05/01/2026
আজ ০৫/০১/২০২৬ খ্রী রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথের'র ১৮তম মহাপ্রয়াণ বার্ষিকী।
শ্রদ্ধেয় রাজগুরু অগ্রবংশ ভান্তের
সংক্ষিপ্ত জীবনী।
===================
শ্রদ্ধেয় রাজগুরু অগ্রবংশ ভন্তে ১৯১৩ সালের ২৩ নভেম্বর বিলাইছড়ি থানার কুতুবদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন৷ তাঁর গৃহীনাম ছিল ফুলনাথ তঞ্চঙ্গ্যা৷ তিনি ছিলেন পিতা কারবারী রুদ্রসিং তঞ্চঙ্গ্যা ও মাতা ইচ্ছাবতী তঞ্চঙ্গ্যার ছয় সন্তানের কনিষ্ঠ সন্তান৷ তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা কৃতিত্বের সাথে সমাপ্ত করেন৷ পরবর্তিতে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের পিতা হন৷ তিনি, ২২ বছর বয়সে সংসার জীবন ত্যাগ করে ১৯৩৫ সালে রাইংখ্যং বগলতলী বিহারের ততকালীন অধ্যক্ষ শ্রীমৎ উঃ তিস্স মহাস্থবিরের নিকট প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন৷ গুরুর সাথে কিছুদিন থাকার পর তিনি রাঙ্গুনিয়া ইছামতী ধাতু চৈত্য বিহারের অধ্যক্ষ পণ্ডিত ধর্মানন্দ মহাস্থবিরের নিকট চলে যান৷ সেখানে তিনি পালি ভাষার ব্যুৎপত্তি লাভ করেন এবং এস এস সি পরীক্ষায় পাশ করেন৷
,
১৯৩৯ সালে তিনি শ্রীমৎ উঃ তিস্স মহাস্থবিরের উপাধ্যায়াত্বে উপসম্পদা গ্রহণ করেন৷ তারপর তিনি বেশ কয়েক বছর বৌদ্ধ পণ্ডিত আনন্দমিত্র ভন্তের সাথে অবস্থান করে ধ্যানব্রত অনুশীলন করেন৷
,
ত্রিপিটকের উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য তিনি ১৯৪৮ সালে বার্মায় গমণ করেন৷ সেখানে তিনি এম, এ এবং ত্রিপিটক বিশারদ উপাধি লাভ করেন৷ ১৯৫৪-১৯৫৬ সালে ভগবান বুদ্ধের ২৫০০ তম বুদ্ধজয়ন্তী উপলক্ষে বার্মায় অনুষ্ঠিত বৌদ্ধ ৬ষ্ঠ সংগীতিতে সংগীতিকারক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন৷ তখন সেখানে আমন্ত্রিত চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের সাথে দেখা হলে রাজা তাঁকে দেশে প্রত্যাবর্তনের আমন্ত্রণ জানান৷
,
দীর্ঘ দশ বছর বার্মায় থাকার পর ১৯৫৭ সালে ডিসেম্বর মাসে তিনি দেশে ফিরে আসলে তাঁকে চাকমা 'রাজগুরু' পদে বরণ করা হয়৷ রাজগুরু পদে দায়িত্ব নেয়ার পরপরই ১৯৫৮ সালে প্রথমে বৌদ্ধ মিশন পরে পার্বত্য বৌদ্ধ সমিতি এবং পার্বত্য চট্টল ভিক্ষু সমিতি প্রতিষ্ঠা করে সভাপতির দ্বায়িত্ব নিয়েছিলেন৷ এবং তারপর পার্বত্য চট্টল ভিক্ষু সমিতির গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করেন৷
,
১৯৭৯ সালে তিনি স্বদেশের নানা সমস্যার কারণে ভারেত চলে যান৷ সেখানে অবস্থানকালীন সময়ো তিনি জাপান, লন্ডন, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, মালেশিয়া, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড ও ইউরোপের অনেক দেশে বৌদ্ধদের অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে বহু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান করেন৷ দীর্ঘ প্রায় ২৪ বছর ভারতে থাকার পর ২০০১ সালের ১৭ জানুয়ারী মাতৃভূমির টানে তিনি বাংলাদেশের উদ্দেশে ভারত ত্যাগ করেন৷
,
১৯৫৬ সালে বার্মা সরকার তাঁকে অগ্রমহাপণ্ডিত উপাধিতে সম্মানিত করার পর ২০০৫ সালে ২২ এপ্রিল পূণরায় তাঁকে 'অগ্গসদ্ধম্মজ্যোতিকাধ্বজ' সর্বোচ্চ ধর্মীয় উপাধি প্রদান করে৷ ২০০৩ সালে বাংলাদেশে তাঁকে পাঁচ শতাধিক ভিক্ষুর উপস্থিতিতে মহাসংঘনায়ক হিসেবে ভূষিত করা হয়৷
,
তিনি ২০০৮ সালে ৫ জানুয়ারী শনিবার বিকাল বেলা বয়ঃবার্ধক্যজনিত কারণে রাত ৯:৩০ মিনিটে রাঙ্গামাটি সদর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন৷ তখন তার বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর এবং ভিক্ষু বর্ষা হয়েছিল ৬৯ বর্ষা৷
রাজগুরু ভন্তে অনেক গুলো গ্রন্থ লিখেছিলে তারমধ্যে ১০টি প্রকাশ করা হলেও বাকী ২৫টি অপ্রকাশিত রয়েছে৷ ভন্তের অপ্রকাশিত গ্রন্থগুলো
প্রকাশের সহায়তার জন্য আহবান....
,
একটা জাতিকে পরিচিতি করাতে হলে প্রথমে প্রয়োজন জ্ঞান সাধনা ও সাহিত্য সাধনা। রাজগুরুভন্তে তাঁর সুদীর্ঘ জ্ঞান-সাধনা ও শাস্ত্র চর্চার সুফল হিসেবে বহু অমূল্য গ্রন্থ রচনা করেছেন৷ তিনি যে গ্রন্থগুলো লিখেছেন বা অনুবাদ করেছেন তারমধ্যে ১০টি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন যা বিদ্ব্যৎ সমাজে সমাদৃত হয়েছে ৷ যেমন-
১) সমবায় বুদ্ধো উপাসনা (১৯৫৮)
২) বৌদ্ধ পঞ্জিকা (১৯৬১)
৩) বুদ্ধ উপাসনা (লোকত্তর বিভাগ) (১৯৮২)
৪) বুদ্ধ উপাসনা (লোক বিভাগ) (১৯৮৪)
৫) চাকমা গীদেন্দি মঙ্গল সূত্র (১৯৭২)
৬) পরিণাম নাটক
৭) শ্রামণ কর্তব্য (১৯৭৭)
৮) Stop Genocide in Chittgong Hill Tracts of Bangladesh
৯) মানবধর্ম পঞ্চশীল
১০) বুদ্ধ সামান্তিকা (২০০৮)
,☺ অপ্রকাশিত রয়েছে ২৫টি গ্রন্থাবলী৷ যেমন-
১) বিশুদ্ধিমার্গ (৩ খণ্ড)
২) বিদর্শন ভাবনা নীতি (৫ খণ্ড)
৩) অভিধর্মার্থ সংগ্রহ
৪) ভিক্ষু প্রাতিমোক্ষ
৫) জন্ম-মৃত্যুর কথা
৬) সাম্য বিথীকা
৭) চন্দ্রগুপ্ত (নাটক)
৮) পাসরে পথে (নাটক)
৯) রূপানন্দা (নাটক)
১০) সঞ্চয়িতা
১১) বাংলাদেশ বড়ুয়া জাতি
১২) মহাকঠিন চীবর বর্ণনা
১৩) বুদ্ধ ও রবীন্দ্রনাথ
১৪) অগ্নিমশাল (গীতিমঞ্জুরী)
১৫) চাঙমা হ়ঃধাদি ধর্মপদ
১৬) পথে তগেয়ে মন (চাকমা ভাষায় নাটক)
১৭) মহামানব গৌতমবুদ্ধ
১৮) আবিলাস্য সংবাদ (চাকমা ভাষায় নাটক)
১৯) সিদ্ধার্থ চরিত্র
২০) মহাস্বপ্ন (চাকমা ভাষায় নাটক)
২১) বেস্সান্তর কীর্তন
২২) মহাযাত্রী গীতিনাট্য
২৩) দর্শন ও বিদর্শন
২৪) ধর্ম ও সমাজ এবং
২৫) বুদ্ধের অবদান (৩খণ্ড)
,
রাজগুরু অগ্রবংশ ভন্তের এই অপ্রকাশিত গ্রন্থগুলো প্রকাশের সহায়তার অসংখ্য ভক্ত অনুরাগী এবং দানশীল ব্যক্তিদের প্রতি ড. জিনবোধি ভিক্ষু (প্রাবন্ধিক, গবেষক ও অধ্যাপক, প্রাচ্যভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়) আন্তরিক আহবান জানিয়েছেন 'দীপ্তি'তে' তাঁর প্রবন্ধে৷
,
তথ্যসূত্র: ''দীপ্তি'' (চাকমা রাজগুরু অগ্রবংশ স্মারক)
দি চাকমা বুদ্ধিস্ট