17/09/2025
মুসলিমরা স্বতন্ত্র জাতি এবং তাদের নিজস্ব শাসনব্যবস্থা (ইসলামী শাসন) প্রয়োজন, একথাটা ইসলামের চিরাচরিত অবস্থান। ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের আগ্রাসনের আগ পর্যন্ত প্রায় ১২ শ’ বছর ধরে এটাই ছিল মুসলিমদের ডিফল্ট রাজনৈতিক সেটিং। এটা উনবিংশ বা বিংশ শতাব্দীতে হঠাৎ আবিষ্কার করা কোন অবস্থান না।
আর যদি উপনিবেশ আমলের উপমহাদেশের কথাও বলা হয়, তাহলেও মুসলিমদের নিজস্ব পলিটি গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষার শেকড় জিন্নাহর কাছে তো না-ই, মুসলিম লীগের কাছেও পাওয়া যাবে না।
সেই শেকড় খুজতে যেতে হবে দিল্লীর মাদ্রাসা রাহিমিয়্যাতে, যেখান থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল শাহ ওয়ালিউল্লাহ এবং শাহ আব্দুলআযীয দেহেলভীর ঐতিহাসিক দাওয়াহ।
এখানেই ইমাম সাইয়্যিদ আহমাদ শহীদের নেতৃত্বে, শাহ মুহাম্মাদ ইসমাইল শহীদের কলম ও তলোয়ারের ভিত্তিতে শুরু হয়েছিল তরীকায়ে মুহাম্মাদিয়া আন্দোলন। আল্লাহ তাঁদের সকলকে রহমতের চাঁদরে জড়িয়ে রাখুন।
উপমহাদেশের আহলে হাদীস, দেওবন্দী, এবং আরও বেশ কিছু দ্বীনি ধারার শেকড়ের মতো ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের পর স্বতন্ত্র ইসলামী রাজনৈতিক প্রজেক্ট নিয়ে চিন্তার শেকড়ও এখানেই।
তরীকায়ে মুহাম্মাদিয়া আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা। ইলায়ে কালেমায়ে রাব্বুল আলামীন, ইহয়া এ সুন্নাতে সাইয়্যিদুল মুরসালিন (ﷺ) - ছিল এ আন্দোলনের স্লোগান।
সাইয়্যিদ আহমাদ শহীদ বুঝতে পেরেছিলেন, মুসলিমের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে, সম্মান ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে হলে, ইসলামী হুকুমাত প্রয়োজন। আর সেই চিন্তা থেকেই বারাসাত, বালাকোট, সাদিকপুর, শামেলি, সিত্তানা।
ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার এই চিন্তা প্রভাবিত করেছিল ‘স্যার’ সৈয়দ আহমাদ খানকেও। সৈয়দ আহমাদের ওপর শাহ ইসমাইল শহীদ রাহিমাহুল্লাহর লেখনীর প্রভাবের বিষয়টা সুপ্রতিষ্ঠিত।
তবে ইসলামী শাসনের ধারণাটা তার চিন্তায় বিকৃত হয়ে পরিণত হয় ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদ’ নামের অক্সিমোরনে। সৈয়দ আহমাদের কাছ থেকে আলীগড়ীদের মাধ্যমে এই ধারণা আসলো মুসলিম লীগে। সেখান থেকে জিন্নাহর কাছে।
তরীকায়ে মুহাম্মাদিয়া বলেছিল মুসলিমদের জন্য ইসলামী শাসনের কথা। মুসলিম লীগ বললো, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সেক্যুলার-লিবারেল রাষ্ট্রের কথা। বিশুদ্ধ ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তার বিকৃত, ভেজাল মিশ্রিত স্থুল সংস্করণ হল ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদ’।
কাজেই উপমহাদেশে, কিংবা পৃথিবীর অন্য যেকোন প্রান্তে মুসলিমদের রাজনৈতিক অপশান কংগ্রেসী আর মুসলিম লীগের ডাইকোটমির মধ্যে সীমাবদ্ধ না। বরং আমাদের মূল অবস্থান বরাবরই এক ছিল এবং থাকবে।
মুসলিমরা মানবজাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ জাতি, এবং আমরা শরীয়াহ মানতে ও প্রতিষ্ঠা করতে আদিষ্ট। ইসলামী হুকুমাতের অধীনে শরীয়াহর শর্ত মেনে আহলুযযিম্মাহ অবস্থান করতে পারবে, যেরকম শত শত বছর ধরে তারা থেকেছে।
এই ব্যবস্থা আধুনিক রাষ্ট্রের মতো ‘সাম্য’ আর ‘স্বাধীনতা’র মিথ্যা বুলি ফেরি করবে না। তবে মহান আল্লাহর নির্দেশিত পথে আদল ও ইনসাফ কায়েম করবে।
ইসলামের চিরন্তন ও সর্বজনীন চিন্তাকে ইউরোপ থেকে চোখ বুজে গ্রহণ করা মানবরচিত ক্ষণস্থায়ী আদর্শের সাথে মেশানোর দাম আজ ৭৫ বছর ধরে উপমহাদেশের মুসলিমদের দিতে হচ্ছে। একেক অঞ্চলে একেকভাবে।
আরও ৭৫ বছর এই ঘানি টানতে না চাইলে - গেরুয়াবাদী, আইএসআই-ফৌজী কিংবা বাঙ্গালিয়ানার জোতদারদের গোলামী থেকে মুক্ত হতে হলে ইমান-কুফরের মিক্সচারের আদর্শ থেকে বের হয়ে আমাদের মূলে ফিরে যেতে হবে। যুগে যুগে এভাবেই পতনের পর উম্মাহর পুনঃজাগরণ হয়েছে।
-Asif Adnan