13/08/2022
বৌদ্ধ ভিক্ষু অবস্থায় কোন নারীর সাথে মৈথুন সেবন (ব্যাভিচার) করলে তার মুত্যুর গতি কোথায় হতে পারে?
প্রশ্নটি আমাকে বহুজনে করেছেন। সময়ের অভাবে উত্তর দিতে পারিনি! আজ কিছু লিখব বলে মনস্থির করলাম। তবে এটি কাউকে নিন্দা বা সমালোচনা উদ্দেশ্য লিখছি না, সকলের জানার প্রয়োজন আছে মনে করে সংক্ষিপ্ত আকারে লিখতে শুরু করছি । অনুগ্রহগূর্বক সময় দিয়ে মনযোগসহকারে পড়বেন.....
বুদ্ধের জীবিত সময়কালীন বৈশালীতে এক ধনাঢ্য পরিবারের একমাত্র সন্তান ''সুদিন্ন" মাতাপিতার অনুমতি নিয়ে বুদ্ধের কাছে প্রবজ্যা গ্রহণ করেন। তিনি (সুদিন্ন) সঠিক, পরিপূর্ণ, পরিশুদ্ধভাবে ব্রহ্মচর্য পালন করছিলেন। একদিন পিন্ডাচরণ করতে করতে তার পূর্বের নিজ গৃহে পৌঁছলেন। তথায় তার পিতা তাকে দেখলে গৃহে নিমন্ত্রণ দিলেন এবং আহার্যবস্তু দান করলেন। আহার শেষ হলে তিনি তার ছেলেকে প্রবজ্যা ত্যাগ করে নিজ (পিতৃ) সম্পত্তি ভোগ করার প্রার্থনা করলেন। সুদিন্ন তা অস্বীকার করে নিজের ব্রহ্মচর্য পালনে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। সুদিন্নকে কিছুতেই প্রবজ্যা ত্যাগ করতে রাজি করতে না পেরে তার (সুদিন্ন) মাতা তাকে বংশ ও সম্পত্তি রক্ষার জন্য একটি পুত্র জন্ম দিতে বললেন। সুদিন্ন তার মায়ের কথায় রাজি হয়ে পূর্বের গৃহী স্ত্রীর সাথে মৈথুন সেবন করলেন এবং পরবর্তীতে তার স্ত্রী সঠিক সময়ে গর্ভবতী হয়ে পুত্র সন্তান প্রসব করলেন। তখন বিনয় প্রজ্ঞাপ্ত করা হয়নি। কিন্তু তার মৈথুন সেবনে কথা ভুমিবাসী দেবতাগন অবগত হয়ে নিন্দা আন্দোলন করতে শুরু করলেন। ভুমিবাসী দেবগণের আন্দলন শুনে স্বর্গের দেবতাগণ ও নিন্দা আন্দোলন করতে শুরু করলেন এই বলে, ভগবানের শিষ্য হয়ে সুদিন্ন কেন মৈথুন কামাসক্ত হলেন।
পরবর্তীতে এই নিন্দা আন্দোলনের কারণ ভিক্ষুরা অবগত হয়ে অতঃপর সেই ভিক্ষুগণ আয়ুষ্মন সুদিন্নকে অনেক প্রকারে ভৎসনা ও নিন্দা করে ভগবানের সমীপে এ বিষয়ে প্রকাশ করলেন। তৎপর ভগবান এই নিদানে, এই প্রকরণে (প্রসঙ্গে) ভিক্ষুসংঘকে সমবেত করায়ে আয়ুস্মান সুদিন্নকে জিজ্ঞেস করলেন, “হে সুদিন্ন, সত্যই কি তুমি তােমার পূর্বের স্ত্রীর সহিত মৈথুনধর্ম (ব্যভিচার) প্রতিসেবন করেছ?”
“হ্যা ভগবান, তা সত্য।”
ভগবান বুদ্ধ ইহা অত্যন্ত গর্হিত (অনুচিত) বলে প্রকাশ করে বললেন, “হে মােঘপুরুষ (মূর্খ), ইহা তােমার পক্ষে অনুচিত, অনুপযােগী, অনুপযুক্ত, অশ্রমণােচিত, অবিহিত এবং অকরণীয় কার্য সম্পাদিত হয়েছে। কীরূপে তুমি এরূপ সুব্যাখ্যাত ধর্মবিনয়ে (বুদ্ধশাসনে) প্রব্রজিত হয়েও যাবজ্জীবন পরিপূর্ণ, পরিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্য আচরণ করতে সক্ষম হলে না? “হে মােঘপুরুষ, অবশ্যই মৎ কর্তৃক অনেক প্রকারে বিরাগের ধর্ম দেশিত হয়েছে; সরাগের ধর্ম নহে, বিসংযােগের ধর্ম দেশিত হয়েছে; সসংযােগের ধর্ম নহে, অনুপাদানের ধর্ম দেশিত হয়েছে; স-উপাদানের ধর্ম নহে।”
“হে মােঘপুরুষ, মৎ কর্তৃক যেখানে বিরাগের ধর্ম দেশিত হয়েছে, কেন তুমি সেখানে সরাগের বিষয়ে চিন্তা করবে? যেখানে বিসংযােগের ধর্ম দেশিত হয়েছে; কেন সেখানে সংযােগের বিষয়ে চিন্তা করবে? যেখানে অনুপাদানের ধর্ম দেশিত হয়েছে, কেন সেখানে স-উপাদানের বিষয়ে চিন্তা করবে?”
“হে মােঘপুরুষ, নিশ্চয়ই মৎ কর্তৃক অনেক প্রকারে রাগ-বিরাগের ধর্ম, মদ-বশীভূতকরণ, পিপাসা-বিনয় (আসক্তি দমন), আলয় সমুঘাত (আকাক্ষার মূলােৎপাটন), ভবচক্রের উচ্ছেদ, তৃষ্ণাক্ষয়, বিরাগ, নিরােধ এবং নির্বাণের ধর্ম দেশিত হয়েছে।”
“হে মােঘপুরুষ, মৎ কর্তৃক অনেক প্রকারে কামের প্রহান (পরিহার) সম্বন্ধে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, কামসংজ্ঞার পরিজ্ঞা সম্বন্ধে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, কামপিপাসার প্রতিবিনয় (দমন) সম্বন্ধে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং কামযন্ত্রণার উপশম সম্বন্ধেও বিশেষরূপে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।”
“হে মােঘপুরুষ, কোনাে নারীযােনিতে লিঙ্গ প্রক্ষিপ্ত করার চাইতে যদি কোনাে কালান্তর সর্পের মুখে লিঙ্গ প্রক্ষিপ্ত (ভিতরে প্রবেশ) করা হয়, তথাপি তাই শ্রেয়।”
“হে মােঘপুরুষ, কোনাে স্ত্রীযােনিতে লিঙ্গ প্রক্ষিপ্ত করার চাইতে উত্তপ্ত, সপ্রজ্জ্বলিত, সজ্যোতিভূত অঙ্গার গর্তে যদি লিঙ্গ প্রক্ষিপ্ত করা হয়, তবুও শ্রেয়।
✰ তার কারণ কী? ইহাই নিদান, ইহাই প্রত্যয় যে—ব্যাভিচারজনিত মহা অপরাধের কারণে সেই ভিক্ষু মরণে পতিত হয় কিংবা মরণতুল্য দুঃখ ভােগ করে থাকে, ইহা ছাড়াও সে কায়ভেদে মৃত্যুর পর অপায় দুর্গতি বিনিপাত নিরয়ে উৎপন্ন হয়ে থাকে। | “হে মূর্খ, ইহাই নিদান (কারণ) যে, সেই পাপপরায়ণ ভিক্ষু কায়ভেদে মরণের পর অপায় দুর্গতি বিনিপাত নিরয়ে উৎপন্ন হয়।”
“হে মােঘপুরুষ, নিশ্চয়ই তুমি ইহা অসদ্ধর্ম, গ্রাম্যধর্ম (মৈথুনকার্য), বৃষল ধর্ম, দুষ্টতা (পাপাচার), গােপনাচার করেছ, কী করে তােমরা উভয়ে উভয়ের সহিত দেহ-সম্ভোগে সমর্পিত হতে পারলে? তুমি বহু অকুশল ধর্মের আদিকর্তা ও পূর্বগামী। তােমার এই কার্যে অপ্রসন্নের (শ্রদ্ধাহীনের) মধ্যে প্রসাদ (শ্রদ্ধা) উৎপন্ন কিংবা অপ্রসন্নের প্রসাদ (শ্রদ্ধাবানের-শ্রদ্ধা) বৃদ্ধি করতে পারে না। বরঞ্চ ইহাতে অশ্রদ্ধাবানের মধ্যে অধিকতর শ্রদ্ধাহীনতা এবং কোনাে কোনাে শ্রদ্ধাবানের মধ্যে অন্যথাভাব উৎপন্ন হবে।”
অনন্তর ভগবান আয়ুষ্মন সুদিন্নকে অনেক প্রকারে নিন্দা ও ভর্ৎসনা করে চঞ্চলতা, মহেচ্ছতা (প্রবলআকাক্ষা) অসন্তুষ্টিতা, সঙ্গপ্রিয়তা এবং অলসতার কুফল বর্ণনা করলেন।
এবং এই বিনয় প্রজ্ঞপ্তি করলেন " যদি কোন ভিক্ষু মৈথুনধর্ম (ব্যভিচার) প্রতিসেবন করে" তবে সেই ভিক্ষুর পারাজিকা হবে এবং ভিক্ষুসংঘ হতে বর্জিত হবে অথাৎ ভিক্ষু অবস্থায় হতে চ্যুত হবে ।
✰মনুষ্য অথবা তির্যক প্রাণীর সহিত যৌনিদ্বার, মুখদ্বার এবং মলদ্বারে মৈথুনসেবন করলেও পারাজিকা হবে।
[ বি: দ্র: লিখিত ভাষ্যগুলি ত্রিপিটক বইয়ে ভাষানুসারে লিখিত হয়েছে, যদি কারোর অশোভনীয় মনে হলে আমি আন্তরিক দুঃখিত]
রেফারেন্স: পারাজিকা, সুদিন্ন পরিচ্ছেদ।
আরো বিস্তারিত পারাজিকা অটঠকথায় দেখুন