25/05/2026
বাংলাদেশে আরাফাহ’র রোজা কবে রাখবেন?
জিলহজ মাস এলেই আমাদের মাঝে একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরেফিরে আসে—
"আমরা আরাফাহ’র রোজা কবে রাখবো? সৌদির হজ্জের দিন নাকি বাংলাদেশের ৯ জিলহজে?"
অনেকেই না বুঝে বিভ্রান্তিতে পড়েন। আসুন, কুরআন, হাদিস এবং বিশ্বখ্যাত আলেম ও ফতোয়া বোর্ডের সিদ্ধান্তের আলোকে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে জেনে নিই।
১. ‘ইয়াওমে আরাফাহ’ আসলে কী? একটি স্থান নাকি একটি নির্দিষ্ট তারিখ? ইসলামি পরিভাষায় জিলহজ মাসের প্রতিটি দিনের আলাদা নাম আছে। যেমন—
৮ জিলহজকে বলা হয়! ‘ইয়াওমুত তারবিয়াহ’,
৯ জিলহজকে বলা হয় ‘ইয়াওমে আরাফাহ’,
১০ জিলহজকে বলা হয় ‘ইয়াওমুন নাহার’ (কোরবানির দিন)
হাদিসের পরিভাষায় ‘ইয়াওমে আরাফাহ’ বলতে নির্দিষ্ট কোনো স্থানকে নয়, বরং জিলহজ মাসের ৯ তারিখকেই বোঝানো হয়েছে। যেভাবে আমরা নিজ নিজ দেশের চাঁদের তারিখ অনুযায়ী ১০ জিলহজে কোরবানি ও ঈদ পালন করি, ঠিক একইভাবে তার আগের দিন অর্থাৎ ৯ জিলহজে আরাফাহ’র রোজা রাখা আমাদের দায়িত্ব।
২. হাদিসের স্পষ্ট নির্দেশনা ও দলিল! চাঁদ দেখার ওপর আমল:
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
"তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে রোজা ভঙ্গ (ঈদ) করো।"
(সহিহ বুখারী ও মুসলিম)
এই নিয়মটি রমজানের মতো জিলহজ মাসের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা (রা.) থেকে বর্ণিত:
"রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) চারটি আমল কখনো ছাড়তেন না:
🔹 আশুরার রোজা,
🔹জিলহজের প্রথম ৯ দিনের রোজা,
🔹 প্রত্যেক মাসের তিনটি রোজা,
🔹 এবং ফজরের আগের দুই রাকাত সুন্নত।"
সুনানে নাসায়ী, হাদিস: ২৪১৬; মুসনাদে আহমাদ
এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে রাসুলুল্লাহ (সা.) জিলহজের ৯ তারিখ হিসেবেই রোজা রাখতেন, কারণ মক্কার বাইরে থাকা সাহাবিদের কাছে সেই যুগে তাৎক্ষণিকভাবে মক্কায় কবে হজ্জ হচ্ছে সেই খবর পৌঁছানোর কোনো প্রযুক্তিগত মাধ্যম ছিল না।
- আরাফাহ’র রোজার ফজিলত:
আবু কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আরাফাহ’র দিনের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন:
"আমি আল্লাহর কাছে আশা রাখি, এটি তার পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা (ক্ষমা) হিসেবে গণ্য হবে।"-সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২
৩. যুক্তির আলোকে বিষয়টি বুঝুন (সময় ও ভৌগোলিক ব্যবধান)
হাজী সাহেবদের আরাফাহ’র ময়দানে অবস্থান (ওকুফে আরাফাহ) শুরু হয় ৯ জিলহজ জোহরের ওয়াক্ত থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। আপনি যদি সৌদি আরবের সাথে মিলিয়ে বাংলাদেশে রোজা রাখেন (যা বাংলাদেশের ৮ জিলহজ), তবে বাংলাদেশে যখন ইফতারের সময় হবে, সৌদিতে তখন কেবল হাজিদের আরাফাহর মাঠে অবস্থান শুরু হচ্ছে! অর্থাৎ সময়ের ব্যবধানের কারণে সৌদির হজ্জের আমলের সাথে মিলিয়ে পৃথিবীর অন্য প্রান্ত থেকে রোজা রাখা ভৌগোলিক ও সামাজিকভাবে অসম্ভব ও যুক্তিহীন।
৪. বিশ্বখ্যাত আলেম ও ফতোয়া বোর্ডের মতামত
বিশ্বের বড় বড় স্কলার এবং ফতোয়া বোর্ড একমত যে, রোজা নিজ দেশের চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল।
সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহ.)-এর ফতোয়া:
তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতার কারণে যদি অন্য দেশে আরাফাহ’র দিন সৌদির সাথে না মেলে, তবে তারা কবে রোজা রাখবে? তিনি স্পষ্ট জবাব দেন:
"সবচেয়ে সঠিক মত হলো, চাঁদের উদয়স্থল ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন হতে পারে। ...অতএব, আপনারা যে দেশে বসবাস করছেন, সেই দেশের চাঁদের হিসাব অনুযায়ী যখন ৯ জিলহজ হবে, তখনই আরাফাহ’র রোজা রাখবেন।"_ মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড: ১৯
ইসলামিক ফিকহ একাডেমি (OIC):
১৯৮৬ সালে জর্ডানে অনুষ্ঠিত ওআইসি-এর ইসলামি ফিকহ একাডেমির বার্ষিক অধিবেশনে বিশ্বের শতাধিক শীর্ষ আলেম ও গবেষক সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেন যে, ঈদ ও রোজা উভয় ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক বা গ্লোবাল সাইটিং নয়, বরং প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব বা আঞ্চলিক চাঁদ দেখাকেই মানদণ্ড ধরতে হবে।
- বাংলাদেশের আলেমদের অবস্থান:
জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি এবং বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় মুফতি ও আলেমদের (দারুল উলুম দেওবন্দ ও দেশীয় ফতোয়া বোর্ডসমূহের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী) স্পষ্ট ফতোয়া হলো—বাংলাদেশিদের জন্য বাংলাদেশের চাঁদের হিসাব অনুযায়ী ৯ জিলহজ তারিখে আরাফাহ’র রোজা রাখা সুন্নাহসম্মত ও বাধ্যতামূলক।
রেফারেন্স: আল-বাহরুর রায়েক: ২/২৬৬; ফতোয়ায়ে উসমানি: ২/১৬৭
সুতরাং, কোনো রকম সংশয় বা দ্বিধাদ্বন্দ্বে না ভুগে, আমাদের বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে ঘোষিত জিলহজ মাসের ৯ তারিখে (ঈদুল আজহার আগের দিন) আরাফাহ’র নিয়তে রোজা রাখুন।
তাই আমরা বাংলাদেশে ইংরেজি ২৭ তারিখ, রোজ বুধবার আরাফার রোজা রাখবো; ইনশাআল্লাহ।
ইসলামে বিশৃঙ্খলা বা বিভ্রান্তির কোনো স্থান নেই। নিজের দেশের নিয়ম মেনে ইবাদত করাই শরিয়তের প্রকৃত সৌন্দর্য।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআন - সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন