতাঃ ।
এবং বলেঃ পুরা বংশঃ প্রখ্যাতঃ পরমর্ষিজঃ ॥
(মহাভারত: আদিপর্ব, ৯৮.৫০-৫৩)
" এরপরে দীর্ঘতমা মুনি মহারাণী সুদেষ্ণার শরীর স্পর্শ করে বললেন, হে দেবি! আপনার গর্ভে সূর্যের তেজতুল্য পাঁচটি তেজস্বী পুত্র জন্মগ্রহণ করবে।
সে তেজস্বী পুত্রগণের নাম হবে — অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র, এবং সুহ্ম। এবং তাঁদের অধিকৃত দেশগুলিও তাঁদের নামেই জগতে প্ৰসিদ্ধ হবে।
অঙ্গের নামে অঙ্গদেশ, বঙ্গের নামে বঙ্গদেশ, কলিঙ্গের নামে কলিঙ্গদেশ, পুণ্ড্রের নামে পুণ্ড্রদেশ এবং সুহ্মের নামে সুহ্মদেশ খ্যাত হয়েছিলো। পূর্বকালে বলিরাজার বংশ এভাবে মহর্ষি হতে উৎপন্ন হয়েছিলো বলে বর্ণিত।"
অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র, এবং সুহ্ম এ পঞ্চপুত্রের জননী হলেন মহারাণী সুদেষ্ণা। সেই হিসেবে এ পাঁচটি জনপদেরও আদি জননী হলেন মহারাণী সুদেষ্ণা। এ পাঁচটি জনপদের মধ্যে প্রধানতম হলো বঙ্গ। তাই বঙ্গের আদি জননী হলেন মহারাণী সুদেষ্ণা। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বঙ্গের আদি জননী সুদেষ্ণার কথা বঙ্গের অধিবাসী অধিকাংশ বাঙালিই জানে না। তাই বঙ্গের এ ভুলে যাওয়া আদি ইতিহাস, উত্তর-প্রজন্মকে জানানোও কর্তব্য। মহারাজ বলি, মহারাণী সুদেষ্ণা এবং দীর্ঘতমা মুনির এ ঘটনাটি মহাভারতে বর্ণিত হলেও, কাহিনীটি মহাভারত পূর্ববর্তী। এ কারণেই মহাভারতের শ্লোকে "পুরা বংশঃ প্রখ্যাতঃ পরমর্ষিজঃ" বলা হয়েছে। অর্থাৎ কাহিনী মহাভারতকালীন নয়, মহাভারতেরও পূর্ববর্তী। তাই তো দেখা যায় বঙ্গ শব্দটির কথা বেদে যেমনি আছে, তেমনি রামায়ণেও আছে।
বৈদিক যুগ থেকেই বঙ্গের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। হয়তো সে সময়ের ভাষা বর্তমান কালের বাংলার মত ছিলো না। ভাষার কাজই স্বেচ্ছা প্রবাহমানতা, সে তার নিজের মর্জি অনুযায়ী প্রবাহিত হয়ে চলে। এ চলতে চলতে বিভিন্ন বাঁকে বাঁকে সে পরিবর্তিত হয়।ঋগ্বেদীয় ঐতরেয় আরণ্যকে বঙ্গ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:
ইমাঃ প্রজাস্তিস্রো অত্যায়মায়ংস্তানীমানি
বয়াংসি বঙ্গাবগধাশ্চেরপাদাঃ ।
(ঋগ্বেদীয় ঐতরেয় আরণ্যক:২.১.১)
বেদের সাথে সাথে রামায়ণেও বঙ্গের কথা আছে।
রামায়ণ থেকে জানা যায়, শ্রীরামচন্দ্রের পিতা রাজা দশরথের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলো বঙ্গদেশ। রামায়ণের অযোধ্যাকাণ্ডে রাজা দশরথ রাণী কৈকেয়ীকে তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বঙ্গদেশের নাম উচ্চারণ করেন।
যাবদাবর্ততে চক্রং তাবতী বসুন্ধরা৷৷
দ্রাবিড়াঃ সিন্ধুসৌবীরাঃ সৌরাষ্ট্রা দক্ষিণাপথাঃ।
বঙ্গাঙ্গমগধা মৎস্যাঃ সমৃদ্ধাঃ কাশিকোসলাঃ৷৷
তত্র জাতং বহু দ্রব্যং ধনধান্যমজাবিকম্।
ততো বৃণীষ্ব কৈকেয়ি যদ্ যৎ ত্বং মনসেচ্ছসি৷৷
(রামায়ণ: অযোধ্যা, ১০.৩৬-৩৮)
"দ্রাবিড়দেশ, সিন্ধু-সৌবীর দেশ, সৌরাষ্ট্র, দক্ষিণাপথ, বঙ্গদেশ, অঙ্গদেশ, মগধ ও মৎস্যদেশ, কাশি, কোশল – এই সকল সমৃদ্ধ দেশ, যতদূর পর্যন্ত সৌরচক্র আবর্তিত হচ্ছে ততদূর পর্যন্ত এই বসুন্ধরা আমার অধীন ; সেই সকল স্থানে জাত ধন-ধান্য, ছাগ-মেষ, সকলই আমার অধীনে। হে কৌকেয়ি! তুমি মনে মনে যা ইচ্ছা কর, তা আমার থেকে চেয়ে নাও।"
ড. কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী