30/08/2025
শ্রী শ্রী রাধাষ্টমী ব্রত মাহাত্ম্য:-
রাধা অষ্টমী হচ্ছে রাধারাণীর আবির্ভাব তিথি। বৈষ্ণব সমাজে এই অষ্টমী মহাসমারোহে উৎযাপিত হয়ে আসছে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তির প্রতিরূপ স্বরূপা হচ্ছেন রাধাঠাকুরানী। রাধাষ্টমী ব্রত পালনের বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, কোন ব্যক্তি একবারের জন্যও যদি এ ব্রত পালন করেন তবে তার কোটি জন্মার্জিত ব্রহ্মহত্যাদি মহাপাপ সকলও তৎক্ষণাৎ নষ্ট হয়। শত সহস্র একাদশী ব্রত পালনে যে ফল লাভ হয়, রাধাষ্টমী পালনে তার শতাধিক ফল লাভ হয়। প্রপঞ্চ লীলায় পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অন্তরঙ্গা স্বরূপশক্তি গোলোকেশ্বরী রাধারাণী ভাদ্র মাসে শুক্লা অষ্টমী তিথিতে অনুরাধা নক্ষত্রে সোমবারে মধ্যাহ্ন কালে ব্রজমণ্ডলে শ্রীগোকুলের অনতিদূরে রাভেল নামক গ্রামে শ্রীবৃষভানু রাজা ও কীর্তিদা মায়ের ভবনে সকলের হৃদয়ে আনন্দ দান করে আবির্ভূত হন। শ্রীরাধারাণীর প্রাননাথ স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ব্যতীত, এই রাধাষ্টমী তিথির সম্যক মাহাত্ম্য কেউই বর্ণনা করতে পারেনা।
রাধা শব্দের উৎপত্তি রাধ্ ধাতু থেকে নিস্পন্ন। রা+ধা = রাধা। রা শব্দে = ব্রহ্মাণ্ড ও ধা = শব্দে ধারণ করা বা আরাধনা করা। এখন এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের মূল আশ্রয়ের তত্ত্ব হলেন সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ পরমব্রহ্ম শ্রীকৃষ্ণ। সেই শ্রীকৃষ্ণকে সর্বদা যিনি ধারণ বা আরাধনা করে থাকেন তিনিই রাধা।
পুরাণে বর্ণিত রয়েছে যে, হেলায় বা অশ্রদ্ধায় যদি কোন পাপিষ্ঠ এ ব্রত পালন করে, তাহলেও তার বৈকুণ্ঠলোকে গতি হয়। পদ্মপুরাণের সর্গখন্ডের চল্লিশতম অধ্যায়ে এমনই এক কাহিনী বর্ণিত রয়েছে- পুরাকালে সত্যযুগে লীলাবতী নামে এক পতিতা বাস করত। একদিন নগর ভ্রমণকালে এক সুসজ্জিত মন্দিরে রাধাঠাকুরাণীর পূজা উদযাপন দেখতে পেয়ে ব্রতীদের কাছে গেলেন। সে তাদের জিজ্ঞেস করল- হে পূণ্যাত্মা সকল! তোমরা এত যত্ন সহকারে কোন ব্রত উদযাপন করছ? তদুত্তরে রাধাব্রতীগন বলতে লাগলেন-যেহেতু ভাদ্র মাসে সীতাষ্টমীতে শ্রীরাধিকা আবির্ভূত হয়েছিলেন, আমরা সেই রাধাষ্টমী ব্রত পালন করছি। এই অষ্টমী ব্রত গোঘাত জনিত পাপ, স্তেয়জ, ব্রহ্মহত্যা জনিত অথবা স্ত্রীহত্যা জনিত সকল পাপই নাশ করতে সক্ষম।
তাদের কাছ থেকে রাধাষ্টমীর মহিমা শ্রবণ করে সেই পতিতাও স্বেচ্ছায় ব্রত পালনে সংকল্প বদ্ধ হলেন এবং ভক্তগনের সহিত যথাযথ ভাবে ব্রত পালন করলেন। পরদিন সর্প দংশনে তার মৃত্যু হল। যমদূতেরা ক্রুদ্ধচিত্তে তাকে বন্ধন করে যমালয়ে যাত্রা করলে, শঙ্খচক্র গদাধর বিষ্ণুদূতগন উপস্থিত হয়ে লীলাবতীর সকল বন্ধন ছেদন করলেন। তাকে নিয়ে রাজহংসযুক্ত দিব্য বিমানে করে বৈকুণ্ঠলোকে গমন করলেন। এভাবে অধঃপতিত বেশ্যাও কেবলমাত্র রাধাষ্টমী ব্রত পালনের ফলে সকল পাপ মুক্ত হয়ে বৈকুণ্ঠে গমন করলেন।
আরেকটি প্রচলিত গল্প হচ্ছে- একজন ভক্ত সারা বিশ্ব পরিভ্রমণ করছিল। সে বেশি কঠোর ছিল না। সে মন্দিরে যেত। তো সমস্ত মহিলারা মালা ও জিনিস তৈরি করছিল। সে বলল, "কি অনুষ্ঠান চলছে?"
"তুমি জানো না? আগামীকাল রাধাষ্টমী! আসো এবং আমাদেরকে রাধাষ্টমী উদযাপনে সাহায্য কর।" তো, এইভাবে সে রাধাষ্টমীতে থেকে গেল এবং সেবায় অংশগ্রহণ করল, অভিষেক দর্শন করল। এটি বলা হয়ে থাকে যে, সে এবং তার অনেক পূর্বপুরুষ ও বংশধরেরা সকল পাপ থেকে মুক্ত হল। সে ভগদ্ধামে ফিরে গেল।
যে ব্যক্তি এই রাধাষ্টমী ব্রত পালন করে না, শতকোটি কল্পেও তার নরক হতে নিষ্কৃতি নেই। শ্রীমতী রাধারাণী শ্রীকৃষ্ণের প্রাণের চেয়েও প্রিয়। আমরা কৃষ্ণকে পাওয়ার আশা করি। আর কৃষ্ণকে পেতে হলে আগে তার প্রাণাধিক প্রিয় রাধারাণীকে সন্তোষ্ট করতে হবে। এক পর্বত সমান দান করলে যে ফল পাওয়া যায়, এ ব্রত পালনে সে ফল পাওয়া যাবে এবং অগণিত পাপ ক্ষয়ে যাবে।
পদ্মপুরাণে শ্রী নারদের প্রতি শিবঠাকুর বলেছিলেন-"হে দেবর্ষি! ব্রহ্মা প্রমূখ মহান সত্তমগনের নিত্য মহারাধ্যা যিনি, দেবতাগন দূর থেকে যার সেবা করতে ইচ্ছা করেন, সেই শ্রী শ্রী রাধারাণীর সতত ভজনা করা উচিত। এই রাধানাম যে ব্যক্তি শ্রীকৃষ্ণনামের সঙ্গে কীর্তন করেন, তার মাহাত্ম্য আমি কীর্তন করতে সক্ষম নই, এমনকি শ্রী অনন্তদেবও নন।"
১। কেউ রাধাষ্টমী ব্রত পালন করলে তার কোটি ব্রহ্মহত্যার পাপ চলে যায়।
২। রাধাষ্টমী ব্রত একবার পালন করলে সহস্র একাদশী পালনের একশো গুণ ফল লাভ হয়।
৩। পর্বত সমান সোনা দান করলে যে ফল লাভ হয়, তার একশো গুণ ফল লাভ হয়, রাধাষ্টমী ব্রত পালনে।
৪। একবার রাধাষ্টমী ব্রত পালন করলে সহস্র কন্যাদানের ফল লাভ হয়।
৫। একবার রাধাষ্টমী ব্রত পালনে গঙ্গা আদি সকল তীর্থের ফল লাভ হয়।
৬। যদি কোন পাপী ব্যক্তি অশ্রদ্ধায় বা অবহেলাতেও রাধাষ্টমী ব্রত পালন করে, তাহলে তার কোটি কুল সহ বিষ্ণুলোকে নিত্যকাল বিরাজ করে।
৭। একবার রাধাষ্টমী ব্রত পালন করলে গোহত্যা, ব্রহ্মহত্যা সহ সকল পাপ বিনষ্ট হয়।
৮। যদি কোন মূঢ় ব্যক্তি জেনে বা না জেনে রাধাষ্টমী ব্রত পালন না করে, তাহলে শতকোটি কল্পেও সে নরক যন্ত্রণা থেকে নিষ্কৃতি পাবে না।
৯। যে রাধাষ্টমী ব্রত পালন করে না, সে কোটিকল্পে নরকবাস করে থাকে আর পৃথিবীতে কোন ভাবে জন্মগ্রহণ করলেও তাকে বিধবা হতে হয়।
১০। যদি কেউ রাধাষ্টমী ব্রত মাহাত্ম্য শ্রবণ করে, তাহলে সে নিত্যকাল বৈকুণ্ঠলোকে বাস করার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারে।
১১। কোটি জন্মের অর্জিত পাপরাশি ভক্তিপূর্ণ রাধাষ্টমী ব্রত ফলে বিনষ্ট হয়।
১২। গঙ্গা ইত্যাদি সমস্ত পবিত্র তীর্থে স্নান করে যে ফল লাভ হয়, একমাত্র বৃষভানু কন্যার জন্মাষ্টমী পালন করে সেই ফল লাভ হয়।
একজনের অবশ্যই মনে করা উচিত নয় যে, আমি রাধাষ্টমী পালন করেছি, তো আমার আর কিছুই করতে হবে না। আমরা সবকিছু করি। কিন্তু সেগুলোর মধ্যে রাধাষ্টমী বিশেষ কৃপার দিন। তো, তাঁর আবির্ভাব তিথি পালনের মাধ্যমে কৃষ্ণের বিশেষ কৃপা পেতে পারি।
রাধাষ্টমীর ব্রত রেখে ভক্তরা রাধারাণীর কাছে প্রার্থনা করবেন,“ শ্রীরাধিকা, কৃপা পূর্বক আমাকে আপনার শ্রীপাদপদ্মের দাস্য দান করুন।” আর শ্রীমতী রাধারানীর দাসত্ব গ্রহণ করার অর্থ হল, শ্রীকৃষ্ণের কৃপা লাভ। সকলে রাধাষ্টমী ব্রত পালন করে ভগবানের অশেষ কৃপা লাভ করুন।
পদ্মপুরাণে শ্রীনারদের প্রতি শিবঠাকুর বলেছিলেন,- হে দেবর্ষি, ব্রহ্মা প্রমুখ মহান সত্তমগনের নিত্য মহারাধ্যা যিনি, দেবতাগণ দূর থেকে যাঁর সেবা করতে ইচ্ছা করেন, সেই শ্রীশ্রীরাধিকাদেবীকে সতত ভজনা করা উচিত। এই রাধানাম যে ব্যক্তি শ্রীকৃষ্ণ নামের সঙ্গে কীর্ত্তন করেন, তার মাহাত্ম্য আমি কীর্ত্তন করতে সক্ষম নই, এমনকি শ্রীঅনন্তদেবও নন।
শ্রীপদ্মপুরাণে (ব্রহ্মখণ্ড ৭/৮) বলা হয়েছে,-
‘’একাদশ্যাঃ সহস্রেন যং ফলং লভতে নরঃ ।
রাধা জন্মাষ্টমী পুণ্যং তস্মাং শত গুণাধিকম্ ।।‘’
অর্থাৎ,- একহাজার একাদশী ব্রত পালন করলে যে ফল লাভ হয়, শ্রীরাধাষ্টমী ব্রত পালন করলে তার চেয়ে শতগুণ অধিক ফল লাভ হয়ে থাকে।
পদ্মপুরাণে আরো বলা হয়েছে-
‘’রাধাষ্টমী ব্রতং তাত যো ন কুর্য্যাচ্চ মূঢ়ধী।
নরকান্ নিষ্কৃতি নাস্তি কোটিকল্পশতৈরপি ।।‘’
অর্থাৎ,- যে মূঢ় মানুষ রাধাষ্টমী ব্রত করে না, সে শতকোটি কল্পেও নরক থেকে নিস্তার পেতে পারেনা।
‘’স্ত্রীয়শ্চ যা না কৃবন্তি ব্রতমেতদ্ সুভপ্রদম ।
রাধাকৃষ্ণপ্রীতিকরং সর্বপাপপ্রনাশম্ ।।
অন্তে যমপুরীং গত্বা পতন্তি নরকে চিরম্ ।
কদাচিদ্ জন্মচাসাদা পৃথিব্যাং বিধবা ধ্রুবম্ ।।‘’
অর্থাৎ,- যে নারী শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণের প্রীতিকর সর্ব পাপনাশক এই শুভপ্রদ মহাব্রত পালণ করে না, সে জীবনের অন্তকালে নরকে গিয়ে চিরকাল সেখানে যাতনা ভোগ করে। পৃথিবীতে থাকাকালীনও সে দুর্ভাগিনী হয়। এই মহাব্রত করলে শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণের অভয় পাদপদ্মে অচলা ও অব্যভিচারিনী ভক্তি লাভ হয়ে থাকে।
রাধারাণীর সৃষ্টি কিভাবে? এর উত্তর ব্রহ্মবৈবর্ত বলছেন,-
"আর্ব্বিভূব কন্যৈকা কৃষ্ণস্য বামপার্শ্বতঃ"।
কৃষ্ণের বাম অঙ্গ থেকে রাধারাণীর সৃষ্টি। রাধাকৃষ্ণ কখনই পৃথক করা যায় না। রুপ পৃথক কিন্তু স্বরুপ এক।
‘’রাধা কৃষ্ণ ঐচ্ছে সদা একই স্বরুপ ।
লীলারস আস্বাদিতে ধরে দুই রুপ ।।''
তাই রাধা ও কৃষ্ণ এক এবং অভিন্ন। সকলে রাধাষ্টমী ব্রত পালন করে দুর্লভ মানব জীবনকে ধন্য করুন ও সকলে রাধারাণীর কৃপা লাভ করুন।
রাধা- ভজনে যদি মতিনাহি ভেলা I
কৃষ্ণভজন তব অকারণে গেলা I I
আতপ– রহিত সুরয় নাহি জানি I
রাধা–বিরহিত মাধব নাহি মানি I I
কেবল মাধব পূজয়ে, সোঅজ্ঞানী I
রাধা– অনাদর করই অভিমানী I I
কবহি নাহি করবি তাঁকর সঙ্গ I
চিত্তে ইচ্ছাসি যদি ব্রজরস – রঙ্গ I I
রাধিকা - দাসী যদি হোয় অভিমান I
শীঘ্রহি মিলই তব গোকুল – কান I I
ব্রহ্মা, শিব, নারদ, শ্রুতি, নারায়ণী I
রাধিকা– পদরজ পূজয়ে মানি I I
উমা, রমা, সত্যা, শচি, চন্দ্রা, রুক্মিণী I
রাধা– অবতার সবে, আম্নায় – বাণী I I
হেন রাধা – পরিচর্য্যা জাঁকর ধন I
ভকতিবিনোদ তাঁর মাগয়ে চরণ I I
যাঁরা রাধাকৃষ্ণের কৃপা ও কৃষ্ণভক্তি লাভ করতে চান - তাঁরা অবশ্যই এই ব্রত পালন করবেন।
❤️ রাধে রাধে ♥️