12/07/2019
#বিলম্বিত_বাসর
#পর্ব_১+২
,
-আমি এখন ঘুমাবো। তুমিও ঘুমিয়ে যাও। আজ যে ধকল টা গেলো আমাদের উপর, টানা সাত দিন ঘুমোতে হবে মনে হচ্ছে।
কথাটি বলেই বিছানার উপরে শরীরটা এলিয়ে দিলো আবেশ।
ছয় বছর প্রেম করার পর আজ বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েছে আবেশ ও আদুরে।
কিন্তু বাসর রাতেই আবেশের মুখে এমন একটা কথা শুনে বিষ্ময়ের শেষ পর্যায়ে চলে গেলো আদুরে।
যে রাত নিয়ে তাদের এতো স্বপ্ন ছিলো সেই রাতেই আবেশের এমন ব্যবহারের কারণটা কি হতে পারে!
বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লো আদুরে৷ ভারী শাড়ি, গহনা, সাজসজ্জা সবমিলিয়ে অস্বস্তি লাগছে তার। আরো বেশি অস্বস্তি লাগছে আবেশের কথা শুনে৷
কতো স্বপ্ন দেখেছিলো সে এই দিনটি নিয়ে! ঘুপটি মেরে বসে থাকবে ফুলে সাজানো বিছানার উপরে। আবেশ এসে তার ঘোমটা তুলবে। তাকে দেখে কপালে আলতো করে চুমু খাবে। অনেকক্ষণ সময় নিয়ে গল্প করবে দুজন দুজনের হাত ধরে। এরপর....
না আর ভাবতে পারছেনা আদুরে। ঘরটা ফুলে সাজানো হলেও আবেশের এমন ব্যবহার কিছুতেই মানা যায়না!
মাথার ঘোমটা হাতে নিয়ে মেঝেতে ছুড়ে ফেললো আদুরে।
ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে নিজেকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে লাগলো সে। তাকে কি খুব বেশি খারাপ লাগছে দেখতে? কিন্তু বিয়ের আসরে আবেশ বলেছিলো তাকে দেখতে কোনো অপসরীর চেয়ে কম লাগছেনা!
তাহলে?
ধীরেধীরে গহনাগুলো খুলতে লাগলো আদুরে।
বুক ফেটে প্রচন্ড কান্না আসছে তার!
-ভাইয়ার বিয়েটা হয়ে গেলো। আমার লাইন এখন ক্লিয়ার। এখন আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারবো।
ফোনের ওপাশে আয়ানের কথা শুনে লামিয়া বললো-
বেকার কোনো ছেলেকে আমি বিয়ে করছিনা!
-আমি বেকার অবস্থায় তোমাকে আনছিও না। তোমার যে ডিমান্ড! আমাকে ভিক্ষা করতে হবে।
-কি বললা তুমি!
-যা শুনেছো।
-আজকে রাতে আর তোর সাথে কথা বলছিনা আমি। তোর ভাই বাসর করবে তুই দুঃখে মর। রাখলাম।
-লাম্মু? এই লাম্মু?
ফোনের লাইন কেটে সুইচড অফ করে দিলো লামিয়া।
রাগ উঠলেই এমনটা করে সে, শাস্তিস্বরূপ এক রাত কথা বন্ধ রাখে আয়ানের সাথে৷ কিন্তু আজও তার এমনটা করার প্রয়োজন ছিলো! পাশেই ভাই বাসর করছে আর সে ফোনে কথাও বলতে পারবেনা! লামিয়া যেই মেয়ে, বিয়ের পর রাগ উঠলে এক রাত অন্য রুমে গিয়ে কাটাবে। আর যদি বাসর রাতে রাগ উঠে? না না, কিছুতেই তাকে বাসর রাতে রাগানো যাবেনা। নাহলে সেই রাতটাও ভেস্তে দিবে এই মেয়ে।
এসব ভেবে নিজেরমনে হাসতে লাগলো আয়ান।
ড্রেসিং টেবিলের একপাশে বসে ফুপিয়ে কেদে চলেছে আদুরে। মা বাবার বড্ড আদরের মেয়ে সে। তার পছন্দের কথা ভেবে আবেশের হাতে তুলে দিতে দ্বিধাবোধ করেননি তারা। কিন্তু এই আবেশই তাকে বিয়ের প্রথম রাতেই অবহেলা করছে! কেনো?
৬বছরেও কি একটা মানুষকে চেনা যায়না!
-আদু?
হঠাৎ আবেশের গলার স্বরে চিন্তার জগতে করা বিচলন থেমে গেল আদুরের।
আবেশ ধীরেধীরে এগুলো তার দিকে। আদুরের পাশে হাটু গেড়ে বসে সে বললো-
ঘুমোবেনা?
কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারছেনা আদুরে। কথা বলতে গিয়েও কান্না আসছে তার।
আবেশ তার দিকে হাত বাড়িয়ে বললো-
আসো? চলো ঘুমোবে।
অভিমানী স্বরে আদুরে বললো-
আমার ঘুম আসছেনা।
-আমার বুকে ঘুমানোর কথা ছিলোনা তোমার এই রাতে?
ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে আদুরে বললো-
আরো অনেক কিছুই কথা ছিলো। হয়েছে কি?
কোনো জবাব দিতে পারলোনা আবেশ। মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে ভাবতে লাগলো কি বলা যায়। তখনি আদুরে প্রশ্ন করলো-
কি হয়েছে তোমার?
মৃদু হেসে আবেশ বললো -
আরে পাগলি আমার খারাপ লাগছে তাই শুয়ে পড়েছি। তাই বলে তুমি কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলিয়ে ফেলবা! দেখি উঠো। আসো বলছি!
আবেশের বুকের উপর মাথা রেখে শুয়ে আছে আদুরে।
এর থেকে বড় পাওনা আর কি হতে পারে! কিন্তু আবেশ কিছু একটা লুকোচ্ছে। যা তার আচরণেই প্রকাশ পেয়েছে। প্রশ্ন হলো কি লুকোচ্ছে আবেশ!
খুব ভোরেই ঘুম থেকে উঠেছেন ফাতেনা বেগম। নতুন বউ বাড়িতে এনেছেন তিনি। আজ দুপুরে বউ ভাতের অনুষ্ঠান করা হবে। সেই আয়োজনে কোনো যেন কমতি না থাকে, এটা ভেবেই দম ফেলানোর সময় টুকু নষ্ট করতে নারাজ তিনি। কিন্তু শত কাজের মাঝেও বারবার মন টা কেপে উঠছে তার। তার বড় ছেলের সুখের কথা ভেবেই আজ এত সব আয়োজন। সুখী হতে পারবে তো সে? প্রেমের বিয়েতে যে তিনি একেবারেই বিশ্বাসী নন।
-আপা নতুন বউ উঠছে?
কাজের মেয়ের প্রশ্নে ফাতেমা বেগম বললেন-
এতো সকালে উঠে কি করবে সে?
-এখন থেকাই অভ্যাস কইরা নেন আপা। নাইলে এই মাইয়া আপনের হাতের নাগালের বাইর হইয়া যাইবো। আমাগো আবেশ তারে ভালোবাইসা বিয়া কইরা আনছে। তাই তার রাজ এই বাড়িতে চলবো। বুঝবার পারছেন কি বলতে চাইছি?
-পেরেছি। কিন্তু বেশি অতিমাত্রায় কথা বলো। এসব আর কারো সামনে বলবেনা। আদুরে খুব ভালো মেয়ে। আমার কথা নিশ্চয় মেনে চলবে সে।
আর মাত্র বিয়ে হলো। কতো ধকল গেল তাদের উপর। এতো তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠার কোনো দরকার নাই। উঠুক আস্তেধীরে।
মুখে কথাটি বললেও ফাতেমা বেগমের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে নানাধরনের প্রশ্ন। শহরের বড় ঘরের মেয়ে পারবে কি রাজশাহীর এই নাচোল নামের গ্রামের পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে?
গোসল সেরে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসলো আদুরে। আবেশ এখনো বেঘোরে ঘুমোচ্ছে।
আবেশের সাথে তার সম্পর্কের ছয় বছর চলছে। এর মধ্যে আদুরে তার মাঝে কোনো খুঁত খুঁজে পায়নি।
একটা ছেলে কি করে এতো নিখুঁত হয় তা জানা নেই।
অন্য আট দশটা প্রেমিকের মতো আবেশ তার জন্য কবিতা লিখেনি কিংবা রাগ ভাঙ্গানোর জন্য বাসার সামনে আইসক্রিম নিয়ে দাঁড়িয়েও থাকেনি, তার দিকে তাকিয়ে কখনো বলেনি তুমি আমার দেখা সেরা সুন্দরী অথবা তার চুলের দিকে তাকিয়ে হারিয়ে যায়নি৷ কথিত প্রেমিক সমাজের কাতারে সে মোটেও ছিলো না।
আদুরে নিয়ম করে রোজ এসব নিয়ে ঝগড়া করলেও পাত্তা দিতোনা আবেশ আবেশ অন্য রকম।
ভীষণ রকম ধৈর্য্যশীল। এমন ম্যান্দামার্কা স্বভাবের ছেলে যে কি করে হয় আদুরের জানা নেই।
তার মতো একটা অগোছালো, উদ্ভব মেয়েকে সহ্য করা কোনো সাধারণ ছেলের কাজ নয় কিন্তু!
তবে বিয়ের আগে দূরে থাকার কারণ বুঝতে পারলেও বাসর রাতে আবেশের এমন আচরণের কারণ বুঝে উঠতে পারছেনা আদুরে। কি চলছে আবেশের মনে!
জানালার গ্রিলের পাশে দাঁড়িয়ে চুলে পেঁচানো গামছাটা খুলে নিচ্ছে আদুরে।
এমন সময় ঘুম ভাঙ্গে আবেশের। জানালার দিকে চোখ পড়তেই আদুরের দেখা পায় সে।
হালকা ক্রিম কালারের সুতির শাড়ি পরেছে সে।
সকালের মিষ্টি রোদ্র স্নানে
ছোট্ট কিশোরীর মত চুল ডানে এলিয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আদুরে।
চোখে ঘুম থাকা স্বত্তেও উঠে পড়লো সে। ধীরপায়ে আদুরের দিকে এগিয়ে এসে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো তাকে।
আচমকা কারো স্পর্শ পেয়ে হতভম্ব হয়ে গেলো আদুরে। আবেশ তার চুলের মাঝে নাক ডুবিয়ে বললো-
শুভ সকাল।
এই ছয় বছরে আবেশ তাকে ছয় বার জড়িয়ে ধরেছে কিনা সন্দেহ! তাই আবেশের ছোঁয়া অচেনাই বলা যায় আদুরের কাছে। তার উপর কাল রাতে যেমন ব্যবহার আবেশ করেছিলো এই সকাল বেলা তাকে সে জড়িয়ে ধরবে এমনটা ভাবেনি।
আদুরের ঘাড়ে আলতো করে ঠোঁট জোড়া ছুইয়ে দিতেই কেঁপে উঠলো সে।
নিজের হাত দিয়ে তার ভেজা চুলগুলো সরিয়ে গভীর চুম্বনে লিপ্ত হয়ে পড়লো আবেশ।
জানালার গ্রিল নিজের হাতে শক্ত করে চেপে ধরলো আদুরে। এই প্রথম আবেশের এমন ছোঁয়ার সাথে পরিচিতি হচ্ছে সে। আবেশ এর আগে কখনোই তার সাথে এমন কিছু করেনি। যতবার দেখা করেছে দুরুত্ব বজায় রেখেছে। মাঝেমাঝে কপালে চুমু এঁকেছে।
সামান্য চুমুতেই এক ভালো লাগা কাজ করতো আদুরের মাঝে। আর আজ আবেশ তাকে আরো কাছে টেনে নিয়েছে। এই যেনো এক অন্যরকম অনুভুতি!
আদুরেকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিতেই আবেশ দেখতে পেলো সে কাঁপছে। যেনো আদুরের ঠান্ডা লেগেছে। তাকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে শান্ত গলায় আবেশ বললো-
জ্বর তো আসেনি, এভাবে কাঁপছো কেনো তুমি?
মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরিয়ে আসছেনা আদুরের।
তার অবস্থা দেখে মৃদু হাসলো আবেশ। নিজের কাছ থেকে আদুরেকে সরিয়ে তাকে কোলে তুলে নিয়ে আবেশ বললো-
এখুনি তোমার কাঁপাকাঁপি বন্ধ করছি আমি।
তাকে কোলে নিয়ে বিছানার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আবেশ। এদিকে আদুরের প্রায় জান যায় যায় অবস্থা।
তাহলে কাল রাতে সত্যিই খারাপ লেগেছিলো আবেশের? যে কারণে সে এমন আচরণ করেছিলো?
তবে কি কাল রাতে যা হয়নি তা কি আজ হতে চলেছে!
ভাবতেই মুখখানা লাল হয়ে গেলো আদুরের।
(চলবে)
,
#বিলম্বিত_বাসর♥♥♥♥♥
#পর্ব_২
দরজা ঠেলে আবেশের রুমের ভেতরে প্রবেশ করলো সীমা। আবেশের কোলে আদুরেকে দেখে থতমত খেয়ে গেলো সে।
এদিকে সীমাকে দেখতে পেয়ে তাড়াহুড়ো করে নিজের কোল থেকে আদুরেকে নিচে নামিয়ে সীমার উদ্দেশ্যে আবেশ বললো-
এভাবে কেউ নক না করে আসে!
-আসলে আমি বুঝতে পারিনি দরজা খোলা। দুঃখিত।
-হুম।
-তা রাতে বাসর কি করিস নাই? সকাল সকাল এতো এনার্জি পেলি কি করে?
কথাটি বলে মুখ টিপে হাসতে লাগলো সীমা।
তার কথা শুনে মুখটা ফ্যাকাসে করে আবেশ জবাব দিলো-
করেছি আবারো করবো। তোর কিরে! আর তুই কি আমার তালতো বোন হস যে এসব দুষ্টুমি করবি? খালাতো বোন খালোতো বোনের মতোই থাক। এখন যা।
-আরে বলতে এসেছিলাম নতুন ভাবি কে খালাম্মা ডাকছেন।
মাথায় ঘোমটা টেনে সীমার উদ্দেশ্যে আদুরে বললো-
হুম চলো?
-নাকি বলবো এখনো উঠোনি তোমরা?
-না না চলো।
সীমার সাথে আদুরে রান্নাঘরে প্রবেশ করতেই ফাতেমা বেগম বললেন-
উঠেছো তুমি?
-না উঠেনি। ঘুমের মাঝে হেটে এসেছে।
সীমার কথা শুনে বিরক্তিভরা কণ্ঠে ফাতেমা বেগম বললেন-
আহ! যখন তখন এসব ভালো লাগেনা। দেখি বউ মাকে একটা পিড়ি পেতে দে।
খালার কথামতো আদুরের জন্য রান্নাঘরের এক কোণা থেকে একটি পিড়ি নিয়ে আসলো সীমা। সেই পিড়িতে আদুরে বসতেই ফাতেমা বেগম তার উদ্দেশ্যে বললেন-
ঘুম হলো?
-খালাম্মা কাল রাতে কি ঘুম হবার কথা!৷ বাসর রাত বলে কথা। অবিবাহিত হয়েও আমি জানি আর তুমি কিনা এটাই জানোনা?
ভ্রু জোড়া কুচকে ফেললেন ফাতেমা বেগম। গম্ভীর গলায় তিনি বললেন-
এই তুই যা এখন এখান থেকে।
-আমি আর কোনো কথা বলবোনা।
-না বললেও তোকে যেতে হবে। যাবি?
চুপচাপ রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো সীমা।
শান্ত গলায় আদুরে বললো-
জ্বী আমার ঘুম হয়েছে।
-শুনো মা, তোমাকে কিছু কথা বলি। আবেশ হলো আমার বড় ছেলে। তুমি এই বাড়ির বড় বউ। তাই তোমার উপর কিন্তু দায়িত্ব বেশি।
-জ্বী।
-কয়েকদিন আরাম করো এরপর কিন্তু নিজের দায়িত্ব নিজেকেই বুঝে নিতে হবে।
-জ্বী।
-কোনো ধরনের সমস্যা হলে আমাকে বলবা। আমি থাকবো তোমার পাশে সবসময়।
-জ্বী।
-আজ দুপুরে তোমার বাসা থেকে মানুষ আসবে। সুন্দর করে সেজে থাকবে কেমন?
-জ্বী।
-ঠিক আছে এখন আসো তুমি। মোরশেদাকে দিয়ে নাস্তা পাঠিয়ে দিচ্ছি আমি। ও হচ্ছে..
-আমি জানি। উনার সম্পর্কে অনেক শুনেছি।
নিজের রুমে প্রবেশ করতেই কাজের মহিলা মোরশেদাকে দেখতে পেলো আদুরে। কাল যেভাবে রুমটা সাজানো ছিলো এখন আর নেই। ফুলে সাজানো সেই বিছানাটাও নেই। অথচ এমন একটা বাসর ঘরের কতোই না স্বপ্ন ছিলো তার!
মোরশেদা আগের চাদর সরিয়ে নতুন চাদর বিছিয়ে দিচ্ছেন খাটের উপরে। তা দেখে আদুরে বললো-
আপনি মোরশেদা খালা?
আদুরের দিকে একবার তাকিয়ে নিজের কাজে মন দিয়ে মোরশেদা বললেন-
হু।
-ভালো আছেন?
-আছি।
মোরশেদাকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো কারণে সে বিরক্ত। কিন্তু কেনো? যাক এই বিষয়ে তার না ভাবলেও চলবে। ভাবার বিষয় হলো আবেশকে দেখা যাচ্ছেনা রুমে৷ সে গেলো কোথায়?
পুকুরপাড়ে বসে আছে আবেশ। একটু আগে যদি সীমা না আসতো তাহলে ভুল কিছু হয়ে যেতে পারতো।
ভুল কিছু? এটাকে কি ভুল কিছু বলা যায়?
বৈধ সম্পর্ক, বৈধ বিয়ে তার আদুরের সাথে। তাহলে তারা একে অপরের কাছে আসাটা অবশ্যই ভুল কিছু নয়। না ভুল কিছুই। অবশ্যই ভুল কিছু৷ আর কারো কাছে না হলেও তার কাছে ভুল। তাই নিজেকে সামলে রাখতে হবে তার। আদুরেকেও কিছু বুঝতে দেয়া যাবেনা। এসবের জন্য নিশ্চয় আদুরে তাকে ছেড়ে যাবেনা! ছিলোইতো ৬বছর শারীরিক কোনো সম্পর্ক ছাড়া তারা। ভালোবাসায় কি শারীরিক কোনো সম্পর্ক থাকা বাধ্যতামূলক? অন্তত আবেশ তা মনে করেনা।
-কিরে ভাই?
সীমার ডাকে ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এলো আবেশ। সীমার উদ্দেশ্যে সে বললো-
আদুরে কই?
সিড়ির উপরে আবেশের পাশে বসে সীমা বললো-
তোর বউ এর দেখাশোনার করার দায়িত্ব দিয়েছিস নাকি আমাকে?
-আরে তুইতো তাকে নিয়ে গেলি।
-সেটা খালার কাছে নিয়ে গেলাম। ওখানেই আছে বোধহয়। আমি বেশি কথা বলি কিনা, তাই খালা আমাকে বেরিয়ে যেতে বললেন।
সীমার কথা শুনে হাসলো আবেশ। মুখটা বাকিয়ে সীমা বললো-
হাসেন। আমি হেনস্তা হয়েছি শুনলেইতো আবার আপনার হাসি পায়।
-হু পাইতো। তুই যে আমার শত্রু তাই আর কি।
আবেশের কথা শুনে ফুঁসতে থাকলো সীমা। সেদিকে খেয়াল না দিয়ে আবেশ বসা থেকে উঠতে উঠতে বললো-
আমি যাচ্ছি। আমার বউ এর কাছে।
-কোথায় ছিলে?
আদুরের করা প্রশ্নে শার্টের কোলার ঠিক করতে করতে আবেশ জবাব দিলো-
পুকুরপাড়ে।
-অনেক শুনেছি তোমার কাছে এই পুকুর পাড়ের কথা। আমিও যাবো।
-তা অবশ্যই যাবে তবে এখন নয়।
-কেনো?
-নতুন বউ তুমি। শান্ত, লক্ষি মেয়ের মতো বসে থাকো। সব বুঝিয়ে বলতে হবে তোমাকে?
-শান্ত আমি না। তা জেনেই কিন্তু বিয়ে করেছো তুমি। আমারও ক্লান্ত লাগছিলো। নাহলে যা কাল রাতে তুমি করেছো এর জন্য...
থেমে গেলো আদুরে।
টেবিলের উপরে রাখা খাবারের ট্রে এর দিকে নজর পড়লো আবেশের। কথা ঘুরিয়ে সে বললো-
মা পাঠিয়েছে নিশ্চয় খাবার?
-হু।
-খেয়েছো?
-না খাইয়ে দাও। দিবেনা?
আদুরের কথা শুনে মৃদু হেসে বললো আবেশ-
কেনো নয়!
বেলা ১২টা বাজলো। ফাতেমা বেগমের বাড়িতে বাড়ি ভর্তি মানুষ গমগম করছে। নতুন বউ দেখতে গ্রামের প্রায় সকলেই ভিড় জমিয়েছে।
খাটের উপর চুপটি করে ঘাপটি মেরে বসে আছে আদুরে। গোলাপি রঙ্গের কাতান শাড়ি পরে মুখের উপর ঘোমটা টেনে বসে আছে সে। এই বাড়ির নিয়ম নাকি এইরকমই।
ছোট, বড়, বৃদ্ধা অনেকেই তাকে দেখতে আসছে। তার মুখের উপর থেকে ঘোমটা সরিয়ে তারা বলছেন, "মাশাআল্লাহ"। তাদের কাউকেই সে চিনছেনা। অবশ্য চেনার কথাও না। তাই তার পাশে বসে সকলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে সীমা।
সকলেই কিছু না কিছু উপহার সাথে করে নিয়ে এসেছেন। যারা আনেনি তারা তার হাতে টাকা গুজে দিচ্ছে। আর ছোটরা নানাধরনের চকলেট। আদুরের অবশ্য চকলেট গুলো দেখেই বেশি খুশি লাগছে। তার চকলেট খুব পছন্দ কিনা!
প্রায় এক ঘণ্টা হলো এসব চলছে। প্রথমে বিষয়টা মজার মনে হলেও এখন এক ধরনের অস্বস্থি কাজ করছে আদুরের।
আচমকা ঘোমটা সরিয়ে সে বললো-
কিছু মনে করবেন না কেউ। আমার খুব বেশি গরম লাগছে। আমাকে একবারেই দেখে নিন আপনারা।
আদুরের কাছে এসে মোরশেদা বললেন-
আবেশের মায়ের কথার এতোটুকু দাম নাই তোমার কাছে? কি কইছিলো সে? যতক্ষণ মানুষ আসবো তোমাকে ততক্ষণ ঘোমটা টাইন্না চুপচাপ বসে থাকতে হইবো। বলেনাই?
-জ্বী৷
-তাইলে? এহুনি ঘোমটা টানো।
বাধ্য মেয়ের মতো মোরশেদার কথামতো ঘোমটা টেনে নিলো আদুরে। এই অদ্ভুত নিয়মের কথা আগে জানলে কোনো একটা ব্যবস্থা সে নিশ্চয় নিতে পারতো!
প্রায় ৪৫মিনিট পর সীমা বললো-
ভাবি আর কেউ আসবেনা। তুমি ঘোমটা খুলতে পারো।
সীমার কথা শুনে ঘোমটাটা বিছানার এক পাশে ফেলে দাঁড়িয়ে পড়লো আদুরে।
গানের তালে বলতে লাগলো সে-
আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে!
-আমাদের ছেড়ে তুই বড় আনন্দে আছিস তাইনা?
দরজার পাশে নিজের মা, বাবা ও ভাইকে দেখতে পেয়ে তাদের কাছে ছুটে গেলো আদুরে। নিজের মাকে জড়িয়ে ধরে সে বললো-
হুম আনন্দেই আছি। ভেতরে এসো তোমরা।
-এমনিতেই অনেকটা দেরী হয়ে গিয়েছে। আগে খাবারটা খেয়ে নিক। তারপর নাহয় গল্প করা যাবে।
সামনে দাঁড়ানো শ্বাশুড়ির কথা শুনে মাথা ঝাকালো আদুরে।
ফাতেমা বেগম আবারো বললেন-
সীমাকেও আসতে বলো। ওদিকটা সামলাতে হবে।
মাত্রই মা বাবা এলো! আর ওমনিতেই তাদের নিয়ে গেলো। একটু পরে খাবার খেলে কি এমন অসুবিধে হতো? বাবা আর ভাইয়ের সাথে একটু কথাও বলতে পারলাম না।। আর পুরো বাড়ি ভর্তি মানুষ কিন্তু আমি রয়েছি একা। কারো কোনো খেয়াল নেই আমার প্রতি। এই আবেশেরই নেই।
নিজের মনে কথাগুলো বলে চলেছে আদুরে। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ তার চোখ চেপে ধরলো। কিছু না ভেবেই আদুরে বলে উঠলো-
আবেশ?
-এ কি! তুই নিজের জামাইয়ের স্পর্শও চিনিস না!
পাড়ার বান্ধবী সিমরানের গলার আওয়াজ শুনে পেছনে ফিরে তাকিয়ে আদুরে বললো-
তুইতো আমার সাথে সবসময় থাকতি। তোরটাও চিনলাম না।
-বারেহ! আমি কি আর তোকে ওভাবে স্পর্শ করতাম নাকি?
-কিভাবে?
-ন্যাকা! ভাইয়া নাহয় বিয়ের আগে নিরামিষ ছিলো। কিন্তু কালতো তার আমিষ হওয়ার কথা। বাসর রাতের পরে তুই আমাকে জিজ্ঞাসা করছিস কেমন স্পর্শ! তা কাল কি কি হলো?
মুখটা ফ্যাকাসে করে আদুরে বললো-
কিছুই না।
-মজা নিচ্ছিস?
-না। তুই খেয়েছিস?
-পরের টেবিলে খাবো। আগে সবটা খুলে বল।
আদুরের মুখে সবটা শোনার পর সিমরান বললো -
সকালে যেহেতু ভাইয়া স্বাভাবিক আচরণ করেছে তাহলে কাল রাতে সত্যি তার খারাপ লেগেছে।
-হু।
-কিন্তু বাসর রাতের মতো একটা স্পেশাল রাতে তার এমন আচরণ মানা যায়না। তোদের জন্যতো আরো বেশি স্পেশাল।
-হুম।
-আচ্ছা এমন নাতো? ভাইয়া নিজেই কাল লজ্জা পেয়েছে। উনিতো আবার ম্যান্দামার্কা স্বভাবের।
-ওই তুই খেতে যা! বেশি বকবক করিস না।
-আচ্ছা শুন।
-কি?
-বলছিলাম আজ রাতে কি হয় দেখ। সকালে যেহেতু ভাইয়ার লজ্জা কেটেছে রাতে নিশ্চয়...
-সিমরান তুই থামবি!
রাত ১১টা হতে চললো। তবুও যেনো কাজের শেষ নেই। সারাদিনের এতো খাটনাখাটনির পরেও যেনো ক্লান্তি এসে ভর করছেনা। আবেশের খুশিতে নিজে সুখ খুঁজে পাচ্ছেন ফাতেমা বেগম।
তার স্বামী ১বছর হলো ইন্তেকাল করেছেন। স্বামীর ফ্যাক্টরির দেখাশোনা করছে এখন আবেশ। কিছুদিন পর আয়ানও তার সাথে যোগ দিবে। আয়ানের জন্যও একটা বউ আনবেন ঘরে। দুই ছেলে ও তাদের বউ বাচ্চা নিয়ে গমগম করবে পুরো বাড়িটা ভাবতেই মুখে হাসি ফুটলো তার।
আদুরেকে নিয়ে তার বড় আশা। আবেশের সব দুঃখ সে ভুলিয়ে দিতে পারবেতো?
সকালের কথা মনে হতেই বারবার শরীরে শিহরণ জেগে উঠছে আদুরের। আবেশের স্পর্শ যেনো একটা মায়া। যে মায়ায় জড়ালে একটা নেশা হয়ে যাবে। আর এই মায়ায় জড়াতে চায় আদুরে। হোক না নেশা!
আচ্ছা, এখন কি আবেশ কাছে টেনে নিবে তাকে? কাল রাতে, আজ সকালে যা হয়নি আজ রাতে কি তা হবে! ভাবতেই অন্যরকম এক ভালো লাগা কাজ করছে আদুরের মাঝে।
(চলবে)