Mahfuz Rahman - محفوظ الرحمن - 馬夫茲拉赫曼

Mahfuz Rahman - محفوظ الرحمن - 馬夫茲拉赫曼 - ইসলামের দৃষ্টিতে দুনিয়া দেখি - Former Banker, Educator and Geopolitical Observer,

"মিরিওকেফালন এর যুদ্ধ - ১১৭৬"উদীয়মান ইসলামী শক্তির অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য এবং পবিত্র ভূমির নিয়ন্ত্রণ পুনরায...
19/09/2026

"মিরিওকেফালন এর যুদ্ধ - ১১৭৬"

উদীয়মান ইসলামী শক্তির অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য এবং পবিত্র ভূমির নিয়ন্ত্রণ পুনরায় নেওয়ার জন্য খ্রিষ্টান সম্প্রদায় এক সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। সেই সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা ছিল শিক্ষা, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সামরিক ক্ষেত্র সহ সকল ক্ষেত্রে। সেই মহাপরিকল্পনার পোশাকি নাম ছিল ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ। এখনও সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন চলছে। অনন্ত আমি এটাই মনে করি।

ক্রুসেড কোন একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধ নয়। শত বছর ধরে চলা বহু দুদ্ধের সমষ্টি। কখনো মুসলমানদের পরাজয় হয়েছে, কখনো পরাজিত হয়েছে খ্রিষ্টান ঐক্য। বহু মুসলিম সুলতান নেতৃত্ব দিয়েছেন শতবর্ষ ধরে চলা এই যুদ্ধের। নূর উদ্দিন জিনগি, সালাহউদ্দিন আইয়ুবী, আল আদেল, রুকন উদ্দিন বাইবার্স, আলপ্ আরসালান ছিলেন উল্লেখযোগ্য। আরব, তাতার, মামলুক/ তুর্কি ও ভারতের মুসলমানরা নিজেদের তাজা রক্ত ঢেলে সমুন্নত রাখার চেষ্টা করেছেন চাঁদ তারা খচিত পতাকা, তাদের জীবনের বিনিময়ে আজ আমরা মুসলমান।

প্রথম ক্রুসেড শুরু হয় ১০৯৫ সালে। পোপ দ্বিতীয় আরবান দ্বৈত উদ্দেশ্যে এই ক্রুসেড শুরু করেন, ঐশ্বরিক শহর জেরুজালেমকে মুসলমানদের কাছে থেকে দখল করা এবং এ পবিত্র ভূমিতে খ্রিস্টান শাসন প্রতিষ্ঠা করা। কাগজপত্রে সর্বশেষ ক্রুসেড হয় ১২৯১ সালে। কিন্তু সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ২০০১ সালে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগনে হামলার পাল্টা জবাবে আ-ফ-গা-নি-স্তা-নে-র নিরীহ মুসলমানদের উপর হামলার সময় ঐ হামলাকে ক্রুসেড হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

প্রথম ক্রুসেড শুরু হবার পর মুসলমানদের নেতৃত্বে আসেন আরব, তাতার, মামলুক ও সেলজুক সুলতানরা। বাইজেন্টাইনদের ইউরোপের মধ্যে আটকে রাখাও ছিল ক্রুসেডের একটি অংশ। লাভ হিসেবে এতে জেরুজালেম মুসলমানদের অধিকারে ছিল এবং বাইজেন্টাইন সহ ইউরোপীয়রা আনাতোলিয়া অতিক্রম করতে সক্ষম হয়নি। ক্রুসেডের তেমনি একটি অংশ হচ্ছে মিরিওকেফালন এর যুদ্ধ। অনেক ঐতিহাসিক হয়তোবা এই যুদ্ধকে ক্রুসেড হিসেবে মানতে নারাজ। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে এটি ক্রুসেডের অংশ বটে। ১১৭৬ সালের ১৯ই সেপ্টেম্বর দক্ষিণ-পশ্চিম তুরস্কের বেইশেহির হ্রদের আশেপাশে ফ্রেগিয়াতে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এবং সেলজুক তুর্কিদের মধ্যে মিরিওকেফালনের যুদ্ধ ছিল। যুদ্ধটি বাইজেন্টাইন বাহিনীর জন্য একটি কৌশলগত বিপরীত ছিল, যারা একটি পাহাড়ের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় অতর্কিত আক্রমণ করেছিল। পাসএটি ছিল সেলজুক তুর্কিদের কাছ থেকে আনাতোলিয়ার অভ্যন্তর পুনরুদ্ধারের জন্য বাইজেন্টাইনদের চূড়ান্ত, ব্যর্থ প্রচেষ্টা।

১১৭৬ সালের এইদিনে (১৯ সেপ্টেম্বর) কিলিজ আরসালানের সেলজুক বাহিনীর কাছে বাইজেন্টাইন, হাঙ্গেরি, অ্যান্টিয়ক ও সার্বিয়ার সম্মিলিত বাহিনী পরাজিত হয়। এটি ছিল সেলজুকদের নিকট থেকে আনাতোলিয়া উদ্ধারের চূড়ান্ত প্রচেষ্টা। তারা বারবার সেলজুকদের কাছে পরাজিত হয়ে ভাসাল হিসেবে সম্রাজ্য রক্ষা করে। কিন্তু তারা এক শতাব্দী পূর্বে মানজিকার্ট যুদ্ধে তাদের হারানো ভূমি পুনরুদ্ধার করতে সংকল্পবদ্ধ ছিল।

সেলজুক ভাসাল রাজা থাকাকালে বাইজেন্টাইন সম্রাট ম্যানুয়েল তার সামরিক শক্তিকে অন্যাত্র কাজে লাগান। তিনি পশ্চিমে হাঙ্গেরিকে পরাজিত করেন এবং সমস্ত বলকানের অঞ্চলে বাইজেন্টাইন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন। তিনি পূর্বে আর্মেনিয়ান সম্রাজ্য থেকে সিলিসিয়া পুনরুদ্ধার করে অ্যান্টিয়ক ক্রুসেডার প্রিন্সিপ্যালিটির অংশ দখল করে নেন। তিনি অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহীদের নির্মূল করতে এবং সামরিক শক্তি অর্জনে সক্ষম হন।

১১৭৫ সালে সেলজুকদের সাথে বাইজেন্টাইন শান্তিচুক্তি ক্ষুণ্ণ হয়। সম্রাট ম্যানুয়েল যুদ্ধের লক্ষ্যে এত বড় সেনাবাহিনী গঠন করেন যে, তা দশ মাইল জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এই বাহিনী লাওডিসিয়া, চোনে, ল্যাম্পে, সেলিয়েনা, চোমা ও অ্যান্টিওক হয়ে সেলজুক সীমান্তের দিকে অগ্রসর হয়। কিলিজ আরসালান শান্তির চেষ্টা করেন কিন্তু ম্যানুয়েল তার বাহিনীর শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন এবং শান্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

তিনি আন্দ্রোনিকোসের অধীনে তার বাহিনীর একটি অংশকে আমাসিয়ায় প্রেরণ করেন এবং বৃহত্তর অংশ নিয়ে সেলজুক রাজধানী কোনিয়ার দিকে অগ্রসর হন। উভয় দলের পথই ছিল ভারী জঙ্গলের মধ্য দিয়ে, যেখানে তুর্কিরা সহজেই লুকিয়ে থাকতে এবং অ্যামবুস করতে পারত। আমাসিয়া-গামী সেনাদলটি সেলজুকদের অ্যামবুশে ধ্বংস হয়ে যায়। সেনাপতি আন্দ্রোনিকোসের মাথা একটি ল্যান্সে বিদ্ধ করে প্রদর্শন করা হয়।

ম্যানুয়েলের যাত্রাপথে তুর্কিরা বাগানে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং পানিতে বিষ প্রয়োগ করে। এই বাহিনীকে মিরিওকেফালন দুর্গের নিকটে জিভরিৎজের পর্বতের গিরিপথে মেন্ডার উপত্যকায় পরিচালিত করার লক্ষ্যে আরসালান চোরাগোপ্তা হামলা করেন। বাধ্য হয়ে ম্যানুয়েল ঐ উপত্যাকার পথ ধরেন। এই স্থানে পূর্বে এক যুদ্ধে তার দাদা অ্যালেক্সিওস বিজয়ী হয়েছিলেন- এটা স্মরণ করে তিনি আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেন।

সৈন্যদের মাঝে খাদ্য-পানির অভাব এবং আমাশয় দেখা দেয়। ফলে, ম্যানুয়েল দ্রুত অগ্রসর হয়ে হামলার সিদ্ধান্ত নেন। তার ৪০ হাজার সৈন্যের মধ্যে ২৫ হাজার ছিল বাইজেন্টাইন; অবশিষ্টাংশ হাঙ্গেরি, অ্যান্টিয়ক ও সার্বিয়া কর্তৃক সরবরাহকৃত। তাদের কয়েকটি বিভাগে বিভক্ত করা হয় - ইনফ্যান্ট্রি ভ্যানগার্ড, মেইন ডিভিশন; রাইট উইং; লাগেজ অ্যান্ড সিজ ট্রেন; লেফট উইং; সম্রাটের গার্ড রেজিমেন্ট ও রিয়ার ডিভিশন।

কিলিজ আরসালান তার ১০ হাজার সৈন্যের বাহিনীকে দুটি অংশে বিভক্ত করেছিলেন; নিজের ও কয়েকজন আমীরের অধীনে আসকার দল এবং তুর্কমান উপজাতির অনিয়মিত সেনাদল। আসকার দল বর্মাচ্ছাদিত মাঝারি ও ভারী অশ্বারোহী বাহিনী ছিল; তারা ধনুক ও ল্যান্স দিয়ে সুসংগত ইউনিটে যুদ্ধ করত। আর, তুর্কোমান অশ্বারোহীরা নিজ সর্দারের অধীনে কাজ করত। তারা হালকা মাউন্টেড তীরন্দাজ হিসেবে পারদর্শী ছিল।

উপত্যাকায় আগমনের পূর্বে বাইজেন্টাইন ভ্যানগার্ড ডিভিশন সেলজুক বাহিনীর সামনে পড়ে এবং অল্প ক্ষতির সাথে উপত্যাকা পার হয়। অতপর তাদের পদাতিক বাহিনীকে ঢালের উপরে সেলজুক সৈন্যদের সরিয়ে দেওয়ার জন্য পাঠানো হয়। তুর্কি হামলায় তারা পালাতে বাধ্য হয়। কিন্তু তাদের পরবর্তী ডিভিশন সতর্কতা অবলম্বন করেনি, প্রতিরক্ষামূলক ফরমেশন বজায় রাখেনি এবং তীরন্দাজ ইউনিট মোতায়েন করেনি।

এভাবে, প্রথম দুটি বাইজেন্টাইন ডিভিশন গিরিখাত পার হয়ে যায়। এরপর যখন পিছনের অংশ প্রবেশ করতে শুরু করেছে এমন সময় তুর্কিরা উচু থেকে নেমে আসে। তারা বাইজেন্টাইন রাইট উইং-এ দুর্ধর্ষ হামলা করে বসে। এই ডিভিশন দ্রুত ফর্মেশন হারিয়ে ফেলে এবং ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। সৈন্যরা এক দিকের অ্যামবুশ থেকে বাঁচতে ছুটে গিয়ে অন্যদিকে অ্যামবুশের মাঝে পড়ে। ডিভিশন কমান্ডার বল্ডউইন নিহত হন।

তুর্কিরা ব্যাগেজ অ্যান্ড সিজ ট্রেন ডিভিশনে হামলা করে, গাড়িটানা পশুগুলোকে হত্যা করে এবং রাস্তা বন্ধ করে দেয়। লেফট উইংও ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়। তাদের কমান্ডার জন কান্তাকুজেনোস নিহত হন। অবশিষ্ট বাইজেন্টাইন সৈন্যরা সামনের হত্যাযজ্ঞ দেখে এবং পিছনেও হামলা হয়েছে ধারণা করে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এমন সময় আকস্মিক মারাত্মক ধুলি-ঝড় সৃষ্টি হয়, যা উভয় বাহিনীকে বিভ্রান্ত করে দেয়।

সম্রাট ম্যানুয়েল তার আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেন এবং দিনভিখারীর মতো রাস্তায় বসে পড়েন। তিনি তার হতভাগা নিহত সৈনিকদের মতো ভাগ্য বরণ করতে প্রস্তুত হন। তবে, শেষ পর্যন্ত তার অফিসাররা তাকে জাগ্রত করে; বাহিনীর শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং বাহিনীকে পুনরায় প্রতিরক্ষামূলক ফর্মেশনে বিন্যস্ত করা হয়। তারা গিরিখাতের বাইরে চলে যায়। জীবীত কমান্ডাররা একে একে ফিরে আসেন।

অগ্রবর্তী সেনাদল- ভ্যানগার্ড ও মেইন ডিভিশন এর সৈন্যরা একটি সুরক্ষিত শিবির স্থাপন করেছিল। সম্রাট সেখানে উপনীত হন এবং কিছু পরে অল্প ক্ষয়ক্ষতির শীকার হয়ে রিয়ার ডিভিশন শিবিরে পৌঁছায়। রাতে সেলজুক মাউন্টেড তীরন্দাজদের হামলা সফলভাবে প্রতিহত করা হয়। পরের দিন, তুর্কিরা শিবিরের চতুর্দিক থেকে তীর বর্ষণ করে। সম্রাটের আদেশে দুটি পাল্টা হামলার মাধ্যমে সেলজুকদের প্রতিহত করা হয়।

ইতোমধ্যে অর্ধেক বাইজেন্টাইন সৈন্য নিহত এবং অবশিষ্টাংশের অর্ধেক আহত হয়। তাদের অবরোধ সরঞ্জামগুলি বেহাত বা ধ্বংস হয়েছিল। তাদের পক্ষে আর অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সম্ভব ছিল না। শান্তি আলোচনার শুরু হয়। সম্রাট ম্যানুয়েল সেলজুক সীমান্তে তার দুর্গগুলো ধ্বংস করবেন; ডোরাইলিয়াম ও সাব্লেউম গ্যারিসন খালি করে দেবেন- এই শর্তে বাইজেন্টাইন বাহিনীকে চলে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

এই যুদ্ধের সামরিক প্রভাবের চেয়ে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব অনেক বেশি ছিল। এটি প্রমাণ করে যে, ম্যানুয়েল তার রাজ্য রক্ষায় সক্ষম নন। এই মনস্তাত্বিক বিজয় কিলিজ আরসালানকে বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনীকে মোকাবেলা করার উপযোগী একটি বাহিনী গড়ে তুলতে সক্ষম করেছিল। আর, ম্যানুয়েলের মৃত্যুর পর তার সাম্রাজ্য অরাজক অবস্থার মধ্যে চলে যায়। তারা কখনই তুর্কিদের থেকে আনাতোলিয়া পুনরুদ্ধার করতে পারেনি।

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ Mohammad Salimullah

(পরিমার্জিত এবং পরিবর্ধিত)

ہٰذَا ؕ وَ  اِنَّ  لِلطّٰغِیۡنَ  لَشَرَّ  مَاٰبٍ ﴿ۙ۵۵﴾ হা-যা- ওয়া ইন্না লিত্তা-গীনা লাশাররা মাআ-ব।This is so! And for th...
19/09/2026

ہٰذَا ؕ وَ اِنَّ لِلطّٰغِیۡنَ لَشَرَّ مَاٰبٍ ﴿ۙ۵۵﴾

হা-যা- ওয়া ইন্না লিত্তা-গীনা লাশাররা মাআ-ব।

This is so! And for the Taghun (transgressors, disobedient to Allah and His Messenger - disbelievers in the Oneness of Allah, criminals, etc.), will be an evil final return (Fire),

এমনই, আর নিশ্চয় সীমালংঘনকারীদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্টতম নিবাস।

সূরা আস-সাদ, সূরা নাম্বারঃ ৩৮, আয়াত নাম্বারঃ ৫৫।

ইসলামের ইতিহাসে, পৃথিবীর বুকে এ যাবৎ যত অকুতোভয়, দূর্ধর্ষ, দুর্দমনীয় বীর যোদ্ধাদের আগমন ঘটেছে তার মধ্যে বাইবার্স ছিলেন অ...
18/09/2026

ইসলামের ইতিহাসে, পৃথিবীর বুকে এ যাবৎ যত অকুতোভয়, দূর্ধর্ষ, দুর্দমনীয় বীর যোদ্ধাদের আগমন ঘটেছে তার মধ্যে বাইবার্স ছিলেন অন্যতম। তার নামের মধ্যেই এক রোমাঞ্চ লুকিয়ে আছে। বাইবার্স নামের অর্থ "মহান চিতা" বা "চিতা রাজ" বা "চিতাদের রাজা"। বাইবার্স ছিলেন মামলুক সাম্রাজ্যের চতুর্থ সুলতান। বাইবার্সকে দ্বিতীয় আইয়ুবি বলা হয় এবং সালাহউদ্দিন আইয়ুবির পরে তাকে স্থান দেয়া হয়।

★ বাইবার্সের পরিচয়ঃ
বাইবার্সের ক্রীতদাস থেকে সুলতান হয়ে উঠার গল্পটা কিন্তু বেশ রোমাঞ্চকর ও আকর্ষনপূর্ণ। বাইবার্সের জন্ম হয় বর্তমান কাজাখস্তানের কুমান গোত্রে ৬২১/২২ হিজরি, ১২২৩ সালে। তার পুরো নাম আল মালিকুয যাহির রুকনুদ্দিন বাইবার্স। তিনি ছিলেন মামলুক গোত্রীয়। মামলুক শব্দের অর্থ হলো "ক্রীতদাস"। যুদ্ধবন্দী যেসব দাস ক্রয়সূত্রে কারো অধিকারে আসে তাদের বলা হয় মামলুক।

কাজাখস্তানের মামলুকরা ছিলো ভীষণ কর্মঠ, তেজস্বী আর তলো য়ার চালনায় সিদ্ধহস্ত। বাইবার্সের বয়স যখন পাঁচ বছর সেই সময় কাজাখস্তানে চেঙ্গিস খানের মোঙ্গল বাহিনী আক্রমন করে সবাইকে পরাভূত করে ফেলে। মোঙ্গলরা বাইবার্সকে বিক্রি করে দেয়। তাকে ৮০০ দিরহামে ক্রয় করে নেয় মিশরের সুলতান সালিহ এর এক সেনা কমান্ডার যার নাম আলাউদ্দিন আইতাকিন বানদুকদারি। আইতাকিন বাইবার্সকে কিনে নিয়ে তাকে দ্বীনি শিক্ষা, অস্ত্র চালনা, রণকৌশল, সামরিক শাস্ত্রের সকল বিষয়াদি শিক্ষা দেন। সেই থেকে আলাউদ্দিন আইতাকিনের নামের নামানুসারে বাইবার্সের নামের সাথে বানদুকদারি পদবিটি যুক্ত হয়। কে জানতো, যেই মোঙ্গলরা ছোট্ট এক বালককে ৮০০ দিরহামে দাস হিসেবে বিক্রি করে দিয়েছে সেই বালকই একসময় তাদের জন্য ত্রাস হয়ে দাড়াবে!

★ তৎকালীন সময়ের অবস্থাঃ
তৎকালীন সময়ে পুরো দুনিয়া তাতার বা মোঙ্গলদের ভয়ে ভীত ছিলো অন্যদিকে মুসলমানদের সাথে খ্রিষ্টানদের (ক্রুসেড) যুদ্ধ চলমান ছিলো। ১২৪৯ সালে ফ্রান্সের রাজা ৯ম-লুই নবম (ক্রুসেডের) ডাক দিলে পুরো ইউরোপ জুড়ে ক্রুসেড যুদ্ধের দামামা বাজতে থাকে। এইদিকে আইয়ুবি সাম্রাজ্যের শেষ শাসক ছিলেন আল-দীন আইয়ুবি। তার মৃত্যুর পর তার স্থলাভিষিক্ত হন তুরাণ শাহ্। ক্রুসেড বাহিনীর বিরুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর প্রধান সেনাপতি হন বাইবার্স। তার নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে থাকে।

★ক্রুসেড যুদ্ধে বাইবার্সের বিজয়ঃ
নবম লুইয়ের ডাকে ক্রুসেড শুরু হলে ১২৫০ সালে ক্রুসেডার আর মুসলিম বাহিনীর মধ্যে ব্যাপক যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে বাইবার্স এতোটাই ক্ষিপ্র আর হিংস্রতার সাথে আক্রমন করে যে ক্রুসেডাররা সব নাস্তানাবুদ হয়ে যায়। এমনকি ক্রুসেডারদের নেতৃত্বে থাকা রাজা নবম লুই স্বপারিষদ বন্দী হন বাইবার্সের বাহিনীর কাছে। এটা ছিলো বাইবার্সের বিশাল এক সফলতা। রাজা লুইকে মুক্তি দেয়ার ব্যাপারে বাইবার্সের শর্ত ছিলো একটাই আর তা হলো "কান্ট্রি অব ত্রিপোলি" মুসলিমদের হস্তান্তর করতে হবে। কিন্তু এর মধ্যেই সুলতান তুরাণ শাহ্ লুইকে অর্থের বিনিময়ে মুক্ত করে দেয়। লুইকে অর্থের বিনিময়ে মুক্ত করে দেয়াতে বাইবার্স ভীষণ ক্রোধান্বিত হন। তার কাছে মনে হয় যে এটা মুসলিমদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা।

★ মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে বাইবার্সের যুদ্ধঃ
মামলুক সাম্রাজ্যের ৩য় সুলতান সাইফুদ্দিন কুতুজের শাসন সময়ে মোঙ্গলরা মিশর আক্রমণের পরিকল্পনা করতে থাকে। সেই সময় বাইবার্স সিরিয়ায় অবস্থান করছিলেন। মোঙ্গলদের যুদ্ধের খবর পেয়ে সুলতান সাইফুদ্দিন বাইবার্সকে মিশরে ফিরে আসার আহ্বান করেন। সুলতানের কথায় বাইবার্স মিশরে আসেন এবং মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে মুসলিম বাহিনীকে ঢেলে সাজাতে থাকেন। তিনি হন মুসলিম বাহিনীর কমান্ডার। ওই সময়ে মোঙ্গলরা ছিলো পৃথিবীর বুকে প্রতিটি মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম। তারা নিজেরা ভাবতো তাদেরকে পরাজিত করা অসম্ভব। ঠিক ওই সময়ে মোঙ্গল বংশধর বারকে খান ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেন এবং মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে বাইবার্সকে সাহায্য করেন। ১২৬০ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর ফিলিস্তিনের জিজরিল উপত্যকায় মোঙ্গল বাহিনী ও মুসলিম বাহিনীর মধ্যে শুরু হয় এক ঐতিহাসিক ভয়াবহ যুদ্ধ। এই যুদ্ধ ইতিহাসে হিমসের যুদ্ধ বা আইনে জালুতের যুদ্ধ বলে পরিচিত। যুদ্ধে বাইবার্স এতো মারাত্নক আর সর্বনাশা আক্রমন করেন যে মোঙ্গলরা এই প্রথমবারের মতো শোচনীয় ভাবে পরাজিত হয় মুসলিম বাহিনীর কাছে। এই যুদ্ধেই বাইবার্স প্রথমবারের মতো যুদ্ধে হাত-তোপ (হ্যান্ড ক্যানন) অস্ত্র ব্যবহার করেন যা "মিদফা" নামে পরিচিত

যুদ্ধ জয়ের পর বাইবার্স সুলতান সাইফুদ্দিন কুতুজের কাছে সিরিয়ার আলেপ্পো অঞ্চল উপহার হিসেবে চেয়েছিলেন কিন্তু সুলতান তা দিতে অস্বীকার করে। এর ফলে বাইবার্সের বাহিনীর কিছু লোক রাগান্বিত হয়ে মিশরে ফেরার পথে সুলতান সাইফুদ্দিনকে করুণভাবে হত্যা করে, যদিও এটা নিয়ে অনেক মতবিরোধ রয়েছে। সুলতান সাইফুদ্দিন এর পর মামলুক সাম্রাজ্যের ৪র্থ সুলতান হন বাইবার্স!

★ দায়িত্ব গ্রহণের পরবর্তী ১৭ বছর (১২৬০-১২৭৭) মোঙ্গল, ক্রুসেডার ওহাশিশিনদের বিরুদ্ধে বাইবার্সঃ

আইনে জালুতের যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর প্রতিশোধ নিতে মোঙ্গলরা আবার যুদ্ধের পরিকল্পনা করতে থাকে। হালাকু খান তার বাহিনী নিয়ে ঝড়ের বেগে মিশর-সিরিয়ার দিকে ছুটে আসতে থাকে। ফোরাত নদী তারা অতিক্রম করে ফেলেছে, মামলুক সাম্রাজ্যের সীমান্তে তারা এসে পড়েছে। এদিকে বাইবার্সও তার বাহিনী নিয়ে প্রস্তুত। ১২৬২ সালের জুলাই মাসে আবার দ্বিতীয় বারের মতো মোঙ্গল ও মুসলিম বাহিনীর মধ্যে শুরু হয় তুমুল লড়াই। পুরো পৃথিবীতে এযাবৎ ত্রাস সৃষ্টি করা মোঙ্গলরা আবার কঠিনভাবে পরাজিত হয় মুসলিম বাহিনীর কাছে। মোঙ্গলরা বুঝে যায়, এ মামলুকরা এক ভিন্ন জাতি! যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মোঙ্গলরা মুসলিমদের সাথে শান্তিচুক্তি করে কিন্তু বাইবার্স এই চুক্তির কোন তোয়াক্কাই করে নি।

মোঙ্গলদের সাথে মুসলিমদের যুদ্ধে ক্রুসেডার বাহিনী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মোঙ্গলদের সহায়তা করেছিলো। এতে বাইবার্স প্রচন্ড রাগান্বিত হন। তিনি ক্রুসেডারদের দমন করতে দৃঢ়সংকল্প হন। শাম অঞ্চলে তখন তিনটি ক্রুসেড রাজ্য টিকে ছিলো। বায়তুল মুকাদ্দাস, ত্রিপোলি ও এন্টিয়ক। বাইবার্স এন্টিয়ক অঞ্চল জয় করতে এক বাহিনী প্রেরণ করেন। বাইবার্সের এক যুদ্ধ কৌশল ছিলো যে, তিনি লড়াইয়ের চেয়ে বেশি কঠিন অবরোধ করে শত্রুদের দুর্বল করে দিতেন। তিনি দীর্ঘদিন এন্টিয়ক অঞ্চল অবরোধ করে রাখেন। শেষে আর্মেনিয়ার রাজা হিথম সেনা সাহায্য পাঠালে তিনি অবরোধ তুলে নেন।

১২৬৩ সালে বাইবার্স ক্রুসেডারদের শক্তিশালী আক্কার দুর্গ জয় করে নেন। ১২৬৫ সালে জেরুজালেম এর নিকটবর্তী কাইসারিয়া ও হাইফা শহর দুটি ক্রু সে ডার দের থেকে জয় করে নেন। এর ৪০ দিন পরই তিনি আরসুফ অঞ্চল দখল করেন। ১২৬৬ সালে তিনি সাফেদ ও রামলা অঞ্চলও জয় করে নেন।

দীর্ঘ সময় পর পূর্ব ঔদ্ধত্য প্রকাশের জন্য বাইবার্স এন্টিয়কের রাজাকে আনুগত্য প্রদর্শন ও কর দানের জন্য আদেশ দেন কিন্তু রাজা এতে অস্বীকৃতি জানালে বাইবার্স আমির সাইফুদ্দিন কালাউনের নেতৃত্ব এক বাহিনী পাঠান। ১২৬৬ সালে মুসলিম বাহিনীর সাথে এন্টিয়কের রাজার বাহিনীর যুদ্ধ হয় এবং মুসলিমরা সেখানকার সিস ও আয়াস নামের দুটি শক্তিশালী দুর্গ দখল করে নেয়। অবশেষে ১২৬৮ সালে মুসলিম বাহিনী এন্টিয়ক জয় করে। এই যুদ্ধে ১৬ হাজার ক্রুসেডার হত্যা করা হয় এবং ১ লাখ ক্রুসেডার বন্দী করা হয়।

এদিকে ১২৭৩ সালে মোঙ্গল বাহিনী আবার তৃতীয় বারের মতো বিরা নামক স্থানে মুসলিম বাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং বাইবার্সের বিধ্বংসী আক্রমনে সেখানেও মোঙ্গলরা শোচনীয় ভাবে পরাজিত হয়। তবুও মোঙ্গলরা থেমে যায় নি। অবশেষে ইতিহাসে শেষবারের মতো ১২৭৭ সালে মোঙ্গলরা সালজুক বাহিনীর সাথে মিলে মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে এক বিশাল চূড়ান্ত যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় এবং এবারও বাইবার্স তার সাড়াশি আক্রমনে মোঙ্গলদের প্রায় সব সৈনিককে হত্যা করে। পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয় এক রক্তপিপাসু জাতির!

★বাইবার্সের উল্লেখযোগ্য কাজঃ
সুলতান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বাইবার্স সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থা সুবিন্যস্তকরণ, সেনাবাহিনী সংস্কার, নৌবহর নির্মাণে কাজ শুরু করে দেন।
শামের নিরাপত্তাব্যবস্থা দৃঢ়করণে তিনি মনোযোগ দেন এবং দামেস্ক হতে কায়রোর মাঝে কবুতরবিশিষ্ট দ্রুতগামী ডাকব্যবস্থার প্রচলন করেন যা ছিলো এক অভিনব ব্যবস্থা। তিনি মুসলিম উম্মাহর মজবুত নেতৃত্বের লক্ষ্যে পুনরায় খিলাফতব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করেন। তিনি জ্ঞানের প্রচার ও প্রসারে অনেক গুরুত্বারোপ করেন।

★ বাইবার্সের সম্বন্ধে কিছু বিচিত্র তথ্যঃ
বাইবার্স যুদ্ধ ময়দানে দুই ঘোড়ার উপর দাড়িয়ে এক নাগাড়ে তীর ছুড়তে পারতেন। বাইবার্সই প্রথম যুদ্ধের ময়দানে প্রথম হাত-তোপ (hand cannon) অস্ত্র ব্যবহার করেন। বাইবার্স ক্রুসেডারদের সাথে লড়াইয়ের থেকে তাদের প্রচন্ড অবরোধ করে দুর্বল করে দিতে বেশি আগ্রহী থাকতেন।

★ বাইবার্সের অন্তিমকালঃ
৬৭৬ হিজরি সনের ২৭ মুহাররম (১২৭৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩০শে জুন) মামলুক সাম্রাজ্যের মহান সুলতান, বাইবার্স দ্য গ্রেট ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা এই মহান বীরকে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমিন

~ বাইবার্স দ্যা গ্রেট (ইতিহাসের এক দুর্ধর্ষ যোদ্ধা)

আজ ভারতের হাতে স্বাধীনতা হারায় মুসলিম রাষ্ট্র হায়দরাবাদ, 'নিহত হন ২ লাখ মুসলমান'। রাষ্ট্র থেকে রাজ্য হায়দরাবাদ: ভারতের...
18/09/2026

আজ ভারতের হাতে স্বাধীনতা হারায় মুসলিম রাষ্ট্র হায়দরাবাদ, 'নিহত হন ২ লাখ মুসলমান'।

রাষ্ট্র থেকে রাজ্য হায়দরাবাদ: ভারতের দখল ও গণহত্যার লুকানো নির্মমতার ইতিহাস

১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট, ভারত ব্রিটিশ আধিপত্য হতে মুক্তিলাভ করে। সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও তাদের অন্তর্গত সবকয়টি রাজ্য তাদের সাথে যোগ দিতে ইচ্ছুক ছিল না। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল হায়দরাবাদ। বর্তমানে হায়দরাবাদ নামের কোন রাস্ট্র না থাকলেও সেসময় এটি ছিল ভারত উপমহাদেশের অন্যতম একটি উন্নত ও ধনী অঞ্চল। ব্রিটিশরা যখন ভারত থেকে চলে যায় তখন হায়দরাবাদের নিজস্ব টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা, বিমান সংস্থা, রেলপথ, ডাকযোগাযোগ ব্যবস্থা, রেডিও স্টেশন, নিজস্ব মুদ্রা এমনকি সেনাবাহিনী পর্যন্ত ছিল। ভারত উপমহাদেশ ব্রিটিশদের অধীনে থাকার সময় স্বভাবতই এই অঞ্চল ব্রিটিশদের অধীনে ছিল কিন্তু ভারতের অন্যান্য অঞ্চলথেকে ব্যাতিক্রম হায়দরাবাদ নিজস্ব নিজাম দ্বারা শাসিত হতো। ভারত উপমহাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময় তৎকালীন নিজাম ছিলেন ওসমান আলী খান সিদ্দীকি সপ্তম আসাফ জাহ এবং তার পরিবার সেই সম্রাট আবু আল-ফাতেহ্ নাসির উদদীন মুহাম্মদ শাহ্ এর সময় থেকে হায়দরাবাদের নিজামের দ্বায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। মুঘলদের আনুগত্যে থাকলেও বাংলার নবাবের মতো সেসময়ের নিজামরাও স্বাধীন ছিল এবং ব্রিটিশদের কাছে দিল্লির পতনের পর তৎকালীন নিজাম স্বভাবতই ব্রিটিশদের আধিপত্য স্বীকার করে নেন।

ব্রিটিশরা যখন ভারত উপমহাদেশকে দুটি ভাগ করে এখান থেকে চলে যায় তখন তিনি দুটির একটি রাষ্ট্রেও যোগ না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ব্রিটিশদের অনুরোধ করেন যেন হায়দরাবাদকে একটি স্বাধীন মুসলিম কমনওয়েলথ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল লুইস ফ্রান্সিস অ্যালবার্ট ভিক্টর নিকোলাস মাউন্টব্যাটেন তার অনুরোধ নাকচ করে তাকে যেকোন একটি দেশের সাথে, বিশেষত পাকিস্তানের সাথে যোগ দেয়ার পরামর্শ দেন, যেহেতু হায়দরাবাদের নিজাম মুসলিম ছিলো। কিন্তু নিজাম ভালোই জানতেন পাকিস্তান ইসলামের দোহাই দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হলেও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মনে অন্য কিছু আছে ফলে বাংলাদেশ যে ভূলটি করেছিল তা তিনি করতে চাননি। আবার মুসলিম হয়ে নতুন গড়ে ওঠা ভারতেও যোগ দেয়া পক্ষপাতী তিনি ছিলেন না। ফলে ব্রিটিশরা হায়দরাবাদকে স্বাধীন রাষ্ট্র না ঘোষণা করলেও তিনি নিজস্ব সেনাবাহিনী গঠন করে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিজের কার্যকলাপ চালিয়ে যেতে থাকেন।

ভারতের স্বাধীন হায়দরাবাদে আপত্তি:

তৎকালীন ভারতের সরকার স্বভাবতই এটি ভালো চোখে দেখেনি। এর অনেক গুলো কারনের মধ্যে প্রধান কারন বলা যায় তিনটি।

প্রথমত, হায়দরাবাদ যদি স্বাধীন থেকে যায় ও অন্য কোন রাজ্য যদি হায়দরাবাদের দেখাদেখি স্বাধীনতা ঘোষণা করে বসে তাহলে তাদের অখন্ড ভারতেও স্বপ্ন কখন বাস্তবায়িত তো হবেই না এমনকি ভারত নামের কোন দেশই হয়তো থাকবে না, কারন জাতীয়তাবাদের দ্বন্দ্ব ভারতীয় রাজ্যগুলোকে প্রবল ভাবে বিদ্যমান। এক রাজ্যের লোকেরা অন্য রাজ্যকে অত ভালো চোখে না দেখা জাতীয় কিছু গোঁড়ামি বিদ্যমান তা অস্বীকারের উপায় নেই, তাই এটি ছিলো একটি বড় ঝুঁকি।

দ্বিতীয়ত, ধর্মনিরপেক্ষ রাস্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও দেশ যখন দ্বি-জাতিতত্ত্ব এর ভিত্তিতে ভাগ হয় তখন কংগ্রেস ও সমানতালে সাম্প্রদায়িক আচরণ করে ও হিন্দুত্ববাদের পক্ষপাতী হয়। এরকম একটি দেশের একেবারে কেন্দ্রে একটি মুসলিম রাস্ট্রের অস্তিত্ব কখনই ঐদেশ মেনে নিতে পারে না। এখানে উল্লেখ্য যে, মারাঠাদের সাথে হায়দরাবাদ এর নিজামের সংঘাতের ইতিহাস অনেক পুরনো ও এই লড়াই এ সর্বদাই হিন্দু-মুসলিম বিভেদের সাম্প্রদায়িকতাকে ব্যবহার করা হতো।

তৃতীয়ত, হায়দরাবাদের অবস্থান ছিলো একেবারে ভারতের মাঝে, অন্যদিকে দক্ষিন ভারতের রাজ্যগুলো আবার ভারতের অধীন। তাই দক্ষিন ভারতের রাজ্যগুলোতে শাসন কার্য চালাতে হায়দরাবাদ কে পেরিয়ে যেতে হয় তা এসব রাজ্যে প্রশাসনকে দূর্বল অবস্থায় ফেলত। ঠিক যেমন টা আজকের বাংলাদেশের ভৌগলিক জন্য পূর্ব ভারতের সেভেন সিস্টার রাজ্যগুলো পরিচালনা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য বেশ কঠিন। তাই স্বাধীন হায়দরাবাদ রাস্ট্র ছিলো ভারতের চক্ষুশূল।

আক্রমনের প্রেক্ষাপট :

তৎকালীন ভারতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বাধীন জোট হায়দরাবাদকে কখনই স্বাধীন হতে দেয়া যাবে না এই বিষয়ে একমত হলেও সেটি কি উপায়ে বাস্তবায়ন করা হবে তা নিয়ে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন মত ছিল। প্রধানমন্ত্রী জাওহারলাল নেহরুর ইচ্ছা ছিল শান্তিপূর্ণ ভাবে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করা কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বল্লভভাই প্যাটেল ছিলেন চরমপন্থী এবং তার ইচ্ছা ছিল সামরিক অভিযানের মাধ্যমে হায়দরাবাদ দখল করা। নেহেরু যেহেতু প্রধানমন্ত্রী ছিল তাই তার মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে নিজামের সাথে একটি ‘স্ট্যান্ড স্টিল’ চুক্তি সাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি মোতাবেক হায়দরাবাদ এক বছরের মধ্যে ভারতের বিরুদ্ধে কোন মিলিটারি অ্যাকশন নিবে না ও সেনাবাহিনী বৃদ্ধি করবে না এবং পাকিস্তানের সাথেও যুক্ত হবে না। নেহেরুর কথা মেনে নিলেও প্যাটেলও কিন্তু ছেড়ে দেয়ার পাত্র ছিল না এবং প্যাটেলের সমর্থকের সংখ্যাও কম ছিল না। তারা তাদের মনবাসনা পূর্ণ করার জন্য হায়দরাবাদের বিরূদ্ধে অভিযোগ আনে হায়দরাবাদ তাদের প্যারামিলিটারির পরিমাণ বৃদ্ধি করছে এবং সেনাবাহিনীর বদলে প্যারামিলিটারিকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করছে। এছাড়াও সমাজতন্ত্রের অনুসারীদের সাথে মুসলিমদের হওয়া দাঙ্গাকে তারা হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা হিসেবে চালিয়ে দেয় যেখানে তারা বলে মুসলিমরা হিন্দুদের নির্যাতন করছে যা হিন্দুপ্রধান ভারতে বারুদে আগুন দেয়ার মতো কাজ করে। এই ঘটনার পরে প্রধানমন্ত্রী নেহেরু তার মনোভাব থেকে সরে এসে হায়দরাবাদে সামরিক আগ্রাসন চালানোর নির্দেশ দেয়। এর সামরিক কোডনেম দেওয়া হয়, “অপারেশন পোলো”।

ভারতের সামরিক আগ্রাসন :

‘স্ট্যান্ড স্টিল’ চুক্তির ফলে হায়দরাবাদ তাদের মিলিটারিকে সেরকম ভাবে উন্নত করেনি বা করতে পারেনি ফলে সেসময় তাদের মাত্র ২৪ হাজার নিয়মিত সৈনিক ছিল যাদের মধ্যে মাত্র ৬,০০০ ছিল সশস্ত্র এবং এই অস্ত্রের বেশ বড় একটি অংশ ছিল মাজল লোডার রাইফেল। এই ছোট্ট বাহিনীকে ভারতীয় সেনাবাহিনী মেজর জেনারেল জয়ন্ত নাথ চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রায় ৩৫ হাজার সু-প্রশিক্ষিত সেনা আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ট্যাংক, আর্টিলারি ও এয়ার সাপোর্টের আন্ডারে ১৩ ই সেপ্টেম্বর ১৯৪৮ সালে আক্রমন করে এবং এর ফলাফল কি হয়েছিল তা সহজেই অনুমেয়। নিজামের বাহিনী মাত্র ৫ দিনে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর কাছে হেরে যায়। কিন্তু এই পাঁচদিনে ও এরপরে কি হয়েছিল তা প্রায় ৬৫ বছর সাধারণ জনগণের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।

যুদ্ধে ভারতীয় নির্মমতা :

আগেই বলেছি হায়দরাবাদের নিজাম ছিলেন একজন মুসলমান এবং হায়দরাবাদের হওয়ার কথা ছিল একটি মুসলিম রাষ্ট্র। তাই স্বভাবতই সেখানকার সামরিক বাহিনীতে মুসলিমদের সংখ্যাই বেশি ছিল। কিন্তু হায়দ্রাবাদ হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল বলে সেনাবাহিনীতে হিন্দুদের সংখ্যাও কম ছিল না। সেনাবাহিনীতে মাত্র ৫৫ শতাংশ মুসলিম ছিল আর বাকি অংশ ছিল হিন্দু বা কিছু খৃষ্টান। কিন্তু ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে পরাজিত হওয়ার পরে সেনাবাহিনী মুসলিমদের নিরস্ত্র করলেও প্রায় সময়ই হিন্দুদের নিরস্ত্র করা হতো না। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে এই আক্রমণ করা হয়েছিল মূলত হিন্দুদের উপর অত্যাচারের কথা বলে আর ভারতীয় সেনাবাহিনী এখানে এই বিষয়টিকেই কাজে লাগিয়ে মুসলমান নিধনে নামে। তারা এসব ঘটনা বলে সশস্ত্র হিন্দুদের তাদের বদলা নিতে উৎসাহিত করে। আর বদলা নেয়ার অন্যতম মাধ্যম ছিল তাদের হত্যা করে সম্পদ লুটপাট আর ধর্ষণ । আর এই কর্মকান্ডে মাঝে মাঝে সৈন্যরাও সরাসরি অংশগ্রহন করত। সৈন্যরা প্রথমে এলাকার সকল পুরুষদের একত্রে গ্রেফতার করে একজায়গায় এনে হত্যাকরত তারপর তাদের বাড়িয়ে গণ ধর্ষণ করত এবং তাদেরও হত্যা করা হতো।

পাঁচদিনের যুদ্ধে এভাবে কত মানুষকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে? পাঁচ হাজার? দশ হাজার? সেসময়ের অফিশিয়াল রিপোর্ট অনুযায়ী চল্লিশ হাজার আর আন-অফিশিয়াল রিপোর্ট অনুযায়ী কমপক্ষে ২ লাখ। আমাদের নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ আর তাদের পাঁচদিনের যুদ্ধে ২ লাখ, এখানেই সে অপারেশনের নির্মমতার ভয়াবহতা বুঝ যায়। এইসব মৃতের মধ্যে প্রায় সবাই ছিল মুসলিম যার ফলে নেহেরু সিদ্ধান্ত নেন এই খবর জনসম্মুখে প্রকাশ না করার। কারণ সেসময় এমনিতেই হিন্দু মুসলিম সম্পর্ক ভালো ছিল না আর এই খবর প্রকাশিত হলে তাদের মধ্যে দাঙ্গা নিশ্চিত ছিল যা খুব সহজেই গৃহযুদ্ধে পরিণত হতো। এছাড়াও যুদ্ধের সময় হায়দরাবাদ সেনাবাহিনীর প্রায় সব অফিসারকে বন্দী করা হয়েছিল। এই গণহত্যার ফলে নেহেরু তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিতে চাইলে প্যাটেল সব হিন্দু অফিসারদের মুক্ত করে দিয়ে মুসলমান অফিসারদের বিচারের জন্য ট্রাইবুনাল তৈরী করে। কিন্তু ১৯৫০ সালে তার মৃত্যুর পর নেহেরুর আগ্রহ না থাকায় তাদের অবশ্য ছেড়ে দেয়া হয়েছিল।

এই সকল ঘটনার বেশিরভাগই প্রায় ৬৫ বছর ধরে গোপন রাখা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৩ সালে এক ব্রিটিশ ব্রিটিশ সাংবাদিকের হাতে তৎকালীর তদন্ত কমিটির রিপোর্টের একটি কপি পড়লে তা বিবিসিতে প্রচার করা হয় এবং তার পরেই বিশ্ববাসী ভারতের হায়দরাবাদ এর এই গণহত্যা সম্পর্কে জানতে পারে ও সত্য উন্মোচিত হয়।

লেখার কৃতজ্ঞতাঃ গ্লোবাল টাইম ২৪ ডট কম

হানিট্র্যাপিং, ব্ল্যাকমেইলিং অ্যান্ড দ্য রাইজ অব হামাস===সত্তরের দশকে ফিলিস্তিনের জাতীয়তাবাদী এবং বামপন্থীরা যেখানে ইসরা...
18/09/2026

হানিট্র্যাপিং, ব্ল্যাকমেইলিং অ্যান্ড দ্য রাইজ অব হামাস
===

সত্তরের দশকে ফিলিস্তিনের জাতীয়তাবাদী এবং বামপন্থীরা যেখানে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই করছিল, সে সময় ইসলামপন্থীরা ছিল অনেকটাই নিশ্চুপ। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সংগ্রামের পরিবর্তে সে সময় তারা ইসরায়েলের বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে, ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অধীনে থেকেই সমাজের ইসলামাইজেশনের উপর গুরুত্ব দিচ্ছিল।

সে সময় গাযায় মুসলিম ব্রাদারহুডের আনঅফিশিয়াল শাখা জামেয়া ইসলামিয়ার সভাপতি ছিলেন শেখ আহমেদ ইয়াসিন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাযার অধিবাসীদেরকে শাসন করার জন্য, তাদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করার জন্য, তাদের ভেতর থেকে গোপন তথ্য সংগ্রহ করার জন্য এর অধিবাসীদের দারিদ্র্য, চারিত্রিক দুর্বলতা এবং বিভিন্ন অনৈতিকতাকে কাজে লাগাচ্ছে; তাদেরকে বিভিন্নভাবে ব্ল্যাকমেইল করছে।

শেখ ইয়াসিন সিদ্ধান্তে আসেন, এগুলো থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হচ্ছে ধর্মভিত্তিক সমাজ এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে মানুষের নৈতিকতা এত শক্তিশালী হবে যে শত্রু তাদেরকে ব্ল্যাকমেইল করে, লোভ দেখিয়ে বা ভয় দেখিয়ে কোনো স্বার্থ আদায় করতে পারবে না। সেরকম একটা ইসলামি সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে করতে যাওয়া মানে নিজেদের নিশ্চিত পরাজয় ডেকে আনা।

১৯৭০ সালের ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর এবং এরপর ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর পিএলওর প্রভাব যখন ধীরে ধীরে কমে আসছিল, সে সময় মুসলিম ব্রাদারহুডের সামাজিক, ধর্মীয়, শিক্ষা এবং চিকিৎসা কার্যক্রমকে বিস্তৃত করার লক্ষ্যে শেখ ইয়াসিন মুজাম্মা আল-ইসলামিয়া (Islamic Center) নামে নতুন একটা সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।

বিনা বাধায় কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য তিনি এর লাইসেন্সের জন্য ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করেন। এবং ইসরায়েলও ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসির অংশ হিসেবে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত পিএলও'র বিপরীতে গড়ে ওঠা শান্তিকামী এই ইসলামি সংগঠনকে লাইসেন্স প্রদান করে।

ইসরায়েলের কাছ থেকে বৈধতা পেয়ে মুসলিম ব্রাদারহুড গাযায় তাদের কার্যক্রম বাড়িয়ে দেয়। লেবাননের গৃহযুদ্ধ এবং ক্যাম্প ডেভিড পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় হতাশ গাযাবাসী সে সময় মুসলিম ব্রাদারহুডের এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যেই নতুন করে ভরসা খুঁজে পায়।

ব্রাদারহুডের কর্মীরা এ সময় গাযায় পিএলও এবং অন্যান্য জাতীয়তাবাদী এবং ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠনগুলোর সাথে প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে এবং সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে ব্রাদারহুডের নিয়ন্ত্রণে চলে আসতে থাকে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এসব দ্বন্দ্বে বাধা না দিয়ে ব্রাদারহুডকে সমগ্র গাযায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার করার সুযোগ তৈরি করে দিতে থাকে।

ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরোধিতা না করে শুধুমাত্র দখলকৃত ফিলিস্তিনের ভেতরে ইসলামি সমাজ এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মুসলিম ব্রাদারহুডের এই প্রচেষ্টা কতদিন পর্যন্ত চলত বলা মুশকিল, কিন্তু সত্তরের দশকের শেষের দিকের এবং আশির দশকের শুরুর দিকের রাজনৈতিক বাস্তবতা তাদের গতিপথকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লব থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে গড়ে ওঠা সশস্ত্র সংগঠন "ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ"-এর কার্যক্রম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়।

আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই শেখ ইয়াসিন বুঝতে পারেন, তাদের নীতি পরিবর্তন করার সময় এসেছে। শুধুমাত্র সমাজের ইসলামিকরণ দিয়ে খুব বেশি কিছু অর্জন করা যাবে না। টিকে থাকতে হলে তাদেরকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে যোগ দিতেই হবে।

১৯৮৩ সাল থেকেই শেখ ইয়াসিন গোপনে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াইয়ের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি একাধিক গোপন সংগঠন গড়ে তোলেন। এই সংগঠনগুলোর মধ্যে একটা ছিল মুনায্‌যামাত আল-জিহাদ ওয়াল-দাওয়াহ বা Organization for Jihad and Proselytizing। আরবি অদ্যাক্ষরগুলোর সমন্বয়ে গঠিত সংগঠনটার সংক্ষিপ্ত নাম ছিল মাজদ (مجد), যার অর্থ গৌরব।

এই সংগঠনের কাজ ছিল ফিলিস্তিনিদের মধ্যে যারা ইসরায়েলের গুপ্তচর হিসেবে কাজ করছিল, তাদেরকে খুঁজে বের করা, গ্রেপ্তার করা, এবং প্রয়োজনে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা। এই সংগঠনের নেতা হিসেবে ইয়াসিন নিয়োগ করেন রুহি মুশতাহা এবং ইয়াহইয়া সিনওয়ারকে, যেই ইয়াহইয়া সিনওয়ারের নেতৃত্বেই ৩৮ বছর পর অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড পরিচালিত হয়।

সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে মুসলিম ব্রাদারহুড যখন সুযোগের জন্য অপেক্ষা করছিল, পিএলও যখন ধীরে ধীরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছিল, ইসলামিক জিহাদ যখন একের পর এক ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর উপর আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক এমন সময় ১৯৮৭ সালের ৮ই ডিসেম্বর গাযার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে চার ফিলিস্তিনি শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গাযাবাসী রাস্তায় নেমে আসে। শুরু হয় প্রথম ইন্তিফাদা।

পরদিন রাতের বেলা শেখ আহমেদ ইয়াসিনের গাযা সিটির পুরাতন ছোট বাসায় ড. আব্দুল আজিজ রানতিসি এবং সালাহ শাহাদাসহ সাত জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি জরুরি একটা অধিবেশনে বসেন। এই সাত জনই ছিলেন মুসলিম ব্রাদারহুডের মাকতাব আস্‌-সিয়াসি, তথা পলিটিকাল ব্যুরোর সদস্য। এবং সাত জনের মধ্যে ছয় জনই ছিলেন ফিলিস্তিনের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গাযায় এসে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থী।

গত চার দশক ধরে তাদের জীবন কেটেছে গাযার বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরের জীর্ণ কুটিরে, জাতিসংঘের ব্যবস্থা করা জীবিকার উপর নির্ভর করে। এর মধ্যে শেষ দুই দশক কেটেছে কোনো ধরনের নাগরিক অধিকার ছাড়া, কঠোর সামরিক শাসনের অধীনে। এর আগে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের সামাজিক কার্যক্রমের সাথে যুক্ত থাকলেও এই প্রথম তারা একত্রিত হয়েছেন তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটা নিতে– তারা কি এখনও আগের মতোই সমাজের ইসলামিকরণ কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন? নাকি ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন?

দীর্ঘ বৈঠক শেষে সাত নেতা একমত হন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার এটাই উপযুক্ত সময়। তারা সিদ্ধান্ত নেন, গত অন্তত চার বছর ধরে মুসলিম ব্রাদারহুডের যে বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন তারা গড়ে তুলেছেন, সেগুলোর সহায়তায় ব্রাদারহুডের অধীনেই তারা নতুন একটা সংগঠন প্রতিষ্ঠা করবেন, যার নাম হবে হারাকাত আল-মুক্বাওয়ামা আল-ইসলামিয়া, বা সংক্ষেপে হামাস। ঐ বৈঠকেই ড. আব্দুল আজিজ রানতিসি হামাসের প্রথম ইশতেহার রচনা করেন, এবং এর ছয় দিন পর, ডিসেম্বরের ১৪ তারিখে সেটা গণমাধ্যমে প্রেরণ করার মধ্য দিয়ে হামাসের আত্মপ্রকাশের ঘোষণা দেন।

যদিও প্রতিষ্ঠাতাদের পরিকল্পনা ছিল যে হামাস হবে মুসলিম ব্রাদারহুডেরই একটা অঙ্গ সংগঠন, কিন্তু বাস্তবে ধীরে ধীরে মুসলিম ব্রাদারহুডই তার সকল অঙ্গ সংগঠন নিয়ে হামাসে এসে বিলীন হয়ে যায়। নতুন নামে হামাসই হয়ে ওঠে মুসলিম ব্রাদারহুডের ফিলিস্তিনি শাখা; খিলাফত কিংবা প্যান-ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে যাদের প্রধান আদর্শ হয়ে দাঁড়ায় “ইসলামো-ন্যাশনালিজম”। অর্থাৎ ইসলামি আদর্শের ভিত্তিতে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব থেকে রাজনৈতিক এবং সামরিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনের মুক্তি অর্জন করা এবং এর মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনে একটা ইসলামি সমাজ এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।

বই: দ্য রোড টু অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড
লেখক: মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা

17/09/2026

মনযোগ সহকারে দেখা উচিত ...

আবূ হুরাইরাহ বর্ণনা করেন, আবুল কাসিম (আবুল কাসিম হচ্ছে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এঁর একটি উপনাম) বলেন, জুমু‘আহর দিনে এমন একটি মুহূর...
17/09/2026

আবূ হুরাইরাহ বর্ণনা করেন, আবুল কাসিম (আবুল কাসিম হচ্ছে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এঁর একটি উপনাম) বলেন, জুমু‘আহর দিনে এমন একটি মুহূর্ত আছে, যদি সে মুহূর্তটিতে কোন মুসলিম দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করে, আল্লাহর কাছে কোন কল্যাণের জন্য দু‘আ করলে তা আল্লাহ তাকে দান করবেন। তিনি এ হাদীস বর্ণনার সময় আপন হাত দিয়ে ইঙ্গিত করলে আমরা বললাম বুঝলাম) যে, মুহূর্তটির সময় খুবই স্বল্প। [৯৩৫] আধুনিক প্রকাশনী- ৫৯৫২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৮৪৫)
পাবলিশারঃ তাওহীদ পাবলিকেশন
গ্রন্থঃ সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ৮০/ দু‘আসমূহ
হাদিস নম্বরঃ ৬৪০০

وَ مَا خَلَقۡنَا السَّمَآءَ  وَ الۡاَرۡضَ وَ مَا بَیۡنَہُمَا بَاطِلًا ؕ ذٰلِکَ ظَنُّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا ۚ فَوَیۡلٌ  ل...
17/09/2026

وَ مَا خَلَقۡنَا السَّمَآءَ وَ الۡاَرۡضَ وَ مَا بَیۡنَہُمَا بَاطِلًا ؕ ذٰلِکَ ظَنُّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا ۚ فَوَیۡلٌ لِّلَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا مِنَ النَّارِ ﴿ؕ۲۷﴾ اَمۡ نَجۡعَلُ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ کَالۡمُفۡسِدِیۡنَ فِی الۡاَرۡضِ ۫ اَمۡ نَجۡعَلُ الۡمُتَّقِیۡنَ کَالۡفُجَّارِ ﴿۲۸﴾ کِتٰبٌ اَنۡزَلۡنٰہُ اِلَیۡکَ مُبٰرَکٌ لِّیَدَّبَّرُوۡۤا اٰیٰتِہٖ وَ لِیَتَذَکَّرَ اُولُوا الۡاَلۡبَابِ ﴿۲۹﴾
ওয়ামা-খালাকনাছ ছামাআ ওয়াল আরদা ওয়ামা-বাইনাহুমা-বা-তিলান যা-লিকা জান্নুল্লাযীনা কাফারূ ফাওয়াইলুলিলল্লাযীনা কাফারূমিনান্না-র। আম নাজ‘আলুল্লাযীনা আ-মানূওয়া ‘আমিলুসসা-লিহা-তি কালমুফছিদীনা ফিল আরদি আম নাজ‘আলুল মুত্তাকীনা কালফুজ্জা-র। কিতা-বুন আনঝালনা-হুইলাইকামুবা-রাকুল লিইয়াদ্দাব্বারূআ-য়া-তিহী ওয়া লিইয়াতাযাক্কারা উলুল আলবা-ব।

And We created not the heaven and the earth and all that is between them without purpose! That is the consideration of those who disbelieve! Then woe to those who disbelieve (in Islamic Monotheism) from the Fire! Shall We treat those who believe (in the Oneness of Allah Islamic Monotheism) and do righteous good deeds, as Mufsidun (those who associate partners in worship with Allah and commit crimes) on earth? Or shall We treat the Muttaqun (pious - see V. 2:2), as the Fujjar (criminals, disbelievers, wicked, etc)? (This is) a Book (the Quran) which We have sent down to you, full of blessings that they may ponder over its Verses, and that men of understanding may remember.

আর আসমান, যমীন এবং এ দু’য়ের মধ্যে যা আছে তা আমি অনর্থক সৃষ্টি করিনি। এটা কাফিরদের ধারণা, সুতরাং কাফিরদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের দুর্ভোগ। যারা ঈমান আনে ও নেক আমল করে আমি কি তাদেরকে যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের সমতুল্য গণ্য করব? নাকি আমি মুত্তাকীদেরকে পাপাচারীদের সমতুল্য গণ্য করব? আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে।

সূরা আস-সাদ, সূরা নাম্বারঃ ৩৮, আয়াত নাম্বারঃ ২৭ - ২৯।

Adresse

Vienna
1100

Benachrichtigungen

Lassen Sie sich von uns eine E-Mail senden und seien Sie der erste der Neuigkeiten und Aktionen von Mahfuz Rahman - محفوظ الرحمن - 馬夫茲拉赫曼 erfährt. Ihre E-Mail-Adresse wird nicht für andere Zwecke verwendet und Sie können sich jederzeit abmelden.

Die Kultstätte Kontaktieren

Nachricht an Mahfuz Rahman - محفوظ الرحمن - 馬夫茲拉赫曼 senden:

Verknüpfungen

Teilen