08/09/2026
*মঠের কাজ এবং আত্মোপলব্ধি বাসন মাজার পাঠ*
---------------------+++--------------
তখন আমি সবেমাত্র বেলুড় মঠে ব্রহ্মচারী হিসেবে প্রবেশ করেছি। মঠের নিয়মকানুন, পড়াশোনা, জপ-ধ্যান এবং তার সাথে পাল্লা দিয়ে চলেছে শারীরিক পরিশ্রম তথা নানা সেবা বা কাজ। মঠজীবনের প্রথম পাঠই হলো অহংকার বিসর্জন দেওয়া—ছোট থেকে ছোট কাজও ভক্তির সাথে করা।
একদিন দুপুরের রান্নার পর বিরাট এক কড়াই এবং প্রচুর থালাবাসন মাজার দায়িত্ব পড়েছে আমার ওপর। মঠের পাচক মহারাজ আমাকে বেশ রাশভারী গলায় বলে দিলেন, "ভালো করে ধোবে যেন একটুও তেলচিটে ভাব না থাকে!"
আমি তখন মঠের নিয়ম মেনে নিজের মনে মন্ত্র জপতে জপতে কাজে লেগে গেলাম। অত বড় কড়াই মাজা মুখের কথা নয়! ঘামে আমার তখন স্নান হওয়ার জোগাড়। মনে মনে একটু অভিমানও হচ্ছিল—
“এত পড়াশোনা করে মঠে এলাম, আর কন্টিনিউয়াস কড়াই মেজে গেলাম!”
ঠিক সেই সময় এক প্রবীণ সন্ন্যাসী মহারাজ পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি মৃদু হাসলেন। আমার মনের অবস্থা হয়তো তিনি দূর থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি কাছে এসে আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন—
"কী রে, কড়াইয়ের সাথে যুদ্ধ চলছে নাকি? মনে রাখবি, এই কড়াই মাজা বা জঞ্জাল সাফ করার কাজটাই হলো আসল জপ। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব কি শুধু মন্দিরে বসে পুজো করার জন্য আমাদের ডেকেছেন? নিজের ভেতরের অহংকার আর ময়লা সাফ করাই হলো এই কাজগুলোর আসল উদ্দেশ্য।
কড়াইয়ের কালি উঠছে, সাথে তোর মনের অহংকারটাও যেন পরিষ্কার হয়!"
মহারাজের সেই কথাগুলো জাদুকরের মতো কাজ করল। হঠাৎ করেই মনে এক অদ্ভুত শান্তি আর আনন্দ নেমে এল। বুঝতে পারলাম, কাজ ছোট বা বড় হতে পারে না; তার পেছনে ভাবটাই আসল। সেদিন সেই কড়াই মাজা শুধু একটা শারীরিক পরিশ্রম ছিল না, সেটা হয়ে উঠেছিল আমার এক বিরাট আধ্যাত্মিক পাঠ।
প্রতিদিনের সাধারণ কাজগুলোর মধ্যেই ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়া যায় এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে সাধনায় রূপান্তর করা যায়।
স্বামী সোমেশ্বরানন্দজী মহারাজের নিজের জীবনের কথা