27/04/2026
আজ একাদশী একাদশীর ব্রত মাহাত্মক কথা এবং একাদশী কেন করবেন সেটা আমি দিলামএকাদশী কী এবং কেন ?
একাদশী কি?
একাদশী হচ্ছে চন্দ্র পক্ষের একটা তিথি। চাঁদের দুটি পক্ষ একটি শুক্লপক্ষ ও আরেকটি কৃষ্ণপক্ষ। চাঁদের পূণির্মা পর্য্যন্ত সময়কে শুক্লপক্ষ এবং আমাবশ্যা পর্য্যন্ত সময়কে কৃষ্ণপক্ষ বলা হয়। পনের দিনে এক পক্ষ সমাপ্ত হয় এই এক পক্ষের এক একটা দিনকে এক একটা তিথি বলা হয়। তিথিগুলোর নাম হল প্রতিপদ, দ্বিতীয়া, তৃতীয়া, চতুর্থী, পঞ্চমী, ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, দশমী, একাদশী, দ্বাদশী, ত্রয়োদশী, চতুর্দশী এবং পূর্ণিমা অথবা অমাবশ্যা । হিন্দু ধর্মমতানুসারে একাদশীকে পুণ্যতিথি হিসেবে বিবেচনা করে একাদশী ব্রত পালন করা হয়। এদিন পূণ্য লাভের আশায় যে কেউ একাদশী ব্রত পালন করতে পারেন। এসময় সাধারণত ফলমূল ও বিভিন্ন সবজি এবং দুধ খাওয়া যায়, তবে একাদশীতে পঞ্চরবি শস্য বর্জন করতে হয়। বিষ্ণুর শয়ন, পার্শ্ব পরিবর্তন ও উত্থান উপলক্ষে যথাক্রমে আষাঢ়, ভাদ্র ও কার্তিক মাসের শুক্লা একাদশী বিশেষ শুভপ্রদ গণ্য করা হয়। ভৈমী একাদশী ও মাঘের শুক্লা একাদশীকেও বিশেষ মাহাত্ম্যপূর্ণ বলে মনে করা হয়। তবে প্রত্যেক একাদশী ব্রত পালনে শুভফল লাভ হয়। নিয়মিত একাদশী ব্রত পালন শরীরের পক্ষেও উপকারী। তাই স্বাস্থ্যগত কারণেও অনেকে প্রতি মাসে দুটি একাদশী ব্রত পালন করেন।
একাদশী আবির্ভাব এর মাহাত্ম্য
পদ্মপূরাণে একাদশী প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, একসময় জৈমিনি ঋষি তাঁর গুরুদেব মহর্ষি ব্যাসদেবকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে গুরুদেব! একাদশীর জন্ম কখন হয়েছিল? একাদশীর অধিষ্ঠাত্রী দেবতা কে? একাদশীতে কেন উপবাস করতে হয়? একাদশী ব্রত পালনে কি লাভ হয়? একাদশী ব্রত পালন না করলে কি ক্ষতি হয়? কখন এই ব্রত পালন করতে হয়। দয়া করে এই সব বিষয়ে আপনার কৃপা বর্ষন করুন।
মহর্ষি ব্যাসদেব জৈমিনি ঋষির প্রশ্ন শুনে অপ্রাকৃত আনন্দধামে উন্নীত হয়ে তখন বলতে লাগলেন “হে ব্রহ্মর্ষি জৈমিনি একাদশী পালনের ফল প্রকৃতরূপে পরমেশ্বর নারায়ণই শুধু এর মাহাত্ম্য শুদ্ধভাবে বর্ণনা করতে পারবেন, তবে আমি তোমার প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রদান করব।”
সৃষ্টির প্রারম্ভে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণু পঞ্চ মহাভূত দ্বারা স্থাবর ও অস্থাবর জীবগণকে এই জড় সংসারে সৃষ্টি করেন। মর্ত্যলোকবাসীদের শাস্তি প্রদানের জন্য একটি পাপপুরুষ সৃষ্টি করেন। সেই পাপপুরুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গাদি নানা প্রকার পাপ কার্য দ্বারা সৃষ্ট। পাপপুরুষের মাথাটি ব্রহ্মহত্যা পাপ দিয়ে, চক্ষুদুটি নেশায় আশক্তিজনিত পাপ, মুখ ছিল স্বর্ণচৌর্যজনিত পাপ, দুই কর্ণ ণ্ডরুপত্নী উপগমন, দুই নাসিকা পরপত্নী হত্যা, দুই হাত গো-হত্যাজনিত পাপ, গ্রীবা পরধন চৌর্যজনিত পাপ, বক্ষদেশ ভ্রুণ হত্যাজনিত পাপ, নিম্নবক্ষ পরস্ত্রী উপগমন জনিত পাপ, উদর আত্মীয়স্বজন হত্যা পাপ, নাভিমূল অধীনস্থ জনকে হত্যা পাপ, কোমর আত্মশ্লাঘা পাপ, জংঘা ণ্ডরুনিন্দা জনিত পাপ, লিঙ্গ শিশু কন্যা বিক্রি জনিত পাপ, পশ্চাদ্দেশ ণ্ডপ্তকথা প্রকাশ করার পাপ, পদদ্বয় পিতৃ হত্যা পাপ, শরীরের কেশরাজি অন্যান্য পাপ কর্মাদি দ্বারা গঠিত। যার শরীর ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, চোখ দুটি পীতবর্ণ। এভাবে একটি বীভৎস পাপপুরুষ সৃষ্টি করেছিলেন। সে পাপিদের কঠিন শাস্তি দান করেন।
এই পাপপুরুষের ভয়ঙ্কর রূপ দর্শন করে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণু মর্ত্যের মানব জাতির কল্যানের কথা চিন্তা করতে লাগলেন। তিনি চিন্তা করলেন আমিই জীবগণের সুখ ও দুঃখের স্রষ্টা, আমি তাদের প্রভু, আমিই জীবজগতের পালন কর্তা। আমি পাপপুরুষ সৃষ্টি করেছি সে প্রতারক পাপীষ্ট মানুষকে দুঃখ যন্ত্রনা প্রদান করে। এখন এই পাপপুরুষের নিয়ন্ত্রক সৃষ্টি করে পাপীদের অন্য ব্যবস্থা করতে হবে। এই সময় ভগবান শ্রীবিষ্ণু যমরাজ ও বিভিন্ন প্রকার নরক সৃষ্টি করলেন। মৃত্যুর পর পাপীদের যমরাজের নিকট পঠাতে হবে এবং তিনি তাদের পাপ বিচার করে বিভিন্ন নরকে যন্ত্রনা ভোগের জন্য পাঠিয়ে দিবেন। একদিন পক্ষীরাজ গরুড়ের পিঠে চড়ে পরমেশ্বর ভগবান যমরাজের গৃহে উপস্থিত হলেন। যমরাজ পরমেশ্বর ভগবানকে দেখেই পাদ্য-অর্ঘ্যে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করে স্বর্ণ সিংহাসনে বসিয়ে যথাবিধি তাঁর পূজা করলেন। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণু বসেই শুনতে পেলেন দক্ষিণ দিক থেকে অসংখ্য জীবের আর্তক্রন্দন ধ্বনি। তিনি তখন যমরাজকে প্রশ্ন করলেন-এ আর্তক্রন্দন কেন?
যমরাজ বললেন, হে প্রভু!, মর্ত্যের পাপী মানূষেরা নিজ কর্মদোষে নরকযন্ত্রনা ভোগ করছেন। সেই যাতনার আর্ত চীৎকার শোনা যাচ্ছে। ভগবান যন্ত্রনাকাতর পাপীদের দেখতে দক্ষিণ দিকের নরকে উপস্থিত হলেন। তাঁকে দেখে নরকবাসীগণ আরো অধিক উচ্চস্বরে চিৎকার করে করজোরে প্রার্থনা করতে লাগলেন “হে প্রভু আমাদেরকে এই নরকযন্ত্রনা থেকে রক্ষা করুন”। যন্ত্রণাকাতর পাপাচারী জীবদের দর্শন করে তাদের যন্ত্রনায় বিচলিত হয়ে করুণাময় ভগবান চিন্তা করলেন আমিই সমস্ত প্রজা সৃষ্টি করেছি, আমার সামনেই ওরা কর্ম দোষে নরক যান্ত্রণা ভোগ করছে, এখন আমিই এদের সদগতির ব্যবস্হা করব।
ব্যাসদেব বলতে লাগলেন “হে জৈমিনি শোন!” পরমেশ্বর ভগবান তারপর কি করলেন। করুনাময় পরমেশ্বর ভগবান পূর্বের বিচার কার্য পুনঃবিবেচনা করলেন। ভগবান শ্রীবিষ্ণু হঠাৎ পাপাচারীদের সামনে একাদশী রূপে এক দেবীমুর্তিতে আবির্ভুত হলেন। সেই পাপীদেরকে একাদশী ব্রত পালনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করিয়ে ব্রত আচরণ করালেন। একাদশী ব্রতের ফলে তারা সর্বপাপ মুক্ত হয়ে তৎক্ষণাৎ বৈকূণ্ঠ ধামে গমন করলেন।
শ্রীব্যাসদেব বললেন “হে জৈমিনি!” একাদশী পরমেশ্বর শ্রীবিষ্ণু ও পরমাত্মার বিগ্রহে প্রভেদ নেই। শ্রীহরির প্রকাশ এই একাদশী পালন অতীব শ্রেষ্ঠ কর্ম এবং সমস্ত ব্রতের মধ্যে উত্তম ব্রত। শ্রী একাদশী আবির্ভাবের কারনে পাপপুরুষ একাদশীর প্রতিকূল প্রভাব অনুভব করল। কিছুদিন পরে ভগবানের সৃষ্ট পাপপুরুষ এসে শ্রীবিষ্ণুর কাছে করজোড়ে কাতর হয়ে প্রার্থণা করতে লাগল। ভগবান শ্রীবিষ্ণু প্রসন্ন হয়ে তাকে বর দিতে চাইলেন। তখন পাপপুরুষ বললেন “হে ভগবান !” আমি আপনার প্রজা, আপনারই সৃষ্টি। আমাকে যারা আশ্রয় করে থাকে, তাদের কর্ম অনূযায়ী তাদের দুঃখ দান করাই আমার কাজ ছিল। কিন্তু সম্প্রতি শ্রীএকাদশীর প্রভাবে আমি কিছুই করতে পারছি না, বরং আমার অস্তিত্ব দিন দিন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কেননা একাদশী ব্রতের ফলে প্রায় সব পাপাচারীরা বৈকূণ্ঠের বাসিন্দা হযে যাচ্ছে। হে ভগবান, এখন আমার কি হবে? আমি কাকে আশ্রয় করে থাকব? আমার মৃত্যুর পর আপনার অংশগুলো যারা জড়দেহ ধারন করেছে তারা সবাই মুক্তিলাভ করে বৈকুন্ঠধাম প্রাপ্ত হবে। সবাই যদি বৈকূণ্ঠে চলে যায়, তবে এই মর্ত্য জগতের কি হবে? আপনি বা কার সঙ্গে এই মর্ত্যে ক্রীড়া করবেন? হে কৈটভনাশন, আমি একাদশীর ভয়ে মানুষ, পশু, কীট, পাহাড়, বৃক্ষ, স্থাবর ও জঙ্গম, নদী, সমুদ্র, জঙ্গল, স্বর্গ, মর্ত, নরক, দেবতা ও গন্ধর্বগণের নিকট আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেছি । কিন্ত শ্রীএকাদশীর প্রভাবে কোথাও নির্ভয় স্হান পাচ্ছি না। হে ভগবান, এখন দেখছি, আপনার সৃষ্ট অনন্ত কোটি ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে শ্রীএকাদশীই প্রাধান্য লাভ করেছে, সেইজন্য আমি কোথাও আশ্রয় পাচ্ছি না। আপনি কৃপা করে আমাকে একটি নির্ভয় বাসস্থান প্রদান করুন যেখানে থাকলে শ্রীএকাদশীর প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারব।
ব্যাসদেব জৈমিনিকে বললেন “এইরূপ প্রার্থনা করে পাপপুরুষ পরমেশ্বর শ্রীবিষ্ণুর পাদপদ্মে নিপতিত হয়ে কাঁদতে লাগল।” পাপপুরুষের প্রার্থনা শুনে ভগবান শ্রীবিষ্ণু বললেন ‘হে পাপপুরুষ!’ তুমি দুঃখ করো না। আর কেঁদো না। একাদশীর দিন তোমার নিরাপদ আশ্রয় কোথায় হবে মন দিয়ে শোন। যখন শ্রীএকাদশী এই ত্রিভুবনকে পবিত্র করতে আবির্ভুত হবে, তখন তুমি অন্ন ও রবিশস্যের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করবে সেখানে আমার মুর্তি শ্রীএকাদশী তোমাকে বধ করতে পারবে না। এইরূপ বলে পরমেশ্বর শ্রীবিষ্ণু অন্তর্ধান হলেন এবং সেইদিন থেকে পাপপুরুষ শ্রীএকাদশী থেকে বাচার নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেল।
শ্রীবিষ্ণুর আদেশে জড় জগতে সকল প্রকার পাপকর্ম একাদশীর দিন খাদ্যশস্যের মধ্যে আশ্রয় গ্রহন করে। তাই পরম পুণ্য লাভের আশায় ব্যক্তিগণ একাদশীর দিন শস্য গ্রহন করেন না। একাদশী ব্রত পালন করলে সকল প্রকার পাপ থেকে মুক্তিলাভ করা যায় এবং কখনো নরক যন্ত্রনা ভোগ করতে হয় না। একাদশীর দিন এক দানা শস্য খেলে কোটি ব্রাহ্মণ হত্যার পাপ হয়। একাদশী ব্রত যারা পালন না করে তারা তো পাপীর অধম। ব্রাহ্মন, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র সবাইকে একাদশী ব্রত পালন করা আবশ্যক। ইহাই শুদ্ধ বর্ণাশ্রমের ভিত্তি। একাদশী ব্রত পালন করলেই সর্বপাপ বিনাশ হয় ও বৈকুন্ঠধাম লাভ করা যায়।
সূর্যোদয়ের এক ঘন্টা ছত্রিশ মিনিট পূর্ব পর্যন্ত দশমী বিদ্ধা বলা হয়। দশমী বিদ্ধা একাদশী ব্রত পালন করা কখনও উচিত নয়। এই সংসারে একাদশীর ন্যায় পবিত্র ব্রত আর নেই। যে ব্যক্তি একাদশী ব্রত পালন করেন না সে নরাধম , তার পরমগতি লাভ হয়না।
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।।
👇একাদশী নিয়মাবলী
একাদশী পালনের নিয়মাবলী:
একাদশীর মূল কাজ হল– নিরন্তর ভগবানকে স্মরণ করা । তাই আপনারা যে নিয়মে, যে সময়ে পালন করুন না কেন, ভগবানকে ভক্তিভরে স্মরণ করাই যেন আপনারই মূল কাজ হয় ।
আমরা একাদশী পালনের সাত্ত্বিক নিয়মটি উল্লেখ করছি । এটি পালন করা সবার উচিত:
১। সমর্থ পক্ষে দশমীতে একাহার, একাদশীতে নিরাহার, ও দ্বাদশীতে একাহার করিবেন ।
২। তা হতে অসমর্থ পক্ষে শুধুমাত্র একাদশীতে অনাহার।
৩। যদি উহাতেও অসমর্থ হন, একাদশীতে পঞ্চ রবিশস্য বর্জন করতঃ ফল মূলাদি অনুকল্প গ্রহণের বিধান রহিয়াছে।
□ সমর্থ পক্ষে রাত জাগরণের বিধি আছে , গোড়ীয় ধারায় বা মহান আচার্য্যবৃন্দের অনুমোদিত পঞ্জিকায় যে সমস্ত একাদশী নির্জলা ( জল ব্যতীত ) পালনের নির্দেশ প্রদান করেছেন । সেগুলি সেমতে করলে সর্বোওম হয় । নিরন্তর কৃষ্ণভাবনায় থেকে নিরাহার থাকতে অপারগ হলে নির্জলাসহ অন্যান্য একাদশীতে কিছু — সবজি , ফলমূলাদি গ্রহণ করতে পারেন । যেমন — গোল আলু , মিষ্টি আলু , চাল কুমড়ো , পেঁপে , টমেটো, , ফুলকপি ইত্যাদি সবজি ঘি অথবা বাদাম তেল বা সূর্যমুখী তেলদিয়ে রান্না করে ভগবানকে উৎসর্গ করে আহার করতে পারেন । বাটাহলুদ, মরিচ, ও সন্ধর্ব লবণ ব্যবহার্য । আবার অন্যান্য আহায্য যেমন — দুধ ,কলা , আপেল , আঙ্গুর, আনারস, আখঁ, আম, শসা, তরমুজ, বেল, নারিকেল, মিষ্টি আলু , বাদাম ও লেবুর শরবত ইত্যাদি ফলমূলাদি খেতে পারেন ।
একাদশীতে পাচঁ প্রকার রবিশস্য গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে:
১। ধান জাতীয় সকল প্রকার খাদ্য যেমন – চাউল,মুড়ি, চিড়া, সুজি, পায়েশ, খিচুড়ি, চাউলের পিঠা, খৈ ইত্যাদি
২। গম জাতীয় সকল প্রকার খাদ্য যেমন – আটা,ময়দা, সুজি , বেকারীর রূটি , বা সকল প্রকার বিস্কুট ,হরলিকস্ জাতীয় ইত্যাদি ।
৩। যব বা ভূট্টা জাতীয় সকল প্রকার খাদ্য যেমন — ছাতু , খই , রূটি ইত্যাদি ।
৪। ডাল জাতীয় সকল প্রকার খাদ্য যেমন — মুগ মাসকলাই , খেসারী , মসুরী, ছোলা অড়রহ , ফেলন, মটরশুটি, বরবঢী ও সিম ইত্যাদি ।
৫। সরিষার তৈল , সয়াবিন তৈল, তিল তৈল ইত্যাদি । উপরোক্ত পঞ্চ রবিশস্য যেকোন একটি একাদশীতে গ্রহণ করলে ব্রত নষ্ট হয় ।
৬। শ্যামা চাল ও কাউনের চাল খাওয়া যাবে না । সাগু দানা না খাওয়া ভালো ।
□ উল্লেখ্য যারা সাত্ত্বিক আহারী নন এবং চা , বিড়ি / সিগারেট পান কফি ইত্যাদি নেশা জাতীয় গ্রহণ করেন, একাদশী ব্রত পালনের সময়কাল পর্যন্ত এগুলি গ্রহণ না করাই ভালো ।
□ একাদশী করলে যে কেবলমাত্র নিজের জীবনের সদ্ গতি হবে তা নয় । একাদশী ব্যক্তির প্রয়াত পিতা / মাতা নিজ কর্ম দোষে নরকবাসী হন , তবে সেই পুত্র ই (একাদশী ব্রত ) পিতা – মাতাকে নরক থেকে উদ্ধার করতে পারে । একাদশীতে অন্ন ভোজন করলে যেমন নরকবাসী হবে , অন্যকে ভোজন করালেও নরকবাসী হবে । কাজেই একাদশী পালন করা আমাদের সকলেরই কর্তব্য ।
একাদশী পারণঃ
(একাদশী তিথির পরদিন উপবাস ব্রত ভাঙ্গার পর নিয়ম ) পঞ্জিকাতে একাদশী পারণের ( উপবাসের পরদিন সকালে ) যে নির্দিষ্ট সময় দেওয়া থাকে , সেই সময়ের মধ্যে পঞ্চ রবিশস্য ভগবানকে নিবেদন করে, প্রসাদ গ্রহণ করে পারণ করা একান্ত দরকার । নতুবা একাদশীর কোন ফল লাভ হবে না । একাদশী ব্রত পালনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল উপবাস করা নয় , নিরন্তর শ্রীভগবানের নাম স্মরণ , মনন , ও শ্রবণ কীর্তনের মাধ্যমে একাদশীর দিন অতিবাহিত করতে হয় । এদিন যতটুকু সম্ভব উচিত । একাদশী পালনের পরনিন্দা , পরিচর্চা, মিথ্যা ভাষণ, ক্রোধ দুরাচারী, স্ত্রী সহবাস সম্পূর্ণ রূপে নিষিদ্ধ ।
□ বিঃ দ্রঃ নিমোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি রাখা বাঞ্ছনীয়ঃ — একাদশী ব্রতের আগের দিন রাত ১২ টার আগেই অন্ন ভোজন সম্পন্ন করে নিলে সর্বোওম । ঘুমানোর আগে দাঁত ব্রাঁশ করে দাঁত ও মুখ গহব্বরে লেগে থাকা সব অন্ন পরিষ্কার করে নেওয়া সর্বোওম । সকালে উঠে শুধু মুখ কুলি ও স্নান করতে হয়।
□ একাদশীতে সবজি কাটার সময় সতর্ক থাকতে হবে যেন কোথাও কেটে না যায় । একাদশীতে রক্তক্ষরণ বর্জনীয় । দাঁত ব্রাশঁ করার সময় অনেকের রক্ত ক্ষরণ হয়ে থাকে । তাই একাদশীর আগের দিন রাতেই দাঁত ভালো ভাবে ব্রাশঁ করে নেওয়াই সর্বোওম ।
□ একাদশীতে চলমান একাদশীর মাহাত্ন্য ভগবদ্ভক্তের শ্রীমুখ হতে শ্রবণ অথবা সম্ভব না হলে নিজেই ভক্তি সহকারে পাঠ করতে হয় ।
□ যারা একাদশীতে একাদশীর প্রসাদ রান্না করেন , তাদের পাচঁ ফোড়ঁন ব্যবহারে সতর্ক থাকা উচিৎ ।কারণ পাঁচ ফোড়ঁনে সরিষার দানা ও তিল থাকতে পারে যা বর্জনীয় ।
□ একাদশীতে শরীরে প্রসাধনী ব্যবহার নিষিদ্ধ । তৈল ( শরীরে ও মাথায় ) সুগন্ধি সাবান শেম্পু ইত্যাদি বর্জনীয় ।
□ সকল প্রকার ক্ষৌরকর্ম — শেভ করা এবং চুল ও নক কাটা নিষিদ্ধ ।
□ একাদশী পারণের যে সময় দেওয়া থাকে সেই সময়ের মধ্যে পঞ্চ রবিশষ্য ভগবানের নিবেদন করে প্রসাদ গ্রহণ করে পারণ করা একান্ত দরকার। নতুবা একাদশীর কোন ফল লাভ হয় না।
একাদশীর পারণ মন্ত্র:
একাদশ্যাং নিরাহারো ব্রতেনানেন কেশব।
প্রসীদ সুমুখ নাথ জ্ঞানদৃষ্টিপ্রদো ভব।।
- এই মন্ত্র পাঠ করে নির্দিষট সময়ের মাঝে পারন করতে হয়।
একাদশী ব্রত পালনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল উপবাস করা নয়, নিরন্তর শ্রীভগবানের স্মরণ, মনন ও শ্রবন কীর্ত্তনের মাধ্যমে একাদশীর দিন অতিবাহিত করতে হয়। শ্রীল প্রভুপাদ ভক্তদের একাদশীর দিন পঁচিশ মালা বা যতেষ্ট সময় পেলে আরও বেশী জপকরার নির্দেশ দিয়েছেন। একাদশী পালনের সময় পরনিন্দা, পরিচর্চা, মিথ্যা ভাষন, ক্রোধ, দুরাচারী, স্ত্রী সহবাস সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।
।। একাদশী বার্তা ।।
তারিখ: ২৭-এপ্রিল-২০২৬ ইং
বার: সোমবার
একাদশীর নাম: মোহিনী
পারণের দিন: পরের দিন অর্থাৎ মঙ্গলবার
ভারত-কলকাতা পারণের সময়: সকাল ০৫:০৫ থেকে ০৯:২৪ মি: মধ্যে।
মোহিনী একাদশী মাহাত্ম্য👇
কুর্মপুরাণে বৈশাখ শুক্লপক্ষের ‘মোহিনী’ একাদশীর ব্রত মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে। মহারাজ যুধিষ্ঠির বললেন- ‘হে জনার্দন! বৈশাখ শুক্লপক্ষীয়া একাদশীর কি নাম, কি ফল, কি বিধি-এসকল কথা আমার নিকট বর্ণনা করুন।’ উত্তরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন হে ধর্মপুত্র! আপনি আমাকে যে প্রশ্ন করেছেন পূর্বে শ্রীরামচন্দ্রও বশিষ্ঠের কাছে এই একই প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন- হে মুনিবর! আমি জনকনন্দিনী সীতার বিরহজনীত কারণে বহু দু:খ পাচ্ছি। তাই একটি উত্তম ব্রতের কথা আমাকেবলুন। যার দ্বারা সর্বপাপ ক্ষয় হয় ও সর্বদু:খ বিনষ্ট হয়।
এই কথা শুনে বশিষ্ঠদেব বললেন- হে রামচন্দ্র! তুমি উত্তম প্রশ্ন করেছ। যদিও তোমার নামগ্রহণেই মানুষ পবিত্র হয়ে থাকে। তবুও লোকের মঙ্গলেরজন্য তোমার কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ ও পরম পবিত্র একটি ব্রতের কথা বলছি। বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষীয়া একাদশী ‘মোহিনী’ নামে প্রসিদ্ধা। এই ব্রত প্রভাবে মানুষের সকল পাপ, দু:খ ও মোহজাল অচিরেই বিনষ্ট হয়। তাইমানুষের উচিত সকল পাপক্ষয়কারী ও সর্বদু:খবিনাশী এই একাদশী ব্রত পালন করা। একাগ্রচিত্তে তার মহিমা তুমি শ্রবণ কর। এই কথাশ্রবণমাত্রেই সমস্ত পাপ বিনষ্ট হয়।
পবিত্র সরস্বতী নদীর তীরে ভদ্রাবতী নামে এক সুশোভনা নগরী ছিল। চন্দ্রবংশজাত ধৃতিমান নামে এক রাজা সেখানে রাজত্ব করতেন। সেই নগরীতেইধনপাল নামে এক বৈশ্য বাস করতেন। তিনি ছিলেন পুণ্যকর্মা ও সমৃদ্ধশালী ব্যক্তি। তিনি নলকূপ, জলাশয়, উদ্যান, মঠ ও গৃহ ইত্যাদি নির্মাণ করেদিতেন। তিনি ছিলেন বিষ্ণুভক্তি পরায়ণ ও শান্ত প্রকৃতির মানুষ। সুমনা, দ্যুতিমান, মেধাবী, সুকৃতি ও ধৃষ্টবুদ্ধি নামে তার পাঁচজন পুত্র ছিল। পঞ্চমপুত্র ধৃষ্টবুদ্ধি ছিল অতি দুরাচারী। সে সর্বদা পাপকার্যে লিপ্ত থাকত। পরস্ত্রী সঙ্গী, বেশ্যাসক্ত, লম্পট ও দ্যুতক্রীড়া প্রভৃতি পাপে সে অত্যন্ত আসক্তছিল। দেবতা, ব্রাহ্মণ ও পিতামাতার সেবায় তার একেবারেই মতি ছিল না। সে অন্যায়কার্যে রত, দুষ্টস্বভাব ও পিতৃধন ক্ষয়কারক ছিল। সবসময় সেঅভক্ষ ভক্ষণ ও সুরাপানে মত্ত থাকত।
পিতা ধনপাল একদিন পথ চলছিলেন। হঠাৎ তিনি দেখতে পেলেন ধৃষ্টবুদ্ধি এক বেশ্যার গলায় হাত রেখে নি:সঙ্কোচে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার নির্লজ্জপুত্রকে এভাবে চৌরাস্তায় ভ্রমণ করতে দেখে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হলেন। এই কুস্বভাব দর্শনে ক্রুদ্ধ হয়ে তিনি তাকে গৃহ থেকে বার করে দিলেন।তার আত্মীয়-স্বজনও তাকে পরিত্যাগ করল। সে তখন নিজের অলংকারাদি বিক্রি করে জীবন অতিবাহিত করত। কিছুদিন এইভাবে চলার পরঅর্থাভাব দেখা দিল। ধনহীন দেখে সেই বেশ্যাগণও তাকে পরিত্যাগ করল। অন্নবস্ত্রহীন ধৃষ্টবুদ্ধি ক্ষুধা-তৃষ্ণায় অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়ল। অবশেষে নিজের গ্রামে সে চুরি করতে শুরু করল। একদিন রাজপ্রহরী তাকে ধরে বন্দীকরল। কিন্তু পিতার সন্মানার্থে তাকে মুক্ত করে দিল। এভাবে বারকয়েক সে ধরা পড়ল ও ছাড়া পেল। কিন্তু তবুও সে চুরি করা বন্ধ করল না। তখনরাজা তাকে কারাগারে বদ্ধ করে রাখলেন। বিচারে সে কষাঘাত দন্ডভোগ করল। কারাভোগের পর অনন্য উপায় ধৃষ্টবুদ্ধি বনে প্রবেশ করল। সেখানেসে পশুপাখি বধ করে তাদের মাংস ভক্ষণ করে অতি দু:খে পাপময় জীবন যাপন করতে লাগল।
দুষ্কর্মের ফলে কেউ কখনও সুখী হতে পারে না। তাই সেই ধৃষ্টবুদ্ধি দিবারাত্রি দু:খশোকে জর্জরিত হল। এভাবে অনেকদিন অতিবাহিত হল। কোনপুণ্যফলে সহসা একদিন সে কৌন্ডিন্য ঋষির আশ্রমে উপস্থিত হল। বৈশাখ মাসে ঋষিবর গঙ্গাস্নান করে আশ্রমের দিকে প্রত্যাবর্তন করছিলেন।শোককুল ধৃষ্টবুদ্ধি তার সম্মুখে উপস্থিত হল। ঘটনক্রমে ঋষির বস্ত্র হতে একবিন্দু জল তার গায়ে পড়ল। সেই জলস্পর্শে তার সমস্ত পাপ দূর হল।হঠাৎ তার শুভবুদ্ধির উদয় হল।
ঋষির সামনে সে কৃতাঞ্জলিপুটে প্রার্থণা করতে লাগল ‘হে ঋষিশ্রেষ্ঠ! যে পুণ্য প্রভাবে আমি এই ভীষণ দৃ:খযন্ত্রণা থেকে মুক্তিলাভ করতে পারি, তাকৃপাকরে আমাকে বলুন।’ ঋষিবর বললেন-‘বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষে মোহিনী নামে যে প্রসিদ্ধ একাদশী আছে, তুমি সেই ব্রত পালন কর। এই ব্রতের ফলে মানুষের বহুজন্মার্জিত পর্বত পরিমাণ পাপরাশিও ক্ষয় হয়ে থাকে। মহামুনি বশিষ্ঠ বললেন-কৌন্ডিন্য ঋষির উপদেশ শ্রবণ করে প্রসন্ন চিত্তে ধৃষ্টবুদ্ধি সেই ব্রত পালন করল। হে মহারাজ রামচন্দ্র! এই ব্রত পালনে সে নিষ্পাপ হল। দিব্যদেহ লাভ করল। অবশেষে গরুড়ে আরোহন করে সকল প্রকার উপদ্রবহীনবৈকুন্ঠধামে গমন করল। হে রাজন, ত্রিলোকে মোহিনী ব্রত থেকে আর শ্রেষ্ঠ ব্রত নেই। যজ্ঞ, তীর্থস্থান, দান ইত্যাদি কোন পুণ্যকর্মই এই ব্রতেরসমান নয়। এই ব্রত কথার শ্রবণ কীর্তনে সহস্র গোদানের ফল লাভ হয়।
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।।*মোহিনী একাদশী*
শ্রী যুধিষ্ঠির মহারাজ বললেন, “হে জনার্দন, বৈশাখ মাসের শুক্ল পক্ষের যে একাদশী (এপ্রিল–মে) ঘটে, তার নাম কী? এটি যথাযথভাবে পালন করার প্রক্রিয়া কী? অনুগ্রহ করে এই সমস্ত বিষয় আমাকে বর্ণনা করুন।”
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ উত্তর দিলেন, “হে ধর্মপুত্র, একসময় বশিষ্ঠ মুনি ভগবান রামচন্দ্রকে যা বলেছিলেন, এখন আমি তোমাকে তা বর্ণনা করছি। মনোযোগ দিয়ে শোনো।
“ভগবান রামচন্দ্র বশিষ্ঠ মুনিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘হে মহামুনি, আমি সকল উপবাস দিবসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সেই দিবসটির কথা শুনতে চাই—যে দিবস সকল প্রকার পাপ ও দুঃখ দূর করে। আমার প্রিয় সীতার বিচ্ছেদে আমি অনেক কষ্ট পেয়েছি, তাই আমি আপনার কাছ থেকে শুনতে চাই, কীভাবে আমার এই দুঃখের অবসান হতে পারে।’
“ঋষি বশিষ্ঠ উত্তর দিলেন, ‘হে রাম, হে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন প্রভু, আপনার নাম স্মরণ করলেই মানুষ ভৌতিক জগতের সাগর পার হতে পারে। আপনি সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ এবং সবার ইচ্ছা পূরণের জন্যই আমাকে এই প্রশ্ন করেছেন। এখন আমি সেই উপবাস দিবসটির কথা বলছি, যা সমগ্র জগতকে পবিত্র করে।
‘হে রাম, সেই দিনটি বৈশাখ-শুক্ল একাদশী নামে পরিচিত, যা দ্বাদশীতে পড়ে। এটি সমস্ত পাপ দূর করে এবং মোহিনী একাদশী নামে প্রসিদ্ধ। সত্যিই, হে প্রিয় রাম, যে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি এই একাদশী পালন করে, সে মায়ার জাল থেকে মুক্তি পায়। অতএব, আপনি যদি আপনার দুঃখ দূর করতে চান, তবে এই শুভ একাদশী যথাযথভাবে পালন করুন; এটি জীবনের সব বাধা দূর করে এবং সর্ববৃহৎ দুঃখ লাঘব করে। এখন এর মাহাত্ম্য শুনুন, কারণ যে ব্যক্তি এই একাদশীর মাহাত্ম্য শ্রবণ করে, তারও মহাপাপ নাশ হয়।
‘সরস্বতী নদীর তীরে একসময় ভদ্রাবতী নামে এক সুন্দর নগরী ছিল, যা দ্যুতিমান নামে এক রাজা শাসন করতেন। হে রাম, সেই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, সত্যবাদী ও অত্যন্ত বুদ্ধিমান রাজা চন্দ্রবংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার রাজ্যে ধনপাল নামে এক বণিক ছিলেন, যিনি বিপুল পরিমাণ ধন-ধান্যের অধিকারী ছিলেন এবং অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ছিলেন। তিনি ভদ্রাবতীর নাগরিকদের কল্যাণের জন্য পুকুর খনন, যজ্ঞমণ্ডপ নির্মাণ এবং সুন্দর উদ্যান সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি ভগবান বিষ্ণুর একজন মহান ভক্ত ছিলেন এবং তার পাঁচ পুত্র ছিল—সুমন, দ্যুতিমান, মেধাবী, সুকৃতি এবং ধৃষ্টবুদ্ধি।
‘দুর্ভাগ্যবশত, তার পুত্র ধৃষ্টবুদ্ধি সর্বদা ভীষণ পাপ কাজে লিপ্ত থাকত, যেমন—বেশ্যাদের সঙ্গে সংসর্গ এবং নীচ সঙ্গ। সে অবৈধ ভোগ, জুয়া এবং ইন্দ্রিয়তৃপ্তির নানা কাজে লিপ্ত ছিল। সে দেবতা, ব্রাহ্মণ, পূর্বপুরুষ, সমাজের বয়োজ্যেষ্ঠ এবং পরিবারের অতিথিদেরও অসম্মান করত। দুষ্টমতি ধৃষ্টবুদ্ধি নির্বিচারে তার পিতার সম্পদ অপচয় করত এবং সর্বদা অপবিত্র খাদ্য গ্রহণ ও অতিরিক্ত মদ্যপানে লিপ্ত থাকত।
‘একদিন ধনপাল তাকে এক পরিচিত বেশ্যার সঙ্গে রাস্তায় হাত ধরে হাঁটতে দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এরপর তার আত্মীয়রাও তাকে ত্যাগ করে। সমস্ত অলংকার বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে গেলে সেই বেশ্যাও তাকে ত্যাগ করে এবং তার দারিদ্র্যের জন্য তাকে অপমান করে।
‘এখন ধৃষ্টবুদ্ধি উদ্বিগ্ন ও ক্ষুধার্ত হয়ে ভাবতে লাগল, “আমি কী করব? কোথায় যাব? কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করব?” এরপর সে চুরি শুরু করল। রাজপুরুষরা তাকে গ্রেফতার করলেও, তার পরিচয় ও পিতার খ্যাতির কারণে তাকে ছেড়ে দিত। এভাবে বহুবার ধরা পড়ে মুক্তি পায়। কিন্তু শেষে তার উদ্ধত স্বভাব ও অসভ্যতার জন্য তাকে গ্রেফতার করে শাস্তি দেওয়া হয় এবং সতর্ক করে বলা হয়, “হে দুষ্টমতি, এই রাজ্যে তোমার কোনো স্থান নেই।”
‘তখন সে বনে চলে যায় এবং ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কষ্ট পেতে পেতে পশু-পাখি হত্যা করে জীবিকা নির্বাহ করতে থাকে—সিংহ, হরিণ, শূকর, নেকড়ে, এমনকি নানা পাখিও। তার পাপ প্রতিদিন বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং সে গভীর পাপে নিমজ্জিত হয়।
‘একদিন বৈশাখ মাসে, পূর্বসঞ্চিত পুণ্যের প্রভাবে সে কৌন্ডিন্য মুনির আশ্রমে পৌঁছে যায়। মুনি গঙ্গাস্নান করে ফিরছিলেন, এবং তার ভেজা বস্ত্র থেকে ঝরে পড়া জলবিন্দু ধৃষ্টবুদ্ধির শরীরে স্পর্শ করে। সঙ্গে সঙ্গে তার অজ্ঞতা দূর হয় এবং পাপক্ষয় শুরু হয়। সে বিনম্র হয়ে মুনির কাছে প্রার্থনা করে, “হে মহাব্রাহ্মণ, আমাকে এমন কোনো প্রায়শ্চিত্ত বলুন যা সহজে পালন করা যায়।”
‘মুনি বললেন, “হে পুত্র, মনোযোগ দিয়ে শোনো। বৈশাখ মাসের শুক্ল পক্ষের মোহিনী একাদশী সকল পাপ নাশ করতে সক্ষম। তুমি যদি এই একাদশী নিষ্ঠার সঙ্গে পালন কর, তবে বহু জন্মের পাপ থেকেও মুক্তি পাবে।”
‘এই কথা শুনে ধৃষ্টবুদ্ধি আনন্দের সঙ্গে উপবাস পালন করে এবং পরে পাপমুক্ত হয়ে ভগবান বিষ্ণুর ধাম লাভ করে।’
‘হে রামচন্দ্র, মোহিনী একাদশী সমস্ত মোহ দূর করে। তিন জগতে এর মতো শ্রেষ্ঠ উপবাস আর নেই।’
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ উপসংহারে বললেন, “হে যুধিষ্ঠির, মোহিনী একাদশী পালন করলে যে পুণ্য লাভ হয়, তা তীর্থ, যজ্ঞ বা দান থেকেও অধিক। আর যে ব্যক্তি এর মাহাত্ম্য শ্রবণ করে, সে হাজার গরু দানের সমান পুণ্য লাভ করে।”
এইভাবে কূর্ম পুরাণে বর্ণিত বৈশাখ-শুক্ল একাদশী তথা মোহিনী একাদশীর মাহাত্ম্য সমাপ্ত।
*বিঃদ্রঃ* যদি এই উপবাস দ্বাদশীতে পড়ে, তবুও বৈদিক শাস্ত্রে একে একাদশীই বলা হয়। গরুড় পুরাণে বলা হয়েছে—একাদশী সম্পূর্ণ, একাদশী-দ্বাদশীর সংযোগ বা তিন তিথির সংযোগ থাকলেও উপবাস করা যায়; কিন্তু দশমী-একাদশীর সংযোগে নয়।🙏🌿🌱