08/03/2023
গীবত একটি "কবীরা গুনাহ"।আমরা অন্যান্য বিষয়ে সচেতন হলেও এই বিষয়ে তেমন সচেতন না বা দৈনন্দিন জীবনে এটাকে এড়াতে পারি না।অনেক প্র্যাকটিসিং মুসলিমও অন্য সব হালাল হারাম মানতে পারলেও এখানে এসে হেরে যায়।সমাজে অন্য গুনাহকে খারাপ চোখে দেখা হলেও এটাকে তেমন কিছু মনে করা হয় না আর এটা আমাদের অভ্যাস হওয়াতে এটাকে তেমন গুরুত্বও দেওয়া হয় না।আবার অনেকে গীবতের বিষয়ে তেমন জানেও না।তাই সব মিলিয়ে আমার নিজের জন্য রিমাইন্ডার হিসেবে ও অন্যদের জানানোর উদ্দেশ্যে আমার এই লেখা।আমি আবদুল্লাহ আল মাসুদ উস্তাযের একটা লেকচার থেকেই মূলত এই লেখাটা লিখছি।
পরিচয়:ইমাম রাগিব আল ইস্পাহানী গীবতের পরিচয়ে বলেন:অন্যের "আড়ালে" "অপ্রয়োজনে" তার "দোষত্রুটি" বর্ণনা করা।
ইমাম নববী আল আযগার কিতাবে গীবতের বিষয়ে বলেন,গীবত হলো কোনো মানুষের অপছন্দনীয় বিষয় অন্যের সামনে উল্লেখ করা।সেটা শারীরিক বিষয়ে হতে পারে যে অমুক খাটো,কালো,কানা,ল্যাংরা। অর্থাৎ উপহাসের নিয়তে অন্যের শারীরিক ত্রূটি বর্ণনা করা।
দীনদারিতার ক্ষেত্রে হতে পারে-সে তো গাফেল,ফাসিক। পবিত্রতা নিয়ে তেমন সচেতন না..
চারিত্রিক ত্রূটি,কারো জামা কাপড়,চাল চলন,আচার আচরণ,পেশা নিয়ে কাউকে তাচ্ছিল্য করা এসবই গীবতের অন্তর্ভুক্ত।এখানে মূলনীতি হলো ❝কারো আড়ালে তার ব্যাপারে এমন কিছু উল্লেখ করা যা তার অপছন্দনীয়❞।এখন এই গীবত বিভিন্নভাবে হতে পারে।
১.মুখে উচ্চারণ।কথা বলার মাধ্যমে যে গীবত হয় এটা অনেকেই জানেন
২.লেখার মাধ্যমে। ইনবক্সে চ্যাটিং এর মাধ্যমে হতে পারে, পোস্ট করার মাধ্যমে হতে পারে।
৩.ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ সরাসরি নাম উল্লেখ না করে কিন্তু বুঝা যায় কাকে বলা হচ্ছে বা কার দোষ বর্ণনা করা হচ্ছে।দীনি কমিউনিটিতে এটা বেশি দেখা যায়। অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে খোঁচা দিয়ে এমনভাবে পোস্ট দেয় যে বুঝা যায় কাকে ইঙ্গিত করে কথা বলছে, কিন্তু সরাসরি নাম উল্লেখ করে বলছে না।এমন পোস্ট দিলে যদি তাকে বলা হয় যে এটা তো গীবত হলো।তখন সে বলে যে সে তো নাম উল্লেখ করে নাই,তাই এখানে গীবত হবে না। কিন্তু এখানে স্পষ্ট থাকে যে কাকে উদ্দেশ্য করে তার দোষ বর্ণনা করা হচ্ছে।
৪.ইশারার মাধ্যমে। অর্থাৎ মুখে উচ্চারণ করে না কিন্তু চোখ দিয়ে ইশারা করে,হাত দিয়ে ,মাথা দিয়ে ইশারা করে অন্যের দোষের দিকে ইঙ্গিত করা হয়।কিংবা তার কিছু বৈশিষ্ট্য নিজেরা অনুকরণ করে ব্যঙ্গ করা হয়।
অর্থাৎ,যে ওয়েতেই হোক না কেন অন্যের আড়ালে তার দোষ বর্ণনা,তাকে তাচ্ছিল্য করা,ব্যঙ্গ করা কিংবা অপ্রয়োজনে এমন সব কথা বলা যা তার অপছন্দনীয় হবে সবই গীবতের মধ্যে পড়ে।আবু হুরায়রা রা থেকে বর্ণিত,রসুলুল্লাহ ﷺ বলেন,“তোমরা কি জান ‘গীবত’ কী? তাঁরা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জ্ঞাত। তিনি বললেন, তোমার ভাই যে কথা অপছন্দ করে তার সম্পর্কে সে কথা বলার নাম গীবত। জিজ্ঞেস করা হলো, আমি যা বলছি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে বিদ্যমান থাকে তবেই তুমি তার ‘গীবত’ করলে। আর যদি না থাকে তাহলে তুমি তাকে অপবাদ দিলে”।(মুসলিম)
ভয়াবহতা:মিরাজের রাতে নবিজি ﷺ একদল জাহান্নামীকে দেখলেন যাদের নখগুলো তামার তৈরি এবং তা দিয়ে তারা নিজেদের শরীরে আঘাত করছে।তাদের অপরাধ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে ফেরেশতারা বললেন যে তারা দুনিয়াতে অন্যের মাংস খেত অর্থাৎ গীবত করতো।
ইয়াহইয়া (রহঃ) ... ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেনঃ নিশ্চয়ই এ দু’জন কবরবাসীকে আযাব দেওয়া হচ্ছে। তবে বড় কোন গুনাহের কারণে কবরে তাদের আযাব দেয়া হচ্ছে না। এই কবরবাসী পেশাব করার সময় সতর ঢাকতোনা। আর ঐ কবরবাসী গীবত (পরনিন্দা) করে বেড়াত....।(সহীহ বুখারি)
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনোভাবে তার ভাইয়ের সঙ্গে অন্যায় আচরণ বা অবিচার করে ফেলেছে, সে যেন তার থেকে পৃথিবীর জীবনেই মাফ চেয়ে দায়মুক্ত হয়ে নেয়। কেননা হাশরের মাঠে দিনার-দিরহাম কোনো কাজে আসবে না। সেদিন তার দায় শোধ করা হবে নেক আমলের মাধ্যমে। যদি কারও ওপর অন্যায় আচরণ করে থাকে, তবে দায় শোধের জন্য সে পরিমাণ নেক আমল তার থেকে নিয়ে নেওয়া হবে। যদি কোনো নেক আমল না থাকে, তবে পাওনাদার ব্যক্তির পাপ থেকে নিয়ে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।’ (বুখারি : ৬৫৩৪)
গীবতের মাধ্যমে অন্যের ওপর জুলুমই করা হয়,তার সম্ভ্রমের ওপর আঘাত হানা হয়।তাই এই বিষয়ে দুনিয়াতেই আপোস মীমাংসা করে নেওয়া উচিত।
আজকে প্রথম পর্বে গীবতের পরিচয়,এর বিভিন্ন সুরত এবং ভয়াবহতা আলোচনা করা হলো।পরের পর্বে ইনশা'আল্লাহ কোথাও গীবত হলে কী করণীয়,নিজের দ্বারা গীবত হলে কী করণীয় ,এ থেকে বেঁচে থাকার উপায় আর কিছু জায়েজ গীবত নিয়ে ইনশা'আল্লাহ লিখবো।
ওয়া মা তাওফিকি ইল্লা বিল্লাহ