30/08/2026
আপনি কি সত্যিই নিজের সিদ্ধান্তে চলেন, নাকি অনেক সময় আপনার নফসই আপনাকে চালায়?
কখনো খেয়াল করেছেন, কেউ প্রশংসা করলে ভালো কাজ করার আগ্রহ বেড়ে যায়, কিন্তু কেউ জানবে না বুঝলে সেই আগ্রহটাই কমে যায়? সকালে alarm বাজে, মনে হয় আর দশ মিনিট ঘুমাই। সালাতের সময় হয়, ভাবি কাজটা শেষ করে তারপর পড়ব। কুরআন খুলতে বসে ফোনটা হাতে নিই। কেউ ভুল ধরিয়ে দিলে কথাটা সত্য কি না ভাবার আগেই ভেতরে প্রশ্ন আসে, “আমাকে এভাবে বলল কেন?”
এগুলো খুব ছোট ঘটনা মনে হয়। কিন্তু মানুষের ভেতরের বড় লড়াইগুলো প্রায়ই এমন ছোট ছোট মুহূর্তেই শুরু হয়। প্রশ্নটা তখন শুধু “আমি কী করতে চাই?” নয়। প্রশ্নটা হলো, যখন আমার ইচ্ছা আর আল্লাহর সন্তুষ্টি একদিকে থাকে না, তখন আমি কাকে অগ্রাধিকার দিই?
আল্লাহ তাআলা বলেন,
“নিশ্চয়ই নফস মন্দ কাজের দিকে প্রবলভাবে প্ররোচিত করে, তবে আমার রব যার প্রতি দয়া করেন সে ছাড়া।”
সূরা ইউসুফ, ১২:৫৩
এর অর্থ এই নয় যে মানুষের প্রতিটি চাওয়া খারাপ। ঘুম, বিশ্রাম, আনন্দ, ভালো খাবার, সাফল্য, সম্মান চাওয়া মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তির অংশ। সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন সেই চাওয়া আল্লাহর সীমার সামনে এসে বলে, “আজ থাক”, “এটুকু করলে কী হবে?”, “আরেকটু পরে”, “মানুষ কী বলবে?”, “আমাকেই ঠিক প্রমাণ করতে হবে।”
নফসের বিরুদ্ধে লড়াই মানে নিজের স্বাভাবিক চাহিদাগুলোকে মুছে ফেলা নয়। বরং নিজের চাহিদাকে আল্লাহর আনুগত্যের সীমার মধ্যে রাখতে শেখা।
ধরুন, আপনি কাউকে সাহায্য করেছেন। কাজটা শেষ হওয়ার পর খুব ইচ্ছা হলো কেউ জানুক। কেউ বলুক, “আপনি অনেক ভালো কাজ করেছেন।” ভালো কাজ প্রকাশ করলেই যে রিয়া হবে, বিষয়টা এত সরল নয়; নিয়ত ও প্রয়োজনের পার্থক্য আছে। কিন্তু নিজের অন্তরকে মাঝেমধ্যে একটা প্রশ্ন করা দরকার, কেউ যদি কোনোদিন না জানে, তবুও কি আমি এই কাজটা করতাম?
রাসূলুল্লাহ ﷺ এমন ব্যক্তির কথা বলেছেন, যে এত গোপনে সদকা করে যে তার বাম হাতও যেন জানে না ডান হাত কী দান করেছে। তাকে কিয়ামতের দিন আল্লাহর বিশেষ ছায়া লাভকারীদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সহিহ আল বুখারি, ১৪২৩
তাই কিছু ভালো কাজ শুধু আল্লাহ আর আপনার মধ্যে রেখে দেখুন। এমন একটা দু‘আ, যার কথা কাউকে বলবেন না। এমন একটা সাহায্য, যার credit আপনার নামে আসবে না। এমন একটা নেক কাজ, যার কোনো ছবি নেই, কোনো post নেই, কোনো প্রশংসাও নেই। এতে নিজের অন্তরকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা শেখানো হয়, মানুষ না দেখলেও আল্লাহ দেখছেন।
নফসের আরেকটি বড় পরীক্ষা আসে comfort-এর জায়গায়। শরীর ঘুম চায়, কিন্তু ফজরের সময় হয়ে গেছে। মন ফোনে থাকতে চায়, অথচ কুরআনের জন্য সময় রাখা দরকার। কাজের চাপ আছে, তবুও অকারণে সালাত দেরি না করে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিতে হবে। চোখ এমন কিছুর দিকে টানছে যেটা দেখা উচিত নয়, তখন চোখ ফিরিয়ে নেওয়াটাই হয়ে যায় নিজের ওপর ছোট্ট এক বিজয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
“আর যে তার রবের সামনে দাঁড়ানোর ভয় রাখে এবং নফসকে কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখে, নিশ্চয়ই জান্নাতই হবে তার আশ্রয়।”
সূরা আন নাযিআত, ৭৯:৪০–৪১
খেয়াল করুন, আয়াতে এমন মানুষের কথা বলা হয়নি যার কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই। তারও ইচ্ছা আছে, টান আছে, দুর্বলতা আছে। কিন্তু সে প্রতিটি ইচ্ছার আনুগত্য করে না।
তাই প্রতিদিন এমন কিছু মুহূর্ত প্রয়োজন, যেখানে নিজের নফসকে শেখানো হবে, “তুমি কিছু চাইলেই আমাকে সেটা করতে হবে না।” ঘুম পাচ্ছে, তবুও উঠলেন। মন চাইছে না, তবুও কয়েক আয়াত কুরআন পড়লেন। খুব ব্যস্ত, তবুও সালাতকে জায়গা দিলেন। খরচ করতে মন চাইছে না, তবুও আল্লাহর জন্য কিছু দিলেন। temptation সামনে, তবুও নিজেকে ফিরিয়ে নিলেন।
এভাবেই discipline তৈরি হয়। বড় কোনো বক্তৃতা শুনে একদিন আবেগী হয়ে নয়, বরং প্রতিদিনের সিদ্ধান্তে আল্লাহকে অগ্রাধিকার দিতে দিতে।
কিন্তু নফসের সবচেয়ে সূক্ষ্ম পরীক্ষা হয়তো অন্য জায়গায়।
কেউ আপনাকে correction করল। সঙ্গে সঙ্গে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে ইচ্ছা হলো। কেউ ভুল বুঝল, মনে হলো এখনই তাকে বোঝাতে হবে যে আপনি ভুল নন। কেউ সমালোচনা করল, মাথার ভেতর মুহূর্তেই দশটা উত্তর তৈরি হয়ে গেল। কারণ নফস শুধু comfort চায় না, অনেক সময় সে জিততেও চায়। সে চায়, শেষ কথাটা আমার হোক। আমি ভুল হতে পারি, এই সম্ভাবনাটাও যেন স্বীকার করতে না হয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
“শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।”
সহিহ আল বুখারি, ৬১১৪; সহিহ মুসলিম, ২৬০৯
এর মানে এই নয় যে সব criticism চুপচাপ মেনে নিতে হবে বা অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যাবে না। প্রয়োজন হলে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতেও হবে। কিন্তু প্রতিটি কথার জবাব সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া, সবাইকে নিজের ব্যাখ্যা মানাতেই হবে, অথবা “আমিই ঠিক” প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত থামতে না পারা কখনো কখনো সত্যের প্রয়োজন নয়, নফসের প্রয়োজন।
কখনো উত্তর দেওয়ার আগে একটু থামা শক্তি। নিজের ভুল থাকলে স্বীকার করা শক্তি। কেউ সত্য কথা বলেছে অথচ কথাটা অহংকারে আঘাত করেছে, তারপরও সত্যটা গ্রহণ করা শক্তি। কারণ তখন আপনি অন্য মানুষকে হারাচ্ছেন না, নিজের ভেতরের অহংকারকে নিয়ন্ত্রণ করছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
“সফল সে, যে তাকে পরিশুদ্ধ করেছে। আর ব্যর্থ সে, যে তাকে কলুষিত করেছে।”
সূরা আশ শামস, ৯১:৯–১০
এই আত্মশুদ্ধি কোনো একদিনের dramatic transformation নয়। আপনি আজ খুব অনুপ্রাণিত হলেন আর কাল থেকে নফসের সব টান শেষ হয়ে গেল, বিষয়টা এমন নয়। বরং alarm বাজার মুহূর্তে, আযান শোনার পর, ফোন হাতে নেওয়ার সময়, কারও কথায় রাগ উঠলে, প্রশংসা পাওয়ার সুযোগ এলে, একা থাকলে এবং কেউ যখন দেখছে না তখন নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোই ধীরে ধীরে বলে দেয় কে কাকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
তাই আজ নিজের জীবনের একটা জায়গা খুঁজে বের করুন।
আপনার নফস সবচেয়ে বেশি কোথায় দরকষাকষি করে? সালাতে? ঘুমে? ফোনে? মানুষের attention পাওয়ার ইচ্ছায়? রাগে? নিজের ভুল স্বীকার করতে? এমন কোনো গুনাহে, যেটা কেউ জানে না?
সবকিছু একসঙ্গে বদলাতে যাবেন না। একটা জায়গা বেছে নিন। সেখানে যখনই নিজের ইচ্ছা আর আল্লাহর সন্তুষ্টি মুখোমুখি হবে, অন্তত একবার সচেতনভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে বেছে নিন।
হয়তো বাইরে থেকে কেউ বুঝবেই না যে আপনার ভেতরে একটা যুদ্ধ হয়েছিল। কেউ হাততালি দেবে না, কেউ বলবে না আপনি আজ খুব বড় কিছু করেছেন। কিন্তু আপনি জানবেন, আল্লাহ জানবেন, আর আপনার নফসও বুঝবে আজ সে যা চেয়েছিল, আপনি তা করেননি, কারণ আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
মানুষকে হারানো অনেক সময় সহজ।
নিজের রাগকে থামানো, নিজের চোখ ফিরিয়ে নেওয়া, নিজের অহংকারকে নরম করা, নিজের আরাম ছেড়ে আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়া, মানুষের প্রশংসা ছাড়াই ভালো কাজ করে যাওয়া অনেক বেশি কঠিন।
আর হয়তো সেই নীরব বিজয়গুলোই একদিন আপনার পুরো মানুষটাকে বদলে দেবে।
আল্লাহ আমাদের নফসের অনিষ্ট থেকে হেফাজত করুন, অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার তাওফিক দিন, গোপনে ও প্রকাশ্যে তাঁর জন্য আমল করার ইখলাস দিন এবং নিজের প্রবৃত্তির ওপর তাঁর আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ার শক্তি দান করুন। আমিন।
━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━