08/24/2022
অবহেলিত শ্রী অরবিন্দ
কলকাতা যে কতটা ভুলে ভরা দাদাঠাকুর তা বুঝতে পেরে মজার গান বেধেছিলেন —- কলকাতা আজব শহর শুধুই ভুলে ভরা । ব্রিটিশ শাসকেরা এ দেশে ১৯০ বছর শাসন করেছে | কলকাতায় যে কটি প্রধান রাজপথ রয়েছে সবগুলি ব্রিটিশ সরকার তাদের ভাইসরয় / গভর্নর জেনারেলদের নামে নামাঙ্কিত করেছিল | কর্নওয়ালিস , হেস্টিংস , ডালহৌসি , ক্যানিং , এলগিন , মেয়ো , ময়রা , রিপন , ডাফরিন , ল্যান্সডাউন , কার্জন , মিন্টো , হার্ডিঞ্জ — এরকম কত জনের নামকে জনমনে গেঁথে দিতে কত রাস্তা বা পার্কের নামকরণ হয়েছে | কিন্তু ব্রিটিশ শাসকেরা প্রকৃতই যাঁরা শ্রদ্ধেয় এবং ইংরেজ সভ্যতার অবদান বলে গণ্য — যেমন , স্যার আইজ্যাক নিউটন , শ্যেক্সপিয়ার , শেলি , কিটস্ , বায়রন বা ওয়ার্ডসওয়ার্থের নামে কলকাতার একটা রাস্তারও নাম রাখেননি | অন্যদিকে , আমরা ইংরেজের দাসত্বকে কতটা ” ঈশ্বরপ্রদত্ত ” বলে মনে করেছি যে আমাদের জাতীয় জীবনের যাঁরা গর্ব তাঁদের কীর্তিকেও অবজ্ঞা করে আমরা ইংরেজদের স্মরণীয় করে রাখতে থিয়েটার রোডের নাম বদলে করেছি শ্যেক্সপিয়ার সরণি | অথচ যাঁকে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন — স্বদেশ-আত্মার বাণীমূর্তি — সেই অরবিন্দ ঘোষ থিয়েটার রোডের একটি বাড়িতে (আট নং থিয়েটার রোড) জন্মগ্রহণ করা সত্বেও সেই থিয়েটার রোডের নাম পরিবর্তন করে অরবিন্দ এভিনিউ করতে পারিনি ! আমরা আন্তর্জাতিকতাবাদী হতে গিয়ে জাতীয় মনীষীদের অবজ্ঞা করেছি | বাঙালি হয়েও আমরা বাংলার গর্ব অরবিন্দ ঘোষকে চিনলাম না!
অরবিন্দ ঘোষ কে? কী তাঁর অবদান আমাদের জাতীয় জীবনে সেটা স্মরণ করতেই আজকের এই পোস্ট ।
প্রথমত, অরবিন্দ ছেলেবেলা থেকেই বিলেতে পড়াশোনা করেছেন । কেমব্রিজের কিংস কলেজের অন্যতম সেরা ছাত্র ছিলেন । আই সি এস পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়েও ইংরেজের “কলুর বলদ” হতে চাননি বলে সামান্য ঘোড়ায় চড়ার পরীক্ষায় অনুপস্থিত থেকেছেন যাতে তাঁকে ইংরেজের দাসানুদাস হয়ে আই সি এসের চাকরি করতে না হয়। একমাত্র সুভাষচন্দ্র ছাড়া আর কে পেরেছেন নিজের স্বার্থকে উপেক্ষা করে এভাবে দেশের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে?
দ্বিতীয়ত, স্বদেশ ফিরে অরবিন্দই প্রথম জাতীয় কংগ্রেসের আবেদন নিবেদনের নীতির তুমুল সমালোচনা শুরু করেন বোম্বাইয়ের “ইন্দুপ্রকাশ” পত্রিকায়।
তৃতীয়ত, বরোদায় সরকারি কলেজের সাতশো টাকার লোভনীয় চাকরি ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন ১৯০৬ সালে জাতীয় কলেজের অধ্যক্ষের পদে । বেতন মোটে দেড়শো টাকা। ঝাঁপিয়ে পড়েন বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে ।
চতুর্থত, অরবিন্দই কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতৃত্বের তুমুল সমালোচনা করে চরমপন্থী মতবাদের প্রকৃত জন্মদাতা।
পঞ্চমত, অরবিন্দ কলকাতায় এসে সরাসরি জাতীয় আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পরে জনসংযোগের উপায় হিসেবে, কৃচ্ছসাধনের পন্থা হিসেবে এবং বিদেশী বয়কটের উপায় হিসেবে একটি মোটা হাতে বোনা দেশী কাপড় সারা অঙ্গে পরিধান করতেন ফলে শরীরের উপরের অংশ অনেকটাই অনাবৃত থাকত। গান্ধি রাজনীতিতে নেমে অরবিন্দের এই স্টাইল অনুসরণ করেন।
ষষ্ঠত, অরবিন্দই জাতীয় নেতাদের মধ্যে প্রথম এদেশে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের ত্রিবিধ পন্থা নির্ধারণ করেন যেখানে (এক) গুপ্ত বিপ্লবী প্রচার ও সশস্ত্র বিদ্রোহ , (দুই) সাধারণ মানুষকে রাজনৈতিক আবর্তে টেনে আনতে গণ আন্দোলন এবং (তিন) অসহযোগ ও অহিংস প্রতিরোধকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সপ্তমত, অরবিন্দই বাংলায় প্রথম কারাসাহিত্যের জন্মদাতা। তাঁর আলিপুর জেলের দিনগুলিকে অমর করে গেছেন “কারাকাহিনী ” বইতে।
অষ্টমত, রাজনৈতিক জীবনে তাঁর দুই উত্তরসূরীর প্রতি তাঁর ছিল অসীম স্নেহ। এই দুজন হলেন বাঘা যতীন ও রাসবিহারী বসু।
নবমত, আলিপুর জেলে বসেই তাঁর অন্তর্জগতে ঘটে গেল এক দিব্য উত্তরণ। তিনি রাজনীতি ছাড়লেন। চলে গেলেন পন্ডিচেরিতে । শুরু হল তাঁর সাধন জীবন। অনেকে তাঁর এই রাজনৈতিক জগত থেকে নিষ্ক্রমণ মেনে নিতে পারেননি। তাঁরা বলেন এটা নাকি পলায়নপরতা!
সত্যি, অরবিন্দ আমাদের আজকের দিনের নেতানেত্রীদের মতন ভাই, বোন, ছেলে , মেয়ে , বউকে রাজনীতিতে ঢুকিয়ে দিয়ে বিদায় নেননি বলেই কি আজ এতোটা অপাংক্তেয়?
গত ১৫ই আগস্ট ছিল তাঁর জন্মদিন | আমাদের প্রণাম |
জয়তু অ র বি ন্দ ।
-শুভেন্দু মজুমদার