19/09/2026
"মিরিওকেফালন এর যুদ্ধ - ১১৭৬"
উদীয়মান ইসলামী শক্তির অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য এবং পবিত্র ভূমির নিয়ন্ত্রণ পুনরায় নেওয়ার জন্য খ্রিষ্টান সম্প্রদায় এক সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। সেই সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা ছিল শিক্ষা, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সামরিক ক্ষেত্র সহ সকল ক্ষেত্রে। সেই মহাপরিকল্পনার পোশাকি নাম ছিল ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ। এখনও সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন চলছে। অনন্ত আমি এটাই মনে করি।
ক্রুসেড কোন একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধ নয়। শত বছর ধরে চলা বহু দুদ্ধের সমষ্টি। কখনো মুসলমানদের পরাজয় হয়েছে, কখনো পরাজিত হয়েছে খ্রিষ্টান ঐক্য। বহু মুসলিম সুলতান নেতৃত্ব দিয়েছেন শতবর্ষ ধরে চলা এই যুদ্ধের। নূর উদ্দিন জিনগি, সালাহউদ্দিন আইয়ুবী, আল আদেল, রুকন উদ্দিন বাইবার্স, আলপ্ আরসালান ছিলেন উল্লেখযোগ্য। আরব, তাতার, মামলুক/ তুর্কি ও ভারতের মুসলমানরা নিজেদের তাজা রক্ত ঢেলে সমুন্নত রাখার চেষ্টা করেছেন চাঁদ তারা খচিত পতাকা, তাদের জীবনের বিনিময়ে আজ আমরা মুসলমান।
প্রথম ক্রুসেড শুরু হয় ১০৯৫ সালে। পোপ দ্বিতীয় আরবান দ্বৈত উদ্দেশ্যে এই ক্রুসেড শুরু করেন, ঐশ্বরিক শহর জেরুজালেমকে মুসলমানদের কাছে থেকে দখল করা এবং এ পবিত্র ভূমিতে খ্রিস্টান শাসন প্রতিষ্ঠা করা। কাগজপত্রে সর্বশেষ ক্রুসেড হয় ১২৯১ সালে। কিন্তু সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ২০০১ সালে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগনে হামলার পাল্টা জবাবে আ-ফ-গা-নি-স্তা-নে-র নিরীহ মুসলমানদের উপর হামলার সময় ঐ হামলাকে ক্রুসেড হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
প্রথম ক্রুসেড শুরু হবার পর মুসলমানদের নেতৃত্বে আসেন আরব, তাতার, মামলুক ও সেলজুক সুলতানরা। বাইজেন্টাইনদের ইউরোপের মধ্যে আটকে রাখাও ছিল ক্রুসেডের একটি অংশ। লাভ হিসেবে এতে জেরুজালেম মুসলমানদের অধিকারে ছিল এবং বাইজেন্টাইন সহ ইউরোপীয়রা আনাতোলিয়া অতিক্রম করতে সক্ষম হয়নি। ক্রুসেডের তেমনি একটি অংশ হচ্ছে মিরিওকেফালন এর যুদ্ধ। অনেক ঐতিহাসিক হয়তোবা এই যুদ্ধকে ক্রুসেড হিসেবে মানতে নারাজ। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে এটি ক্রুসেডের অংশ বটে। ১১৭৬ সালের ১৯ই সেপ্টেম্বর দক্ষিণ-পশ্চিম তুরস্কের বেইশেহির হ্রদের আশেপাশে ফ্রেগিয়াতে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য এবং সেলজুক তুর্কিদের মধ্যে মিরিওকেফালনের যুদ্ধ ছিল। যুদ্ধটি বাইজেন্টাইন বাহিনীর জন্য একটি কৌশলগত বিপরীত ছিল, যারা একটি পাহাড়ের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় অতর্কিত আক্রমণ করেছিল। পাসএটি ছিল সেলজুক তুর্কিদের কাছ থেকে আনাতোলিয়ার অভ্যন্তর পুনরুদ্ধারের জন্য বাইজেন্টাইনদের চূড়ান্ত, ব্যর্থ প্রচেষ্টা।
১১৭৬ সালের এইদিনে (১৯ সেপ্টেম্বর) কিলিজ আরসালানের সেলজুক বাহিনীর কাছে বাইজেন্টাইন, হাঙ্গেরি, অ্যান্টিয়ক ও সার্বিয়ার সম্মিলিত বাহিনী পরাজিত হয়। এটি ছিল সেলজুকদের নিকট থেকে আনাতোলিয়া উদ্ধারের চূড়ান্ত প্রচেষ্টা। তারা বারবার সেলজুকদের কাছে পরাজিত হয়ে ভাসাল হিসেবে সম্রাজ্য রক্ষা করে। কিন্তু তারা এক শতাব্দী পূর্বে মানজিকার্ট যুদ্ধে তাদের হারানো ভূমি পুনরুদ্ধার করতে সংকল্পবদ্ধ ছিল।
সেলজুক ভাসাল রাজা থাকাকালে বাইজেন্টাইন সম্রাট ম্যানুয়েল তার সামরিক শক্তিকে অন্যাত্র কাজে লাগান। তিনি পশ্চিমে হাঙ্গেরিকে পরাজিত করেন এবং সমস্ত বলকানের অঞ্চলে বাইজেন্টাইন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন। তিনি পূর্বে আর্মেনিয়ান সম্রাজ্য থেকে সিলিসিয়া পুনরুদ্ধার করে অ্যান্টিয়ক ক্রুসেডার প্রিন্সিপ্যালিটির অংশ দখল করে নেন। তিনি অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহীদের নির্মূল করতে এবং সামরিক শক্তি অর্জনে সক্ষম হন।
১১৭৫ সালে সেলজুকদের সাথে বাইজেন্টাইন শান্তিচুক্তি ক্ষুণ্ণ হয়। সম্রাট ম্যানুয়েল যুদ্ধের লক্ষ্যে এত বড় সেনাবাহিনী গঠন করেন যে, তা দশ মাইল জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এই বাহিনী লাওডিসিয়া, চোনে, ল্যাম্পে, সেলিয়েনা, চোমা ও অ্যান্টিওক হয়ে সেলজুক সীমান্তের দিকে অগ্রসর হয়। কিলিজ আরসালান শান্তির চেষ্টা করেন কিন্তু ম্যানুয়েল তার বাহিনীর শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন এবং শান্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
তিনি আন্দ্রোনিকোসের অধীনে তার বাহিনীর একটি অংশকে আমাসিয়ায় প্রেরণ করেন এবং বৃহত্তর অংশ নিয়ে সেলজুক রাজধানী কোনিয়ার দিকে অগ্রসর হন। উভয় দলের পথই ছিল ভারী জঙ্গলের মধ্য দিয়ে, যেখানে তুর্কিরা সহজেই লুকিয়ে থাকতে এবং অ্যামবুস করতে পারত। আমাসিয়া-গামী সেনাদলটি সেলজুকদের অ্যামবুশে ধ্বংস হয়ে যায়। সেনাপতি আন্দ্রোনিকোসের মাথা একটি ল্যান্সে বিদ্ধ করে প্রদর্শন করা হয়।
ম্যানুয়েলের যাত্রাপথে তুর্কিরা বাগানে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং পানিতে বিষ প্রয়োগ করে। এই বাহিনীকে মিরিওকেফালন দুর্গের নিকটে জিভরিৎজের পর্বতের গিরিপথে মেন্ডার উপত্যকায় পরিচালিত করার লক্ষ্যে আরসালান চোরাগোপ্তা হামলা করেন। বাধ্য হয়ে ম্যানুয়েল ঐ উপত্যাকার পথ ধরেন। এই স্থানে পূর্বে এক যুদ্ধে তার দাদা অ্যালেক্সিওস বিজয়ী হয়েছিলেন- এটা স্মরণ করে তিনি আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেন।
সৈন্যদের মাঝে খাদ্য-পানির অভাব এবং আমাশয় দেখা দেয়। ফলে, ম্যানুয়েল দ্রুত অগ্রসর হয়ে হামলার সিদ্ধান্ত নেন। তার ৪০ হাজার সৈন্যের মধ্যে ২৫ হাজার ছিল বাইজেন্টাইন; অবশিষ্টাংশ হাঙ্গেরি, অ্যান্টিয়ক ও সার্বিয়া কর্তৃক সরবরাহকৃত। তাদের কয়েকটি বিভাগে বিভক্ত করা হয় - ইনফ্যান্ট্রি ভ্যানগার্ড, মেইন ডিভিশন; রাইট উইং; লাগেজ অ্যান্ড সিজ ট্রেন; লেফট উইং; সম্রাটের গার্ড রেজিমেন্ট ও রিয়ার ডিভিশন।
কিলিজ আরসালান তার ১০ হাজার সৈন্যের বাহিনীকে দুটি অংশে বিভক্ত করেছিলেন; নিজের ও কয়েকজন আমীরের অধীনে আসকার দল এবং তুর্কমান উপজাতির অনিয়মিত সেনাদল। আসকার দল বর্মাচ্ছাদিত মাঝারি ও ভারী অশ্বারোহী বাহিনী ছিল; তারা ধনুক ও ল্যান্স দিয়ে সুসংগত ইউনিটে যুদ্ধ করত। আর, তুর্কোমান অশ্বারোহীরা নিজ সর্দারের অধীনে কাজ করত। তারা হালকা মাউন্টেড তীরন্দাজ হিসেবে পারদর্শী ছিল।
উপত্যাকায় আগমনের পূর্বে বাইজেন্টাইন ভ্যানগার্ড ডিভিশন সেলজুক বাহিনীর সামনে পড়ে এবং অল্প ক্ষতির সাথে উপত্যাকা পার হয়। অতপর তাদের পদাতিক বাহিনীকে ঢালের উপরে সেলজুক সৈন্যদের সরিয়ে দেওয়ার জন্য পাঠানো হয়। তুর্কি হামলায় তারা পালাতে বাধ্য হয়। কিন্তু তাদের পরবর্তী ডিভিশন সতর্কতা অবলম্বন করেনি, প্রতিরক্ষামূলক ফরমেশন বজায় রাখেনি এবং তীরন্দাজ ইউনিট মোতায়েন করেনি।
এভাবে, প্রথম দুটি বাইজেন্টাইন ডিভিশন গিরিখাত পার হয়ে যায়। এরপর যখন পিছনের অংশ প্রবেশ করতে শুরু করেছে এমন সময় তুর্কিরা উচু থেকে নেমে আসে। তারা বাইজেন্টাইন রাইট উইং-এ দুর্ধর্ষ হামলা করে বসে। এই ডিভিশন দ্রুত ফর্মেশন হারিয়ে ফেলে এবং ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। সৈন্যরা এক দিকের অ্যামবুশ থেকে বাঁচতে ছুটে গিয়ে অন্যদিকে অ্যামবুশের মাঝে পড়ে। ডিভিশন কমান্ডার বল্ডউইন নিহত হন।
তুর্কিরা ব্যাগেজ অ্যান্ড সিজ ট্রেন ডিভিশনে হামলা করে, গাড়িটানা পশুগুলোকে হত্যা করে এবং রাস্তা বন্ধ করে দেয়। লেফট উইংও ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়। তাদের কমান্ডার জন কান্তাকুজেনোস নিহত হন। অবশিষ্ট বাইজেন্টাইন সৈন্যরা সামনের হত্যাযজ্ঞ দেখে এবং পিছনেও হামলা হয়েছে ধারণা করে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এমন সময় আকস্মিক মারাত্মক ধুলি-ঝড় সৃষ্টি হয়, যা উভয় বাহিনীকে বিভ্রান্ত করে দেয়।
সম্রাট ম্যানুয়েল তার আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেন এবং দিনভিখারীর মতো রাস্তায় বসে পড়েন। তিনি তার হতভাগা নিহত সৈনিকদের মতো ভাগ্য বরণ করতে প্রস্তুত হন। তবে, শেষ পর্যন্ত তার অফিসাররা তাকে জাগ্রত করে; বাহিনীর শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং বাহিনীকে পুনরায় প্রতিরক্ষামূলক ফর্মেশনে বিন্যস্ত করা হয়। তারা গিরিখাতের বাইরে চলে যায়। জীবীত কমান্ডাররা একে একে ফিরে আসেন।
অগ্রবর্তী সেনাদল- ভ্যানগার্ড ও মেইন ডিভিশন এর সৈন্যরা একটি সুরক্ষিত শিবির স্থাপন করেছিল। সম্রাট সেখানে উপনীত হন এবং কিছু পরে অল্প ক্ষয়ক্ষতির শীকার হয়ে রিয়ার ডিভিশন শিবিরে পৌঁছায়। রাতে সেলজুক মাউন্টেড তীরন্দাজদের হামলা সফলভাবে প্রতিহত করা হয়। পরের দিন, তুর্কিরা শিবিরের চতুর্দিক থেকে তীর বর্ষণ করে। সম্রাটের আদেশে দুটি পাল্টা হামলার মাধ্যমে সেলজুকদের প্রতিহত করা হয়।
ইতোমধ্যে অর্ধেক বাইজেন্টাইন সৈন্য নিহত এবং অবশিষ্টাংশের অর্ধেক আহত হয়। তাদের অবরোধ সরঞ্জামগুলি বেহাত বা ধ্বংস হয়েছিল। তাদের পক্ষে আর অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সম্ভব ছিল না। শান্তি আলোচনার শুরু হয়। সম্রাট ম্যানুয়েল সেলজুক সীমান্তে তার দুর্গগুলো ধ্বংস করবেন; ডোরাইলিয়াম ও সাব্লেউম গ্যারিসন খালি করে দেবেন- এই শর্তে বাইজেন্টাইন বাহিনীকে চলে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
এই যুদ্ধের সামরিক প্রভাবের চেয়ে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব অনেক বেশি ছিল। এটি প্রমাণ করে যে, ম্যানুয়েল তার রাজ্য রক্ষায় সক্ষম নন। এই মনস্তাত্বিক বিজয় কিলিজ আরসালানকে বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনীকে মোকাবেলা করার উপযোগী একটি বাহিনী গড়ে তুলতে সক্ষম করেছিল। আর, ম্যানুয়েলের মৃত্যুর পর তার সাম্রাজ্য অরাজক অবস্থার মধ্যে চলে যায়। তারা কখনই তুর্কিদের থেকে আনাতোলিয়া পুনরুদ্ধার করতে পারেনি।
কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ Mohammad Salimullah
(পরিমার্জিত এবং পরিবর্ধিত)