30/09/2023
শিবনাথ শাস্ত্রী (৩১.০১.১৮৪৭ - ৩০.০৯.১৯১৯)
১৮৪৭ সালের ৩১ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার চাংড়িপোতা গ্রামে এক গোঁড়া হিন্দু ব্ৰাহ্মণ পরিবারে শিবনাথ শাস্ত্রী জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শিবনাথ শাস্ত্রী একাধারে একজন সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সমাজ-সংস্কারক, লেখক, অনুবাদক, ঐতিহাসিক এবং ব্রাহ্মধর্ম প্রচারক। তিনি কলকাতার সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুল থেকে এন্ট্রান্স (১৮৬৬) এবং সংস্কৃত কলেজ থেকে এফএ (১৮৬৮), বিএ (১৮৭১) ও এমএ (১৮৭২) পাস করেন। পরে ওই কলেজ থেকেই ১৮৭২ খ্ৰী সংস্কৃতে এম.এ. পাশ করে "শাস্ত্রী" উপাধি পান। ১৮৭৩–৭৪ খ্রী. মাতুল দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের বিখ্যাত ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকা সম্পাদনা করতেন এবং হরিনাভির স্কুলটিও তিনিই দেখতেন। তাঁর ‘আত্মচরিত’ পুস্তকে ১৮৬৮ খ্রী. তাঁরই উৎসাহে সম্পাদিত বিপত্নীক যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ ও বিধবা মহালক্ষ্মীর বিবাহের বিষয় বর্ণিত আছে। এই বিবাহের প্ৰায় সব খরচ বিদ্যাসাগর মহাশয় বহন করেন। এই উপলক্ষে পিতার ক্ৰোধ সত্ত্বেও সমাজে নবদম্পতিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি বহু দুর্যোগ মাথা পেতে নেন এবং উপেন দাসের সঙ্গে নবকৃষ্ণ বসুর বিধবা কন্যার বিবাহেও তিনি সাহায্য করেন।
হিন্দু ব্ৰাহ্মণ পরিবারে জন্ম হলেও হিন্দুদের মধ্যে প্রচলিত পৌত্তলিকতা, কুসংস্কার ও অর্থহীন আচার-আচরণের প্রতি তাঁর বিতৃষ্ণা জন্মায়। ১৮৬৯ সালে পিতার প্রবল বাধা সত্ত্বেও তিনি ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেন ফলে উপবীত ও মূর্তিপূজার সঙ্গে এখানেই তাঁর ইতি ঘটে যার ফলস্বরূপ পিতা কর্তৃক বিতাড়িত হন। পিতার প্রবল বাধার সামনে দাঁড়িয়ে ধর্মপরায়ণ এই মানুষটি বলেছিলেন, “আপনার সকল আজ্ঞা পালন করিতে রাজি আছি, কিন্তু আমার ধর্মজীবনে হাত দিবেন না”।
১৮৬৭ সাল পর্যন্ত আদি ব্রাহ্মসমাজ এরসাথে তাঁর গভীর সংযোগ দেখা যায়। কিন্তু সেইসময় ব্রাহ্মসমাজের জনপ্রিয় নেতা কেশবচন্দ্র সেনের আদর্শ ও কাজকর্মে শিবনাথ শাস্ত্রী আকৃষ্ট হন এবং ১৮৬৯ সালের ২২শে অগাস্ট তিনি কেশবচন্দ্র সেনের দলে যোগ দেন। এরপরে কেশবচন্দ্র সেনের ‘Indian Reforms Association-এর সাথে যুক্ত হন, এই সভার বহুবিধ কর্মতালিকা ছিল, যথা : 'মদ্যপান নিবারণ' এবং 'শিক্ষা', 'সুলভ সাহিত্য' ও 'কারিগরী বিদ্যার' প্রচার। ১৮৭০ সালে মদ্যপানের বিরোধিতা কল্পে তিনি প্রকাশ করেন "মদ না গরল" শীর্ষক একটি মাসিক পত্রিকা। পরে তিনি 'সোমপ্রকাশ' (১৮৭৩-৭৪) ও ধর্মবিষয়ক 'সমদর্শী পত্রিকা' (১৮৭৪) এবং আরও পরে 'তত্ত্বকৌমুদী', 'ইন্ডিয়ান মেসন্জর' ও 'মুকুল' (১৮৯৫) পত্রিকা সম্পাদনা করেন। নারী-মুক্তি আন্দোলনেও তিনি কেশবচন্দ্রের সহযোগী ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তাদের বলিষ্ঠ আন্দোলনের ফলেই ১৮৭২ খ্রী. আইনতভাবে মেয়েদের বিবাহের ন্যূনতম বয়স-সীমা চোদ্দ বছর নির্ধারিত হয়।
তিনি কেশবচন্দ্র সেনের ভারত আশ্রমের বয়স্কা মহিলা বিদ্যালয় (১৮৭২), ভবানীপুর সাউথ সুবারবন স্কুল (১৮৭৪) এবং হেয়ার স্কুলে (১৮৭৬) শিক্ষকতা করেন।
এরপরে ১৮৭৭ সালে ব্রাহ্ম যুবকদের নিয়ে "ঘননিবিষ্ট" নামে একটি বৈপ্লবিক সমিতি সংগঠিত করে পৌত্তলিকতা ও জাতিভেদের বিরুদ্ধে এবং নারী-পুরুষের সমানাধিকার ও সর্বজনীন শিক্ষার পক্ষে সংস্কার আন্দোলনের সূচনা করেন। সমিতির কাৰ্যসূচীতে জাতীয়তামূলক ও সমাজ-সংস্কারমূলক শিক্ষা এবং রাষ্ট্ৰীয় স্বাধীনতার পরিকল্পনা ছিল। তাঁর গুপ্ত সমিতিতে আনন্দমোহন বসু ও সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় যোগ দিয়েছিলেন। তাদের অন্যান্য অঙ্গীকার ছিল-জাতিভেদ অ-স্বীকার, সরকারী চাকরি অ-স্বীকার, সমাজে নারী-পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত করা ইত্যাদি। অশ্বারোহণ ও বন্দুক-চালনা শিক্ষা এই সমিতির কর্মসূচীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাঁরই রচিত ‘যুগান্তর’ নামে সামাজিক উপন্যাস থেকে ‘যুগান্তর’ পত্রিকার (১৯০৭) নামকরণ হয়।
পরবর্তী কালে কেশবচন্দ্রের কার্যকলাপ, কেশবচন্দ্র সেনের ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মোসমাজে অবতারত্বের অবতারণা, বৈষ্ণবসুলভ আচরণ ইত্যাদি নিয়ে যখন প্রশ্ন ও বিরোধ দেখা দিতে থাকে, কেশবচন্দ্র সেনের সমালোচনা করে ‘সমদর্শী’ ও ‘সমালোচক’ নামে দুটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। তার সম্পাদক ছিলেন শিবনাথ শাস্ত্রী স্বয়ং। এরপরে ১৮৭৮ খ্রী. নানান বিবাদ বিসম্বাদের পরেও কেশব সেন যখন নিজের নাবালিকা কন্যার হিন্দুমতে বিবাহ দেন, তখন পাকাপাকিভাবে দলত্যাগ করেন শিবনাথ শাস্ত্রীসহ বহুজন, এরই ফলশ্রুতিতে ১৫ই মে ১৮৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় 'সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ' । এখন থেকে তিনি সমাজ-সংস্কারে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। তিনি ধর্মপ্রচার ছাড়াও সারা ভারতে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংহতি এবং সাম্যের কথাও প্রচার করেন। মাদ্রাজ ভ্রমণের সময়ে সেদেশের 'জাতিভেদ ও ছুঁৎমাৰ্গকে' তীব্রভাবে আক্রমণ করেন।
শিক্ষাপ্রসারের জন্য আনন্দমোহন বসু ও সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে একযোগে 'সিটি স্কুল' (১৮৭৯) স্থাপন করেন এই বছরেই ‘স্টুডেন্টস সোসাইটি’ নামে একটি গণতান্ত্রিক ছাত্র প্রতিষ্ঠান গঠিত হয় এবং নারী শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে মেয়েদের নীতিবিদ্যালয় (১৮৮৪) স্থাপন করেন। ব্রাহ্ম সমাজের পক্ষে ভারতের প্রথম কিশোর মাসিক পত্রিকা "সখা" (১৮৮৩) তাঁর উদ্যোগেই প্রকাশিত হয়। ১৮৯২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি শিবনাথ শাস্ত্রী তাঁর ঈপ্সিত লক্ষের প্রতি প্রথম পদক্ষেপ করলেন "সাধন-আশ্রম" প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, এই সাধন পথে শুধু নিজেকেই ব্যাপৃত রাখলে চলবে না, একদল যুবক চাই যাঁরা ব্রাহ্ম আদর্শকে বুকে ধারণ করে এই আধ্যাত্মিক সাধন-মার্গকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। গড়ে তুললেন ব্রাহ্ম কর্মী মণ্ডলী, 'ব্রাহ্ম ওয়াকার্স গ্রুপ'। তবে সাধন আশ্রমের কর্ম শুধু কলকাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তৎকালীন অখণ্ড ভারতের বিহারের বাঁকিপুর, লাহোর, ঢাকা, এলাহাবাদ, বাংলার উলুবেড়িয়ার সন্নিকটস্থ বাণীবন, কলকাতার উপকণ্ঠে আড়িয়াদহে সাধন আশ্রমের শাখা স্থাপিত হয়। সেবা কাজ এই প্রতিষ্ঠানের মুখ্য উপজীব্য ছিল। এর দ্বারা পরিচালিত সেবা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে 'বাংলা ও আসামের অনুন্নত শ্রেণির উন্নতি বিধায়িনী সমিতি', 'ঢাকা হিন্দু বিধবা আশ্রম', 'রামমোহন রায় সেমিনারি' পাটনা, 'হাজারীবাগ দাতব্য চিকিৎসালয়' সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকরূপে তাঁর রচনার সংখ্যা অনেক। রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ (১৯০৪), আত্মচরিত (১৯১৮), History of Brahma Samaj ইত্যাদি তাঁর গবেষণামূলক আকরগ্রন্থ। বাংলা প্ৰবন্ধকাররূপে তাঁর খ্যাতি সর্বাধিক। তাঁর রচিত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ:, নির্বাসিতের বিলাপ (১৮৬৮), পুষ্পমালা (১৮৭৫), মেজ বৌ (১৮৮০), হিমাদ্রি-কুসুম (১৮৮৭), পুষ্পাঞ্জলি (১৮৮৮), যুগান্তর (১৮৯৫), নয়নতারা (১৮৯৯), রামমোহন রায়, ধর্মজীবন (৩ খন্ড, ১৯১৪-১৬), বিধবার ছেলে (১৯১৬), ‘Men I have seen’ ইত্যাদি। তাঁর ‘মেজ বৌ’ উপন্যাসটির ইংরেজী অনুবাদ ইংল্যান্ডের Indian National Journal-এ প্রকাশিত হয়েছিল।
পরিশেষে বলা যায় নিজের বিশ্বাস ও কাজে তিনি কোনোদিনই ফারাক রাখেননি। যদিও সে পথ খুব সহজ ছিল না। পরিবারের সঙ্গে বিচ্ছেদ, প্রথম স্ত্রীকে হারিয়ে ফেলা – মূল্য হিসেবে দিতে হয়েছিল অনেককিছু। তাঁর ধর্মজীবনের ভাবনা জুড়েছিল তাঁর মানবিকতা, সমাজচিন্তা ও সমাজসংস্কারের মধ্যেই। তিনি ছিলেন 'ধর্মপরায়ণ'। তার মূলে সংস্কারমুক্ত যুক্তিবাদী মন থাকলেও, সেটির প্রকাশ ঘটত ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমেই।
আজ এই মহাপুরুষের ১০৪ তম প্রয়াণ দিবস। ১৯১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কলকাতায় এই মহামানব শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।।