06/09/2026
আরব ইতিহাসের একজন তাগুত প্রধান ইবলিশ শয়তান মোঃ ইবনে আব্দুল্লাহ কিভাবে এত বিভাজন করেছে মানুষের মাঝে
মানুষের শরীর এক,ক্ষুধা এক,আকাঙ্ক্ষা এক-তবু সৃষ্টিকর্তার পথে এত বিভাজন কেন?
একজন মানুষ যখন পৃথিবীতে জন্ম নেয়, সে কোনো ধর্মের নাম নিয়ে জন্মায় না।
তার প্রথম কান্নার কোনো ধর্ম নেই।
তার প্রথম ক্ষুধার কোনো ধর্ম নেই।
তার রক্তের কোনো ধর্ম নেই।
তার হৃদস্পন্দন কোনো ধর্মের ভাষা বোঝে না।
একটি শিশু জন্মের পর প্রথম যে জিনিসটি খোঁজে, তা হলো জীবন-মায়ের দুধ,উষ্ণতা,স্পর্শ,নিরাপত্তা।
সে জানে না সে মুসলমান,হিন্দু,খ্রিস্টান,বৌদ্ধ,ইহুদি কিংবা অন্য কিছু।
তারপর সমাজ তাকে একটি নাম দেয়,একটি ভাষা দেয়,একটি সংস্কৃতি দেয়,একটি জাতিসত্তা দেয় এবং অবশেষে একটি বিশ্বাসের কাঠামো দেয়।
অর্থাৎ-
মানুষ প্রথমে মানুষ হয়ে জন্মায়; পরে সে পরিচয়ের মানুষ হয়ে ওঠে।
এখানেই শুরু হয় এক বিস্ময়কর মানবিক বৈপরীত্য।
* একই পৃথিবী,একই শরীর-তবু এত আলাদা সত্য
ধর্ম ও রাজনীতির ক্ষেত্রে মানুষ প্রায়ই এমনভাবে কথা বলে যেন তার কাছে থাকা সত্যটি সম্পূর্ণ, চূড়ান্ত এবং প্রশ্নাতীত।
সে বলে-
“আমার বিশ্বাসই সত্য।”
অন্যজনও একই আত্মবিশ্বাসে বলে-
“না, আমার বিশ্বাসই সত্য।”
এই ভাবে ১৩৫ ফেরকার মুসলমানেরা বলে
৯০০ কোটির সবাই বলে
সবাই নিজের গল্পের নায়ক।
مِنَ الَّذِیۡنَ فَرَّقُوۡا دِیۡنَہُمۡ وَکَانُوۡا شِیَعًا ؕ کُلُّ حِزۡبٍۭ بِمَا لَدَیۡہِمۡ فَرِحُوۡنَ
[৩০:৩২] যারা নিজেদের জীবনব্যবস্থায় বিভেদ সৃষ্টি করেছে আর ধর্মীয় নানান দলে (মাজহাবে) ভাগ হয়ে গেছে, প্রত্যেক (মাজহাবের) ধর্মীয় দলই তো নিজেদের কাছে যা রয়েছে (ধর্মের বানোয়াট গ্রন্থ, ফলসফা, ফেকাহ ও হাদিস) তাই নিয়ে আনন্দ করছে।
وَاعۡتَصِمُوۡا بِحَبۡلِ اللّٰہِ جَمِیۡعًا وَّلَا تَفَرَّقُوۡا ۪ وَاذۡکُرُوۡا نِعۡمَتَ اللّٰہِ عَلَیۡکُمۡ اِذۡ کُنۡتُمۡ اَعۡدَآءً فَاَلَّفَ بَیۡنَ قُلُوۡبِکُمۡ فَاَصۡبَحۡتُمۡ بِنِعۡمَتِہٖۤ اِخۡوَانًا ۚ وَکُنۡتُمۡ عَلٰی شَفَا حُفۡرَۃٍ مِّنَ النَّارِ فَاَنۡقَذَکُمۡ مِّنۡہَا ؕ کَذٰلِکَ یُبَیِّنُ اللّٰہُ لَکُمۡ اٰیٰتِہٖ لَعَلَّکُمۡ تَہۡتَدُوۡنَ
[৩:১০৩] আর তোমরা সবাই আল্লহ্ তাআলার রজ্জু (কুরআনকে) একত্রে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরো, তোমরা ফেরকা‑ফেরকা হয়ে যেও না, তোমরা স্মরণ করো, আল্লহ্ যে নিয়ামত তোমাদেরকে দান করেছেন, যখন একে‑অন্যের দুশমন ছিলে, কিন্তু আল্লহ্ তোমাদের মনে আকর্ষণ সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আল্লহ্ তাআলার নিয়ামতের ফলে একে‑অন্যের ভাইরূপে গণ্য হয়েছ, অথচ তোমরা অগ্নিকুণ্ডের কিনারায় দাঁড়িয়েছিলে। আল্লহ্ তোমাদেরকে তা থেকে বাঁচিয়েছেন। আল্লহ্ এমনি করে বিস্তারিতভাবে নিজের সব আয়াতগুলো তোমাদের জন্য বুঝিয়ে দিচ্ছেন। যেন তোমরা হিদায়াতের পথে এগিয়ে যেতে পার।
اِنَّ الَّذِیۡنَ فَرَّقُوۡا دِیۡنَہُمۡ وَکَانُوۡا شِیَعًا لَّسۡتَ مِنۡہُمۡ فِیۡ شَیۡءٍ ؕ اِنَّمَۤا اَمۡرُہُمۡ اِلَی اللّٰہِ ثُمَّ یُنَبِّئُہُمۡ بِمَا کَانُوۡا یَفۡعَلُوۡنَ
[৬:১৫৯] নিশ্চয় যারা নিজেদের জীবনব্যবস্থা হিসেবে নানান মাজহাব আবিষ্কার করেছে, আর নানান মাজহাবে ভাগ হয়ে গেছে, তাদের ব্যাপারে তোমার কোনো দায়িত্ব নেই। তাদের কাজকর্ম আল্লহ্ তাআলার উপরেই ন্যস্ত রয়েছে। তাইতো আল্লহ্ তাদেরকে খবর দিবেন, যেসব কাজকর্ম তারা করেছে।
কিন্তু সবাই রবের দেওয়া
অক্সিজেন নেয়।
কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়ে।
হৃদয় রক্ত পাম্প করে।
ক্ষুধার্ত হয়।
তৃষ্ণার্ত হয়।
ব্যথা পায়।
ভালোবাসা চায়।
প্রত্যাখ্যাত হলে কষ্ট পায়।
শরীরে বয়স বাড়ে।
কোষ মৃত্যুবরণ করে।
দুজনেরই একদিন পৃথিবীর মাটিতে ফিরে যেতে হয়।
মানুষের শরীর যেন প্রকৃতির এক বিশাল ঘোষণা-
“তোমরা যতই আলাদা পরিচয় বানাও,জৈবিকভাবে তোমরা একই জীবনের সন্তান।”
مِنۡہَا خَلَقۡنٰکُمۡ وَفِیۡہَا نُعِیۡدُکُمۡ وَمِنۡہَا نُخۡرِجُکُمۡ تَارَۃً اُخۡرٰی
[২০:৫৫] এই মাটি দিয়ে তোমাদেরকে আমি সৃষ্টি করেছি। আর এতেই তোমাদেরকে আমি ফিরিয়ে আনব। আর এখান থেকেই আমি আবার তোমাদেরকে তুলবো।
* খাবারের টেবিলে মানুষ এতটা এক কেন?
একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষকে বসিয়ে দিন।
একজন আরব,একজন বাঙালি,একজন জাপানি, একজন আফ্রিকান,একজন ইউরোপীয়,একজন ভারতীয়, একজন আমেরিকান।
তাদের খাবারের স্বাদ আলাদা হতে পারে।
কেউ ভাত খাবে,কেউ রুটি,কেউ পাস্তা,কেউ নুডলস, কেউ মাছ,কেউ মাংস,কেউ সবজি।
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا کُلُوۡا مِنۡ طَیِّبٰتِ مَا رَزَقۡنٰکُمۡ وَاشۡکُرُوۡا لِلّٰہِ اِنۡ کُنۡتُمۡ اِیَّاہُ تَعۡبُدُوۡنَ
[২:১৭২] শোনো হে মুমিনগণ! আমি তোমাদের যে রুজি দান করেছি, তা থেকে পবিত্র জিনিস খাও, আল্লহ্ তাআলার শুকরিয়া আদায় করো, যদি তোমরা শুধু আল্লহ্ তাআলারই দাসত্ব করার দাবি রাখো।
কিন্তু খাবারের মৌলিক উদ্দেশ্য একই-
শরীরকে শক্তি দেওয়া।
কার্বোহাইড্রেট ভেঙে গ্লুকোজ হয়।
প্রোটিন ভেঙে অ্যামিনো অ্যাসিড হয়।
চর্বি ভেঙে ফ্যাটি অ্যাসিডে যায়।
কোষের mitochondria-তে শক্তি উৎপাদনের মৌলিক প্রক্রিয়া মানুষের মধ্যে ধর্ম দেখে বদলে যায় না।
একজন মুসলমানের কোষ বলে না-
“আমি মুসলমান, তাই আমার ATP আলাদা হবে।”
একজন হিন্দুর mitochondria বলে না-
“আমার শক্তি উৎপাদনের নিয়ম অন্য।”
প্রকৃতি এখানে আশ্চর্যরকম নিরপেক্ষ।
* যৌনতার ক্ষেত্রে পৃথিবী আরও বেশি এক
মানুষের যৌন আকাঙ্ক্ষা কোনো ধর্মীয় বই থেকে শেখা জৈবিক প্রয়োজন নয়।
এর পেছনে রয়েছে-
হরমোন, স্নায়ুতন্ত্র, মস্তিষ্কের reward circuitry, dopamine, oxytocin, testosterone, estrogen এবং evolutionary biology।
মানুষ প্রেমে পড়ে।
স্পর্শ চায়।
ঘনিষ্ঠতা চায়।
সঙ্গ চায়।
সন্তান জন্ম দেয়।
এগুলো মানবপ্রজাতির বিবর্তনের গভীরতম জৈবিক স্তরের অংশ।
পৃথিবীর পোশাকের ধরন হাজার রকম।
কিন্তু নগ্নতা ঢাকার সামাজিক প্রবণতা প্রায় সর্বত্রই দেখা যায়।
কেন?
কারণ সংস্কৃতি আলাদা হলেও মানুষ একই ধরনের শরীর নিয়ে জন্মেছে।
এখানে একটি গভীর সত্য লুকিয়ে আছে-
সংস্কৃতি আমাদের বাহ্যিক আচরণকে বদলায়; প্রকৃতি আমাদের মৌলিক প্রয়োজনগুলোকে এক করে রাখে।
* Give and Take-বিশ্বাসের বাইরে মানুষ আশ্চর্য বাস্তববাদী
দোকানে গিয়ে আপনি বলেন-
“এই জিনিসটির দাম কত?”
দোকানি আপনার ধর্ম জিজ্ঞেস করে না।
আপনি টাকা দেন,সে পণ্য দেয়।
ব্যাংকে টাকা রাখেন-ব্যাংক আপনার বিশ্বাসের দর্শন যাচাই করে না।
বিমান কিনতে গেলে প্রকৌশলী বলেন না-
“আপনার ধর্ম অনুযায়ী aerodynamics একটু পরিবর্তন হবে।”
আপনি হাসপাতালে গেলে surgeon আপনার বিশ্বাস অনুযায়ী আপনার রক্তের group পরিবর্তন করেন না।
বিজ্ঞান,প্রযুক্তি,অর্থনীতি,চিকিৎসা,পরিবহন-
সব জায়গায় মানুষ প্রমাণ, হিসাব, কার্যকারিতা এবং পারস্পরিক বিনিময়ের বাস্তব নিয়ম মেনে চলে।
কিন্তু আশ্চর্যভাবে যখন বিষয়টি আসে-
“আমার ঈশ্বর সম্পর্কে ধারণা কী?”
তখন একই মানুষ কখনো কখনো যুক্তি, প্রশ্ন এবং আত্মসমালোচনার দরজা বন্ধ করে দেয়।
কেন?
* এখানেই শুরু হয় মানুষের মনস্তত্ত্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অধ্যায়
মানুষ শুধু সত্য খোঁজে না।
মানুষ এমন সত্যও খোঁজে-
যেটি তার পরিচয়কে নিরাপদ রাখে।
মনোবিজ্ঞানে আমরা দেখি, মানুষের beliefs প্রায়ই তার identity-এর সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
তখন কোনো বিশ্বাসকে প্রশ্ন করা মানে শুধু একটি ধারণাকে প্রশ্ন করা থাকে না।
মানুষ মনে করতে পারে-
“তুমি আমার অস্তিত্বকে প্রশ্ন করছ।”
তখন যুক্তি আর যুক্তি থাকে না।
তা হয়ে যায় আত্মরক্ষার অস্ত্র।
* নিজের গল্পের নায়ক,অন্যের গল্পের ভিলেন-
এটি মানব মনস্তত্ত্বের এক গভীর সত্য।
একজন বিপ্লবীর কাছে সে মুক্তিদাতা।
একজন শাসকের কাছে সে রাষ্ট্রদ্রোহী।
একজন রাজনৈতিক দলের কাছে তাদের নেতা দেশপ্রেমিক।
অন্য দলের কাছে সেই একই ব্যক্তি স্বৈরাচারী।
একজনের কাছে ধর্মরক্ষা।
অন্যজনের কাছে ধর্মীয় উগ্রতা।
একজনের কাছে শহীদ।
অন্যজনের কাছে অপরাধী।
অর্থাৎ মানুষ প্রায়ই ঘটনাকে শুধু দেখে না-
নিজের গল্পের ভেতর থেকে দেখে।
George Herbert Mead-এর self এবং social identity সম্পর্কিত চিন্তাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়-মানুষের “আমি” আসলে সামাজিক সম্পর্কের মধ্যেই গড়ে ওঠে।
আর Nietzsche-এর বিখ্যাত ভাবনার একটি গভীর সারকথা হলো-
“There are no facts, only interpretations.”
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে বাস্তব সত্য বলে কিছু নেই; বরং মানুষ বাস্তবতাকে প্রায়ই নিজের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করে।
* তাহলে ধর্মীয় বিশ্বাস এত সংবেদনশীল কেন?
কারণ ধর্ম শুধু একটি proposition নয়।
অনেক মানুষের কাছে ধর্ম হলো-
পরিচয় + পরিবার + শৈশব + ভয় + আশা + মৃত্যু সম্পর্কে ধারণা + নৈতিকতা + সম্প্রদায় + অর্থপূর্ণতার অনুভূতি।
তাই কোনো বিশ্বাসকে আঘাত করলে মানুষ মনে করতে পারে তার বাবা-মা, পূর্বপুরুষ, সংস্কৃতি, জীবনদর্শন-সবকিছুকে আঘাত করা হচ্ছে।
* এখানে ধর্মের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে একটি জিনিস-
মানুষের পরিচয় রক্ষার প্রবৃত্তি।
মানুষ সত্যের জন্য লড়াই করে-এটি মহৎ।
কিন্তু আরও বিপজ্জনক হলো-
মানুষ যখন নিজের বিশ্বাসকে সত্য প্রমাণ করার জন্য সত্যকেই বদলে ফেলতে শুরু করে।
* Socrates-এর সবচেয়ে বড় শিক্ষা: “আমি জানি যে আমি কিছুই জানি না”
সক্রেটিসের দর্শনের শক্তি ছিল তার জ্ঞানের অহংকারে নয়, বরং নিজের অজ্ঞতাকে স্বীকার করার সাহসে।
এটি আসলে সভ্যতার সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক বিনয়।
কারণ যে মানুষ বলে-
“আমি ভুল হতে পারি”
সে সত্যের দরজা খোলা রাখে।
আর যে বলে-
“আমি নিশ্চিত; আমার ভুল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই”
সে নিজের চারপাশে একটি অদৃশ্য কারাগার তৈরি করে।
* Einstein-এর বিস্ময় এবং মানবিক বিনয়
Albert Einstein-এর চিন্তায় বারবার ফিরে আসে মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি।
মহাবিশ্ব যত বড়, মানুষের জানা তত সামান্য।
আমরা যে মহাবিশ্বে বাস করি,তার অধিকাংশই এখনও আমাদের কাছে রহস্য-dark matter, dark energy, consciousness-এর প্রকৃতি, quantum reality-কত কিছুই আমরা পুরোপুরি বুঝি না।
তাহলে একজন মানুষ কীভাবে কয়েকটি গ্রন্থ, কয়েকটি ব্যাখ্যা কিংবা কয়েকজন মানুষের বক্তব্যের ভিত্তিতে মহাবিশ্বের সমস্ত রহস্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চয়তার দাবি করতে পারে?
এখানেই প্রয়োজন epistemic humility-জ্ঞানের প্রতি বিনয়।
* Rumi-এর দরজায় দাঁড়ালে বিভাজন ছোট হয়ে যায়
রুমির দর্শনের একটি গভীর সৌন্দর্য হলো-
মানুষ বাহ্যিক পরিচয়ের ওপরে উঠে অন্তরের ঐক্য খুঁজতে পারে।
তিনি লিখেছিলেন-
“The lamps are different, but the Light is the same.”
প্রদীপ আলাদা হতে পারে।
আলোকে ধারণ করার পাত্র আলাদা হতে পারে।
কিন্তু আলোকে যদি সত্যিই আলো হিসেবে দেখা যায়, তখন পাত্র নিয়ে যুদ্ধ করার অর্থ কমে যায়।
এই উপমাটি ধর্মীয় মতবাদ প্রমাণ করার জন্য নয়-
মানুষের বৈচিত্র্যের মধ্যে মৌলিক মানবিক ঐক্য বোঝার জন্য।
একটি হাসপাতালের ICU-তে ধর্মের অহংকার কোথায় যায়?
ভাবুন-
* একটি ICU-তে পাঁচজন মানুষ শুয়ে আছে।
তাদের পাঁচটি দেশের নাগরিকত্ব।
পাঁচটি সংস্কৃতি।
হয়তো পাঁচটি ধর্মীয় পরিচয়।
কিন্তু monitor-এ দেখা যাচ্ছে-
heart rate
oxygen saturation
blood pressure
respiratory rate
কোনোটিই ধর্মের ভাষায় লেখা নেই।
অক্সিজেন কমে গেলে শরীর দুর্বল হবে।
রক্তচাপ পড়ে গেলে মস্তিষ্ক বিপদে পড়বে।
হৃদপিণ্ড থেমে গেলে পরিচয়ের পতাকা কোনো কাজে আসবে না।
মৃত্যুর সামনে মানুষ হঠাৎ বুঝতে পারে-
* আমাদের সবচেয়ে গভীর পরিচয়গুলো হয়তো আমরা নিজেরাই বানিয়েছি; কিন্তু আমাদের সবচেয়ে মৌলিক পরিচয়টি হলো-আমরা জীবিত প্রাণী।
তাহলে কি ধর্ম অজ্ঞতা?
এখানে আমাদের খুব সতর্ক হতে হবে।
ধর্মবিশ্বাস নিজে অজ্ঞতার প্রমাণ নয়।
কারণ একজন মানুষ কোনো বিশ্বাসকে গভীর দর্শন, নৈতিকতা, অস্তিত্বের প্রশ্ন এবং ব্যক্তিগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে গ্রহণ করতে পারেন।
সমস্যা ধর্মে নয়।
সমস্যা শুরু হয় যখন-
বিশ্বাস প্রশ্নকে নিষিদ্ধ করে।
যখন-
বিশ্বাস প্রমাণের বিকল্প হয়ে যায়।
>যখন-
নিজের অজ্ঞতাকে ঈশ্বরের নিশ্চিত জ্ঞান বলে ঘোষণা করা হয়।
> যখন-
নিজের ব্যাখ্যাকে ঈশ্বরের বক্তব্যের সমান করে ফেলা হয়। এবং সবচেয়ে ভয়ংকর অবস্থাটি তখন-
* যখন মানুষ ঈশ্বরকে রক্ষা করার নামে মানুষকে আঘাত করতে শুরু করে।
যদি কোনো সর্বশক্তিমান সত্য সত্যিই সত্য হয়, তবে তাকে মানুষের ক্রোধ,অস্ত্র,গালি কিংবা হত্যার মাধ্যমে রক্ষা করার প্রয়োজন কেন হবে?
অজ্ঞতার সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ হলো নিজের অজ্ঞতা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা
এটাই হয়তো আপনার প্রশ্নের সবচেয়ে গভীর উত্তর।
অজ্ঞতা মানে শুধু কিছু না জানা নয়।
* অজ্ঞতার গভীরতম রূপ হলো-আমি জানি না,সেটিও না জানা।
একজন জ্ঞানী মানুষ বলতে পারে-
“আমি জানি।”
আরও জ্ঞানী মানুষ বলতে পারে-
“আমি জানি না।”
কিন্তু প্রজ্ঞাবান মানুষ বলতে পারে-
* “আমি যা জানি বলে মনে করছি, তার কোন অংশ সত্য এবং কোন অংশ আমার ব্যাখ্যা-আমি সেটিও পরীক্ষা করব।”
* মানুষের সবচেয়ে বড় বিপদ বিশ্বাস নয়-বিশ্বাসের সঙ্গে অহংকারের সংযোগ
বিশ্বাস মানুষকে শান্ত করতে পারে।
বিশ্বাস মানুষকে নৈতিক হতে শেখাতে পারে।
বিশ্বাস মানুষকে আশা দিতে পারে।
বিশ্বাস মানুষকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস দিতে পারে।
কিন্তু বিশ্বাস যখন অহংকারের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা বলে-
“আমার সত্যই একমাত্র সত্য।”
আর তখন একই বিশ্বাস-
মানুষকে বিভক্ত করতে পারে,
ঘৃণা জন্মাতে পারে,
সহিংসতা বৈধ করতে পারে,
প্রশ্নকে অপরাধ বানাতে পারে।
তখন বিশ্বাস আর আত্মার আশ্রয় থাকে না-
পরিচয়ের দুর্গ হয়ে ওঠে।
শেষ প্রশ্নটি তাই ঈশ্বরকে নয়-নিজেকেই করা দরকার
আমি যে ধর্মে জন্মেছি, সেটি কি আমি সত্য অনুসন্ধান করে গ্রহণ করেছি?
নাকি জন্মের সঙ্গে পাওয়া পরিচয়কে সত্য বলে ধরে নিয়েছি?
আমি যে রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করি, তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত কি সত্যিই ন্যায়সঙ্গত?
নাকি আমার দল করেছে বলেই আমি সেটিকে ন্যায্য মনে করি?
আমি কি সত্যকে ভালোবাসি?
নাকি আমার পছন্দের সত্যকে ভালোবাসি?
আমি কি ঈশ্বরকে খুঁজি?
নাকি ঈশ্বর সম্পর্কে আমার নিজের ধারণাকেই ঈশ্বর বানিয়ে ফেলেছি?
হয়তো সভ্যতার পরবর্তী ধাপ হবে-বিশ্বাস থেকে বিনয়ের দিকে যাত্রা
আমাদের হয়তো ধর্মহীন পৃথিবী দরকার নেই।
আমাদের দরকার
অহংকারহীন বিশ্বাস।
আমাদের রাজনীতিহীন পৃথিবী হয়তো সম্ভব নয়।
আমাদের দরকার-
অন্ধ আনুগত্যহীন রাজনীতি।
আমাদের বিশ্বাস থাকতে পারে।
কিন্তু প্রশ্নও থাকতে হবে।
আমাদের conviction থাকতে পারে।
কিন্তু humility-ও থাকতে হবে।
আমরা বলতে পারি-
“আমি সত্যকে অনুসরণ করি।”
কিন্তু আরও সুন্দর হবে যদি বলতে পারি-
“আমি সত্যকে এত ভালোবাসি যে, আমার বিশ্বাস ভুল প্রমাণিত হলেও আমি সত্যের পক্ষেই থাকব।”
কারণ সত্যের প্রতি সবচেয়ে বড় ভালোবাসা হলো-
নিজের ভুল হওয়ার সম্ভাবনাকে স্বীকার করার সাহস।
শেষ দৃশ্য
একদিন পৃথিবীর সব মানুষকে যদি কোনো বিশাল টেবিলে বসানো যায়-
সেখানে কেউ ভাত খাবে,কেউ রুটি,কেউ স্যুপ,কেউ নুডলস।
কারও পোশাক সাদা, কারও কালো, কারও লম্বা, কারও ছোট।
কারও প্রার্থনার ভাষা আলাদা, কারও দর্শন আলাদা।
কিন্তু সবার শরীর ক্ষুধা চিনবে।
সবার চোখে জল লবণাক্ত হবে।
সবার হৃদয় ভালোবাসায় নরম হবে।
সবার শরীর একদিন ক্লান্ত হবে।
সবার কোষ একদিন থেমে যাবে।
এবং শেষ পর্যন্ত-
পৃথিবী কাউকে জিজ্ঞেস করবে না, “তুমি কোন পরিচয়ের ছিলে?”
প্রকৃতি শুধু তার পুরোনো নিয়মে বলবে-
“তুমি ছিলে জীবনের একটি ক্ষণস্থায়ী প্রকাশ।”
তাই হয়তো মানুষের সবচেয়ে বড় জ্ঞান কোনো নির্দিষ্ট পরিচয়কে বড় করা নয়।
বরং এতটুকু উপলব্ধি করা-
“আমি যে মানুষটিকে অন্য মনে করে ঘৃণা করছি, তার শরীরের ভেতরেও একই ক্ষুধা, একই রক্ত, একই ভয়, একই ভালোবাসা এবং একই মৃত্যুর অপেক্ষা।”
আর সম্ভবত সেই মুহূর্তেই-
ধর্মের দেয়াল ভাঙতে হয় না;
শুধু মানুষটির ভেতরের মানুষটিকে দেখতে হয়।
সেখানেই দর্শন বিজ্ঞানের সঙ্গে হাত মেলায়।
সেখানেই বিশ্বাস বিনয়ের কাছে মাথা নোয়ায়।
আর সেখানেই মানুষ প্রথমবার সত্যিকার অর্থে-
মানুষ হয়ে ওঠে।