27/09/2025
দুর্গাপূজা মহাপূজা
বাঙালি হিন্দুর সবর্বৃহৎ পূজা বা উৎসব হল দুর্গাপূজা। কিন্তু মহাপূজা কেন বলা হয়? "মহা" শব্দটি আছে মহান বা বৃহৎ অর্থে।
"শারদীয়া মহাপূজা চতুঃকর্মময়ী শুভা।"
অর্থাৎ শারদীয়া মহাপূজায় চারটা কাজ মূল থাকবে।
চারদিনের কাজের বর্ণনা লিঙ্গপুরাণ ও দেবীপুরাণে বলা হচ্ছে।
"চতুঃকর্মময়ীত্যনেন চতুরবয়বত্বেনাভিধানাৎ স্নপনপূজনবলিদানহোমরূপা।"
অর্থাৎ চার কাজ হল স্নান, পূজা, বলিদান ও হোম।
এবং বলা যেতে পারে যে, যে দেবতা একই সাথে ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষফল প্রদান করেন সে দেবতার পূজাকে মহাপূজা বলে।
এই যে মহাপূজার চার কাজ, সপ্তমীতে স্নানই মূল, অষ্টমীতে মহাপূজা, নবমীতে বলিদান এবং হোমই মূল কাজ হয়। দশমীতে কেবল বিসর্জনের কাজ হয়।
#মহাষ্টমী ও মহানবমী
"আশ্বিনয্য তু শুরুয্য, ভবে যা অষ্টমী তিথিঃ। মহাষ্টমীতি সা প্রোক্তা দেব্যাঃ প্রীতিকরী পরাঃ।।
ততেংনু নবমী যা স্যাৎ সা মহানবমী স্মৃতা।
সা তিথিঃ সর্বলোকানাং পূজনীয়া শিবপ্রিয়া।"
(কালিকাপুরাণ ৬০/২,৩)
'অর্থাৎ আশ্বিন মাসের যে শুক্লপক্ষীয় অষ্টমী তিথি, তাহা দেবীর অতিশয় প্রীতি-করী 'মহা অষ্টমী' নামে বিখ্যাত।
তৎপরবর্তী মহানবমী বলে, সেই তিথি শিবপ্রিয় এবং সর্বলোক-পূজনীয়।'
মহাপূজা শব্দটি মার্কণ্ডেয় পুরাণে রাজা সুরথ, মহাভাগবদে রাম ও ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে কৃষ্ণের দ্বারা দেবীর পূজার আদি উল্লেখ আছে। এবং ষষ্ঠীতে বোধনের পূজা করলেও তা হবে কেবল বিল্ববৃক্ষে। মৃণ্ময়ী প্রতিমায় মূল পূজা হয় সপ্তমী থেকে দশমী অবধি।
'মহা' শব্দটি প্রসঙ্গে স্মার্ত পণ্ডিত রঘুনন্দন বলেছেন
"মহাবিপত্তারকত্বাদ্ গীয়তেঽসৌ মহাষ্টমী।
মহাসম্পাদ্দায়কত্বাৎ সা মহানবমী মতা।।"
অর্থাৎ মহাশক্তি দুর্গার আবির্ভাবে মহাবিপদ কেটে গেলো বলে অষ্টমী তিথির নাম হলো মহাষ্টমী এবং মহাসম্পদ লাভ হলো বলে নবমী তিথি হলো মহানবমী।
তিনি একথাও উল্লেখ করছেন যে, কৃষ্ণানবমী, প্রতিপদ, ষষ্ঠী, সপ্তমী, মহাষ্টমী, কেবল মহাষ্টমী, মহানবমী নিয়ে দুর্গাপূজায় মোট সাতটি কল্প থাকে। তিনি এখানেও অষ্টমী কিংবা নবমী বাদে অন্যদিনগুলিকে 'মহা' বলে উল্লেখ করেন নাই।
কিন্তু আমাদের খাজনার থেকে বাজনা বেশি।
মহাপূজার নামে মহাব্যয় আর মহা গোলযোগের বিষয়টাও স্পষ্ট ভাবে ফুটে উঠেছে। অনেক পূজার নিমন্ত্রণ পত্রে দেখলাম পূজার দিনগুলি শুরু হয়েছে মহাপঞ্চমী, মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী, মহানবমী, বিজয়া দশমী। কিন্তু এত মহা কেন? এই মহা কোত্থেকে থেকে পেলো? মহাপূজা বলা হচ্ছে তাই? নাকি ব্যবসায়ী-বা রাজনীতিবিদরা তাদের মহাব্যয়ের হিসাব দিয়ে দিলেন?
আপনার মত ভিন্ন হলেও হতে পারে, কিন্তু সম্প্রতিকালে লক্ষ্মীদেবী যে কিছুটা বাঙ্গালীর হস্তগত হয়েছেন তা বাংলদেশ ও পশ্চিমবাংলার লক্ষ লক্ষ টাকার ব্যয়বহুল পূজার প্যান্ডেল দেখলেই বুঝা যায়। আর এই ফাঁকে জ্ঞান-প্রজ্ঞা হিসেবে সরস্বতীদেবী যে সম্পূর্ণ ত্যাগ করেছেন তা কেউ লক্ষ্যই করেন নাই।
কিন্তু মূল জিনিসটা জায়গা থেকে সড়ে গেলে কি হবে? এমন চলতে থাকলে দুর্গাপূজার জায়গায় অন্য কিছু দাঁড় হবে।
একটা রূঢ় সত্য কথা কি জানেন?
এভাবে বাহিরের চাকচিক্য দিয়ে আর কত ভুলে থাকবেন? ভিতরটা যে ফাপা হয়ে গেছে খেয়াল আছে? দুর্গার ব্যাপারে কতটা জানেন?
পুতুল খেলার মতো লাগে এখন! দিন দিন হিন্দুর সংখ্যা কমছে আর পূজামন্ডপের সংখ্যা বাড়ছেই। কিন্তু সাময়িক খুশি দিয়ে সরকারও আপনাকে ভুলিয়ে রাখছে আপনিও ভুলে থাকছেন, এভাবে আর কত? তর্করত্ন, ন্যায়রত্ন উপাধিপ্রাপ্ত পণ্ডিতের ছেলেও আজ দেব নিন্দাকারী হয়েছে খেয়াল আছে?
আপনি হিন্দু নন, হিন্দু বলে দাবি করা বঙ্গবাসী মাত্র। কেন এক্কেবারে সরাসরি হিন্দু বলছি না জানেন?
কারণ এটাই যে, হিন্দু বলতে তাদেরই বুঝায় যারা আর্য অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ, যারা উৎকৃষ্ট মানব, যারা জ্ঞানী।
এই যে হিন্দু দাবি করা করা লোকজন তাদের ক'জনের সামান্যটুকু ধর্মজ্ঞান আছে? থাকলে তাদের পূজার অবস্থা এমন হতো বলে তো আমার মনে হয় না। দুর্গাপূজায় প্রতিমার যে শ্রী হয়েছে এটা এখানে না বলাই শ্রেয়; শ্রী বলাটা ঠিক হবে না ওটা ছিরি। আর পূজার কোন তিথিতে কোন কাজ গুরুত্বপূর্ণ সেটাইবা কেন জানবে! আরতির নামে হচ্ছে অপ্সরার নৃত্য। শ্রীশ্রীচণ্ডীপাঠের বদলে হচ্ছে গীতাপাঠা।
যেখানে পূজা হয় সেখানে স্থায়ী মন্দির, স্থায়ী শাস্ত্রীয় পুস্তকের পাঠাগার, আর মহাষ্টমীতে সর্বসাধারণের ভোজন আর উচিৎ দানের ব্যবস্থায় রেকর্ড করলে হয়তো পূজার মূল নিয়মটাও রক্ষা পেতো আর নামটাও বজায় থাকতো। এই সব অতিরিক্ত দিবস বাড়িয়ে আমোদ-প্রমাদপূর্ণ উৎসব-আনন্দের জন্য বাড়তি পয়সা খরচের মধ্যে নিজের অহমিকার প্রকাশ করাটা পূজার পূণ্যের (শক্তির) স্থলে পাপবৃদ্ধি করছি এই কথা ছাড়া আর কিছু বলার রাখে না। তবে, সকলেরই ধর্মে মতি হোক এই প্রার্থণা করছি।
যাই হোক আমোদ-প্রমোদ বাঙালি হিন্দুর যথেষ্ঠ প্রবৃত্তি হয়েছে, তবে আলস্য যৎপরিমাণ হলেও গায়ে বাসা বেঁধেছে; তাতে মনে হয় না তারা তাদের মস্তিষ্ক ব্যয় করে এতদূর পড়েছেন, যদি পড়ে থাকেন তাহলে এটুকুই বলব আপনি হিন্দু, আপনি আর্য, বৈদিক, আপনি সনাতনী, আপনি জ্ঞানী, এবং জ্ঞানীর পরিচয় দিয়েছেন।
১০ আশ্বিন, ১৪৩২